>

মধুবাণী ঘোষ

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 8/15/2016 |



এইবারই  ছিল শেষ যাওয়া| ফি বছর কনকনে শীতের দুটো মাস কাটাই সাগরের জলে| এক জাহাজ ছাত্র ছাত্রী নিয়ে অতখানি সময় জলে জলে ভেসে বেড়ানোর হ্যাপা কম নয়| ব্যবস্থাপনা দেখলে মনে হবে রাবণের যজ্ঞ| ছাত্র শিক্ষক কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ছয়শো মানুষের খাওয়া দাওয়া ওষুধপত্র সাত সতের নিয়ে চৌদ্দ ডিঙ্গা মধুকর সাজানো যেন| জাহাজেই ক্লাস পড়ানো, ক্ষুন্নিবৃত্তি, খেলাধুলা, বিশ্রাম....দুটো মাসের জন্য জলচর বেঁচে থাকা| ভাসতে ভাসতে জাহাজ গিয়ে পৌছবে কোনো দ্বীপে ..সেইখানে খানিক সময় নোঙ্গর ফেলা ... শক্ত মাটিতে পা রাখা ..আবার কদিন পরে ভেসে যাওয়া| বন্ধু বান্ধবের বলত ‘ধন্যি চাকরি বাপু...নিখরচায় দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ানো..বরফ কোপানোর ঝক্কি নেই .. তা তোমার জাহাজে আমাদের একটা কাজ দেখে দাওনা...আমরাও কদিন ভেসে ভেসে বেড়াই ..’

নিরবিচ্ছিন্ন সুখ তো আর হতে পারেনা..তাহলে তো আমরা সুখের কদরই করতে পারতাম না| সুখের সাথে দেখা হলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতাম| সুখ কোনদিনই নিজেকে অমন এলে বেলে ভ্যাবলা ছেলে হতে দেবেনা| এখানেও তাই হলো| কলেজ থেকে জানিয়ে দিল যে জাহাজে স্থান সংকুলান হচ্ছে না | যে হারে ছাত্রসংখ্যা বাড়ছে তাতে সকলের ঠাই হবে না| অতএব কেবল তারাই যেতে পারবে যাদের আদতে জাহাজ চালানোর প্রশিক্ষণ দরকার| জাহাজী ব্যবসা সংক্রান্ত অদরকারী আদার ব্যাপারী ছাত্র শিক্ষক এখন থেকে ডাঙায় বসেই পঠন পাঠন সারবে ...তাদের আর সাগরে ভীড় বাড়িয়ে কাজ নেইকো| অতএব এইবারই  ছিল শেষ যাওয়া.... এক ভাসমানতার অবসানে অন্য গন্তব্য খুঁজে নেবার সময় হলো আরও এক বার ....

এবারের সফরের নতুন সঙ্গী হয়ে এলো বছর পয়ত্রিশের ছিপছিপে পেলব নরম সরম জেনিফার লেভেস্কু| জেনিফার একজন মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলর| এইটে আমাদের লেফট, রাইট, এটেনশন, ইউনিফর্ম, আধা সামরিক হাঁক ডাকের মাঝে এক নব্য ব্যাপার বটে| এমনিতে আমাদের জাহাজে ডাক্তার বদ্যিরা কেবলমাত্র শারীরিক ভাঙচুর আর জ্বর, পেটের অসুখ, যৌন রোগ ইত্যাদি প্রভৃতি কেতরে পড়ার মেরামতি করে এসেছে ...তবে ইদানিং কালে খেয়াল করছি যে শরীরের খোলসের ভেতরে যে জটিল মনের বাসা ...সেই বাসার পরিচর্যা, মেরামত, উঠোন নিকোনোর প্রতিও কলেজ যত্নশীল হয়েছে| কানাঘুষো শুনেছি যে মনের  দুঃখে নাকি দু একজন বিফল প্রেমিক ছাত্র জলে ঝাঁপ দেবার কথা বলেছিল| আমাদের জাহাজে নরম সরম জেনিফার লেভেস্কুর আগমন হল সেই সব মানসিক অশান্তির মুশকিল আসানকারী এক নবদিগন্তের সূচক|

জেনিফার লেভেস্কুর সঙ্গে প্রথম আলাপ হয় জাহাজের খাবার ঘরে নৈশভোজের সময়| জাহাজে নৈশভোজ হলো বিকেল পাঁচটা থেকে সারে ছটা পর্য্যন্ত| সকলের খাওয়া হলে তবেই রাধুনীরা দিনের মত ছুটি পাবে| কাঁচের জানালার বাইরে খটখটে রোদে সমুদ্রের রং নীলার মত দ্যুতিমান| সারাদিন ক্লাস পড়িয়ে বেশ আলুনি সেদ্ধ সবজি, পাস্তা, আর মশলার নামগন্ধহীন হয় মাছ, নয় মাংস, সোনামুখ করে খেয়ে ফেলতাম রোদ্দুর ঝলকানো ঢেউএর দিকে চেয়ে| কয়েকটা গোল টেবিলে এককাট্টা হয়ে বসে ইঞ্জিনিয়াররা, ডেক অফিসাররা, ডাক্তারেরা... তারা নিজেদের মধ্যে তাদের দপ্তরের খুঁটিনাটি আলোচনা করে  নৈশভোজের সময়| আমার দপ্তর থেকে যেহেতু কেবল আমি একাই যাই তাই আমার কোনো নির্দিষ্ট টেবিল নেই.... ঘুরে ফিরে যেখানে জায়গা পাই বসি.... কানের পাশ দিয়ে ভেসে যায় অন্যান্য দপ্তরের খুঁটিনাটি আলাপচারিতা... কাঁটা চামচ আর ছুরিতে আলগোছে বিদ্ধ হতে থাকে  আলুনি সেদ্ধ সবজি, পাস্তা, আর মশলার নামগন্ধহীন, হয় মাছ, নয় মাংস|

একদিন ডাক্তারদের টেবিলে বসেছি.... আর বসেছে বছর পয়ত্রিশের ছিপছিপে পেলব নরম সরম এক মেয়ে| আলাপ হলো ...নাম জানলাম... জেনিফার লেভেস্কু ....এই সফরের নবতম সংযোজন...  মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলর| জেনিফার খুব  আস্তে কথা বলে...বাদামী চুলগুলো কোনরকমে একটা গিট্ দেওয়া.... পরণে জাহাজের নীল আর খাকি ইউনিফর্ম... মুখে প্রসাধনের লেশমাত্র নেই....প্রথম আলাপে যেটা খেয়াল করলাম তা হলো ওর উদাত্ত হাসি| ও যখন হাসে তখন মাথা ঝাকিয়ে ঝাকিয়ে হাঃ হাঃ করে হাসে ...সেই হাসির চমক লাগে ওর চোখে আর তার আওয়াজ আমাদের টেবিল অতিক্রম করে ঘুরে বেড়ায় ইঞ্জিনিয়ারদের, ডেক অফিসারদের টেবিলের খুঁটিনাটি আলোচনায়|

অন্যান্য সময়ে জেনিফার লাজুক আর মুখচোরা| কথাবার্তায় বুঝলাম যে এই নতুন কর্মস্থলের সাথে মানিয়ে নিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে ওকে.... ঢেউএর উত্থান পতন, আধা সামরিক আদব কায়দা , আবহাওয়া আর ক্যাপ্টেন বুশীর মেজাজের অনিশ্চয়তা,..সবটাই ওর কাছে একেবারে আনকোরা| জাহাজে ছাত্রীদের আর রাধুনীদের বাদ দিলে আমাকে নিয়ে মাত্র গুটি চারেক মেয়ে... অন্য দুজন বেশ কাঠখোট্টা ডাকাবুকো মেরিন ইঞ্জিনিয়ার .... তাদের সাথে তেমন কথাবার্তা জমে না....অতএব জেনিফারের সবে ধন নীলমণি হলো মধুবাণী| সে আমার সাথে খটখটে রোদে নৈশভোজ সারে.... আমার সাথে স্ক্রাবেল খেলায় রোজ হারে... আর এক মাথা জোছনা মেখে রাত্তিরে জাহাজের ডেকে বসে আমার সাথে সুখ দুঃখের গল্প করে|

বিয়ে করেনি জেনিফার| কারণ জানতে চাইনি| এমনিতেই আমার কৌতূহল অল্প| জেনিফার যা নিজের থেকে বলতে চায় কেবল সেইটুকুই শুনি| এক রাতে জাহাজের ডেকে বসে ঢেউএর দিকে চেয়ে বললে সে একজনকে ভালবাসে...ভদ্রলোক নৌকো তৈরী আর সারাইয়ের কাজ করেন... দুটি সন্তানের পিতা.... বিবাহ বিচ্ছেদ আসন্ন...তিনি নাকি জেনিফারকে খুব ভালো রাখেন.... সাহচর্য্য দেন| তাকে ছেড়ে মাঝসমুদ্রের এই দোলাচল জেনিফারকে কষ্ট দেয় খুব| জ্যোস্নায় জেনিফারের  চোখদুটো চিকচিকোচ্ছিল| আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম|

দিন যায় ... রাত যায় ... ভাসতে ভাসতে একদিন আমরা এসে পৌছলাম পুএর্ত রিকোর সান জুয়ান বন্দরে| এখানকার মানুষজনের বলে সান হুয়ান| আমি আগে বার কয়েক এসেছি.... ঘুরে বেরিয়েছি বন্দরের অলিতে গলিতে| এখানে এসে মনে হলো সান হুয়ান দুর্গের কথা... কামসূত্র মার্টিনির কথা| ভূগোলের ম্যাপে দেখেছিলাম যে পুএর্ত রিকোর দক্ষিণ পূর্ব কোনে এক ক্ষুদে দ্বীপ রয়েছে ... তার নাম কুলেব্রা| নামের মধ্যে কেমন একটা দখিনা বাতাস... দিঘল বেনীর ভাব রয়েছে যেন|

“বুঝলে জেনিফার ...আমার খুব কুলেব্রা যেতে ইচ্ছে করছে...তুমি আমার সঙ্গে যাবে?”

এমনিতে আমি সব জায়গায় হুট করে একাই চলে যাই...অন্য মানুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, ছক কষে, হিসেব নিকেশ করে চলার অভ্যেস নেই আজ বহুদিন হল| জাহাজে জেনিফারের তেমন বন্ধু নেই... এছাড়া বন্দরে এসে বিরহী যক্ষের মত ম্রিয়মান হয়ে কেবিনে আটকা থাকার মত বাজে জিনিস আর দুটো নেই| জেনিফার ফোন, ইমেল, টেক্সটএর জটে ‘যাও পাখী বোলো তারে...সে যেন ভোলে না মোরে’ সামসুঙ্গে শ্যামসঙ্গ ভজনা করে যাবে অহর্নিশি আর কালবৈশাখী মার্কা দীর্ঘশ্বাস ফেলবে| এ হতে দেওয়া যায় না|

“কুলেব্রা?সেটা আবার কোথায়? কেমন করে যেতে হয়?”
“ কুলেব্রা একটা দ্বীপ জেনিফার ...এই চেনা শহর, চেনা গন্ডীর বাইরে...সেখানে কেমন করে যেতে হয় তা আমার জানা নেই| তবে রসো... খোঁজ নিছি| ”

বন্দরের গেটের বাইরে পুএর্ত রিকোর পর্যটন দপ্তরের আপিস| সেখানে গেলাম দিশার সন্ধানে| খুব লম্বা নখ আর হেয়ার জেল ঢালা বজ্রকঠিন চুল কাউন্টারের ওপাশ থেকে আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন| জানা গেল যে সস্তায় গন্ডায় যাবার উপায় বেশ কঠিন| প্রথমে সান হুয়ান বন্দরের বাস গুমটি থেকে এম-3 বাসে চেপে যেতে হবে সাগার্দ কোরাজোন রেল স্টেশনে| সেখান থেকে রেলে করে যেতে হবে রিও পিয়েদ্রা স্টেশন| সেখান থেকে পায়ে হেঁটে বা অন্য কোনো অজানা উপায়ে যেতে হবে ফাহার্দ ফেরীঘাট| সেখান থেকে ফেরী করে যেতে হবে কুলেব্রা দ্বীপ| এসব করতে খরচ পরবে ১৫ ডলার তবে একটা গোটা দিন লেগে যাওয়া অসম্ভব নয়| ফেরী ফেল করবার সম্ভাবনাও রয়েছে| বিকেলের ফেরী না ধরতে পারলে ফাহার্দ ফেরীঘাটেই রাত কাটাতে হবে| নয়তো আমরা ট্যাক্সি ধরে ফাহার্দ ফেরীঘাটে যেতে পারি.... চালকের সঙ্গে দরদস্তুর করতে হবে ... খরচ পরবে ১০০ ডলার মত| এইসব বলে লম্বা নখ আমার হাতে কুলেব্রার হোটেলের প্যামফ্লেট, বাস আর ট্রেনের রুট ম্যাপ ধরিয়ে দিয়ে অন্য পর্যটকের সাথে কথা কইতে লাগলেন|

