>

গোপেশচন্দ্র দে

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 10/15/2016 |



এই দিদি দিদি! কে যেন তোর খোঁজে এসেছে?
কে এলোরে?
আমি চিনিনারে….
ছেলে নাকি মেয়ে?
ছেলেএকটি লোক
রীনা এইমাত্র বাথরুম থেকে স্নান করে নিজের রুমে ঢুকলকিছুক্ষণ হল বাইরে থেকে এসেছেবাইরে বলতে প্রাইভেট টিউশানিসকাল সন্ধে বাড়ি বাড়ি টিউশানি করে বেড়ায়একটু ভাবসা গরম তাই সে এই সন্ধায় আবার স্নান করে নিলএখন সন্ধে সাতটা পঁচিশএই সময় কে এলো আবার? রীনা তার ছোটভাই গুড্ডুকে বলেছে লোকটিকে বসতেতাদের ঘরটা নিতান্তই ছোটলোকটিকে তাদের বারান্দার ঘরে বসতে দেয়া হয়েছেরীনা ড্রেসিং টেবিলে বসে চুল আঁচড়াচ্ছে আর ভাবছে কে হতে পারে? তার কোনো বন্ধু কী? কলেজ লাইফে অমল, শরৎ, সুখেন, বিভাস অনেক বন্ধু ছিলএদের কেউ কি? শরতের সাথে দশদিন আগে দেখা হয়েছিল রীনারঅনেক কথা হয়েছিলএকটা কফিশপে বসেছিল তারাশরৎকে অবশ্য তার ঠিকানাটা দিয়েছিলফোন নাম্বারও দেয়া হয়েছিলতবে কী শরৎ? কিন্তু আসলে তো পারতপক্ষে ফোন করে আসবেরীনা একটু তাড়াতাড়ি মাথার চুল আঁচড়ালো

সে বারান্দার ঘরে ঢুকলনা শরৎ নাযে লোকটি বসে আছে তাকে রীনা চেনেপথে ঘাটে মুখ চেনাএ পাড়াতেই থাকেতবে তাদের বাড়ি থেকে বেশ দূরেইতবে কথা হয়নি কোনোদিনভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করল

নমস্কার, বসুন
ভদ্রলোক বসলেন
রীনা ভেবে পাচ্ছেনা এই লোকটি কেনই বা তার কাছে এসেছেভদ্রলোক চিকন ফ্রেমের চশমা চোখে দিয়ে বললেন, আপনি কি মিস রীনা? মানে রীনা সরকার?
আজ্ঞে হ্যাঁ
আমার দুটো মেয়ে আছেএকটা ক্লাশ ফোরে আরেকটা ক্লাশ টুতে পড়ে

রীনা এইবার নিশ্চিত হল কেন ভদ্রলোক তার কাছে এসেছেরীনার এই পাড়াতে এক আধটু টিউশানির সুনাম আছেছোট বাচ্চাকাচ্চাদের খুব যত্ন করে পড়ায় সেরীনা মুচকি হাসি দিয়ে বলল, পড়াতে হবে বুঝি?
হ্যাঁপ্লিজ দেখুন নাআমার মেয়েদুটো নিজে থেকে একফোঁটাও পড়েনাআমার কথাও শোনেনাকেমন জেদি হয়েছে মেয়েদুটো জানেন….
আচ্ছা আচ্ছাআমি পড়াবকবে থেকে বলুন?
কালই আসুন না….
কখন?
আপনি কখন পারবেন?
এই ধরুন সকাল সাতটা আটটা
ভদ্রলোক মুখটা একটু পানসে করে বললেন, না মানে ওরা তো খুব সকালে উঠতে পারেনাআপনি সন্ধায় পারবেন কি?
রীনা লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে একটিবার না ভেবেই বলে দিল, হ্যাঁ পারবোকিন্তু পরক্ষণেই মনে হল মান্তু ছোটকু ওদের তো ওই সময় পড়ানো হয়তাহলে?

