>

অরুণ চক্রবর্তী

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 1/15/2017 |



ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস

দিনের কলেজ আর রাতের কলেজের তফাৎটা প্রথম দিনেই চোখে পড়ে। একই বিল্ডিংয়ে রাতের কলেজটা যেন ব্রাত্যজনের। অন্যদিকে দিনের কলেজ যেন রাজা। চোখেও পড়ে তা। এখানে তারুণ্য ছোটাছুটি করে, রাতের কলেজে ঝুঁকে পড়া যুবাদলের ফাঁকিবাজি। রাতের কলেজে রাজনীতি ছিল বার দুয়ারে, দিনের কলেজে রাজনীতি কলেজের ক্লাশরুমে, অলিন্দে। ক্যান্টিনে। সামনের রাস্তার ফুটপাথে। কলেজের প্রথম দিনেই  দেখি আমি রাজনীতির মুখোমুখি। আসলে আমার কলেজ অভিজ্ঞতায় রাজনীতি কলেজের ভেতরে এতটা প্রত্যক্ষ ছিল না। পাকিস্তানে আমাদের কলেজে রাজনীতি ছিল রাষ্ট্রব্যাবস্থার বিরুদ্ধে। শাসক শ্রেণীকে ক্ষমতাচ্যুত করার রাজনীতি। দলমত নির্বিশেষে আমরা এই লক্ষেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তাম। আমাদের পথ আলাদা ছিল, লক্ষ ছিল এক। কলকাতার কলেজ রাজনীতিটা দেখি অনেকখানি প্রত্যক্ষ। এই রাজনীতি রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে না। এখানে রাজনীতি নিজের দলের জন্য আর অন্য দলের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য। সিটি কলেজে অন্যান্য কলেজের মতই দুটো গোষ্ঠী-- এসএফআই আর ছাত্র পরিষদ। এদের কাজ নিজেদের মূখ্য দল-- কম্যুনিস্ট পার্টি আর কংগ্রেসের দলশক্তিকে সমর্থনের সংখ্যায় ও শক্তিতে মজবুত করা। এদের নিজস্ব কোন এজেন্ডা নেই। আমি মেলাতে পারি না। তাই প্রথম দিন থেকেই নিজেকে রাজনীতির পরিমন্ডল থেকে দুরে রাখার চেষ্টা করে গেছি।

সেটা  সম্পূর্ণ হল এক ঘটনায়। কী এক কারণে ছাত্র পরিষদ মিছিল করবে বলে নানা ক্লাশ থেকে ছেলেদের রাস্তায় এনে দাঁড় করাচ্ছিলঅধ্যাপকরাও ক্লাশে এসে হৈ হট্টগোল দেখে টিচার্স রুমে ফিরে যাচ্ছিলেন। সবাই রাস্তায় দাঁড়াচ্ছিল , তাও না। কেউ কেউ  গেটের পাশে কলেজ ক্যান্টিনে ঢোকে, কেউ কেউ তো এদিক সেদিক চলে যেতে থাকে। আমার কী হল, রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়েই কয়েকজনকে বলছিলাম, 'এটা কেন? কালকে করো, আমরাও রেডি হয়ে আসব। একজন দুজন নয়, সবাই মিলে আরো বড় মিছিল করব,' এই ধরনের কোন কথা। কি হল, দেখি, আমার চারপাশে বেশ ভীড় জমে গেল, তা দেখে আমি গলা চড়াই। যুক্তির পর যুক্তি টানতে থাকি। হাততালি পড়তে লাগল। আমিও বলতে থাকি, চলো, ক্লাশে ফিরে যাই, স্যারদের ডেকে এনে ক্লাশ চালু করে দিই। হল কিন্তু। অনেকেই হুড় হুড় করে আবার ওপরে দোতলায় উঠে গেল। আমি আমাদের ক্লাসের স্যারকে ডেকে আনি, বলি, 'মিস্আন্ডার্সটায়ান্ডিং স্যার, আমরা কাল যাব, আজ ক্লাশ হবে,' স্যার এলেন, আমাদের ক্লাস চালু হয়ে গেল। সেই দেখে অন্য আরো কয়েকটা ক্লাশেও। শেষটায় মিছিলের কী হয়েছিল এখন মনে পড়ছে না।