কাগজপত্র বগলদাবা করে রোদ্দুর বিছানো সান জুয়ানের পথ দিয়ে এগোলাম জেনিফারের সঙ্গে দেখা করতে| সেই দখিনা বাতাস... দিঘল বেনীর মত যার নাম, তার কাছে পৌছবার সময় এসেছে| জেনিফারের সঙ্গে দেখা হলো সান হুয়ানে আমার প্রিয় রেস্তোরা রাইসেসএ| আমাদের জাহাজঘাটার ঢিল ছোড়া দুরত্বে পুএর্ত রিকান রেস্তোরা রাইসেস| ধবধবে সাদা মলমলের  স্কার্ট ব্লাউস আর মাথায় সাদা বান্দানা পরা মেয়েরা সেখানে খাবার পরিবেশন করে| তাদের অলিভের মত গায়ের রং আর ধবধবে সাদা মলমলের মত হাসি| সেখানে গেলেই তারা আদর আপ্যায়ণ করে কাঠের চেয়ার টেবিলে বসতে দেয়... টিনের থালা বাটিতে খেতে দেয়... টিনের বালতিতে লাল ন্যাপকিনে সাজিয়ে দেয় খাবার কাঁটা চামচ .... সেখানে গেলে টাটকা ডাবের জল, মশলাদার কাঁচকলা সেদ্ধ বা মফঙ্গ  আর সদ্য ধরা মাছ বা চিংড়ির শুরুয়া দিয়ে গরম ভাত খাওয়া যায়| সেখানে গেলে মনে হয় অনেকদিন জলে ভেসে বেড়াবার পরে বাড়ি ফিরলাম যেন|

জেনিফার জানালার ধারে একটা টেবিলে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল| ওর সামনের টেবিলে টিনের বালতিতে লাল ন্যাপকিন রোদ্দুরের আলোয় প্রোজ্জ্বল| পর্যটন আপিসের কাগজপত্র, কুলেব্রার ম্যাপ, বাস রুট সব টেবিলে মেলে ধরে ভাত আর চিংড়ি অর্ডার করলাম|সস্তায় গন্ডায় কুলেব্রা যাবার জটিল প্রক্রিয়া শুনে তো জেনিফারের চক্ষু চড়কগাছ! করকরে ১০০ ডলার গচ্ছা দিয়ে ট্যাক্সি ধরে ফাহার্দ ফেরীঘাটে যাবার প্ল্যানটাও একই রকম কষ্টদায়ক| জেনিফার ভাবুক ভাবুক মুখ করে খানিকক্ষণ জানালার বাইরে রোদের পানে চেয়ে রইলো...

“ আমি বোধহয় গোটা এক দিন আর এক রাত ছুটি পাবোনা| কয়েকজন ছাত্র বলছিল কথা বলতে চায় ..... ওদেরকে সময় দিতে হবে....”
“ আচ্ছা ..তুমি তোমার দপ্তরে কথা বলে দ্যাখো ছুটি পাও কিনা... আমি আগামীকাল যাব ঠিক করলাম|”
“ আমি না গেলেও যাবে?”

“হ্যা... যাব| আগামীকাল না গেলে আমার এই জীবনে আমার আর কুলেব্রা যাওয়া হবে না| আর পরজন্ম সম্বন্ধে এখনো ধারণা বেশ ধোঁয়াটে”

জেনিফার মাথা ঝাকিয়ে ঝাকিয়ে হাঃ হাঃ করে হাসলো ...সেই হাসির চমক লাগল ওর চোখে আর তার আওয়াজ আমাদের টেবিল অতিক্রম করে ঘুরে বেড়ালো কাঠের টেবিলে, জানালার রোদ্দুরে, ধবধবে সাদা মলমলের স্কার্ট ব্লাউস আর মাথার সাদা বান্দানায়.....

“তুমি একটা আস্ত পাগল! আচ্ছা দাড়াও.... কাল ছুটির ব্যবস্থা করছি... তবে আমরা ওই বাস, ট্রেন, ফেরীফেলের চক্করে পড়ব না ...বেশি খরচ পরলেও আমরা ট্যাক্সি চেপেই ফেরিঘাটে যাব|”
“বেশ তো... তাই সই...”

আমিও স্বস্তি পেলাম| সস্তার তিন অবস্থা কথাটা তো নেহাত ফেলনা নয়| খাওয়া দাওয়া সেরে জেনিফার জাহাজে ফিরে গেল| ও বেশিক্ষণ রোদে থাকতে পারেনা...এছাড়া ওর ফোন, ইমেল, টেক্সটএর পিছুটান আছে.... আমি হাটতে হাটতে বাস গুমটিতে গিয়ে একটা টি ৫ বাস ধরে ঘুরে বেড়ালাম গোটা সান জুয়ান শহর... কালে লৈসা, আইলা ভার্দে, ইতুরেগুই ...আরো কত সব অচেনা জায়গা...| ফেরবার পথে জাহাজঘাটার বাইরে এক ট্যাক্সিচালকের সঙ্গে দরদাম সেরে ফেললাম| রফা হলো যে সে আমাদের পরদিন দুপুর বারোটায় তুলে নিয়ে ফাহার্দ ফেরীঘাটে পৌঁছে দেবে আর ভাড়া বাবদ নেবে ৮০ ডলার ...তার এক কানা কড়িও বেশি নয় !!

পরদিন ঠিক সময়ে ঘন নীল সালোয়ার কামিজ আর লাল ফুলতোলা কাপড়ের  ব্যাগে রাত্রিবাসের উপযোগী অল্প কিছু দরকারী জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে সোজা হাজির জাহাজঘাটার গেটএ| পেট পুরে লাঞ্চ সেরেও  ব্যাগে দুটো আপেল আর এক বোতল খাবার জল নিয়ে নিয়েছি| সাবধানের মার নেই! জেনিফারও ঠিক সময়ে উপস্থিত| ওর মাথায় রোদ্দুর আটকানো বিশাল খড়ের টুপি, পরণে একটা ফুলহাতা গেঞ্জী আর জিনস| পিঠের ব্যাকপ্যাকে ওর আগামী ২৪ ঘন্টার প্রয়োজনগুলি| দরদাম করে ট্যাক্সি ভাড়ায় খানিকটা সাশ্রয় করতে পেরেছি শুনে ভারী খুশি হলো সে|

ট্যাক্সিতে উঠে বসলাম দুজনে| চালক বেশ হাসিখুশি আর গপ্পে| বেশ ঝিং চ্যাক বাজনা বাজছে গাড়িতে..ক্যারিব সাগরের হাওয়া এসে গাড়ির ভেতরে সে কি হুটোপাটি.... আমাদের ফেরী ছাড়বে তিনটের সময় ...তেমন ভিড় না হলে আমরা দুপুর দুটো নাগাদ পৌঁছে যাব ফাহার্দ ফেরীঘাটে| সব ঠিকঠাক চলছে....

“ ইয়ে বলছিলাম ..কুলেব্রাতে আমরা রাতে কোথায় থাকব?”
“ ওহ...দাড়াও...সেটা এখনি ঠিক করে ফেলি...তবে ওখানে পৌছেও খুঁজে নেওয়া যাবে...”

মনে হলো জেনিফার থাকার জায়গা ঠিক না হলে স্বস্তি পাবেনা... ওর কপালে একটা দুটো ভাঁজ পড়ছিল| আমার ব্যাগ হাতরে বের হলো পর্যটন দপ্তরের দেওয়া হোটেলের হদিশ... জেনিফারের ব্যাগ হাতরে বের হলো সেলফোন| জানালার বাইরে হুশ হুশ করে সরে যাচ্ছিল হাসিয়েন্দা পাহাড়, ক্যারোলিনা, রিও গ্রান্ডে, লোকিলো... আমার মন রইলো সেখানে ...চোখ রইলো হোটেলের ফোন নম্বরে...কান রইলো জেনিফারের কথোপকথনে| বেশ কয়েকটা জায়গায় ফোন করলো জেনিফার ... “ ঠাই নাই...ঠাই নাই...”

ওর কপালে যে অতগুলো ভাঁজ পরে তা কে জানত ... বুঝলাম রাত্রিবাসের ঠিকানা না পেলে এই দ্বীপান্তরকে ও কালাপানিতে চিরনির্বাসনের স্টেটাস দেবে| অবশেষে হোটেল দেবতা মুখ তুলে চাইলেন| এক হোস্টেলের মালকিন ফোন ধরলেন| জানালেন যে কুলেব্রার ফেরিঘাট থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্ত্বে ওনার হোস্টেল| সেখানে খুবই পকেটবন্ধু দামে আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হবে| আমাদের ঘরে অবশ্য অন্যান্য মানুষ জন থাকবে...এটা একটা হোস্টেল কিনা ...হোটেলের মত প্রাইভেট রুমের ব্যবস্থা এখানে নেই | বাথরুমও সার্বজনীন| ভদ্রমহিলা খুবই করিতকর্মা| মুহুর্তের মধ্যে জেনিফারের সেল ফোনে ভেসে উঠলো ফেরীঘাট থেকে হোস্টেলে যাবার ম্যাপ| ফেরী থেকে নেমে তিনবার ডানদিক ঘুরলেই বাদিকে হোস্টেল ...আমাদের ভুলচুক  হবার কোনো সম্ভাবনাই নেই....
জেনিফারের কপাল অবশেষে মসৃন...আমার চোখ, কান, মন সমস্ত আচ্ছন্ন করে রইল... হাসিয়েন্দা পাহাড়, ক্যারোলিনা, রিও গ্রান্ডে, লোকিলো.....

এক অজানা দ্বীপের পথে চলেছি ...সেখানে  পৌঁছে তিনবার ডানদিক ঘুরেই আমার গন্তব্য ....আগামী ২৪  ঘন্টার মত ঠাই .... সেখানে ঘন নীল সালোয়ার কামিজ পরণে লাল ফুলতোলা কাপড়ের  ব্যাগে স্থাবর অস্থাবর নিয়ে কলিং বেল বাজালেই  যে মানুষটা দরজা খুলবে তাকে এক্কেবারে গ্রেগরী পেকের মত দেখতে.....|

ফাহার্দ ফেরীঘাটে পৌছলাম বেলা দুটো নাগাদ| টিকিট কাউন্টারে কুলেব্রা যাবার রিটার্ণ টিকিট কাটতে গিয়ে জানলাম যে ফেরী কর্তৃপক্ষ কেবল কয়েকটি আগাম রিটার্ণ টিকিট বিক্রি করেন| সেগুলি বিক্রি হয়ে গেলে কেবল এক তরফা টিকিট কেনা যায়| ফিরতি পথে আবার কুলেব্রার টিকিট কাউন্টারে লাইন দিয়ে ফাহার্দর টিকিট কাটতে হবে| টিকিট না পেলে কুলেব্রাতেই থাকতে হবে আর সান জুয়ানের বন্দরে আমাদের জাহাজ ফেল হবে| এ ছাড়া কুলেব্রা থেকে যদিও বা ফেরার টিকিট পাই, ফাহার্দ পৌঁছে আবার সান জুয়ান ফেরার ট্যাক্সি পাব কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই| এই সময়ে জেনিফারের কপালটা নিশ্চয় দর্শনীয় হয়েছিল কিন্তু আমি সেদিকে দৃষ্টিপাত না করে বললাম
“ ঠিক আছে আমাদের কুলেব্রা যাবার দুটো টিকিট দিন|”

