>

মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 8/15/2016 |



আগে যা ঘটেছে::: বাঘাযতীনে কাজ পেয়ে নতুন সব অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফেরে অষ্টমী

স্টেশনে নামার পর থেকেই লক্ষ্য করছে অষ্টমী চেনা মুখ যারা তারা কেমন অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছে; অটোতে ওঠার পরেও তাই। বাড়ি ফিরে আসল কারণটা উদ্ধার করতে পারলো। বিকাশ মানে তার স্বামী সারা রাত বাড়ি ফেরেনি; এমনকি গতকাল সারাদিনেও খেতে বা বিশ্রাম করতেও আসেনি। ঠাকুমা নাতনি মিলে খুঁজেছে, আর অপেক্ষা করেছে। দুটো দুটো দিন ছুটি পেয়েও একটু শান্তি স্বস্তি জুটলোনা অষ্টমীর। বর কে খুঁজতে খুঁজতে কেটে গেল; বিকাশ ঘরে ফিরলই না। দুটোদিন অপেক্ষা করে, শোক করে, পরে পাওয়া চোদ্দ আনার ছুটি কাটিয়ে আবার চলল কাজে; ভাবলো সেখানে গিয়ে একটু বুদ্ধি পরামর্শ করবে, সত্যিই থানা পুলিশ করবে কিনা, অনেকেই তো তেমন করতে বলছে। এইদিন ট্রেনে বারুইপুর থেকে মাসীরা উঠলো ঢোল কাঁধে, হাতে খট খট করে তালি দিতে দিতে। এদের প্রতি অষ্টমীর বিশেষ শ্রদ্ধা,দুর্বলতা আছে। একদল মানুষ যারা মানুষের সম্মান, মর্য্যাদা কোনো কিছুই পায় না। অথচ কিছু কিছু সময়ে এরা বেশ উপকারী; আগে একবার মঙ্গলাকে দেখে আশির্বাদ করে বলেছিলো মঙ্গলার পরীক্ষার ফল ভালো হবে, ঠিক ঠিক মিলে ছিলো। এমন আরো অনেক বারের অভিজ্ঞতা আছে অষ্টমীর। তবে শুনেছে সরকার নাকি এখন এদের জন্য কি করছেন, তাও ভালো। ওদের দেখলে সব সময়েই অষ্টমী সুন্দর করে কথা বলে আর ওরাও অষ্টমীকে প্রাপ্য সম্মান দেয়। আজ ওরা ট্রেনে উঠেই অষ্টমীকে দেখে তালি দিতে দিতে কর্কশ আওয়াজে বলল

"
অ্যাই মঙলার মা, মাস্সি তোর ঘরের নোক টা কোথায় রে?"

"
ঝানিনেগো মাসি,দেখো না দুটো দুটো দিন পেইরে গেল,খপর পেইনি। নেশা করতি
গিয়ে মরে ঠোরে গেল নাকি? তিনটে আত বাড়ি এলোনি!!!"

"
লারে মাস্সি, স্সে বেঁচে আছে হ্যাঁ, ওই রকম মরেনি; অন্যরকম মরেছে। স্সে ব্যাটা এক
মাগীকে লিয়ে লতুন স্সংস্সার করচে বাইরুপুরে"

"
লিঝের মেয়ের বিয়ের বয়স হচ্ছে, কি ভিরমতি" কপাল চাপড়ায় অষ্টমী

"
তুই না অর অটোর লোন স্সুধিস? একটা পয়স্সাও দিবিনা আর,হ্যাঁ; ( একটা নোংরা
গালি দিয়ে) থাকুক লতুন বউ লিয়ে। তুই তোর মেয়েকে লিয়ে স্সাস্সুরি কে লিয়ে থাক,
মেয়েটাকে নেকাপরা সেকা, মানুস কর। বাপের ছিঁয়া পড়তে দিস্স লা। এরপর ঘরে এলে
(আবার দুটো গালি সহযোগে) তেইড়ে দিস হ্যাঁ।"