রীনা ভেবে নিল, সে দেখা যাবেমান্তু ছটকু ওদের সকালে শিফট করে নেবেআর কথা বাড়াল না রীনাভদ্রলোক ঠিকানাটা দিয়ে, ফোন নাম্বারটা দিয়ে চলে গেলেনরীনা গতবছর বিএ পাশ করে চাকরি খুঁজছে কিন্তু পাচ্ছেনাএখনকার দিনে চাকরি জোগার করা যে কতটা কষ্টের তা একজন চাকরিপ্রার্থীই হাড়ে হাড়ে টের পায়রীনাও কিছুটা টের পাচ্ছেরীনার বাবা নেইমা, ছোটভাই আর সেছোটভাই সবে কলেজে উঠেছেপুরো সংসারের খরচ রীনার হাতেইটিউশানি করে আর বাবার জমানো ব্যাঙ্কের কিছু টাকা তুলে কোনোমতে সংসারটা চলে যায়ছোটভাই বায়না ধরেছে মোবাইল ফোনেররীনা সামনের মাসেই দেবে বলে ভাইকে আশ্বস্ত করে রেখেছেকলেজে ওঠা একটা ছেলে সামান্য একটা মোবাইলের আবদার করতেই পারেদিদি হয়ে ভাইয়ের কেন এই সামান্য অভাব পূরণ করতে পারবেনা? অভাব সামান্য হতে পারে কিন্তু টাকা সামান্য নয়রীনা ভেবে নিল, আরেকটা টিউশানি তো পেয়েই গেলসংসারটা আরেকটু স্বাচ্ছন্দ্যে চালানো যাবেরীনা ঠিক সন্ধে সাতটার মধ্যেই বাড়িটাতে পৌছে গেলভদ্রলোক বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন রীনার জন্যসে এই বাড়িটি চিনে বৈকি কিন্তু এটা যে ঐ ভদ্রলোকের বাড়ি তা সে জানতনাঅনেকবার এই বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছে সেভদ্রলোককেও যে একেবারেই দেখেনি ব্যাপারটা তা নয়রীনা মেয়েদুটোকে পড়াতে বসে একটা বিষয় মাথাচাড়া দিলওদের মাকে সে কেন দেখতে পাচ্ছেনা? বাড়িতে কি বাবা মেয়েরাই থাকে? সে মেয়েদুটোকে ওদের মায়ের কথা বলবে বলে ভাবলোকিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, না থাকবাড়িটার বাইরেরটা যতটা না সুন্দর ভেতরটা তারচেয়ে বেশি সুন্দর ও অনেক সাজানো গোছানোতার ছাত্রীদুটোর ঘরটা চমৎকারএকটা দারুণ সেন্টের গন্ধও আসছে ঘরময় জুড়েরীনা বই খুলে ওদের পড়াতে শুরু করলমেয়েদুটোকে বেশ শান্তই মনে হচ্ছে তারপ্রথমদিন বলেই কি শান্ত? হতে পারেদেখাযাবে কয়েকদিন পর মেয়েদুটো একেবারে বাঁদরে পরিণতি হয়ে গেছেসামলানোই মুশকিলতার বেশ কিছু স্টুডেন্টদের সাথে এরকমটি ঘটেছেপ্রথম প্রথম বেশ শান্তএকেবারেই গোবেচারা টাইপ চেহারাসর্বক্ষণ ভয় ভয় অনুভূতি! পরে দেখা যায় ওরা যতটা গোবেচারা ততটাই দুরন্ত, দুষ্টু

নিন চা খান

রীনা বই থেকে পেছনে মুখ ঘোরালোভদ্রলোক একটা ট্রেতে করে চা, বিস্কিট কিছু চানাচুর এনেছেনরীনা কিছুটা বিস্মিত হল, ভদ্রলোকের স্ত্রী কোথায় তাহলে? এসব কাজ তো মেয়েলোকেররীনা হ্যাঁ, না কোনো কথাই বললনাকি বলবে ভেবে পাচ্ছেনাএকটু লজ্জাও লাগছে তারএকজন একেবারে যুবকও না আবার বৃদ্ধও না এমন মাঝবয়েসী মানুষ সাদাপাকা চুল নিয়ে তার জন্যে চা এনেছেব্যাপারটা রীনার কাছে একটু লজ্জারই মনে হচ্ছে

রীনা মাথা নিচু করে ওদের পড়া বুঝিয়ে দিতে লাগলসে চেয়ারে বসে আছে আর মেয়েদুটো বিছানায় বসে আছেভদ্রলোক চলে গেলেন ভেতরেকিছুক্ষণ বাদে তিনি আবার এলেনএবার খালি গায়েতিনি খাটের এক কোণায় বসলেনএবার একটু কেশে বললেন, ওরা পড়া ঠিকমতো পারে তো?