টিকিট কেটে ফেরী ধরবার জেটির লাগোয়া গুমটিতে গিয়ে বসলাম| ভারী সুন্দর ছিমছাম বসবার ব্যবস্থা| বিভিন্ন ফেরীর  জন্য নির্দিষ্ট গেট আর বসবার জায়গা রয়েছে| বিকেল তিনটের কুলেব্রা ফেরী ধরতে হলে গেট নম্বর ৫ এর সামনের চেয়ারগুলিতে বসতে হবে| দেখলাম মালপত্র নিয়ে কিছু মানুষ সেখানে ফেরীর অপেক্ষায় বসে রয়েছে| এরা সবাই স্থানীয় মানুষ| হপ্তার বাজার সেরে আবার ফিরে যাচ্ছে নিজস্ব দ্বীপে| কেউ বা যাচ্ছে ছুটি কাটাতে| সান জুয়ানের মত মার্কিন পর্যটকের ভিড় নেই এইখানে| একজন পুলিশ অফিসার স্পানিশ ভাষায় সকলকে বিধি নিয়ম সম্বন্ধে সতর্ক করে দিছে| তার পরণে খুব টাইট ইউনিফর্ম| ঢেউ খেলানো শরীর ঠিক এঞ্জেলিনা জোলির মত...মনে হচ্ছিল এক্ষুনি বুঝি রেগে গিয়ে লারা ক্রফট টুম্ব রেডার হয়ে সাংঘাতিক ডিগবাজি খেয়ে সক্কলকে ধরাশায়ী করে দেবে !! জেনিফার ওর ব্যাকপ্যাক থেকে একটা গল্পের বই বার করে পড়তে লেগেছে| হয়ত কুলেব্রা থেকে ফেরবার অনিশ্চয়তাজনিত চিন্তা এড়াতে মনকে অন্যভাবে ব্যস্ত রাখা, হয়ত আশপাশের মানুষের সাথে চোখাচোখি এড়ানো ...হয়ত গল্পটা নাছো়ড়...| আমি আবার বাইরে বেরিয়ে এক্কেবারে বই পড়তে পারিনা...গাড়িতে বা ট্রেনে বসে মাথা নিচু করে পড়তে গেলেই মাথা ঘোরে...তাছাড়া চোখের বাইরে যে এক আশ্চর্য্য সুন্দর বিবর্তন ঘটে চলেছে প্রতি মুহুর্তে ...তার থেকে এক পলকের জন্যেও চোখ সরিয়ে নিতে মন চায়না|

খেয়াল করলাম গুমটির এক পাশে একটা খাবার দোকান...সেখানে কি সব ভাজাভুজি চলছে আর গরম তেলেভাজার গন্ধে ম ম করছে ৫ নম্বর গেট| কে বলবে খানিক আগেই লাঞ্চ সেরেছি! ব্যাগের আপেল রইলো ব্যাগে...আমি এঞ্জেলিনার কাছে অনুমতি নিয়ে গেলাম সরেজমিন তদন্তে| দেখলাম সেখানে এক যুবতী গরম কড়াইয়ে পাস্তিলো কার্নে বা মাংসের সিঙ্গারা ভাজছে| এছাড়া গরম কফি আর নানা রকম শীতল পানীয় পাওয়া যাচ্ছে সেই দোকানে| এমন আবেদন তো আর অবহেলা করা যায়না.... অতএব দুটি পাস্তিলো কার্নে, একটি কোক আর একটি খালি প্লাস্টিকের কাপ নিয়ে ফিরলাম জেনিফারের পাশটিতে| একটি কোক নিপুন দক্ষতায় ঠিক অর্ধেক ভাগে পৌঁছলো প্লাস্টিকের কাপে ... সঙ্গে সদ্য কড়াই থেকে উঠে আসা পাস্তিলো কার্নে.... জেনিফারের মসৃণ কপাল যেন ফেয়ার এন্ড লাভলির বিজ্ঞাপন.... আর আমাদের পায়ের কাছে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসে জুড়ে বসা ক্ষুধার্ত পায়রা|

পৌনে তিনটে নাগাদ এঞ্জেলিনা জোলি পাঁচ নম্বর গেট খুলে দিলেন... আমরা লাইন করে গেট দিয়ে বেরিয়ে দেখি আমাদের জলযান প্রস্তুত ... সাদা আর নীল রঙ্গা সুন্দর জাহাজ ...নাম কায়ো ব্লাংকো| তার গায়ে ছলাত ছলাত করে লাজুক আঘাত হানছে ক্যারিব সাগরের ঢেউ| জাহাজের ভেতরে লাল রঙের গদি দেওয়া অনেকগুলি বসবার জায়গা....আমরা জানলার ধারে দুটি সিটে থিতু হলাম|

কায়ো ব্লাংকো চলেছে কুলেব্রা অভিমুখে .... পেছন পানে ঝাপসা হয়ে আসছে ফাহার্দ ফেরীঘাট...সামনে  অগুন্তি ছোট ছোট দ্বীপ...সেখানে মানুষ বাস করেনা ...সেখানে কেবল বাসা বাঁধে সামুদ্রিক পাখি ...তাদের পাশ কাটিয়ে আমরা এগোলাম কুলেব্রা অভিমুখে.... সেই দ্বীপ... যার নামের মধ্যে কেমন একটা দখিনা বাতাস... দিঘল বেনীর ভাব রয়েছে যেন|

অবশেষে জাহাজ পৌঁছলো কুলেব্রা ফেরীঘাটে| দিনে কেবল তিনটি ফেরী আসে এই বন্দরে আর তখনি যা একটু লোক চলাচল.... এছাড়া অন্য সময়ে ফেরীঘাটে একলা হয় সমুদ্র আর আকাশ| বন্দরে ভিড়তেই স্থানীয় মানুষেরা যে যার গন্তব্যে এগোলো... কয়েকজন পর্যটক তাদের হোটেলের থেকে পাঠানো গাড়িতে গিয়ে উঠলো... ওদের হাঁটাচলায় একটা সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের দৃপ্ততা|আমি আর জেনিফার আসতে সুস্তে এগোলাম এক আশ্চর্য্য সুন্দর ঘুমন্ত রাজকন্যের মত দ্বীপের পথ ধরে| সরু সরু ঘোরানো রাস্তা এগিয়েছে জলের পাশ বরাবর.... ছোট ছোট এক তলা বা দোতলা বাড়ি...কয়েকটা মনিহারী দোকান... প্রথম ডানদিক ..... ছোট ছোট এক তলা বা দোতলা বাড়ি...বাড়ির গেটে লতানে ফুলগাছে অগুন্তি ফুল ধরেছে....দ্বিতীয় ডানদিক...... ছোট ছোট এক তলা বা দোতলা বাড়ি... বাড়ির পাশে চ্যাটানো পাত্রে পাখির খাবার দেওয়া ....সেই খাবার খেতে ভিড় জমানো হলদে পাখিদের পিকনিক .....তৃতীয় ডানদিক...একটা ছোট কাঠের পাটাতন দেওয়া ব্রিজ...নিচে সাগর থেকে বিছিন্ন এক বিরহী জলপ্রণালী..... শব্দ বলতে কেবল পাখির ডাক শোনা যায়.... পৃথিবীর একান্তে কি আশ্চর্য্য সুন্দর এই বিচ্ছিন্নতা| আমি আর জেনিফার মুগ্ধ হয়ে চারিদিক দেখতে দেখতে বাদিকের ফুটপাথে সেই পূর্বনির্দিষ্ট হোস্টেলে এসে পৌছলাম| সামনে এক চিলতে বাগান... সেখানে বসে কফি হাতে গল্প করছে দুইজন তরুণী ব্যাকপ্যাকার.... বাগান পেরিয়ে সদর দরজা...কলিং বেল| মাথার চুল ঠিকঠাক ভদ্রস্থ করে বেল টিপলাম.... দরজা খুললেন এক হাসিখুশি, কাচা পাকা চুলের বিনুনি বাঁধা মোটাসোটা মধ্যবয়েসী ভদ্রমহিলা|

“আরে আপনারা এসে গ্যাছেন? পথ চিনতে অসুবিধে হয়নি তো? আসুন আপনাদের ঘরটা চিনিয়ে দিই |”

দোতলা ছিমছাম হোস্টেল| মালকিন আমাদের একটা লম্বাটে ঘরে নিয়ে গেলেন| সেখানে দেওয়ালের লাগোয়া গোটা দশেক সিঙ্গেল বেড| পরিষ্কার চাদর পাতা| ঘরের কোনে একটা ছোট টেবিল| এছাড়া আর কোনো আসবাব নেই| কয়েকটা বিছানার ওপরে ব্যাকপ্যাক বা অন্য ব্যক্তিগত জিনিসপত্র| অনুপস্থিত মানুষের অবস্থানের জানান দেওয়া টুকরো টাকরা সরঞ্জাম| জেনিফারের মনে হয় ঘর পছন্দ হয়েছে... রাত্রিবাসের একটা ব্যবস্থা আর মালকিনের ইংরেজি ভাষার ওপরে দক্ষতায়  ওর মুখে স্বস্তির প্রলেপ| এদিকে আমি কোনদিন হোস্টেলে থাকিনি .... হঠাত করে এক ঘর অপরিচিত মানুষের সঙ্গে ঘুমাতে হবে ভেবে ভেতরটা একটু কাহিল হচ্ছিল| যে চিন্তাটা অন্য সব চিন্তাকে অতিক্রম করে যাচ্ছিল তা হলো ...রাত্তিরে যদি আমার নাক ডাকে তাহলে কি হবে!! ঠিক এই সময়ে হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই পাশের লাগোয়া বাথরুম থেকে একজন ভদ্রমহিলা একটা সাদা তোয়ালে পরে বেরিয়ে এলেন  আর তিন নম্বর বিছানায় রাখা ওনার ব্যাকপ্যাক থেকে একটা জাঙ্গিয়া বার করে পরবার উপক্রম করলেন| ঘটনার আকস্মিকতায় এবং নাটকীয়তায় আমার কপালে বোধয় করোগেটেড  টিনের চালের মত ভাঁজ পড়েছিল|আমি চিত্রার্পিতের মত সাদা দেওয়ালের দিকে চেয়ে...
“ ইয়ে আমরা বরং বাইরে বসে একটু আলোচনা করে নিই ”

জেনিফার আমাকে নিয়ে বাইরের বাগানে এল| মালকিন আমাদের একটু কথা কইবার সুযোগ দিয়ে খানিকটা দূরত্ত্বে রইলেন|
“শোন..আমার মনে হয় তুমি কোনদিন হোস্টেলে থাকনি| তোমার এখানে এভাবে থাকতে অসুবিধে হবে| আমরা তো পথে আরও কয়েকটা হোটেল দেখলাম...চল তারই একটাতে ব্যবস্থা করি.... ঠিক একটা উপায় হয়ে যাবে”
“বেশ”
আমরা হোস্টেল মালকিনকে আমাদের সিদ্ধান্তের কথা জানালাম| উনি আমাদের বিদায় জানিয়ে দোর দিলেন|

হোস্টেল থেকে বেরিয়ে খানিক এগিয়ে...একটা ছোট কাঠের পাটাতন দেওয়া ব্রিজ...নিচে সাগর থেকে বিছিন্ন এক বিরহী  জলপ্রণালী..... প্রথম বাদিক ঘুরেই মামাসিটাস গেস্ট হাউস| হালকা বেগুনি, গোলাপী আর সবুজ রঙের দেওয়াল ..তাতে একটা মস্ত কাছিম আঁকা| আপিস ঘরের কাঁচের দেয়াল ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই আমাদের হাসিমুখে আপ্যায়ণ করলেন একজন ঢিলেঢালা চেয়ারে এলানো মানুষ| এক রাতের মত একটা ঘর চাই শুনে হঠাত গম্ভীর হয়ে কাকেশ্বর কুচকুচের মত একটা মস্ত খাতায় পেন্সিল দিয়ে খানিক কাটাকুটি করে জানালেন যে বহু কষ্টে একটা ঘর পাওয়া যাবে| কেউ শেষ মুহুর্তে আসবে না বলে জানিয়েছে| ঘরের ভাড়াও বেশ ট্যাকসই| আমরা দুজনে অনার চিত্রগুপ্তের খাতায় সইসাবুদ করে দোতলায় ঘর দেখতে গেলাম| ছিমছাম ঘর...তাতে একটা ডবল বেড সঙ্গে বাথরুম| ঘরে একটা দেরাজ আর কাঠের টেবিল| টেবিলের ফুলদানিতে কয়েকটা গোলাপী প্লাস্টিকের ফুলই যা একটু চক্ষুশূল| তবে ঘরের লাগোয়া বারান্দায় বেরোলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়| বারান্দার ঠিক নীচে সেই নীল সবুজের ছায়া মাখা  বিরহী  জলপ্রণালী.....সাগরের হাত ছাড়িয়ে যে কিনা পথ ভুলে কুলেব্রার অন্দরমহলে চলে এসেছে|