"
দেবনি? এসকো বার দেব; ঝেতি বলো ক্যানো? আমি কি না দিইচি মাসি, এখন তার
লতুন জৈবন ডাকলো? আমার খেলো, আমার পরলো আর এখন অন্যত্র ঘেচে? ঝ্যাঁটা
মারবো থাকতি এলি"

যাক তবুতো একটা খবর পেল অষ্টমী; যদিও খবরটায় মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো। মেয়েটার সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা, ভালো করে যাতে পরীক্ষা দিতে পারে এখন সেই দিকেই মন দেবে সে। তারপর শহরের কোনো ইস্কুলে দিতে হবে তাদের গ্রামে তেমন স্কুল কোই? এক্ষুনি বিয়ে দেবেনা, পাঁচজনের একজন হবে তার মঙ্গলা। ডাক্তার হোক কি ইস্কুলের দিদিমনি, সমাজের পাঁচটা মানুষের উপকার করলে তবে না? বিয়ের কত সম্মন্ধ এখনি আসতে লেগেছে; অনেক গুলোই জুটিয়ে আনত বিকাশ স্বয়ং। সবাই ই বলে বিয়ের পরেও পড়াশোনা করতে দেবে, ঠিক বিশ্বাস হয় না, যদি না দেয়? সেই ভয়ে অষ্টমী আর জোৎস্না মিলে আড়াল করে রাখে মেয়েটাকে। এখন একদিকে ভালই হলো তারদের সংসারের একটা মানুষও কমলো, কিছু উৎপাত কমবে; তারা দুজনে মেয়েটাকে মনের মত করে বড় করতে পারবে। এইসব ভাবতে ভাবতে কাজের বাড়ি পৌঁছে নিজের কাজে মন দেয় অষ্টমী; সেখানে কেউ টেরই পেল না এই দুটোদিন কি গেছে অষ্টমীর।

সারাটা দিন যখন একা থাকে সেই সময়ে ধুলো ঝেড়ে পুঁছে সাফ করে, মিসেস মজুমদারের ভাষায় 'ডাস্টিং' করে রাখে; এই ডাস্টিং করার সময় মজুমদারদের ছেলে, মেয়ে-জামাই, নাতনি এদের ছবি গুলো দেখে অষ্টমী। কত সুন্দর সুন্দর জায়গায় থাকে ওরা; মনে মনে ভাবে তার মঙ্গলাটাও যদি এমন সব জায়গা দেখতে পেত, তারও কি এই মেয়েটার মত সুন্দর একটা হাসিখুশি পরিবার হবে? অষ্টমীও কি এমন করে মঙ্গলাদের ছবি সাজিয়ে রাখবে তার কুঁড়ে ঘরে আর আঁচল দিয়ে ধুলো ঝাড়বে ?

দেখ না দেখ দিন কাটে, মঙ্গলার মাধ্যমিক পরীক্ষার সময়ে অষ্টমী আর জোৎস্নার কত চিন্তা, দৌড়দৌড়ি। জোৎস্না গিয়ে গিয়ে বসে থাকে সেন্টারে। ওদের আচরণে মনেই হয়না বিকাশ বলে কেউ কোনদিন ওদের সংসারে ছিল। ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে ওরা অমন মানুষকে। আর বাড়ি যেহেতু জোৎস্নার নামে, কাজেই কোনো ঝুট ঝামেলা ছাড়াই ওরা বেশ কাটাচ্ছিলো।