হ্যাঁ পারে, রীনা লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে বলললোকটার বুকভর্তি লোমরীনার তাকাতে খানিকটা লজ্জা লাগছেলোকটা হ্যাংলার মত বসে আছে কেন কে জানে?  আর বসেই যদি থাকে তাহলে একটা গেঞ্জি অন্তত পরা উচিত ছিলখুব বেশি গরম পড়েছে কি আজকে? রীনা লজ্জায় লোকটির দিকে চাইতে পারলনাভদ্রলোক রীনার ব্যাপারটা হয়ত বুঝতে পেরেই ভেতরে গিয়ে আবার গেঞ্জি পরে আসলেন মেয়েদের রুমেরীনার মুখে একটু হাসি খেলে গেল ওদের বাবার গায়ে গেঞ্জি পরা দেখেএবার রীনা নিজে থেকেই প্রশ্নটি করেই বসল,  ওদের মা বাড়িতে নেই?

ভদ্রলোক চোখ থেকে চশমাটা নামিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ওদের মা থাকলে কি আমি চা বানিয়ে আনি বলুনওদের মা মারা গেছে
রীনা লক্ষ্য করল, ভদ্রলোকের কথাটা বলতে গিয়ে গলাটা কেমন যেন ধরে এলোচোখ মুছল সকলের অগোচরেরীনার বড্ড মায়া লাগল মেয়ে দুটোর দিকে তাকিয়েসে আবার বলল, আপনার স্ত্রী মারা গেল কিভাবে?
সে অনেক কথাআরেকদিন বলবউঠিউঠি বলেও তিনি উঠলেন নারীনা লক্ষ্য করল মেয়ে দুটো বেশ মনোযোগে তাদের কথাবার্তা শুনছে
রীনা মেয়েদুটোকে বলল, তোমরা পড়ো হ্যাঁএখান থেকে স্টার্ট করো
ব্রেন হেমারেজ বুঝলেনঅনেক ডাক্তার ফাক্তার দেখিয়েছি কিন্তু বাঁচাতে পারলাম না কণিকাকে
রীনা বুঝে নিল, তার স্ত্রীর নাম কণিকাভদ্রলোকের চোখের কোণায় জল এসে থেমে রইলরীনা কী বলবে ভেবে পেলনাভদ্রলোক এবার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি আপনাকে কি তুমি করে বলতে পারি?
হ্যাঁশিওর
থ্যাংকসতুমি আমাকে দাদা বলেই ডেকোকমল দা বললেই হবেআমার নাম কমলকমল রায়
রীনা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল

কমল রায় এবার পড়ার রুমের পেছনে ছোট্ট ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দরজাটা ভেজিয়ে একটা সিগারেট ধরালেনসিগারেটের গন্ধ রুমে চলে আসতেই রীনার গাটা গুলিয়ে গেলসিগারেটের গন্ধ একদমই সহ্য হয়না তারঅথচ মেয়ে দুটো কত সুন্দরভাবে বেশ মনোযোগে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেমেয়েদুটোর অভ্যেস হয়ে গেছে বোঝা যাচ্ছেরীনার পড়ানো শেষ হলে ভদ্রলোক রীনাকে এগিয়ে দিতে রাস্তায় নেমে এলেনরীনা হাঁটতে হাঁটতে কমলবাবুকে আরেকটা বিয়ের কথা বলল

বিয়ের কথা বলছ? বড্ড হাসি পেলএভাবেই বেশ আছি তোমেয়েদুটোকে নিজের মত করে মানুষ করছি
রীনা দেখল, ভদ্রলোক তাকে প্রায় ঘেঁষে ঘেঁষে হাঁটছেনরীনা বলল, তারপরেও মেয়েদুটোর জন্য মায়ের ভালোবাসা দরকার আছে
কমল রায় বললেন, একটা বিষয় কি রীনা জানো? বিয়ে করলে করা যায়টাকাপয়সা, ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স কোনো কিছুতেই কমতি নেই আমার কিন্তু ওদের নতুন মা যদি বাচ্চাদুটোকে ভাল চোখে না দেখেযদি ওদের ভাল না বাসে?
রীনা বলল, সেটাও ঠিকরীনা লক্ষ্য করল, ভদ্রলোক তার প্রায় গা ঘেঁষে ঘেঁষে হাঁটছেনরীনা বেশ খানিকটা সরে গিয়ে বলল, আপনার আর আসতে হবেনাআমি একাই যেতে পারব এখনআপনি বরং মেয়েদুটোর কাছে যানওরা একা একা আছে….
তাও অবশ্য ঠিকআচ্ছা চলিকাল দেখা হবেভদ্রলোক দ্রুত পায়ে হাঁটলেনরীনাও দ্রুত পা চালাল তার বাড়ির দিকে