চটপট হাতমুখ ধুয়ে আমি আর জেনিফার ঠিক করলাম যে বেলা থাকতে থাকতে কুলেব্রার খানিকটা ঘুরে দেখে নেওয়া উচিত|একতলার আপিস ঘরের কাঁচের দেয়াল ঠেলে আর একবার ঢিলেঢালার মুখোমুখি হলাম| সে আমাদের একটা কুলেব্রার ম্যাপ ধরিয়ে দিয়ে বলল যে এখানে কয়েকটি পৃথিবীবিখ্যাত বেলাভূমি আছে যা না দেখতে পেলে জীবন বৃথা| আমরা যেন অতি অবশ্য ফ্লামেঙ্ক বীচ, জোনি বীচ, লার্গা বীচ, মেলোনেস বীচ ইত্যাদি প্রভৃতি দেখতে যাই .... সেখানে সমুদ্রের ময়ূরকন্ঠী রং আর গোলাপী বালি দেখলে আমরা নাকি আর চোখ ফেরাতে পারব না| ম্যাপে দেখলাম গোটা দ্বীপে কেবল দুটি মাত্র বড় রাস্তা রয়েছে ...২৫০ আর ২৫১| বাকি ২৪৯ টা রাস্তা কোথায় গেল জিজ্ঞেস করাতে কোনো সদুত্তর পেলাম না|

ঢিলেঢালা জানালো যে এই দ্বীপে যাতায়াত করবার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো গল্ফ কার্ট| উত্তর কলকাতার গলির মত সরু রাস্তা সমুদ্রের ধার ঘেসে চলে গেছে চড়াই উতরাইএর সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে| ২৫০ আর ২৫১এর ঠিক সংযোগস্থলে রয়েছে কার্লোস জীপ্ রেন্টাল| ওরা জীপের সঙ্গে গল্ফ কার্টেরও ব্যবসা করে| আমরা যদি চাই তাহলে ঢিলেঢালা সস্তায় গন্ডায় একটা গল্ফ কার্ট ভাড়ার ব্যবস্থা করে দেবে| হোস্টেলে থাকা আর গল্ফ কার্ট চালানো..দুটি আমার কাছে আনকোরা নতুন অভিজ্ঞতা| তবে পরেরটি নিয়ে তেমন বেগ পেতে হবেনা মনে হল ...

“বেশ তাহলে আমাদের জন্য কার্লোস মশাইকে বলে একটা গল্ফ কার্টের ব্যবস্থা করুন”
ঢিলেঢালা ফোন তুলে স্প্যানিশ ভাষায় কিছু কইবার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই মামাসিটাস গেস্ট হাউসের সামনে ক্যাচ করে ব্রেক কষে একটা জীপ্ থামল|

“ ওই যে কার্লোস মশাই বাহন পাঠিয়েছেন| আপনারা বেলাবেলি ঘুরে আসুন| বেশি রাত করবেন না| মামাসিটাস গেস্ট হাউসে উইকএন্ডে দারুণ সব নাচাগানার ব্যবস্থা থাকে| মিস করবেন না যেন ....”
“ আরে না না ...সে আর বলতে ...আমরা ঠিক সময়ে ফিরে আসব ”

সারা গায়ে উল্কি করা এক পুএর্ত রিকান নব্য যুবক জীপের চালক| আমরা জীপে উঠতেই উল্কি সেই সরু সমুদ্রের ধার ঘেসা রাস্তা ধরে চড়াই উতরাইএর সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে জীপ্ চালানোর ভেলকি দেখাতে শুরু করলো| জীপ্ চলেছে ২৫১ ধরে রীতিমত বেয়াদব গতিতে ... আমি আর জেনিফার দাঁত ছিরকুটে পড়বার ভয়ে জীপের হাতল আঁকড়ে বসেছি ... চোখের সামনে বিদ্যুত গতিতে সরে সরে যাচ্ছে এক স্বর্গীয় দৃশ্যপট|আমাদের পথ চেয়ে রয়েছে এক অনাবিষ্কৃত দ্বীপ... যার নামের মধ্যে কেমন একটা দখিনা বাতাস... দিঘল বেনীর ভাব রয়েছে যেন|

ঠিক যেখানে ২৫০ এসে ২৫১এর হাত ধরেছে সেইখানে কার্লোস জীপ্ রেন্টাল| দোকানের বাইরে সারি সারি জীপ আর গল্ফ কার্ট খদ্দেরের জন্যে অপেক্ষমাণ | ঠিক উল্টো দিকেই কুলেব্রার ক্ষুদে বিমানবন্দর| যাদের অনেক টাকাকড়ি, তারা ট্যাক্সি, ফেরী, বাস, ট্রেনের চক্করে না গিয়ে পেলব চড়ুই পাখির মত ছোট্ট ছোট্ট প্লেনে চেপে কুলেব্রা বেড়াতে আসে| এয়ার স্ট্রিপের সবুজে খেলা করছে সমুদ্দুরে হাওয়া|

উল্কি আমাদের দোকানের সামনে নামিয়ে দিয়েই বাহন সমেত উল্কার মত উধাও| ছিমছাম সাদা রঙের একতলা দোকান| ভেতরে ঘন নীল কাউন্টারের ওপারে এক রকম পোশাক পরা হাসি খুশি মানুষেরা কুলেব্রা দ্বীপের চলাচল বিক্রি করছে| একটি অল্পবয়েসী মেয়ে আমাদের দেখে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালো|
“ দেখুন আমরা ২৪ ঘন্টার জন্য একটা গল্ফ কার্ট ভাড়া নিতে চাই| কিন্তু আমরা আগে কখনো গল্ফ কার্ট চালাইনি| একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে|”
“আরে: গল্ফ কার্ট চালানো কোনো ব্যাপারই নয়| চোখ বুজে শিখে ফেলা যায়!”

এর আগে সাতার আর সাইকেল চালানো নিয়ে একই মন্তব্য শুনেছিলাম| ও দুটো প্রচেষ্টায় চোখ এখনো বন্ধই আছে! নানারকম কাগজপত্রে সই সাবুদ হল| তাদের একটাতে আমরা মেনে নিলাম যে গল্ফ কার্ট নিয়ে যে কোনো প্রকার অঘটন ঘটলে সব দায় হবে আমাদের| এ বিষয়ে কার্লোস জীপ্ রেন্টালকে কখনই দায়ী করা যাবেনা| জীবনের কোনো নিজস্ব ফর্ম নেই| সে ফর্ম ছাড়াই, ঠিক একই চুক্তিতে, আমাদের দিনাতিপাত করায়|

লাইসেন্সের ফটো কপি, ভাড়ার টাকা, অঘটনজনিত দায়মুক্তি... সব বুঝে নিয়ে মেয়েটি আমাদের গল্ফ কার্ট পাড়ায় নিয়ে এলো|
“ আমরা কিন্তু একটা টকটকে লাল রঙের গল্ফ কার্ট ভাড়া নেব”
“বেশ তো.... এই যে এইখানে রয়েছে ...আসুন চালানোটা বুঝিয়ে দিই”

বেশ ঝকঝকে লাল সেলাম বাহন| তার মাথায় রোদ্দুর আটকানো একটা ছাদ.. মোট চারজন বসার বন্দোবস্ত রয়েছে| স্টিয়ারিং হুইলে একটা চেন দিয়ে তালা আটকানো|

“ এই নিন চাবি| একটা দিয়ে এই তালাটা খুলবেন আর অন্যটা দিয়ে গল্ফ কার্ট চালাবেন| এইখানে ব্রেক আর এইখানে এক্সিলেটর| এই হাতলটা ডানদিকে ঘোরালে গাড়ি সামনে যাবে আর বাদিকে ঘোরালে পেছনে| গাড়ি সবসময় তালা দিয়ে রাখবেন| হারিয়ে গেলে আপনাদের দায়| আপনাদের দিন শুভ হোক”| হাসিমুখে মেয়ে দোকানে ফিরে গেল| জেনিফারের কপালে অল্প ভাঁজ...

খানিকটা সময় গেল স্টিয়ারিং হুইলের তালা খুলতে| লাল সেলামকে মুক্ত করে আমি বসলাম চালকের আসনে ..জেনিফার আমার পাশে| চালাবার প্রথম প্রচেষ্টা খুব একটা সুখব্যঞ্জক হলো না| ব্যাটে বলে না হওয়ায় লাল সেলাম উচ্চিংড়ের মত লাফ দিয়ে পাশের এক নিরীহ বাদামী গল্ফ কার্টকে প্রায় রামগোত্তা মারে আর কি!!

“ইয়ে ...গল্ফ কার্টএর কত দাম হয় জানো ?...আমার কোনই ধারণা নেই ....”
জেনিফারের প্রশ্নে বুঝলাম যে ও আমার চালনায় খুব একটা ভরসা করতে পারছেনা|
“ঘাবড়ে যেও না| হাতটা একটু মকশ হলেই আর কোনো চিন্তা থাকবেনা|”

হাত মকশ করতে করতে জেনিফারকে নিয়ে বেরোলাম কার্লোস জীপ্ রেন্টাল ছেড়ে .. ২৫১ নম্বর রাস্তা ধরে ঢিকিশ ঢিকিশ করে এগোলো লাল সেলাম| এই পথ যেখানে শেষ হবে সেইখানে গা এলিয়ে রয়েছে ফ্লামেঙ্ক বীচ| শোনা যায় যে গোটা পুএর্ত রিকোয় এইটিই নাকি সর্বশ্রেষ্ঠ| ঘোড়ার নালের মত অর্দ্ধচক্রাকার এক অসামান্য বেলাভূমি....যেখানে জলের রং দেখলে ময়ূরের পেখমের কথা মনে হয়.... যেখানে বালির রং কিশোরীর লজ্জাকে হার মানায়...যার ডানদিকে তাকালে সবুজ পাহাড় হাতছানি দেয় আর বাদিকে শান্ত স্নিগ্ধ ক্যারিব সাগরের সীমাহীনতা.... শুনেছি এই স্বর্গের মত সুন্দর দ্বীপে এক সময় মার্কিন নৌবাহিনীর ঘাঁটি ছিল| সত্তরের দশক পর্য্যন্ত এখানে তারা বোমাবর্ষণের মহড়া করত| সেই সময়ের চিহ্নস্বরূপ এই ময়ূরপেখম তটভূমিতে জলের কিনারে কাত হয়ে শুয়ে রয়েছে একটি শের্মান ট্যাঙ্ক| এখন সেখানে ছবি আঁকে স্থানীয় মানুষ... ডিমে তা দেয় শঙ্খচিল.... ঢেউ ভাঙ্গে অভিমানে .....

বড় বিস্ময় লাগে.......

২৫১ ধরে উত্তর পশ্চিমে চলেছে লাল সেলাম| আমার হাত এখন অনেকটা সড়গড়| জেনিফার খানিকটা স্বস্তিতে| পথের দুই ধরে গেরস্তের ঘরকন্না| ছোট ছোট একতলা রংচঙ্গা বাড়ি , সামনে একচিলতে বাগানে বাহারি বোগেনভিলিয়ার ঝলমলে হাসিমুখ, চেনাশোনা নারকেল গাছ, পেঁপে গাছ, টগর, গন্ধরাজ.... মনে হল দেশে ফিরলাম যেন...

“জেনিফার ..এই রোদ্দুর এই উষ্ণতা এই রং দেখলে কে বলবে আর খানিক উত্তরে সাদা ধবধবে বরফের কঠিন শৈত্যে অসার হয়ে রয়েছে বস্টন শহর| সে যেন এক অন্য পৃথিবী|”
জেনিফার চুপ করে হাসলো| ওর প্রিয়জন রয়েছে সেই অসার বরফের কঠিন শৈত্যে|

“খানিক বাদেই সন্ধ্যে নামবে| আজকে মনে হয় ফ্লামেঙ্ক বীচ ছাড়া আর অন্য কথাও যাবার সময় হবেনা| রাতের অন্ধকারে এই সরু রাস্তায় গল্ফ কার্ট চালানোর মত হাতের মকশ এখনো হয়নি| আমরা কাল খুব ভোরবেলা উঠে বাকি জায়গাগুলি দেখে নেব...ঠিক আছে?”