পরের দিন কলেজে যেতেই, একজন লম্বা চওড়া, হাতা গোটানো পাঞ্জাবি আর পাজামা পরা, রোমশ বুক আর শক্তপোক্ত হাত, পলিটিক্যাল সায়েনস ক্লাশের বন্ধু, আমাকে দোতালার বারান্দার একপাশে ডেকে নিয়ে গেল। 'দারুণ করলি তো! তোর মধ্যে লিডার্শিপ কোয়ালিটি প্রচুর। শুনেছি, তুই এসএফআই সাপোর্টার? এবারের নির্বাচনে তোকে কলেজে আমরা চাই।' ছেলেটা লক্ষমীকান্ত দে। পরে, কম্যুনিস্ট পার্টি দুভাগ হলে, সিপিএমের এমএলএ হয়েছিল। বিধানসভায় একবার দলের চীফ হুইপও। আমি বলি, 'নারে লক্ষমী, আমি রাজনৈতিক পরিবারের বটে, কম্যুনিস্ট বাবা মা'র সন্তানও বটে। কিন্তু, আমি রাজনীতি করব না। আমি এ দেশের কিছুই জানি না। তা ছাড়া, আমার অন্য কাজ আছে। সেটা রাজনীতি না।' পরের দিনগুলোতে লক্ষমীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠল ঠিকই, কিন্তু সরাসরি ওদের কোন আন্দোলনেই আমি থাকি না। এই ঘটনারই পরপর, নাকি আরো কিছুদিন পরে মনে নেই, আমি ক্লাশে ক্লাশে আচমকা ক্লাশ বন্ধ করার বিরোধিতা করছিলাম। সব ক্লাশেই হাততালি মিলছিল। আমিও দ্বিগুণ উৎসাহী তখন। হঠাৎ দেখি, কয়েকজন তাগড়া ছেলে এগিয়ে এল, ক্লাশের ডায়াস থেকে আমাকে চ্যাং দোলা করে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামিয়ে সোজা একেবারে রাস্তায় শুইয়ে দিয়ে বলল, এ রকম লেকচারবাজী করতে দেখলে শালা...' সে কাজ ছাত্র পরিষদ করেছিল নাকি ধুরনদ্ধর লক্ষমীর ছেলেরা, তা এখন আর মনে পড়ে না। এটা মনে পড়ে, এই ঘটনার পরে কলকাতায় সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকান্ডে, একমাত্র ম্যাকনামারার কলকাতা সফরের আগে, আমি নিজেকে জড়াইনি কোনদিন। ম্যাকনামার ঘটনা অনেক পরে, আমি তখন ইউনিভার্সিটিতে।

লেকচারবাজির ফলে একটা কাজ হল, কলেজে আমার বন্ধু সংখ্যা বেড়ে গেল। সব স্ট্রিমের ছেলেরাই কোন না কোন মাত্রায় আমার কাছের মানুষ হতে থাকল। ক্যান্টিনে ঢুকলে একাধিক টেবিলে বসে আড্ডা দেয়ায় আর অসুবিধা থাকে না। এই ভাবে একদিন দেখা গেল, আমরা চারজন ঘণিষ্ঠ হয়ে গেছি। এবং বিস্ময়ের, আমরা চারজন চারটি ভিন্ন বিষয়ে অনর্স পড়ি। অভীক বাংলায়, সত্য ইকনম্নিক্সে, অর্জুন পলিটিক্যাল সায়েনসে। আর আমার তো ইংরেজি। আমি খুব খুশি চার পথের এই মোড়টাতে পৌঁছে। ওই তিনজনের মানসিকতা আর পছন্দের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারি সহজেই। আমি অবলীলায় অভীকের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা বাংলা সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে পারতাম, সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে অর্জুনের সঙ্গে বা সমাজ নিয়ে সত্যের সঙ্গে।  আমাদের আড্ডার চেহারাটা রকবাজী পর্যায়ের হয়ে দাঁড়াল। যদিও আমরা কলেজের কাছেই দুটো বেঞ্চের 'বসন্ত কেবিন' (কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের না) আর আমাদের রেল কলোনীর কাছে আমজাদীয়া ছাড়া আর কোথাও বসতাম না। অভীকের বাবা কলকাতার খুব নামী আইনী প্রকাশক, সত্যদের আছে একটি টেইলারিং শপ, শ্যামবাজারে। খুব নামী দোকান। অর্জুনের বাবা সাধারণ সরকারী কর্মচারি। বলতে পারব না, আমরা কি করে আড্ডার খরচা চালাতাম। আমি তো নইই। আমার কোন প্রশ্নই ছিল না। ওরা তিনজন ধনী সন্তান তাও না। ওরা মোটা অঙ্কের হাত খরচা পেত তাও না। তবু, চায়ের ওপরে সিঙ্গারা বা কাটলেট বা চাঁপ রোটি আমরা যে খেতাম না তাও না। তবে হ্যাঁ আমরা ভাগ করে খেতাম, তাই খরচাটা ভাগে কম পড়ত। আমাদের আরও একটা ব্যাপার অনুঘটকের কাজ করে থাকবে। সেটা, আমরা কেউই ব্রিলিয়ান্ট ছিলাম না। আমরা ছিলাম সাধারণ মেধার ছাত্র। তাই আমাদের কথাবার্তা কখনই কোন গূঢ় আলোচনায় বদলে যেত না। 