রীনা সকালবেলা রাস্তায় বের হতেই তার ছোটবেলার এক বান্ধবীর সাথে দেখা হলমেয়েটাকে রীনা একদমই পছন্দ করেনাবেশি বকবক করেদেখা হলেই তাকে এড়িয়ে চলে রীনাএবার এড়িয়ে যেতে পারলনা
এই রীনা শোন
রীনা একটা শুকনো হাসি হেসে বলল, হ্যাঁ মৌমি বল কী বলবি?
মৌমি বলল, তুই নাকি কমলবাবুর মেয়েদুটোকে পড়াচ্ছিস?
হ্যাঁতুই জানলি কি করে?
না শুনলাম এক জনের কাছ থেকেশোন তোকে একটা কথা বলি….
রীনা বুঝতে পারল মৌমি উল্টোপাল্টা কিছু বলবেকারণ উল্টোপাল্টা কথা বলার সময় তার গলার স্বর পরিবর্তন হয়ে যায়শেষ কথাটা ঠিক ওরকমই শোনালো
রীনা মুখ ঘুরিয়ে বলল, কী বল?
কমলবাবু লোকটা বেশি সুবিধের নাএকটু সাবধানে থাকিস, খুব বাজে রিপোর্ট….
রীনা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ঠিক আছে, চলিরে….
রীনা বুঝতে পারল মৌমি তার পড়ানোর হিংসে করছেসে নিজেও টিউশানি করেভালো টিউশানি পাচ্ছেনা বলেই কান ভাঙানো শুরু করেছেরীনা হেঁটে হেঁটে বাস ধরার জন্য এগিয়ে যেতেই কমলবাবুর সাথে দেখাকমল বাবু তার মোটরসাইকেল দাড় করিয়ে সিগারেট টানছিলেন
কোথায় যাচ্ছ রীনা?
এইতো পড়াতে
বাস ধরছো বোধহয়?
আজ্ঞে হ্যাঁআপনি?

আমি এখন বাড়িতে ঢুকববলছি কি চল তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসিরীনা না বললেও তিনি কথা শুনলেন নাঠিকই রীনাকে বাইকের পেছনটায় চড়তে হলরীনার খানিকটা লজ্জা করছেসে লজ্জায় মাথা একেবারেই নিচু করে ফেললোলোকটা নাছোড়বান্দা টাইপলোকটার চেহারার কী একটা যেন আছে কঠিনভাবে কিছু না বলাও কঠিনকী আছে লোকটার চাউনিতে? রীনার কেমন যেন লাগে কমলবাবুর দিকে চেয়ে থাকতেকমলবাবু রীনাকে বাস ধরানোর নাম করে সোজা পার্কে নিয়ে আসলরীনা বেশ ভয় পেয়ে গেলপার্কে আনল কেন? সেতো বাসে চড়ে সেক্টর ফাইভ যাবেআপনি আমাকে এখানে আনলেন কেন? আমার তো পড়ানো আছেতীব্র উৎকণ্ঠা রীনার গলায়!

তিনি বললেন, তোমার একদিন না পড়ালে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবেনাফোন করে বলে দাও যে তুমি একটা কাজে আটকা পড়েছ
আপনি কাজটা কিন্তু ভাল করলেন নারীনার একটু ঘৃণা জন্মালো লোকটির প্রতিচায় কী লোকটা?
আমি এখানে এসেছি তোমাকে কিছু বলতে
বলুন
আমি তোমার সম্পর্কে কম বেশি অনেক কিছুই শুনেছিতোমার ভাই আপাতত কিছু করছেনা
কে বলল, কিছু করছেনাও তো সবে কলেজে পা দিলকলেজ পাশ তো করুক
না মানে চাকরিবাকরি করলে করতে পারেতাতে তোমাদের সংসারটা ভালোমতো চলবে
রীনা কমলবাবুর দিকে চেয়ে রইল
কমলবাবু আরো বললেন, আমার হাতে অনেক বড় বড় লোক আছেতুমি চাইলে ভাল মাইনের চাকরি দিতে পারি তোমার ভাইকে
কেন দেবেন শুনি? রীনা বুঝে নিল লোকটার কথার ভেতরে বেশ রহস্য আছে
রীনা আবার বলল, আপনি এই কথা বাড়িতেও বলতে পারতেন কিন্তু পার্কে কেন? রীনা চারপাশটা দেখল
তা পারতামকিন্তু একটা মোস্ট ইম্পরট্যান্ট কথা আছে
কী?
তুমি আমায় বলেছিলেনা বিয়ে করার কথা?
হ্যাঁ বলেছিলামতো….
তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে চাও?
রীনা দেখল, লোকটি তার দিকে করুণভাবে চেয়ে আছেসে বলল, এটা কী সম্ভব?
তুমি যদি চাও তো অবশ্যই সম্ভববলো রীনা উইল ইউ ম্যারি মি?