জেনিফার মাথা হেলিয়ে হাসিমুখে জানালো যে ঠিক আছে| কুলেব্রা থেকে  ফাহার্দ  যাবার তিনটি ফেরী আছে| সকাল সাড়ে ছটা, দুপুর একটা আর বিকেল পাঁচটা|২৫১ ধরে যেতে যেতে ঠিক করলাম যে পরদিন আমরা দুপুর একটার ফেরী ধরতে চেষ্টা করব|  ফাহার্দ পৌঁছে আবার সান জুয়ানের ট্যাক্সি খোঁজার ঝক্কিটা বেলাবেলি দিনের আলো থাকতে থাকতে সেরে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে| কোনো কারণে যদি সেই ফেরীতে ফেরবার টিকিট না পাই তাহলে তখন থেকেই বিকেল পাঁচটার ফেরীর জন্য লাইন দেব| শেষ ফেরীর টিকিট না পেলে শেষে সান জুয়ানে জাহাজ ফেল হবে!সে এক চিত্তির!! তার মানে হলো গোটা কুলেব্রা কাক ভোরে উঠে ...লাল সেলামকে নিয়ে আধ বেলায় দেখে ফেলতে হবে| তিরিশ বর্গ কিলোমিটারের একটা দ্বীপ চষে ফেলার জন্য আধ বেলা যথেষ্ট| জেনিফারকে এখন এইসব বলে ঘাবড়ে না দেওয়াই ভাল| রাত্তিরে খাবার সময় ধীরে সুস্থে জানানো যাবে| এতখানি বুদ্ধি খরচ করে শ্রান্ত মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দিয়ে মন ভাসালাম নিসর্গে| রোদ্দুর নরম আর স্বর্ণাভ হয়ে আমাদের দিকে চেয়ে...নারকোল পাতায় বাতাসের শিরশিরোনো আদর|

খানিক এগিয়ে আমাদের ডানধারে লাগুনা ডেল ফ্লামেঙ্ক বা ফ্লামেঙ্ক লাগুন| ক্যারিব সাগরের জল কোনো একদিন ডাঙ্গায় উকিঝুকি মারতে এসে ধরা পরে গেছে| তার আর ঘরে ফেরা হয়নি| কিছু পাথুরে দেয়াল আর গাছ পালা তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে| এখন সেখানে ছায়া ফেলেছে গুল্ম লতা ...নানা পাখপাখালির বাস... তাদের এখন বাসায় ফেরার সময়... মাছের আঁশটে গন্ধ আর জীবনের নানা চিহ্ন সেই জলাভূমি জুড়ে|

লাগুন শুনলেই মনে পড়ে দা ব্লু লাগুন আর ব্রুক শিল্ডস| তখন সবে যাদবপুরে প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলাম  হয়ত... রক্ষণশীল কলকাতায় হই চৈ ফেলে দিয়েছিল এক অচেনা দ্বীপে পরিত্যক্ত সোনার বরণ মেয়ে আর এক স্বর্গীয় নীলাভ জলাশয়| জেনিফার অবশ্য সে সব কথা জানেনা ... তার চেতনায় এখন কেবল লাগুনা ডেল ফ্লামেঙ্ক|

খানিক বাদেই পৌছলাম আমাদের গন্তব্য ফ্লামেঙ্ক বীচ| নির্দিষ্ট জায়গায় লাল সালামকে বাঁধা ছাদা করে এগোলাম দুজনে| খড়ের ছাউনি দেওয়া নারকোল গাছের ছাযায় কয়েকটা দোকানে পানীয় বিক্রি করছে রোদে সেঁকা কয়েকজন মানুষ| বেশ ক্ষিদেতেষ্টা পেয়েছিল আমাদের দুজনের| কিন্তু বেলাশেষে খাবার আর কিছু অবশিষ্ট নেই| আমরা ডাব দিয়ে রাম খেতে চাই কিনা জিজ্ঞেস করলো দোকানী| আমি চাইলাম শুধু ডাব আর জেনিফার চাইল শুধু এক বোতল বিয়ার| দোকানী আমাদের চাহিদার বৈচিত্রে ওবেলিক্সের কায়দায় দিস টুরিস্টস আর ক্রেজি জাতীয় কিছু স্বগতোক্তি করে আমাদের চাহিদা মিটিয়ে টাকা বুঝে নিল| আমরা পানীয় হাতে পৌছলাম এক স্বপ্নের তটে| শেষ বেলায় সাগর কিনার প্রায় জনহীন .... জায়গাটি ঠিক যেমনটি শুনেছিলাম...অবচেতনে জেনেছিলাম ...

ঘোড়ার নালের মত অর্দ্ধচক্রাকার এক অসামান্য বেলাভূমি....সেখানে জলের রং দেখলে ময়ূরের পেখমের কথা মনে হয়.... সেখানে বালির রং কিশোরীর লজ্জাকে হার মানায়...তার ডানদিকে তাকালে সবুজ পাহাড় হাতছানি দেয় আর বাদিকে শান্ত স্নিগ্ধ ক্যারিব সাগরের সীমাহীনতা.... একদা ধ্বংসের চিহ্নস্বরূপ এই ময়ূরপেখম তটভূমিতে জলের কিনারে কাত হয়ে শুয়ে রয়েছে একটি শের্মান ট্যাঙ্ক| এখন সেখানে ছবি আঁকে স্থানীয় মানুষ... ডিমে তা দেয় শঙ্খচিল.... ঢেউ ভাঙ্গে অভিমানে .....

এই খানে গভীর রাতে ডিম পারতে আসে আদিম জায়েন্ট লেদারব্যাক সামুদ্রিক কচ্ছপ... আসে পাশে তাদের পায়ের চিহ্ন| আমি আর জেনিফার পাউডারের মত মোলায়েম হালকা গোলাপী বালির ওপরে বসলাম কিছুটা সময় .... পায়ের পাতা ছুয়ে গেল ময়ূর পেখম জল.... ক্যারিব সাগরের বাতাস বলল... ‘এলে শেষ পর্য্যন্ত?’....

আর খানিক বাদে লজ্জায় লাল হয়ে সবুজ পাহাড়ের পেছনে মুখ লুকোলো একটা আশ্চর্য্য দিন|

ফিরতি পথে সন্ধ্যেকে ধাক্কাধুক্কি দিয়ে সরিয়ে ঝুপ করে রাত নামল ২৫১ নম্বরে| গরুর গাড়ির হেডলাইট কথাটা নেহাত মিথ্যে নয়| লাল সেলাম বেশ চোখ গরম করে আমাদের আগলে আগলে চলেছে| কচ্চিত কদাচিত দু একটা জীপ হুশ করে  পাশ কাটিয়ে মিশে যাচ্ছে অন্ধকারে|লাগুনা ডেল ফ্লামেঙ্কর পাখিরা ঘুমে অচেতন| দৃষ্টি ও শ্রবণ যখন অকেজো তখন ঘ্রাণ হয় তীক্ষ্ণ|মাছের আঁশটে গন্ধ জানিয়ে দেয় লাগুনা ডেল ফ্লামেঙ্কর অবস্থান| আরো যেটা এই সময় তীক্ষ্ণ ছিল তা হলো ক্ষুধা| ফাহার্দ ফেরীঘাটের পাস্তিলো কার্নে যে কখন হজম হয়ে গ্যাছে কে জানে| পেটের ভেতরে  ছুঁচোরা ডন বৈঠক সেরে মুগুর ভাজতে লেগেছে| পর্যটন দপ্তরের কাগজ ঘেঁটে আমরা আগেই ঠিক করেছিলাম যে আজ রাতের ডিনার সারব এল ইডেন রেস্তোরায়| কুলেব্রায় এসে স্বর্গে যাবনা তাও কি হয় নাকি!

এল ইডেন নাকি টাটকা মাছের স্বর্গ| ময়ূর পেখম জল থেকে সদ্য ধরে আনা মাছ, লবস্টার, শঙ্খ রান্না হয় তরিবত করে| এখানে নাকি খোদ স্পেন থেকে আনা জাফরান দিয়ে তৈরী হয় চিংড়ি আর আঙ্গুর দেওয়া রিসোটো| সেটি যে একবার খেয়েছে তার স্বর্গলাভ সুনিশ্চিত|দোকানের মালিক দম্পতি রিচার্ড আর লুজ এর ভাষায়  ‘এখানে যদি একবার আসো, তুমি বন্ধু... যদি বারবার আসো, তাহলে তুমি পরিবার |’

মামাসিটাস গেস্ট হাউস থেকে প্রথম ডানদিক ঘুরলেই একটা ছোট কাঠের পাটাতন দেওয়া ব্রিজ...নিচে সাগর থেকে বিছিন্ন এক বিরহী জলপ্রণালী..... তারপরেই একটা বাদিক নিলেই এল ইডেন রেস্তোরা| সেখানে পৌঁছে লাল সেলামকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাঁধা ছাদা করে যখন রেস্তোরার দরজা ঠেলে ঢুকলাম তখন সেখানে খদ্দেরের জমজমাট ভিড়| নীল রঙের ছাদ, কমলা রঙের দেওয়ালে টুনি বাল্বের মালা ঝোলানো... দরজার পাশেই পানশালা.... কাঁচের গবলেটের কানায় নুন মাখিয়ে, লেবু বা আনারসের চাকতি সাজিয়ে তৈরী হচ্ছে রংবাজ মার্গারিটা| কাঁচের গেলাশের টুং টাং শব্দ ছাপিয়ে ক্যারিব দ্বীপের বাজনা.... মিঠে পার্কাসানের আওয়াজ বুকের ভেতরে দ্রিমি দ্রিমি শব্দে ধাক্কা মারে ... ঢুকতেই অভ্যর্থনা জানায় এক প্রমান সাইজের চোখে ফেট্টি বাঁধা মাটির জলদস্যু আর দোকানের মালিক রিচার্ড|
‘আপনাদের রিসার্ভেসন আছে?’
‘ আজ্ঞে না... তবে জম্পেশ খিদে আছে|’
রিচার্ড রসিক মানুষ| মুচকি হেসে বলল....
‘ আসুন একটা টেবিলের ব্যবস্থা করছি |’

দেওয়াল ঘেষে একটা টেবিল পেলাম| সেখানে বসে সকলকে হা করে চেয়ে চেয়ে দেখছি এমন সময় আমাদের টেবিলে এসে বসলেন রিচার্ডের স্ত্রী লুজ| কালো ঢেউ খেলানো চুল...লম্বাটে গড়ন... মনে হয় আদি নিবাস স্পেন ...সেই জন্যেই বোধহয় এই স্বর্গের অমৃত হলো জাফরানি রিসোটো| লুজ আমাদের ধৈর্য্য ধরে আজ মেনুতে কি কি আছে ...আর তা কেমন করে তৈরী হয়েছে সব বুঝিয়ে দিলেন| দোকানের মালকিন নিজে এসে মেনু বুঝিয়ে অর্ডার নিচ্ছেন এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি| যাই হোক...সাব্যস্ত হলো যে জেনিফার খাবে মাখন মাখা লবস্টার আর আমি খাব একটা রেড স্ন্যাপার ভাজা|সঙ্গে এক বাটি চিংড়ি আর আঙ্গুর দেওয়া রিসোটো আমরা ভাগাভাগি করে নেব|জেনিফার খাবে একটা রংবাজ মার্গারিটা আর আমি খাব এক গেলাস ঠাণ্ডা জল| খানিক বাদে টেবিলে খাবার এল| খাবারের পরিমান দেখে তো আমাদের চোখ কপালে... জেনিফারের লবস্টার যেন মাখনে নাইতে আসা তিমিমাছ ...আর আমার রেড স্ন্যাপার বিশাল প্লেটে জায়গা সংকুলান করতে পারছেনা...তার কুরমুরে ভাজা ল্যাজ প্লেটের বাইরে নিশানের মত উত্তান| যেমন টাটকা মাছ, তেমন উপাদেয় রান্না| পেট ভরে মন ভরে তৃপ্তি করে খেয়ে দেয়ে রিচার্ড আর লুজকে বিদায় জানিয়ে লাল সেলামকে বন্ধনমুক্ত করে ফিরলাম মামাসিটাস গেস্ট হাউস| সেখানে তখন সাংঘাতিক জগঝম্প বাজনা চলছে ... চারিদিকে আলোর রোশনাই... গিটার বাজিয়ে গান গাইছে একটি মেয়ে.... ঘন নীল জলের লাগোয়া টেবিলে গালগল্পে মশগুল হুল্লোরে মানুষ ... বরফ শীতল মার্গারিটারা নুন ছিটিয়ে তৈরি...দেয়ালে একটা সাইন দেখতে পেলাম....বালিমাখা পায়ের বুড়ো আঙ্গুল আর নুনমাখা চুমু .....
ঢিলেঢালার কথা মনে পড়ল....
“আপনারা বেলাবেলি ঘুরে আসুন| বেশি রাত করবেন না| মামাসিটাস গেস্ট হাউসে উইকএন্ডে দারুণ সব নাচাগানার ব্যবস্থা থাকে| মিস করবেন না যেন ....”