আমার অনর্স পড়ায় কতগুলো অসুবিধা ছিল। প্রথম অসুবিধা, ইংরেজি সাহিত্যের বই দামী, সেগুলো কেনার ক্ষমতা আমার নেই। দ্বিতীয়ত আমি পাকিস্তানের ছেলে, ভারতে ইংরেজি সাহিত্যের প্রেফারেনস জানি না। তৃতীয়, আমার সাধারণ মেধা। ক্লাশ ফলো করা তাই ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে পড়ল। সঙ্গে ছিল বাংলা আর পলিটিক্যাল সায়েন্স। আমার তাইতে মনযোগ বেশি। সেগুলো তো বই ছাড়াই ম্যানেজ করা যায়, সে কারণেও হতে পারে। ধীরে ধীরে এই অবস্থান থেকে মুক্তির উপায় বার করলাম, খুব যে এফেক্টিভ হল তা অবশ্য নয়। আমি দ্রুত লিখতে পারতাম ছোটবেলা থেকেই। ভাদুড়ি দিদিমা, ক্যাবলার ঠাকুমা, কিরণ কাকিমা এদের হয়ে আমিই তো পোস্টকার্ডে চিঠির ডিকটেশন নিতাম। আমি ক্লাশে স্যারদের লেকচার যতটা সম্ভব ভারবাটিম নোট করতে লাগলাম। ঘরে ফিরে সেগুলোয় চোখ বোলাতাম আর সে সব ছড়িয়ে ছড়িয়ে ভাবতাম। কিছুদিনের মধ্যে বিষয়গুলো অনেকটা ঝরঝরে হয়ে উঠতে লাগল। আমার এই মনযোগী নোট নেয়াটা অলক্ষে একটা সুফলও এনে দিল। স্যাররা ভাবলেন, তাঁদের লেকচার আমার ভালো লাগে, তাই নোট করি। ভাবলেন, আমি একজন সিরিয়াস স্টুডেন্ট। ভাবলেন, আমি মেধাবী। আর এভাবেই আমি ওঁদের চোখে মিছিমিছি ক্লাশের একজন ভালো ছাত্র হয়ে উঠলাম। আমি অবশ্য আমার আসল দুর্বলতা কারু কাছেই ফাঁস করি না। এমন কি ওই তিন বন্দ্ধুর কাছেও না। এই মিথ্যের পরিমন্ডলেই একটা সময় এলো, যখন আমি নিজেও নিজেকে ভালো ছাত্র ভাবতে শুরু করি।

