>

সুপ্রিয়া রায়

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 3/15/2017 |



ভাষার পরিবর্তন অনেক হয়েছে, বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষা থেকে আমরা অনেক দূরে এসেছি। তারাশঙ্কর, শরৎচন্দ্রের ভাষাই কি আমরা ব্যবহার করি? এখন কথায় কথায় আমরা একটু ইংরেজি শব্দ জুড়ে দিই- বক্তব্যটা জোড়ালো করার জন্য। যেমন অনেক বাঙালী দোকানদারকে বলতে শুনেছি, “ দিদি, এই শাড়ীটা কি stylist বা decent?” প্রথম প্রথম সংশোধন করার চেষ্টা করেছি- stylist নয়  stylish, বৃথা চেষ্টা। কতজনকে বোঝাবো? ওটা ত universal হয়ে গেছে। ওই দেখুন, আমিও দোষে দোষী।
     
এমন ত আমার নিরক্ষর কাজের মেয়ে ১৪ই ফেব্রুয়ারী যে ভ্যালেন্টাইনদিন জানে- সেদিন বাজারে লাল গোলাপের দাম বেশী থাকে সেটাও জানে।
     
আমার গল্প এক solid middle class background- এর দুই মেয়েদের নিয়ে।  middle class কি করে solid বা liquid হয়? এক দেশের উন্নতি-সভ্যতার মাপকাঠি ত মধ্যবিত্তরা, বা স্থিতিশীল অবস্থার মধ্যবিত্তদের জন্য। ইতিহাস বলে যে দেশে শুধু উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্ত সে দেশের মূল্যবোধ অন্যরকম।

সেইরকম এক solid মধ্যবিত্ত বাড়ীর একটি solid মূল্যবোধ সম্পন্ন এক মেয়েকে নিয়ে। বাবা উচ্চশিক্ষিত, কোন এক বাণিজ্যিক সংস্থানের বড় কাজ করছেন কোন দুনম্বরী করেননি। কিন্তু লক্ষ্মীর পূজার সঙ্গে সরস্বতীর পূজা করে গেছেন সারাজীবন। মেয়েকে শিখিয়েছেন বিদ্যা চর্চা এক মানুষকে কত সমৃদ্ধ করে। মা শিক্ষিতা, স্বল্পভাষিণী, অতি মার্জিতরুচি সম্পনা আর গৃহকর্মা নিপুণা। এই পরিবেশে কেকা বড় হয়েছে- ছোটবেলা বড় সুন্দর। ভালো স্কুলে পড়েছে, গান শিখেছে, বাবা-মা মূল্যবোধ শিখিয়েছেন আর শিখিয়েচ্ছেন অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ না করতে।
     
কেকার স্কুলজীবন বড় সুন্দর, মেধাবী ছাত্রী- বিদ্যা অর্জন কখনও এক পীড়াদায়ক ব্যাপার হয়নি- কলেজে থাকতে মেশবার সুযোগ পেল ছেলেদের সঙ্গে। খুব ভাব হলো সজলের সঙ্গে, ভাব থেকে প্রেম। মেয়েমহলে সজলের খুব চাহিদা। নিন্দুকরা তার নাম দিয়েছিল কলির কেষ্টকেকা ওইসব কানে দেয়নি, নিন্দুকরা ত ওইসব বলেই থাকে। প্রেমে হাবুডুবু খেলে ওসব কথা শুনতে ভালো লাগে না। বাবা মা চিন্তিত, কিন্তু দেখলেন পৈতৃক সম্পত্তি আছে, পরিবারের সবাই ব্যবসা করে, সজলও পৈতৃক ব্যবসায়ে যোগ দিয়েছে। বেশ রমরমা অবস্থা। কলিকাতার আভিজাত্য এলাকায় বিরাট বাড়ী। এক এক তলা এক এক ভাইয়ের। কোলকাতার কয়েকটি নামকরা ক্লাবের সদস্য। তারপরে ব্যবহারে কোন খুঁত নেই। মন রেখে কথা বলতে জানে। চেহারাতে যাকে বলে সোজা বাংলাতে smart (স্মার্ট)। ভগবান কোন কার্পণ্য করেননি, তারপরে অপুর্ব গানের গলা- মেয়েদের মন জয় করার এক বিরাট অস্ত্র। তারপরে সজল ক্লাবে গিয়ে ইংরেজী pop song আর হিন্দী সিনেমার গান করে। শ্বশুরবাড়ীতে এসে রবীন্দ্রসঙ্গীত। কেকার সঙ্গে গলা মিলিয়ে, ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানাধূমধাম করে বিয়ে হলো। কিন্তু কেকার বাবা-মার মনে মনে অজানা এক ভয় উঁকিঝুঁকি দিতে থাকলো- solid মধ্যবিত্ত আর liquid মধ্যবিত্তের লড়াই। বাঙালী কি এই কারণে ব্যবসা করতে পারে না- যারা ব্যবসা করে তাদেরকে নিয়ে এক অহেতুক ভয়।
     