জলের ধারে একটা টেবিলে বসলাম আমি আর জেনিফার| অন্ধকার নেমেছে|সেই অন্ধকারে জলের ভেতরে কয়েকটা ঘন নীল রঙের আলো জলছে| সম্মোহক আলো ... সেদিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকা যায় বহুক্ষণ| দেখলাম আমারই মত সম্মোহিত কয়েকটা বিশাল মাছ সেই আলোকে ধীরে ধীরে প্রদক্ষিণ করে চলেছে| তাদের যেন আর অন্য কোথাও সাঁতরে যাবার শক্তি নেই| কিছু না অর্ডার করলে যদি খেদিয়ে দেয় তাই আমরা  ফলের রস চাইলাম| না| মামাসিটাস গেস্ট হাউসে উইকএন্ডে সন্ধ্যায় বোধহয় এমন অর্ডার কেউ করে না| পরিবেশিকা শুধোল আমরা ফলের রসে রাম মেশাতে চাই কিনা| আমাদের উত্তর শুনে চাহিদার বৈচিত্রে ওবেলিক্সের কায়দায় দিস টুরিস্টস আর ক্রেজি জাতীয় কিছু একটা স্বগতোক্তি করে আমাদের চাহিদা মিটিয়ে টাকা বুঝে নিল|

ঠিক এই সময়ে গায়িকা গান শেষ করে গিটার বাক্সবন্ধ করে চলে গেল আর শুরু হলো সার্বজনীন কারাওকে| সামনে একটা স্ক্রিনে গানের কথা ভেসে ভেসে উঠছে.... ভালবাসার গান, মিলনের গান, বিরহের গান আর সমবেত জনতা গলা সপ্তমে ঠেলে সেই সব গান গাইতে লাগল| সব গানই তাদের মুখস্থ| কেউই খুব একটা পর্দায় চোখ ফেলছে না| বুঝলাম ঢিলেঢালা উইকএন্ডে দারুণ সব নাচাগানার ব্যবস্থা নিয়ে অতিশয়োক্তি করেনি|
খানিক বাদে জেনিফারের পানে চেয়ে দেখি কপালে বেশ কয়েকটা ভাজ|
“ বেশি আওয়াজ মনে হচ্ছে? ঘরে যাবে?”
“তাই চল”
কারাওকে স্টেজের পাশ দিয়ে দোতলার সিঁড়ি আর তার মাথাতেই আমাদের ঘর| তখন প্রায় মধ্যরাত| নীচে সকলে চিল চিৎকার করে  গাইছে ...
‘ইউ আর দা ওনলি ওয়ার্ল্ড আই নো.....’
ঘরে ঢুকে দোর দিলাম| জেনিফার ওর ব্যাকপ্যাক খুলে ক্রীম, চিরুনি ইত্যাদি বার করছে.... কপালে আওয়াজের ধাক্কা...
“ আমি আমার ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে রাখছি বুঝলে ... কাল অন্ধকার থাকতে উঠে দ্বীপের অন্য দিকটা ঘুরে আসব| দুপুর একটার ফেরী নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে”

জেনিফারের ক্রীমমাখা হাত নাকের পাশে থমকালো|
“এই এত রাতে ঘুমিয়ে অন্ধকার থাকতে উঠবে?... আজ এত ধকল গেল ...আমি বোধহয়  অত সকালে উঠতে পারবোনা|....”
“ আচ্ছা ..তুমি দেখো উঠতে পার কিনা... আমি ভোরবেলা যাব ঠিক করলাম|”
“ আমি না গেলেও যাবে?”
“হ্যা... যাব |  কাল হাতে কেবল কয়েক ঘন্টা সময়|ভোরবেলা না গেলে আমার এই জীবনে  আর কুলেব্রার বাকিটা দেখা হবে না | এই দ্বীপে সূর্যোদয় দেখা হবে না .... আর পরজন্ম সম্বন্ধে এখনো ধারণা বেশ ধোঁয়াটে”
জেনিফার মাথা ঝাকিয়ে ঝাকিয়ে হাঃ হাঃ করে হাসলো .
“ ঠিক আছে ...আমাকেও ডেকে দিও... আমিও যাব ..পরে জাহাজে ফিরে ঘুমিয়ে নিলেই হবে ”
“ বেশ তো ”
নীচে সকলে চিল চিৎকার করে  গাইছে ...
“উনা পালোমা ব্লান্কা”

আমি লাল ফুলতোলা কাপড়ের  ব্যাগ থেকে রাতের পোশাক, দাঁতের মাজন, ব্রাশ  ইত্যাদি নিয়ে বাথরুমে গেলাম| সেখানে গিয়ে প্রথম কাজ হলো জোরে কল খুলে দেওয়া...যাতে কোনো জৈবিক শব্দবাদ্য জেনিফারের কানে না পৌঁছয়| এমনিতেই আমি কোনদিন কোনো মেমসাহেবের সঙ্গে রাত্রিবাস করিনি... তার ওপরে যদি রাত্রে নাক ডাকে সেটা নিয়েও বিশেষ দুশ্চিন্তা| এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কলকাতার এসি মার্কেট থেকে কেনা কমলা ফুল ছাপ, বুকে বক্রম সেলাই আর লেস বসানো ঢোলগোবিন্দ হাফ হাত নাইটি পরে খুব আড়ষ্ট হয়ে বাথরুম থেকে বেরোলাম|

নীচে সকলে চিল চিৎকার করে  গাইছে ...
“ সুইট ক্যারোলাইন ...”
জেনিফার হরাস করে ওর ফুলহাতা গেঞ্জী আর জিনস খুলে ফেলল...দেখলাম নিচে একটা কালো হাফ প্যান্ট আর কালো হাতকাটা গেঞ্জী|
“আমার কাছে মুখ পরিষ্কার করার জন্য তুলো আছে জেনিফার ...এই নাও...কানে গুঁজে নাও...নীচে যা আওয়াজ হচ্ছে !! গুড নাইট স্লীপ টাইট”
ঘড়িতে ভোর চারটের অ্যালার্ম দিয়ে ঢোলগোবিন্দকে সামলে সুমলে বিছানার এক্কেবারে বাদিকে, বাদিক ফিরে শুলাম|
নীচে সকলে চিল চিৎকার করে  গাইছে ..
“ এন্ড আই লাভ ইউ সো ...দ্যাট পিপল আস্ক মি হাউ ..হাউ আই লিভড টিল নাউ...
আই টেল দেম .... আই ডোন্ট নো .......”

ফোনে অ্যালার্ম  অথবা কানে তুলো কোনটারই দরকার ছিলনা| গানের গুঁতো আর কুলেব্রায় একটা টাটকা দিনের জন্ম দেখার অধীর আগ্রহে ঘুমের টিকিটিও দেখা গেল না| চারটে নাগাদ উঠে পা টিপে টিপে ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাথরুমে গিয়ে ঢোলগোবিন্দকে এ যাত্রার মত অবসর দিয়ে চটপট তৈরী হয়ে নিলাম|
“সুপ্রভাত জেনিফার ...উঠে পর...এবার বেরোতে হবে ”
“সুপ্রভাত”
জেনিফার বাথরুমে গিয়ে খুব জোরে কল খুলে দিল| আমি ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম| গতকাল রেস্তোরায় পরিবেশিকাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এই দ্বীপে কোথা থেকে সবচেয়ে ভালো সূর্যোদয় দেখা যাবে| মিষ্টি হেসে মেয়েটি আমাদের সেই পথ বাতলে দিয়েছিল|

অন্ধকার থাকতেই আমি আর জেনিফার রাস্তায় নামলাম| লাল সেলামের গায়ে রাতের শিশির পড়েছে| রাস্তাঘাট শুনশান| কারাওকে গায়কের দল শেষরাতে ঘুমিয়েছে| তাদের ঘুম ভাঙ্গতে এখন ঢের দেরী|লাল সেলাম অল্প আড়মোড়া ভেঙ্গে আমার নির্দেশে সাড়া দিল| মামাসিটাস গেস্ট হাউস থেকে প্রথম ডানদিক ঘুরলেই একটা ছোট কাঠের পাটাতন দেওয়া ব্রিজ...নিচে সাগর থেকে বিছিন্ন এক বিরহী জলপ্রণালী.....তারপরেই একটা বাদিক নিলেই প্রথমে এল ইডেন রেস্তোরা...তারপর ভিলা বোহেমে.... পুবের আকাশে অল্প ফরসা ভাব.... আমার বা দিকে এনসেনেদা হন্ডা... এই দ্বীপের সবচাইতে বড় জেটি এলাকা .... ক্যারিব সাগরের জল এখানে লক্ষ্মী মেয়ের মত চুপটি করে বসে রয়েছে...কোনরকম দস্যিপনা নেই| তাকে চারিদিকে অভিভাবকের মত ঘিরে রয়েছে কুলেব্রা দ্বীপ| লোকে বলে যে গোটা ক্যারিবিয়ানে নাকি এনসেনেদা হন্ডার মত এত সুরক্ষিত বন্দর নেই ... আর যেখানেই  হারিকেন হোক না কেন... এই শান্ত মেয়েটিকে কোনো ঝড় কোনদিন বিপদে ফেলতে পারবেনা| জলের পাশ দিয়ে চলেছে লাল সেলাম| দুরে পাহাড়ের আড়ালে একটা দিনের জন্মমূহূর্ত আগত| এবার ডানদিকে ভিলা প্যানোরামা.... কাছেই কোথাও একটা মোরগ ডেকে উঠল ..... আমি আর জেনিফার এই অসামান্য সৌন্দর্যের মহানুভবতায় নিশ্চুপ...নতজানু| আর ঠিক তখনই.... আমাদের পথ আটকে ...এনসেনেদা হন্ডার জলে সোনার প্রদীপ জ্বালিয়ে একেবারে সামনে এসে দাড়ালেন বিভাবসু|
মুগ্ধ হলাম....

খানিক বাদে ডানদিকে পড়ল ক্লাব সীবোর্ন হোটেল| এই দ্বীপের সবচেয়ে অভিজাত আস্তানা| কোথাও কোনো জনমানব নেই...সমস্ত দ্বীপ যেন ঘুমের কাঠি ছোঁয়ানো  রাজকন্যে| লাল সেলামে সওয়ার, অচিন দেশে, এক নীল পোশাকের মানুষের ঠাকুমার ঝুলি মনে পরে...

‘ খোক্কস বলিল ..বঁটে! ঘঁরে কেঁ জাঁগে?
যত খোক্কসে কিচিমিচি .... কেঁ জাঁগে?কেঁ জাঁগে?
লালকমল উত্তর করিলেন –
নীলকমলের আগে লালকমল জাগে
আর জাগে তরোয়াল
দপ দপ করে ঘিয়ের দীপ জাগে
কার এসেছে কাল?’