সিএন রায় স্যার আমাকে ভালোবাসবেন, এতে অবাকের কিছু ছিল না। ওঁর সুপারিশেই আমার ইংলিশ অনর্সে ভর্তি হওয়া। স্যারের বাড়ি যেতাম। আমার কাছে বই নেই এ কথা বলতাম না কখনো। আমি ক্লাশের নোট থেকে যা বুঝতাম সেটাই ওঁর কাছে বলতাম। ভুল হলে শুধরে দিতেন বা নানান ক্লাশ নোট পড়তে দিতেন। কখনো বা একটা দুটো রেফারেন্স বইও দিতেন। ফেরত দেবার শর্তে। আমি ঘরে এসে সে সব নাড়াচাড়া করে খুব একটা কিছু বুঝে ফেলতাম তা নয়। তবে ইংরেজি সাহিত্যের একটা বাতাবরণের ছোঁয়া পেতাম অবশ্যই। আমার মস্ত অসুবিধা হচ্ছিল, ইংল্যান্ডের আকাশ বাতাস সমাজ মানুষ কোন কিছু সম্পর্কেই আমার কোন সম্যক ধারণা নেই। আমি বাংলা সাহিত্যের ছাত্র না হয়েও অভীকের সঙ্গে বাংলা নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা চালিয়ে যেতে পারতাম, সেটা বাংলা সাহিত্যে আমার দখল আছে, তা বলে তো নয়, বরং সেটা সম্ভব হত আমি বাংলাকে বেশি করে চিনি বলে। বাংলার মাটি মানুষ নদী নালা সমাজ জীবন যাপন অর্থনীতি সব কিছুতেই আমার একটা প্রত্যক্ষ ধারণা তো ছিল, এবং সেটাই আমাকে বাংলা সাহিত্যকে আমার কাছে অচেনা অজানা করে রাখত না। কিন্তু ইংরেজির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। আমার কাছে ইংল্যান্ডের পরিচয় একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে, তার বাইরে কিছু না। কিন্তু যত বেশি ক্লাশ করতে শুরু করলাম ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে আমার প্রাথমিক অজ্ঞানতার কুয়াশাটা ধীরে ধীরে হাল্কা হতে থাকে। কিন্তু স্পষ্ট হয় না। আমাদের একটা ক্লাশ হত ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস। এই ক্লাশটা আমাকে খুব আকর্ষণ করত। একটাই কারণ, যিনি পড়াতেন, মনে হত, তিনি ইতিহাসের মাস্টারমশয় বেশি, সাহিত্যের মাস্টারমশয় কম। এই ক্লাশটা ধীরে ধীরে হলেও আমাকে ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করাতে পারছিল। এক বন্ধুর কাছে আ হিস্ট্রি অফ ইংলিশ লিটারেচার নামে একটা বই দেখলাম। ঢাউস। দামও ঢাউস। ভয় পেয়ে যাই।

একদিন অভীকদের ডাইনিং টেবিলে, ওটাই ছিল আমাদের চার বন্ধুর কাছে  ড্রইং রুম, সাহিত্য আর সমাজ নিয়ে আমার গুব্লেট চিন্তার কথা আলোচনা করছিলাম। মাসিমা এই সময়ে আমাদের এটা ওটা খেতে দেন, আমাদের কথাবার্তা শুনে বললেন, 'তুই একবার শমীকের সঙ্গে দেখা কর। আমাদের কলেজে ইংরেজি পড়ায়।' মাসীমা সিটি মর্ণিং মানে, মেয়েদের কলেজ, রামমোহন কলেজে হিন্দী পড়ান। মাসীমা কানপুরের প্রবাসী বাঙালি। শমীক মানে শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি এখন বাংলা ও সাহিত্য সিনেমা বিষয়ে অথরিটি, তিনি। দু'তিন দিন পরে মাসীমা যখন বললেন, আমার কথা ওঁকে বলেছেন, পৌঁছে গেলাম। বললাম, আমি একটা ঠিকঠাক সহজ হিস্ট্রি অফ লিটারেচারের বই খুঁজছি। কিন্তু সব ক'টা বই এত বিশাল বিশাল, সাহস পাচ্ছি না, আর তা ছাড়া পার্ট ওয়ান পরীক্ষার পরেই তো ওটা আর কাজে লাগবে না। আমার পরের কথাগুলো নিশ্চয়ই হাস্যকর ঠেকেছে শমীকবাবুর, হাসলেন, 'কেন? সাহিত্য নিয়ে পড়বে না? ইতিহাস তো সব সময়ই কাজে লাগবে।' বুঝলাম, ধরা পড়ে গেছি। চুপ করে থাকি। উনি নিজেই বললেন, তুমি একদিন এসো, আমার কাছে একটা হিস্ট্রি বই আছে। তোমাকে দেব। ইতিহাস মানে, বলতে পার, ইতিহাসের অ্যাব্রিজ্ড ভার্সান। বুকের পুকুরে ঢিল পড়ে, আমি তো তেমনই একটা সিরিয়াস ফাঁকিবাজি পড়াশুনার পথই খুঁজছিলাম!

বইটা অ্যালবার্টস হিস্ট্রি অফ ইংলিশ লিটারেচার। বেশি মোটা না। বইটা মাস দুই তিনেকের মধ্যে আদ্যপান্ত পড়ে ফেলি। আর আমি আমার মত করে ইংলিশ অনর্সের 'ভালো' ছাত্র হয়ে যাই।

----------
(এরপর পরবর্তী সংখ্যায়)


[অরুণ চক্রবর্তী]

Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.