বিয়ের পরে কেকা আনন্দ সহকারে সংসার করতে লাগলো। এক বাড়ীতে থাকা, কিন্তু ঠিক যৌথ পরিবার নয়। ওদের আলাদা ফ্ল্যাট। মার শিক্ষায় কেকা অতি সুগৃহিনী- অপুর্ব রান্নার হাত। সজলের সুবিধে হলো। ব্যবসার খাতিরে যাদের খাওয়ানো দরকার তাদের বাড়ীতে ডাকতে শুরু করলো। দুহাতে খরচা। কেকা কোনদিন আয় ব্যায়ের হিসাব রাখেনি। মাকে কখনও দেখেনি ব্যায়ের হিসাব রাখতে- ভুলে গেলো যে বাবা এক নামকরা সংস্থানে চাকরি করতেন-সুতরাং মাপা টাকা, আর এখানে ব্যবসা। এক ছেলে আর মেয়ে হলো। সেখানেও কেকা এক সার্থক মা। খুশীতে ডগমগ করছে। বাচ্চারা বেশ ছোট সেইসময়ে একদিন সজল একটু কাঁদো কাঁদো ভাবে বললো কেকা যদি একটা চাকরি করে ত ভালো হয় কারণ ব্যবসাতে সবসময় একরকম রোজগার হয়না আর খরচা বড় বেড়েই গেছে। কেকা কৃতী ছাত্রী ছিল তাই সেই স্কুলে চলে গেলো চাকরির সন্ধানে। চাকরী হয়ে গেলো। মা আর শ্বাশুড়ী ভার নিলেন বাচ্চাদের দেখাশুনায়।
     
বুদ্ধিমতী কেকা বুঝতে পারেনি স্বামীর চাতুরী। স্বপ্নেও ভাবেনি যে স্বামী সব জায়গায় সময়মতো পাওনাদারদের টাকা দেয়না। কেকা সরল মনে সংসারের মাসকাবারি বাজার করে তার উপার্জন থেকে। ক্লাবে যাওয়া, লোক খাওয়ানো চলতেই থাকে। কেকা হঠাৎ আবিষ্কার করে তার একটা শৈল্পিক দিক আছে- মেয়ের জামায় এক ছবি এঁকে ফেললো। প্রশংসায় সবাই মুখরিত। প্রশংসা মানুষকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। নানারকম experiment চললো। প্রথমে কিছু করে লোককে উপহার দিতো পরে সেটা ব্যাবসায় দাঁড়িয়ে গেলো। এত ব্যাস্ততার মধ্যে খেয়াল করেনি কি করছে। সজল মনের সুখে আরো ক্লাব, আরো গান করে মেয়েদের মনোরঞ্জন করছে।
     
কেকার মা অতি সরল, রুচিবোধ বাধ সেধেছে মেয়েকে কিছু বলতে। জীবনটা কি এই? খালি উপার্জন করা আর তারপরে কিছু লোকেদের জন্য প্রাণপাত রান্না করে খাওয়ানো। ব্যাবসা করতে হলে হয়তো এসব করতে হয়। তিনি ক্লাব culture-এ ওয়াকিবহাল নন।
     
কেকা এখনও স্বামীকে সরল মনে বিশ্বাস করে, মনে করে স্বামী এখনও তাকে আগের মতনই ভালোবাসে। বাচ্চাদের বড় করার দায়িত্ব সবই তার। তারা কি খাবে, school এর টাকা দেওয়া, তাদের পড়া দেখে দেওয়া, এসব কাজ তো সত্যিই মেয়েদের কাজ। কোন বাড়ীতে বাবারা ছেলেমেয়েদের homework দেখিয়ে দেয় বা এ বোতাম আছে কি না দেখে!যদি হয় তো সেটাই অস্বাভাবিক এক বাঙালী বাড়ীতে।
     