যেতে যেতে যেতে যেতে এক সময় জলের কিনারে রাস্তা শেষ হয়ে গেল| সামনে আর পথ নেই...স্থল নেই...যতদূর চোখ যায় সোনার রঙ্গে রাঙানো ক্যারিব সাগর| আমি আর জেনিফার সেই সীমারেখায় এসে খানিক সময় দাড়িয়ে রইলাম| মোরগ ডাকছে.... .....গাছের পাখিরা নতুন দিনের জন্য প্রস্তুত ... কয়েকটা প্রজাপতি দিশেহারার মত উড়ে বেড়াচ্ছে ইতস্তত ...হঠাত মাটির দিকে তাকিয়ে দেখি একটা শামুক হেঁটে হেঁটে চলেছে| সাদা কালো ফুটকি দেওয়া গায়ের রং একেবারে পথের সঙ্গে মিশে রয়েছে| চলাফেরা না করলে ঠাহর করতে পারতাম না| কিন্তু শামুকের তুলনায় গতিবেগ যথেষ্ট দ্রুত| আস্তে করে শামুকেটাকে উল্টে দেখি... তার পেটে লাল রঙের দাঁড়া... সেটিকে চট করে যে গুটিয়ে নিচ্ছে সে মোটেও শামুক নয়... শামুকের খোলে আশ্রয় নেওয়া অনুপ্রবেশকারী হার্মিট ক্র্যাব| কাগবগের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য এক অসাধারণ বর্মধারণ|

লাল সেলাম এবার ফিরতি পথে| বেশ খিদে পেয়েছে দুজনার| শহরে ফিরে কোথাও একটা সকালের  চা জলখাবার সারতে হবে| তারপর শেষবারের মত মামাসিটাস গেস্ট হাউসে ফিরে, স্নান সেরে, ঘর ছেড়ে দিযে এই দ্বীপের বাকিটুকু দেখে নেওয়া| জেনিফার এখন চালকের আসনে| ফাঁকা রাস্তায় ও এবার হাত মকশো করে নিচ্ছে | একটা নাছোরবান্দা মোরগ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই গোটা দ্বীপে| হঠাত কারো দৌড়নোর আওয়াজ কানে এলো | পথের বাঁক ঘুরতেই দেখলাম একটি মেয়ে কালো গেঞ্জী আর ট্র্যাকপ্যান্ট পরে সকালবেলা দৌড়তে বেরিয়েছে .... মাথায় কালো হেডব্যান্ড...পায়ে সাদা কালো স্নীকার্স| চাবুকের মত শরীরে চুইয়ে পড়ছে প্রথম আলো| লাল সেলামের পাশ দিয়ে ছুটে যেতে যেতে আমাদের পানে চেয়ে একটু হাসলো| আমিও হাত নেড়ে হাসলাম....

তখন জানতাম না যে আর কয়েক ঘন্টা পরে ওর সাথে আবার দেখা হবে....সম্পূর্ণ অন্য পরিস্থিতিতে ..... 

শহরের ঠিক মাঝখানটিতে পান্ডেলা বেকারী| হলদে রঙের একতলা দোকানের গায়ে নরম সকালের রোদ| এ জায়গাটার কথা আগে জানতাম না| মামাসিটাস গেস্ট হাউসের ঠিক পাশের রাস্তাতেই দোকান| খানিক আগেই দোকান খুলেছে| একজন দুজন করে সবে খদ্দের আসতে শুরু করেছে| আমরা তাড়াতাড়ি লাল সেলামকে বেঁধে ছেদে কাঁচের দরজা খুলে দোকানে ঢুকলাম| টাইলস বসানো মেঝে...কাউন্টারে নানারকম মিষ্টিমাষ্টা সাজানো... ওপরে নোটিশ বোর্ডে মেনু লেখা আছে| ঊর্ধ্বমুখী হয়ে খাদ্যচাহিদা জানালে একজন অর্ডার লিখে নেবে আর অন্য একজন গরমাগরম রেঁধে দেবে| কয়েকটা টাইলস বসানো টেবিল আর প্লাস্টিকের চেয়ার সাজানো রয়েছে| কাগজের প্লেট আর স্টাইরোফোমের গেলাস|আমি আর জেনিফার পান্ডেলা বেকারীতে বসে পেট পুরে ডিম রুটি সসেজ ইত্যাদি নানা স্বাস্থ্যবর্ধক খাবার খেয়ে ক্ষান্ত দিলাম| আমি  সঙ্গে নিলাম এক বোতল কমলা লেবুর রস| জেনিফার নিল মারাত্ত্বক কড়া দু কাপ তিতকুটে কফি| কারাওকের জ্বালায় প্রায় সারারাত জেগে ছিল বটে কিন্ত মনে হয় ঐরকম কফি খেলে আগামী দু হপ্তাও জেগে থাকবে !! আসতে আসতে ভিড় বাড়তে লাগল| আমরা লাল সেলামে চেপে শেষ বারের মত মামাসিটাস গেস্ট হাউসে ফিরলাম|

স্নান সেরে পোশাক পাল্টে নিলাম| নীলকমল থেকে এক্কেবারে লালকমল| সওয়ার হয়ে বেরোলে কোনটা যে গাড়ি আর কোনটা মানুষ বোঝা যাবেনা| জেনিফার দেখলাম স্নান করে একই পোশাক পরে রইলো| বোঝাই যাচ্ছে যে আমার লাল ফুলতোলা কাপড়ের  ব্যাগে ওর ব্যাকপ্যাকের ঢের বেশি জিনিস আঁটে|
একতলার আপিস ঘরে টাকা মেটাতে গিয়ে রাত দুটো অব্দি কারাওকের আওয়াজ নিয়ে ঢিলেঢালার কাছে একটু গজর গজর করল জেনিফার...
মোলায়েম মাখন হাসি হাসল ঢিলেঢালা....
“ হেঃ হেঃ ...আপনাদের তো বলেছিলাম যে মামাসিটাস গেস্ট হাউসে উইকএন্ডে দারুণ সব নাচাগানার ব্যবস্থা থাকে....হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ ....” 
আমরাও হেঃ হেঃ করে বাইরের রোদ্দুরে|
“ জেনিফার একবার ফেরীঘাটে যাই চল| টিকিটের ব্যবস্থাটা বুঝে আসা যাক|”
“তাই চল”
ফেরীঘাট ফাকা| কেউ কোত্থাও নেই|
“কি ব্যাপার? এখন এখানে কি করছেন? এখন তো ফেরী নেই ...”
চেয়ে দেখি বিয়ারের বোতল হাতে, ফুল ছাপ জামা আর হাফ প্যান্ট পরা এক লটর পটর আমেরিকান| ওনার মনে হয় গতকাল রাত এখনো শেষ হয়নি ...নইলে সকাল নটা নাগাদ কেউ মদ্যপান করে?”
“ না ..মানে দুপুর একটার ফেরী ধরব ...তাই টিকিট কাটতে এসেছিলাম...”
“ ওহ...সে টিকিট তো এখন পাওয়া যাবে না... একটার ফেরীর টিকিট বিক্রি হবে বারোটা থেকে... তখন আসবেন....এখন এখানে কিসুই হবে না...”

দেখলাম লটর পটর জাতে মাতাল তালে ঠিক| আর কথা না বাড়িয়ে লাল সেলামের মুখ  ঘুরিয়ে নিয়ে এগোলাম মেলোনেস বীচের পথে| খানিকটা পশ্চিমে গেলেই জনমানবশূন্য মেলোনেস বীচ| এইখানে সামুদ্রিক জীবজন্তুর অভয়াশ্রম| মাছ ধরা বা অন্য জীবজন্তুকে কোনভাবে উত্যক্ত করা বিলকুল বারণ| কোথাও একটা আশ্চর্য্য পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল.... শান্ত সমুদ্রে নরম ঢেউয়ের আওআজ.... সব রকম নীল মিশিয়ে জল এঁকে রাখা হয়েছে যেন.... আমি আর জেনিফার সেই বেলাভূমি ধরে হেঁটে গেলাম খানিকটা পথ.... মাঝে মাঝে নীচু হয়ে কুড়িয়ে নিচ্ছিলাম নুড়ি, প্রবাল, ঝিনুক| কি প্রশান্তি সেই বেলাভূমিতে ...সময় যেন থমকে রয়েছে.... আর কোথাও যাবার নেই ...কিছু পাবার নেই ....কিছু হারাবার নেই.....|

“চল ২৫০ ধরে দ্বীপের পূব দিকটা দেখে আসি”
জেনিফারের কথায় সম্বিত ফিরল ....
“চল”
২৫০ প্রথমে পূব দিকে যায় তারপরে হঠাত কি খেয়ালে উত্তরমুখো হয়ে এগোতে থাকে গেরস্থের বাড়ি, ভেড়ার খামার আর আস্তাবলের পাশ দিয়ে| একেবারে শেষ দিকটায় রাস্তায় সাংঘাতিক উতরাই আর রাস্তা গিয়ে শেষ হয়েছে সমুদ্দুরে| টিলার ওপর থেকে ওই গা ছমছমে উতরাই দেখে মনে হচ্ছিল এবার বুঝি নড়বড়ে লাল সেলামকে নিয়ে হুরমুরিয়ে এক্কেবারে সাগরের গভীর নীলেই সলিল সমাধি!!  আমাদের আর দুপুর একটার ফেরী ধরতে হবে না!

যাই হোক.... কোনরকম অঘটন না ঘটিয়ে লাল সেলাম আমাদের জোনি বীচ ঘুরিয়ে আনলো| বেলাভূমির অসামান্য রূপ এতক্ষণে আমাদের কাছে জল ভাত হয়ে গ্যাছে| ডাকসাইটে  রূপসী বিয়ে করা বউ হলে যা হয় আর কি ... ঘর কা মুরগী ডাল বরাবর! তবু আরও একবার একটা আশ্চর্য্য দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হতেই হল| ফেরার পথে চালকের আসনে জেনিফার| আমি তাই রাস্তার থেকে চোখ সরিয়ে আশ পাশটায় বেশি মনোযোগ দিতে পারছি.... ঘন নীল জলের পাশ দিয়ে চলেছে লাল সেলাম|
“জেনিফার একটু গাড়ি থামাও.... গাড়ি থামাও.... একটু ব্যাক কর ...প্লীজ...”

জেনিফারকে গাড়ি থামিয়ে হাতলটা বাদিকে ঘুরিয়ে খানিকটা পেছনপানে যেতে হল| গাড়ি থেকে নেমে জলের পাশটিতে গিয়ে ভাল করে ঠাহর করে আমরা দুজনে হতবাক| এইখানটা খানিক পাথুরে ...জলে শিকড় ডুবিয়ে নিশ্বাস নিচ্ছে গরান গাছ.... আর ঠিক তার পাশে...কি আশ্চর্য্য.... কি আশ্চর্য্য.... ঠিক তার পাশে....অনেক অনেক অনেকগুলি শঙ্খ.....!! তাদের গায়ের রোদের আলোয় এক গোলাপি আভা... কি স্নিগ্ধ রূপ....কেন যে তারা দল বেঁধে এক জায়গায় জড়ো হয়েছে কে জানে.... এরা কি সকলে মৃত?....এইখানেই কি তবে ইচ্ছামৃত্যু?... তাদের এমন আকস্মিক প্রকাশে আমরা মুগ্ধ.... ঠিক যখন মনে হচ্ছিল সবই তো জানা হয়ে গ্যাছে...দেখা হয়ে গ্যাছে...বোঝা হয়ে গ্যাছে...ঠিক তখনি.... ঠিক তখনি .... শঙ্খমালার সঙ্গে দেখা হল|
“সাগর রানীর সাগর কন্যা বুক পাতিয়া দিল
হাজার শঙ্খে আরতি দিয়া পাতালপুরে নিল|”

রোদের তাপ বাড়ছে| সকালে যে ছিল কোমল প্রদীপের মত, সে এখন হাজার আলোর রোশনাই আর আগুন নিয়ে হনহনিয়ে এগোচ্ছে মধ্য গগনের দিকে| লাল সেলাম রোদে সেঁকা ২৫০ ধরে চলেছে দক্ষিণ পশ্চিমে ... তার চাকায় এখন ঘরে ফেরার সুর...কার্লোস জীপ্ রেন্টালে অপেক্ষা করে রয়েছে নতুন সওয়ারী| ফিরতি পথে মনটা বড় উচাটন ছিল| এই স্বপ্নের মত দ্বীপ, ময়ূর পেখম জল, আচমকা আবিষ্কৃত শঙ্খবেলা,বালির তাপের  জিয়নকাঠিতে কাছিমের প্রাণ ...এই সব ছেড়ে ফিরে যেতে হবে দৈনন্দিন ব্যস্ততায় .... ফিরে যেতে হবে এক আগ্রাসী শৈত্যে.... ফিরে যেতে হবে নিরবিচ্ছিন্ন নিস্তব্ধতায়.....সে একরকম অস্থিরতা| এছাড়া একটার ফেরী ধরবার অনিশ্চয়তা ... ফাহার্দয় পৌঁছে বাহন পাবার ডামাডোল.... দর কষাকষি ...এই সব চিন্তা হৈ হৈ করে বল্লম উঁচিয়ে তেড়ে আসছিল মগজের কোষে কোষে| একটা ছবি মাথায় ঘুরছিলো ... সান জুয়ানের ফাঁকা বন্দর ...আমাদের জাহাজ টি এস কেনেডি কিছুক্ষণ আগে চলে গেছে উত্তরপানে ... লাল সালোয়ার কামিজ পরণে,লাল ফুলতোলা কাপড়ের  ব্যাগ হাতে আমি শুনশান বন্দরে ভ্যাবলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি| অপরিচিত পথচারীরা পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে|

