>

কল্যাণ মুখোপাধ্য়ায়

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 5/15/2016 |




************************


                    হঠাৎ করে আমার transfer হয়ে গেল ছিলাম উত্তরবঙ্গের একটি জেলার  S.P.  চলে এলাম কলকাতার অফিসে একদম অসময়ে বিনা মেঘে বজ্রপাত মাসখানেকের মধ্যে জেলার বাংলো ছেড়ে সপরিবারে চলে আসতে হবে কলকাতায় কপাল ভালো শহরতলীতে একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট কেনা ছিলো কেনার পর থেকে যদিও সেখানে কোনোদিন পদধূলি পরেনি। স্ত্রীর দাবি ওই Flat   উঠতে হলে তাকে আপাদমস্তক  Remodel  করতে হব Make over আর কি ! নবরূপায়ন ঘরের ব্যাপারে ঘরণীই শেষ কথা - এই আপ্ত বাক্যটি মনে  রেখে, সহবাসিনীকে  (religion এর খোপটা শূন্য রাখি বরাবর - তাই সহধর্মিনী বলতে পারি না বোধহয়) নিয়ে এলাম নতুন flat-

                   Flat এর দরজা খুলেই শুরু  হলো মহীয়সীর  নির্দেশনা।  "এই দেওয়ালটা ভেঙে ফেলতে হবে ৷ ওখানে একটা দরজা বসাতে হবে। এখানে এক সেট তাক করতে হবে তোমার ওই কয়েকশো বই কোথায় রাখবে বলো তো! ব্যালকনিতে কাঁচ বসাতে হবে আমি পেছন পেছন একটা ছোটো নোটবুকে নোট নিতে থাকি  বাজার-সরকারের  মতো  

বাথরুমের দরজা খুলে কালীপটকার মতো ফেটে উঠলেন তিনি ,  "এটা বাথরুম ? এর চেয়ে তো ট্রেনের টয়লেট বড়ো হয় ! " 
   "কেন ? বাথরুমে তো একসাথে দুজন যাব না মনে হয় " --  আমি  একটু কৌতুকী হবার চেষ্টা করি
    "না , না , চলবে না বাথরুমটা Extend করতে হবে দরকারে passage টা সরু করতে হবে
    "Passage  সরু করা যেতেই পারে তবে তোমার ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যোন্নতি  আশংকার কারণ 'তে  পারে "
 বারুদে আগুন পড়ার মতো জ্বলে উঠে তিনি বললেন  "বাজে বোকো না তাহলে তোমার ফেসবুকের তন্বী বান্ধবীদের নিয়েই থাকো সরু  passage দিব্যি গলে যাবে আর ঘুলঘুলি মার্কা বাথরুমেও অসুবিধা হবে না
 ফেসবুক নিয়ে খোঁটা আমি "মুখে - বুকে"  মাখি না দার্শনিকের মুখ করে হজম করলাম  

প্রসঙ্গ পরিবর্তনের  আশায় বললাম  "রান্নাঘর দেখবে না ?" 
  "আরে  হ্যাঁ ! কিচেন ! কিচেন তো দেখতেই হবে কিচেনেই তো আমার অর্ধেকটা সময় কাটে

কিচেনে অবশ্য ঢুকতে হল না - বাইরে থেকে দেখেই এক্কেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন প্রিয়তমা!
 “এটা কিচেন ? না ইঁদুরের গর্ত ?" 
 "Flat তো তোমার আটশো স্কোয়ার ফুটের তাতে আর কত বড় রান্নাঘর হবে ?"
"দেখো , কিচেন নিয়ে তুমি কিচিরমিচির  'রো না বলে দিচ্ছি এখন কিচেনের  concept বদলে গেছে আমার কিন্তু  open kitchen চাই" - আহা - গলায় তার  মধুচন্দ্রিমার আবদার!   
"Open kitchen ? কোথায় হবে সেটা ? terrace ? না কি balcony তে ? "
তিনি আমার মুখের দিকে এমন ভাবে তাকালেন যে  মনে 'লো সুগভীর মুর্খতার এক অংশও টের পেলে আমায় বিয়ে করে জীবন জলাঞ্জলি দিতেন না