স্কুলের কাজে কেকার খুব সুনাম। আসলে কেকা যা করে মনপ্রাণ দিয়ে করে- কোন ফাঁকি নেই। ভালোই লাগে স্কুলে যেতে। যেসব teacher দের কাছে পড়েছে তারাই এখন তার colleaguePrincipal স্নেহ করেন। ছাত্রীরা সম্মান দেয়। Staff room এ বেশ মজা হয়। যে টেবিলে বসে সেই টেবিলে অনেকেই ভালো রাঁধে তাই lunch time টা অনেক সময় feast-এ পরিণত হয়। কেকাও আগের রাতের খাবার খাইয়ে অন্যদের তাক লাগিয়ে দেয়।  ভাব হলো সুমনার সঙ্গে। সুমনা নিচু ক্লাসে পড়ায়, ভালো রাঁধে। রান্নায় কি মশলা পড়েছে- এই আলোচনা থেকে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো।

দুজনে tiffin ভাগ করে  খায়। সুমনাকে দেখে কেকার বড় কষ্ট হয়। ছোট মেয়েকে সঙ্গে করে একবস্ত্রে বাপের বাড়ীতে চলে এসেছে। অথচ সুমনাও তার মতন এক solid middle class থেকে এসেছে। বাবা এক নামকরা পরিবারের- বিলেতে পড়াশোনা করে এক বাণিজ্যিক সংস্থানে বিরাট কাজ করছেন। মা এক উচ্চশিক্ষিকা গুণী মানুষ। কিন্তু সুমনা প্রেমে পড়লো এক liquid middle class ছেলের সঙ্গে। ছেলের বাবার নাকি একমাস লেগেছিলো পৈতৃক সম্পত্তি উড়িয়ে দিতে। বাপকা বেটা কুছ নেহি ত থোরা থোরা। কিন্তু সুমনার বর দেখতে ভালো - প্রায় greek god-এর মতন- ইংরাজী ভালো বলে বাংলা accent-এ নয়- ছোটবেলায় missionary school এ পড়ার ফল। চলাফেরা কায়দা দুরস্ত- আর মেয়েদের মন কি করে জয় করতে হয় সে সব আটঘাট জানে। নিন্দুকরা বলে বিয়ের আগেরদিনও সুমনার বাবা এই বিয়েতে মত দিতে পারেননি। মেয়েকে বলেছিলেন এই বিয়ে ভেঙে দিতে- আর্থিক ক্ষতি বা সামাজিক মানহানির কথা না ভেবেই। ভূমিকম্পের কাঁপন অনুভব করেছিলেন- বলেছিলেন তার স্বভাববিরুদ্ধ ভাষায় ঐ মাকাল ফল আমার মেয়েকে সুখী করতে পারবে নাকপালের লেখন কেউ খণ্ডাতে পারে না বোধহয়। বিয়ে যথাসময়ে হলো। বড়লোকের আহ্লাদী মেয়ে জেদের বশে বিয়ে করে রাতারাতি সংসারী হয়ে গেলো। হতেই হলো। শ্বাশুড়ী কুটোটি নাড়েন না- বর বেশীরভাগ ছেলের মতন বাড়ীর কাজে অনভ্যস্থ। সুমনা মাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করে কোন ডালে কি ফোড়ন দিতে হয়। বেশী সময় লাগে না- অপূর্ব রান্নার হাত- শ্বাশুড়ী আরও অকেজো হয়ে গেলেন। বাবার অমতে বিয়ে করেছে তাই বাপের বাড়ীতে বলে না দৈন্যদশার কথা। সংসারের কাজ করে দুপুরবেলা থেকে tuition করতে শুরু করলো। জীবনে এত খাটেনি। একসময়ে একঘণ্টা ধরে চান করতো সে।  সুমনার চান করার পরে লোকে সেই বাথরুমে যেতে ভয় পেতো- অর্ধেক শিশি talcum powder মেজেতে পড়ে থাকতো। সেই মেয়ে কোনরকমে কাকস্নান করেই কাজের মধ্যে ডুবে থাকে।
     