পরীক্ষা শেষেও মঙ্গলা মাঝে মাঝেই ইস্কুল যায়, মাস্টারমশাই, দিদিমনিরা নতুন জায়গায় উচ্চমাধ্যমিক পড়তে গেলে কি করণীয় সে সব বলে দেন। কিছু কিছু পড়াশোনাও দেন; ওনাদের ধারণা মঙ্গলা ভালো রেজাল্ট করবেই আর তাই এখন থেকে নতুন ক্লাসের পড়া তৈরী করতে বলেন। ওনাদের সকলের ইচ্ছা সায়েন্স নিয়ে পড়ুক মঙ্গলা এবং জয়েন্ট এন্ট্রান্স এও বসুক। ওনারা যা বলেন যেই ভাবে চলতে বলেন সেই ভাবেই চলছে মঙ্গলা নইলে তার বা তার মা ঠাকুমার তো কোনো ধারণাই নেই কি করণীয়। কদিন ধরেই জোৎস্নার শরীরটা তেমন জুতের ছিল না, নাতনির পরীক্ষা উপলক্ষে কটাদিন বড্ড অনিয়ম হয়েছে; বয়সও হয়েছে তো হয়ত সেই জন্যই। তেমন গা করেনি কেউই আর তাদের গ্রামে তো স্বাস্থ্য কেন্দ্র ছাড়া আর কিছুই নেই, সেটাও তো ইস্কুলের একটা ঘরে হয়। কাজেই সেখানেও যে ঠিকঠাক চিকিৎসা পাবে মানুষে তেমন নয়। অতএব রোগ চাপাই রইলো। এমনই একদিন মঙ্গলা স্কুলে গেছে, অষ্টমীতো ভোর বেলাই কাজে গেছে, জোৎস্না ছিল একা ঘরে; মঙ্গলা ফিরে ঠাকুমার সাড়া না পেয়ে এদিক ওদিক খুঁজতে গিয়ে দেখে বাড়ির পিছন দিকে ডোবার ধারে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে বুড়ি। ধরতে গিয়ে বুঝলো অনেক আগেই সব শেষ; শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। পাড়াপড়শিদের ডাকা, মায়ের কাজের বাড়ি খবর করা, সবই করলো মেয়েটা একা একা; শুধু মা আসতে ভেঙ্গে পড়ল, এত সময় নিজেকে অনেক কষ্টে আটকে রেখেছিলো।

তবে এযাত্রায় আর খবর লুকিয়ে রাখা গেল না, ঠিক বিকাশের কানে গেল; 'আহা বুড়ির একমাত্র সন্তান, মুখে আগুন তো তারই দেবার কথা' অতএব উপকারটি আত্মীয়, প্রতিবেশি কেউ একজন করেই দিল। যথারীতি খবর পেয়েই বিকাশ তার নতুন বৌকে  নিয়ে হাজির; সে বউ আবার সন্তানসম্ভবা। এসেই খানিক লোক দেখানি হাঁউ মাঁউ কান্না কাটি; তারপর দাহ কাজ এবং পরের নিয়মাদি মানার পর বিকাশ আর তার বউ ই সর্বেসর্বা হয়ে উঠলো। বিকাশ যতোক্ষণ ঘরে থাকে বউটা কোঁকায়, ন্যাকামো করে সেবা নেয় মঙ্গলা-অষ্টমীর। আর বিকাশ ঘরে না থাকলেই তার রুদ্র মূর্তি।  শেষ মেশ অষ্টমীর আশঙ্কাই ঠিক হলো, জোৎস্নার ক্রিয়াকর্ম্ম মিটতে না মিটতেই মেরে ধরে তাদের মা বেটিকে দূর করে দিল বিকাশ আর তার বউ। কারণ বাড়ি বিকাশের মায়ের নামে, মায়ের অবর্তমানে ছেলেই সব, কাজেই সে ই ঠিক করবে কাকে থাকতে দেবে আর কাকে নয়। নিজেদের যতটুকু জিনিস নেওয়া যায় সেইটুকুন নিয়ে, মেয়ের হাত ধরে বেরিয়ে পড়ল অষ্টমী। আর এক মুহূর্তও এখানে নয়; সেতো জলে পড়ে নেই, কাজ তো করে, অতএব ঠিক কিছু একটা রাস্তা বের করে নেবেই। হয় কাজের বাড়ির সাথে আলোচনা করবে নয়তো বারুইপুরের বৃহন্নলা মাসিদের পেলে তাদের সাথে পরামর্শ করবে। কিন্তু কোনো মতেই মাথা নীচু করে এখানে থেকে মেয়ের ভবিষ্যত নষ্ট করবেনা। রাস্তায় আসতে আসতে অনেকেই বুদ্ধি দিলো থানা পুলিশ করতে, নিজের ন্যায্য পাওনা নিয়ে লড়তে। অষ্টমী ভেবে নিলো ওই সবের মধ্যে সে যাবে না; কারণ তাতে হয়ত আইনি লড়াইয়ে সে জিতবে কিন্তু সে করতে গিয়ে যে পরিমান অর্থ এবং সময় ব্যয় হবে সেটা বরং মঙ্গলার জন্য খরচ করলে ভালো হবে। ধরেই নিল সে বিধবা হয়ে গেছে, ব্যাস আর কোনো ল্যাঠা নেই। সোজা মিসেস মজুমদারের বাড়ি; সেখানে এক দুটো দিন থাকার অনুমতি পেল, এবং ওই এক দু'দিনেই আসেপাশের গজিয়ে ওঠা জবরদখল কলোনিগুলোর একটায় ঘর ভাড়া নিতে পারলো। যদিও এই সব কলোনিগুলোতে পাঁচমিশালী মানুষের বাস, খারাপ মানুষ, খারাপ কথাবার্তার ছড়াছড়ি। কিন্তু এছাড়া আর কিছুই উপায় নেই আপাততঃ।