যখনই এই সব চিন্তাগুলি মাথায় ভিড় করে আসে.... যখনই দুঃখবোধ  চেতনাকে আচ্ছন্ন করে .... যখনই কষ্ট হয়... তখনই আমি গিয়ে প্রকৃতির হাত ধরি| সে আমাকে তার রূপ রস শব্দ গন্ধ দিয়ে এক আশ্চর্য্য মায়ায় ভুলিয়ে রাখে| আমি চোখ রাখলাম ময়ূর পেখম জলে... কান রাখলাম ঢেউএর সমর্পনে...মন রাখলাম দ্বীপের মায়ায়...| কোথায় যে সাগর শুরু আর আকাশ শেষঠিক ঠাহর হয় না .....আর ওমনি বল্লমগুলি গুটিয়ে পাটিয়ে চিন্তাগুলি কোথায় গিয়ে লুকোলো কে জানে|

কার্লোস জীপ্ রেন্টালের সঙ্গে আগে থেকেই ব্যবস্থা করা ছিল| তারা লাল সেলামকে ভাল করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বুঝে নিয়ে একটা জীপে করে আমাদের কুলেব্রা ফেরীঘাটে পৌঁছে দেবার বন্দোবস্ত করলো| এবার আর উল্কির উল্কাপাত নয়...ভারী সুবোধ এক কিশোর ধীরে সুস্থে গল্প করতে করতে জীপ চালাচ্ছে|

“ ভাই আমরা একটার ফেরীর টিকিট পাব তো?”
“নিশ্চই পাবেন| কোনো চিন্তা করবেন না| বেশির ভাগ টুরিস্ট এখানে সারা দিন কাটিয়ে সন্ধ্যের ফেরী ধরে...আপনাদের কোনই অসুবিধে হবে না ”
“ ভাই এখানে দুপুরে হালকা কিছু খেয়ে নিতে চাই| কতক্ষণে ফাহার্দ পৌছব তার ঠিক নেই... কোনো ভালো জায়গা বাতলাতে পারো?”

“ নিশ্চই পারি ... আপনারা ভিব্রা ভের্দেতে খেয়ে নেবেন| ফেরীঘাট থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা  পথ| সেখানে যে একবার স্যান্ডুইচ খেয়েছে তার জন্ম সার্থক!”
“ থ্যাঙ্ক ইউ ভাই| ফেরীর টিকিট কেটে তাহলে সেখানেই কিছু খেয়ে নেব”
সুবোধ আমাদের ফেরীঘাটে নামিয়ে হাসিমুখে হাত নেড়ে আবার এস বলে ফিরে গেল|

তখন ঠিক দুপুর বারোটা| কিছু মানুষ লাইন দিয়েছে টিকিট কাউন্টারের সামনে| আমরা যাদের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম| একজন পুলিশগোছের লোক আমরা ঠিক কোথায় দাঁড়াব, ঠিক কোথায় টিকিট কাটব এই সব নিয়ে স্পানিশ ভাষায় বিস্তারিত নির্দেশ দিয়ে গেল| আমরা মাথা নেড়ে জানালাম যে সব বুঝেছি! লটর পটরকে কথাও দেখলাম না| তার বোধহয় এখন রাত হয়েছে| টিকিট কেটে নিশ্চিন্ত হয়ে আমি আর জেনিফার এগোলাম সুবোধের বাতলে দেওয়া গন্তব্যে |ভিব্রা ভের্দে রেস্তোরা...নেবেন| ফেরীঘাট থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা  পথ| সেখানে যে একবার স্যান্ডুইচ খেয়েছে তার নাকি জন্ম সার্থক!

খুব ভালো লাগলো|অর্গানিক খাবারের এই দোকানটি  চালায় মধ্য তিরিশের এক দম্পতি নেস্টর আর আনাবেল| টাটকা মাছ, ফলমূল, শাক সবজি দিয়ে নিজের হাতে খাবার বানায় আনাবেল| নেস্টর খদ্দেরদের দেখাশোনা করে.. টাকাকড়ির ব্যাপারগুলো ও সামলায়| ওরা নিজেরা রুটি তৈরী করে ... ভালো চীজ আনায় সাগরপার থেকে ... তরিবত করে তৈরী করে টাটকা স্যান্ডুইচ, ফ্রুট স্যালাড, এগ বেনেডিক্ট| একটা সার্ফ বোর্ডে চক দিয়ে মেনু লেখা রয়েছে| হাতে সময় অল্প| জেনিফার একটা আভকাডো স্যান্ডুইচ আর আমি একটা চিকেন স্যালাড স্যান্ডুইচ প্যাক করে দিতে বললাম..সঙ্গে টাটকা ফলের রস| বেশ তাড়াতাড়ি হাতে তৈরী রুটিতে মাল মশলা দিয়ে স্যান্ডুইচ বানিয়ে দিল আনাবেল| ফেরীঘাটের কাঠের বেঞ্চিতে বসে ভাবুক ভাবুক মুখ করে নীলের পানে চেয়ে সেই তরিবত করে বানানো খাবার খেলাম| এমন সময় কায়ো ব্লাংকো ভেঁপু বাজিয়ে জানান দিল ...সময় হয়েছে.... এবার যে যেতে হবে.....

কায়ো ব্লাংকো চলেছে ফাহার্দ অভিমুখে .... পেছন পানে ঝাপসা হয়ে আসছে  কুলেব্রা ফেরীঘাট ...সামনে  অগুন্তি ছোট ছোট দ্বীপ...সেখানে মানুষ বাস করেনা ...সেখানে কেবল বাসা বাঁধে সামুদ্রিক পাখি ...তাদের পাশ কাটিয়ে আমরা এগোলাম ফাহার্দ অভিমুখে.... পেছনপানে রয়ে গেল সেই দ্বীপ... যার নামের মধ্যে কেমন একটা দখিনা বাতাস... দিঘল বেনীর ভাব রয়েছে যেন|

অবশেষে কায়ো ব্লাংকো ভিড়ল ফাহার্দ জেটির পাঁচ নম্বর গেটের সামনে| সব যাত্রীর মনে হল  নির্দিষ্ট গন্তব্য, বাহন বা ব্যবস্থা রয়েছে| তাদের চলনের দৃপ্ততায় সেটা স্পষ্ট|আমি আর জেনিফার জেটি থেকে বেরোলাম চাতক পাখির অস্থিরতায়| বাইরে দু একটা ট্যাক্সি...কিন্তু তাদের সওয়ারী ঠিক হয়ে গ্যাছে| অন্য সকলে হাঁটা দিয়েছে কার পার্কের দিকে ..তাদের নিজস্ব গাড়ি আছে| একটা ট্যাক্সিতে উঠবার উপক্রম করছিল দুটি অল্পবয়েসী মেয়ে|পরণে টি শার্ট আর জিনস, পিঠে ব্যাকপ্যাক| হন্তদন্ত হয়ে লাল সালোয়ার কামিজ তাদের শুধলো.. 
“আচ্ছা আপনারা কি সান জুয়ান যাচ্ছেন?”
“হ্যা ... সান জুয়ান বিমান বন্দর”

“ ওহ... আমরাও সান জুয়ান ফিরব তবে আমাদের গাড়ি নেই... আমরা কি আপনাদের সঙ্গে এই ট্যাক্সিতে যেতে পারি? ভাড়াটা ভাগাভাগি করে নেওয়া যাবে| আমনাদের বিমানবন্দরে পৌঁছে আমরা যাব জাহাজঘাটায়| বারতি যা লাগবে আমরা দিয়ে দেব”
মেয়ে দুটি নিজেদের ভেতরে মৃদু স্বরে প্রস্তাবটা বিবেচনা করে ট্যাক্সি চালকের সাথে কথা বলে নিল| সকলে রাজি| সকলের মাথা পিছু ২০ ডলার খরচা পরবে| আমরাও হাঁপ ছেড়ে নিজস্ব ব্যাক প্যাক আর লাল ফুলতোলা কাপড়ের  ব্যাগপত্র নিয়ে গাড়িতে উঠলাম| 

গাড়ি চলেছে সান জুয়ান অভিমুখে| জানালার বাইরে হুশ হুশ করে সরে যাচ্ছে লোকিলো, রিও গ্রান্ডে,  ক্যারোলিনা, হাসিয়েন্দা পাহাড়..... আমি আর জেনিফার পেছনের সিটে বসেছি যার সঙ্গে তাকে ভারী মিষ্টি দেখতে ... রজনীগন্ধার মত স্নিগ্ধ চেহারা ...পেশায় অস্ট্রিয়ান এয়ার্লাইন্সের এয়ার হোস্টেস ...বান্ধবীর সাথে ছুটি কাটাতে এসেছিল এই দ্বীপে| সামনের সিটে প্রৌঢ় চালকের পাশে যে বসেছে তার চাবুকের মত শরীর... দেখলে লাল গোলাপের কথা মনে হয় .... পেশায় পূর্ত দপ্তরের সরকারী অফিসার| আমরা পরস্পরের সাথে কথা কইছিলাম...ট্যাক্সি চালকও ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে তাল মেলাচ্ছিল| বলছিল ওর পরিবারের কথা অর ছেলের কথা যার বয়েস নাকি পাশে বসা মেয়েটির মতই  হবে| জেনিফার অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিল| হঠাৎ লাল গোলাপকে বলল
“ আচ্ছা আজকে ভোরবেলা কি তুমি এনসেনেদা হন্ডার পাশ দিয়ে দৌড়োচ্ছিলে? আমরা একটা লাল রঙের গল্ফ কার্ট চেপে যাচ্ছিলাম ...মনে আছে?
“ ওহ ...হ্যা হ্যা.... ঠিক ঠিক ..তাই ভাবছিলাম তোমাদের কোথায় দেখেছি....?”

লাল গোলাপ উচ্ছসিত হয়ে হাসতে লাগলো...হাসির দমকে কেঁপে উঠলো চাবুক শরীর....আর পাশে বসা সমবয়েসীর পিতার চোখের দৃষ্টি আর মনোযোগ পাল্টাতে লাগলো আলগোছে.... আড়ালে....

তারপর...বিমানবন্দর....তারপর জাহাজঘাটা....তারপর আর এক যাত্রাপথ...আর এক গন্তব্য.... আর এক শীত...আর এক বসন্ত.....আর এক বিরহ ...আর এক মিলন .... কিন্ত সে সবের আড়ালে ...আলগোছে... থাকবে একটা ঝোঁকের মাথায় দেখে ফেলা দ্বীপ......যার নামের মধ্যে কেমন একটা দখিনা বাতাস... দিঘল বেনীর ভাব রয়েছে যেন.... যে বয়েস মানেনা... আগুপিছু ভাবেনা ... যেখানে এক আকাশ ময়ূর পেখম জল মিশে যায় এক সমুদ্র আকাশে ....যেখানে অপেক্ষায় থাকে শঙ্খমালা... যেখানে বালির তাপের  জিয়নকাঠিতে  কাছিমের প্রাণ....যেখানে গোলাপি তটভূমিতে জলের কিনারে কাত হয়ে শুয়ে থাকে জীর্ণ সংঘাত.... এখন যেখানে ছবি আঁকে স্থানীয় মানুষ... ডিমে তা দেয় শঙ্খচিল.... ঢেউ ভাঙ্গে অভিমানে .....

(সমাপ্ত)

[মধুবাণী ঘোষ]

Comments
4 Comments

4 comments:

  1. বড় ভাল লাগল। দীঘল বেণী, দখিনা বাতাস, সব ঘোরা হয়ে গেল এটা পড়ে। - অমিতাভ প্রামাণিক।

    ReplyDelete
  2. M di.... ki opurbo likhecho.... parade ground theke phire eshe amar caribbian dweep ghora hoye gelo....etoh shoundorjer ejta dweep lukiye chilo... arr tumi take drkge nile obolilai...Subarna

    ReplyDelete
  3. M di.... ki opurbo likhecho.... parade ground theke phire eshe amar caribbian dweep ghora hoye gelo....etoh shoundorjer ejta dweep lukiye chilo... arr tumi take dekhe neele obolilai...Subarna

    ReplyDelete
  4. Oshonkhyo dhonyobad tomader...:)

    Madhubani

    ReplyDelete

Blogger Widgets
Powered by Blogger.