প্রতিদিনই স্বামীর এক একটি রূপ প্রকাশ পেতে লাগলো। স্ত্রীর সঙ্গে আর ভালো লাগে না- তাই রাত করে বাড়ী ফেরে - মুখে মদের গন্ধ। সুমনা কাকভোরে উঠে সকলের জন্য জলখাবারের ব্যবস্থা করে- নিজের অর্ধেকদিন ঠিক করে খাওয়া হয় না বা খেতে গিয়ে দেখে পাউরুটি কম বা মাখন নেই। চারজন ঝি এর কাজ একলা করে। Tuition থেকে বাজার করে গলদঘর্ম হয়ে ফিরে দেখে শ্বাশুড়ী সেজেগুজে পাড়া বেড়াতে গেছেন। নাতনীর দেখাশোনা করতে রাজী নন। উলটে খোঁটা দেন যে বাপের বাড়ীতে কোন কাজ শেখেনি। এরমধ্যে একদিন স্বামীকে টাকা দিয়ে বললো electricity bill-টা অফিসের পথে দিয়ে যেতে। বলা বাহুল্য, সেটা অন্য জায়গায় খরচ হয়ে গেলো। স্বামী দেবতা কিছুদিন পরে আমতা আমতা করে বললেন যে অন্য জায়গায় খরচা হয়ে গেছে। মদ না মেয়েমানুষ? সেটা পাঠক পাঠিকারা ভেবে নেবেন। একদিন সুমনা বাড়ীতে একটা ফোন পেলো office থেকে ফোন। আবার এক বজ্রাঘাত- শুনলো স্বামীর office নেই তিনমাস চাকরি নেই- প্রত্যেকদিন বেড়িয়ে যাওয়াটা খালি দেখানোর জন্যে। সুমনা আর সহ্য করতে পারছে না- জেদ করে প্রেম করে বিয়ে করে এ কি করলো? বাপের বাড়ীতে বলতে পারে না- কি বলবে?

জীবনটা মনে হচ্ছে এক বিরাট বোঝা- সেরকম বন্ধু নেই যাকে বলতে পারে। নিজের বোনকে বা বাপের বাড়ীর কাউকে বলতে পারছে না- তাদের তো  মত ছিল না এই বিয়েতে। ছোট মেয়েকে নিয়ে কি করবে? অতি কষ্টে এক ঠিকে ঝি জোগাড় করলো- সেইসময়ে দু-তিনটে আরও tuition নিয়ে নিলো।

সুদর্শন স্বামী এবারে দেরী করে বাড়ী ফেরে- টলতে টলতে মাতাল স্বামীর চাহিদা আরও বেড়ে গেছে- শয্যাসঙ্গিনী হতেই হবে- কোন অজুহাত শুনবে না। শ্বাশুড়ী কিছুই না বোঝার ভান করে চলেন। ঠিকে ঝি একদিন সুমনার বাপের বাড়ীতে গিয়ে বলে দিলো আহ্লাদী দিদিমণি’-র দুরাবস্থা। সুমনার মা অহংকারী, কোনদিন কারুর কাছে মাথা নত করেননি- গুমরে গুমরে মরে যাচ্ছেন। অসহায় অবস্থায় একদিন কেঁদে ফেললেন ননদের মেয়ের কাছে। সে সান্ত্বনা দিলেন যে শুধু কান্নাকাটি করে লাভ হবে না বরং সুমনাকে স্বাবলম্বী করতে হবে। একটা বড় স্কুলে কাজ জোগাড় করে দিলো- সেখানে কেকা কাজ করে। একটা সুবিধে হলো মেয়ের পড়াশুনা free হলো।

সারাদিন স্কুলে কাজ করে তারপরে স্কুলের পরে tuition করে একটু সুরাহা হলো। স্কুলের পরিবেশ অতি স্বাস্থ্যকর। সবাইকার সহানুভূতি এই নির্যাতিতা মেয়েটির প্রতি। কেকার সঙ্গে এক টেবিলে বসে আরো অনেকের সঙ্গে। কেকা দেখে সুমনার টিফিন বক্সে একটু পাউরুটি। কেকার অর্থাভাব নেই তারপরে রন্ধনে পটু তাই ও একটু বেশী করে আনতে শুরু করলো। এইভাবে দুজনের বন্ধুত্বের সূত্রপাত। -