দেখতে দেখতেই মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোলো; অলকেন্দু রোল নম্বর নিয়ে রেজাল্ট দেখে দিল। রেজাল্ট দেখে তো সবার চোখ কপালে, মঙ্গলা সত্যিই সাংঘাতিক ভালো করেছে। সম্ভাব্য তালিকায় প্রথম দশ জনের মধ্যে নাম রয়েছে তার। কটাদিন যেন ঘোরের মধ্যে দিয়ে কাটলো। যেখানেই যায় সেখানেই সকলে হই হই; মার্কশীট আনতে স্কুলে গেছিলো সেখানে তো পারলে মাথায় করে ওকে। ট্রেনে যাতায়াতের সময় যাদের যাদের সাথে দেখা হলো সবাই গর্বিত; অষ্টমী আর মঙ্গলা তাদের জীবনের প্রথম যুদ্ধে জয়ী হলো।

কোথায় পড়বে, কি নিয়ে পড়বে এগুলো বেশ কিছুদিন ধরেই অলকেন্দু দেখভাল করছিলো, তার তো অনেক অভিজ্ঞতা; অষ্টমী, মঙ্গলা দুজনেই নিশ্চিন্ত এমন সঠিক পরামর্শদাতা পেয়ে। শহরে থাকা, বাসে ট্রামে যাতায়াত এসবে যেহেতু অনভ্যস্ত মঙ্গলা তাই ঘরের কাছের স্কুলেই পরা ভালো, তাতে আরো একটা সুবিধা আছে সময়ও বাঁচবে মঙ্গলার। যেহেতু পরীক্ষার পর পর আবার নতুন ক্লাসের পড়া শিখতে শুরু করেছিলো কাজেই সায়েন্স নিয়েই পড়বে। প্রাইভেট টিউটর রাখার ক্ষমতা নেই তাই অলকেন্দু নিজেই ভার নিল পড়ানোর। স্কুল থেকে সে সোজা মায়ের কাজের বাড়ি আসে, তার পড়াও শেষ হয় অষ্টমীর কাজও তারপর মা বেটিতে হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতে করতে ঘরে ফেরে। কত গল্প জমে আছে দুজনেরই; আবার কোনো কোনো দিন ফুচকা,চুরমুর, কুলফিবরফ কিছু খেয়ে বা খেতে খেতে আসে। এই কয়দিনেই যেন কত বড় হয়ে গেছে মঙ্গলা। পড়াশোনার পাশাপাশি এলাকার বাজে ছেলেদের আলপটকা মন্তব্য কি করে গায়ে না মেখে চলতে হয় শিখে গেছে। জীবন কেমন গুছিয়ে এনেছে দুজনে; কিন্তু ওপরওয়ালার বুঝি অন্য পরিকল্পনা ছিলো।

(
চলবে)

[মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী]

Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.