আমার মনে পড়লো ছোটোবেলায় দুর্গাপুরে আমাদের single bedroom quarter  এর আট বাই আট ছোটো রান্নাঘর একদিকের  দেয়ালে ছিলো কয়েকটা তাক একটা জাল ঘেরা জানলা রান্নাঘরের  ভেতরে একটা সরু তারের জালঘেরা মিটসেফ ছিলো আর একটা তোলা উনুন কয়লার পাশে তার দোসর জনতাস্টোভ  
Open kitchen? দরজা খোলা রাখলেই open নইলে closed. 

আমার ভাবনার জাল ছিঁড়ে গিন্নী বলে উঠলেন , "রান্নাঘরের এই সামনের দেওয়ালটা ভেঙে দাও "
"সে আবার কি?  Drawing -cum-dining space টার থেকে kitchen এর কোনো আড়াল থাকবে না ? "
"কিসের আড়াল? আমি রাঁধতে রাঁধতেই  T.V. দেখবো Guest দের সাথে আড্ডা মারবো৷ এই ওভেন থেকে শুরু করে ওই ফ্রীজ যেখানে থাকবে সবটা জুড়েই আমার রান্নাঘর, মল্লিকার রান্নাঘর "
" বাঃ ! মন্দ নয় কিন্তু আমার guest এলে বসবে কোথায় ? তোমার এই  extended kitchen - ? "
" মোটেই না তোমার study তে।  সবদিন তো আর লোক আসবে না আর যখন সবে তুমি তো তখন বইয়ে মুখ ডুবিয়ে বসে থাকবে না
জোরালো যুক্তি বউ তো নয়, হাইকোর্টের  উকিল  

তবু মিনমিন করে বললাম , " এতবড় কিচেন ? এরপর তো আর লোককে বলতে পারবো না আমাদের ঘরে আসুন , বলতে হবে আমাদের রান্নাঘরে আসুন "
" কথাটা মন্দ বলোনি এস.পি. সাহেব শুনেছো তো রবি ঠাকুরের কথাটা , জেনো বাসনার সেরা বাসা রসনায় ! তা তোমার রসনার বাসনাকে তৄপ্ত করতে হলে একটা জম্পেশ কিচেন দরকার - এটা মানো তো ?" 
আমি একটা জুত্সই জবাব খোঁজার আগেই তিনি হর্ষ ভোগলের মতো হুড়হুড় করে বলতে থাকলেন  - "Kitchen gives character to your home. রান্নাঘর দেখেই বোঝা যায় ঘরের মানুষের  রুচি,  সংস্কৄতি, পছন্দ তুমি হুসেন পছন্দ করো  না গনেশ পাইন? তোমার  রান্নাঘরের  tiles - এই বোঝা  যাবে তুমি কতটা নান্দনিক তা তোমার চামচের হাতলের ডিজাইনেই বোঝা যায় তোমার লবনদানি থেকে শুধু লবন বেরোবে না , সেটা জানান দেবে যে তুমি সুইজারল্যান্ড ঘুরে এসে ওটা নিয়ে এসেছো আচ্ছা শোনো এই ঘরটার কোন দিকটা কোন দিক ?"