সুমনার স্বামীর এখন পোয়া বারো- সংসারের ভার বইতে হচ্ছে না বরং electric bill এর টাকায় নিজের স্থূল কামনা বাসনা পূর্ন করতে পারছে। সুমনা টের পেলো যখন electric line কেটে গেলো। এরকম অনেক উদাহরণ। বন্ধুদের দোকানে গিয়ে সুমনার নামে ধারে শাড়ী কিনে অন্যকাউকে উপহার দেওয়া। Shock treatment চলছে কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদের কথা ভাবতে পারে না। পৃথিবীর নব্বই শতাংশ মেয়ের মতো ভাবে স্বামী ভুল বুঝবে একদিন। শুধরে যাবে। হয় না, হবেও না। এখনও পৃথিবী পুরুষশাসিত আর কোথাও মেয়েরা ভয় পায় সব বন্ধন ছিন্ন করে একা থাকতে। সমাজ যে নুন্যতম সাহায্য করে না।

একদিন রাতে সুমনার স্বামী টলতে টলতে এসে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত স্ত্রীকে ধর্ষণ করলো। বাধা দিতে গিয়ে নির্যাতন আরও বেড়ে গেলো। সারা শরীরে যন্ত্রণা- মানসিকভাবে হতাশ। পরের দিন স্কুলে যেতে পারলো না। গুমরে গুমরে মরলো, ভাগ্যকে দোষারোপ করা ছাড়া আর কোন অস্ত্রই নেই হাতে। নিজে বিয়ে করেছে সবাইকার অমতে তাই নিজের মাকেও বলতে পারলো না। দিনগত পাপক্ষয় হতেই লাগলো। কিছুদিন পরে নির্মম আঘাত- সুমনা আবার সন্তানসম্ভবা সেই কুৎসিত রাতের পরিণাম। কি করবে? স্বামীর অত্যাচার চলতেই থাকলো। তিন মাস কেটে গেছে। একদিন দুজনের কথা কাটাকাটি তার থেকে আবার শারীরিক অত্যাচার- সুমনা জ্ঞান হারালো।

জ্ঞান হলো সকালে যখন সে অনেক রক্তের মধ্যে রয়েছে। শরীরে জোর নেই যে উঠে কাউকে ডাকে। সেদিন সুমনা মরে গেলে হয়তো ভালো হতো। না, আরও নাটক বাকী আছে। এক প্রতিবেশিনী ভাগ্যচক্রে এসে পড়লো আর ঐ অবস্থায় দেখে সবাইকে খবর দিলো। প্রায় এক সপ্তাহ হাসপাতালে ছিলো- সন্তান নষ্ট হলো। ভালোই হলো! বাঁচলে খালি সুমনার ঐ অত্যাচারের কথা মনে হতো। সুমনার মা এবারে এগিয়ে আসলেন মেয়েকে সাহস দিলেন বিবাহ-বিচ্ছেদের। সুমনা তার ছোট মেয়েকে নিয়ে প্রায় একবস্ত্রে বাপের বাড়ীতে চলে আসলো।

স্কুলের সবাই সহানুভূতিশীল, সবথেকে বেশী কেকা। এখন আর খাবার নয়। বাড়ীতে নিয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রীতে সুমনাকে সব জায়গায় নিয়ে যায়। আলমারি খুলে নিজের শাড়ী পড়তে দেয়। কেকার বুক ফেটে যায় সুমনার কষ্ট দেখে। কিভাবে ওর জীবনটা একটু সুখের হয়, মুখে যেন একটু হাসি ফোটে। দুজনের অনেক মিল। দুজনেই ভালো রান্না করে, দুজনেরই শিল্পী মন, অপূর্ব হাতের কাজ। Design করে শাড়ী বানায়। দিনগুলি হৈ হৈ করে কাটাতে থাকে। এদিকে divorce-এর জন্যে আলিপুর কোর্টে যেতে হয় শুনানি শুনতে। কেকার নরম মন। ভাবলো সুমনা একা যাবে ওর পক্ষে সম্ভব নয় স্কুল কামাই করে স্বামিকে বলে দিলো সুমনাকে নিয়ে যেতে। পাশে একজন পুরুষ থাকলে মানুষ মনে বল পায়। সমাজ বড় নির্মম- পুরুষবিহীন এক নারী একা লড়াই করছে এটা লোকে ভালো চোখে দেখে না। সুমনার মা উদারহস্তে মেয়েকে আর ছোট নাতনীকে সব রকম সুখ দেবার চেষ্টা করলেন। বাড়ী পর্যন্ত লিখে দিলেন মেয়ের নামে।