মরেছে !!  প্রশ্নটা বুঝতেই কয়েক সেকেন্ড লাগলো তারপর কয়েক সেকেন্ড লাগলো প্রশ্নটা করার কারণ বুঝতে উত্তর তো জানা ৷কিন্তু উত্তরটা দেবো কি না সেটা বুঝে নিতে  আরো কয়েক সেকেন্ড সময় নিলাম এই ক্রমপর্যায়ে ভাবনা চিন্তা 'রে উত্তর দেবার অভ্যেসটা আমি বিয়ের পরেপরেই রপ্ত করেছি  
বললাম  "জানলার দিকটা দক্ষিন "
 " বাঃ ! দক্ষিন-পূর্ব দিকে গ্যস ওভেন বসবে জানো তো ফেংশুই বলে অগ্নি থাকবেন দক্ষিন-পূর্বে?" 
 " ওঃ  তোমার সেই লাফিং বুদ্ধ ? "
 " বুদ্ধ নয় , বুড্ঢা  , বুড্ঢা , কতবার বলেছি শোনো ওভেন বসবে ওদিকেInduction cooker  নয় কিন্তু ওটা আগুন নয়
 " ওটা তবে কি ? " 
 " তুমি না বাংলায় পন্ডিত ? ওটা তাপ আগুন কিন্তু দর্শনধারী আহা ! Jackman কে দেখেছো ? আগুন একেবারে ! আমাদের রণবীরটাও কম যায় না
পঞ্চাশোর্ধ আমার গতযৌবন চেহারা, সাদাকালো পাতলা চুল তবু আঁতে ঘা লাগলো
 "আমি কি ফেলনা? " 
 " না গো  , আমার মাইক্রোওয়েভ তো তুমি  নাই বা হলে আগুন , গরম করতে জুড়ি নেই By the way , মাইক্রোওয়েভ টা এই কোনায় বসবে , হাতের নাগালে ওভেনের ওপরের দেওয়ালে টালি দিতে হবে "

" বেশ। লাল রংয়ের
 " লাল ? রংটা বড্ড  passionate হয়ে যাবে  না? বছর কুড়ি আগে হলে চলত
 " তবে সাদা ? " 
 " না অতটা শান্ত এখনো হই নি গো ওটা  নাহয় বছর দশেক বাদে দিও
 " তবে ? হালকা  বেগুনী  ? " 
 " Purple ? Not  bad. একদিকে  fade হয়ে  ivory white হয়ে যাচ্ছে  - এমন একটা কিছু লাগিও মেজাজটা ধরা যাবে আর এই  cabinet  কিন্তু  change করতে হবে Modular kitchen cabinet  লাগবে "
" কেন? এতে বুঝি জিনিস রাখা যাবে না? আমার মায়ের তো শুধু কটা তাক ছিলো তবু রান্না কেমন 'তো বলো ? " 
 " শোনো, ওসব কালিদাসের কাল গেছে সে তো এককালে রান্নাঘর বলেও কিছু ছিলো না মাঠে ঘাটে রান্না 'তো
 " মায়ের রান্নাঘরে একটা তোলা উনুন আর  জনতা স্টোভ ছিলো
 " স্টোভ ?? খাবে তো ? খাবে স্টোভে করা কেরোসিনের গন্ধওয়ালা রুটি ? মুখে রুচবে তো ? " 

 জানি শাশুড়ির প্রশংসা বউ সহ্য করতে পারে না - তবু মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল -   "যাই বলো , তোমার  microwave , air frier , induction , convection , fridge ,  ice maker , coffee maker ....  উহ্  , এতো যন্ত্রীর চেয়ে যন্ত্র বেশী "
" তুমি এসবের কি বুঝবে! একবার  TLC দেখো যদি কিছু মাথায় ঢোকে রান্না এখন একটা শিল্প  না ,  চপ -  শিল্প নয়  art  .. art .. কিচেন এখন একটা artist's den আমি এখন শিল্পী যখন  মটন ডাকবাংলো করে সাজিয়ে এনে দেবো না ,  তুলতুলে খরগোশের মতো মটন, তখন বুঝবে গো এস.পি.সাহেব   !!  শোনো আমায় আরো দু একটা জিনিস কিনতে হবে কিন্তু  " 

 " তা কেনো  , হাতের দক্ষতার অভাব যন্ত্রের কেরামতিতে  ঢাকতে হবে রান্নাঘর তো নয়, যেন কারখানা একটা তুমি বরং একটা হেলমেট 'রে বসে থেকো তোমার কিচেনে "

আমি  বিড়বিড় করি  ,  " পিলার , কাটার , মিক্সার , কুকার .... আমার আয়ের অর্ধেক কিচেনেই ঢুকে  যায় এত আয়োজন তবু মায়ের  হাতের  মতো শুক্তো, টকডাল আর আলুপোস্তো কোথায় ! "


[কল্যাণ মুখোপাধ্যায়]

Comments
5 Comments

5 comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.