Divorce হয়ে গেলো। এক বাড়ীতে রয়েছে বলে সুমনার লড়াই একটু কম হলো। কেকা আর সুমনা এখন অভিন্নহৃদয় বন্ধু। কেকার স্নেহপ্রবন মন, সুমনাকে নিজের ভালো শাড়ী পড়তে দেয়, সিনেমায় নিয়ে যায়, ক্লাবে নিয়ে যায়। একসঙ্গে রান্না করে সজলকে খাওয়ায়, বন্ধুদের খাওয়ায়। পৃথিবীতে সন্দেহবাতিক লোকের অভাব নেই। তারা তির্যক মন্তব্য করেছে কিন্তু কেকার কানে পৌঁছায়নি। একজনের মুখে হাসি ফুটিয়ে ওর জীবন পরিপূর্ন। পরোপকার করার মধ্যে এক স্বর্গীয় আনন্দ আছে। ওরা যে solid middle class পরিবেশে মানুষ। কাউকে সন্দেহ করা, বা পরনিন্দা, পরচর্চা করা ওর স্বভাবে নয়, সময়ও নেই।

একদিন শরীর খারাপ, গায়ে জ্বর, স্কুলে যেতে পারলো না কেকা। প্রায় দুপুরবেলা কলিংবেল বেজে উঠলো- দেখে একজন কাজের মেয়ে হাতে একটি অপূর্ব কেক, দেখেই বোঝা যায় দোকানে কেনা নয়। একজন তার সমস্ত-হৃদয় ভালোবাসা, দরদ দিয়ে তৈরী করেছে। শৈল্পিক মনের পরিচয় পাওয়া যায়। কেকের সঙ্গে একটা খাম তার ভিতরে একটা কার্ড। কেকা তার স্বভাবগত সারল্যে কার্ডটা পরে ফেললো। সেটাই কাল হলো। মনে হলো ভূমিকম্প হচ্ছে। চিঠিটি ওর স্বামী সজলের জন্য। এক প্রেমিকার আত্মনিবেদন। কেকা বুঝল এই হৃদয় দেওয়া নেওয়া অনেকদিন ধরেই চলেছে। সেই যে শয্যাশায়ী হলো কেকা, হাজার চেষ্টাতেও উঠতে পারলো না। এ তো দুই দিক থেকে বিশ্বাসঘাতকতা- স্বামী ও প্রিয় বান্ধবী। মানবজাতি সম্বন্ধে এক তীব্র রাগ, ক্ষোভ, বিদ্বেষ। কি করবে? ছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ী চলে যাবে? কিছু ভাবতে পারছে না। শরীর ও মনের যে নিবিড় সম্পর্ক এইরকম পরিস্থিতিতে বোঝা যায়। সেই যে বিছানা নিলো, স্কুল থেকে ছুটি নিতে হলো।

এসব রসালো গল্প মূহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। দুই দল হয়ে গেলো। একদল কেকার দুঃখে দুঃখিত। আরেক দল বাধ্য হলো সুমনার দিকে। তারমধ্যে অবশ্যই সুমনার মা। তিনি যে solid middle class, বিদুষী। তিনি লজ্জায় মাথা নিচু করে রইলেন। কেকাকে দেখতে যাবার মতো দুঃসাহস নেই।

শরীরে যখন একটু বল পেলো কেকা, মন্থরগতিতে স্কুলে গেলো। কিন্তু টিফিন বক্সে একজনের জন্য টিফিননিজের জন্যে। দুই অভিন্ন হৃদয় বন্ধু এক পুরুষের জন্য ভিন্ন হয়ে গেলো। অন্যঘরে গিয়ে বসলোস্কুলে তো টিচারদের তিনটি ঘর। যন্ত্রের মতো কাজ করে গেলো। দুই বন্ধু মুখোমুখি হলে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। দুজনেরই মনের মধ্যে ঝড় চলছে। সজলের কি অবস্থা? না, সে ঠিক আছে তার জায়গায়। সে ক্লাবে গিয়ে মদ খাচ্ছে, গান করছে। কোন হেলদোল নেই। সে যে পুরুষ। ও কি করবে? মেয়েরা যে ওর সঙ্গ চায়। তাছাড়া ও যে liquid middle class.              

সুপ্রিয়া রায়

Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.