রীনা ভেবে পেলনা মাত্র দুদিনের পরিচয়েই এমন একটা প্রপোজ আসতে পারেঅবশ্য চোখের সামনে মেয়ে দুটোর ছবি ভেসে এলোওদের মা হওয়ার নিমন্ত্রণ দিচ্ছে লোকটারীনা কি হ্যাঁ বলেই দেবে? কিছু না ভেবে কি হ্যাঁ বলা যায়? ওদিকে মৌমি কি একটা….রীনার মাথাটা এলোমেলো হয়ে গেলসে বলল, দেখুন আমি কোনো ডিসিশান নিতে পারছিনাএকটু ভাবতে হবে যে আমায়এভাবে অল্পকদিনের পরিচয়ে হুট করে….

ভদ্রলোক রীনার কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, ঠিক আছে তুমি ভাবোআমি বাধা দেবনাআর পরিচয় অল্প বেশিতে কিছুই এসে যায়নাতুমি আমার সম্পর্কে সবটাই জানো

কমলবাবু রীনাকে মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে তাকে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেনএকেবারে রীনার বাড়ির সামনে বাইক দাড় করালনাপাছে কেউ সন্দেহ করে কী নারীনা বাথরুমে স্নান করতে করতে পার্কের কথাগুলো ভাবতে লাগললোকটার বয়েস কতই বা হবে? বড়জোর পয়তাল্লিশসে কোথায় যেন পড়েছে এই বয়েসী মানুষগুলোর ভালোবাসা পারফেক্ট হয়তাছারা লোকটির সুঠাম শরীরচওড়া কাঁধপ্রশস্থ ললাটবুকভর্তি কাঁচাপাকা লোমবুকে লোম থাকলে নাকি মানুষের মায়া বেশি থাকেলোকটার চেহারায়ও মাধুর্য আছেপোশাকে সাহেবিয়ানাসুখে থাকবে তো সে? সে বেশিক্ষণ স্নান করতে পারলনাতারাতারি বাথরুম থেকে বেড়িয়ে এলো রাতে ঘুমানোর সময় রীনা চোখের পাতা সহজে এক করতে পারলনাকমলবাবুকে কি সে বিয়ে করবে? মাকে কি বলা যায় বিষয়টা? গুড্ডুরও একটা গতি হবেলোকটা কথা দিয়েছে ভাইকে একটা চাকরি দেবেনা ঘুম আজ আর বোধহয় আসবে নারীনার ঠিক চৌদ্দ বছরের মেয়েদের মতই চোখে লাল নীল স্বপ্ন খেলে গেলহোকনা একটু বয়স্ক তাতে কি? সালমান খান তো বিয়েই করতে পারলনাআর বয়স্ক মানুষ তো করছে বিয়েতাছারা লোকটা বিপত্নীকমা কি সায় দেবে? বুঝিয়ে বললে দেবে না কেন? আবার মৌমি তাকে সাবধান করে দিয়েছেরীনা মৌমিকে ছোটবেলা থেকেই দেখতে পারেনামেয়েটা বড্ড বেশি বকবক করেচার পাঁচটা ছেলের মাথা ভেঙে এখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছেরীনার ঘুমাতে ঘুমাতে বেশ রাত হয়ে গেল

রীনা প্রতিদিন পড়াতে বসলেই ভদ্রলোক তার সাথে গল্পজুড়ে নেয়রীনারও বেশ লাগে গল্প শুনতেগল্প বলে আর হো হো করে হাসেতিনি বেশ মজা করে অনেক কথাই বলেনসেদিন রীনাকে একটা মোবাইলফোন গিফট করলেন এটা রাখো রীনা হাতে নিয়ে ব্যাগ খুলেই বুঝতে পারল একটা দামী মোবাইল ফোনকিন্তু ওর তো মোবাইলফোন আছেতাহলে কি ভাইয়ের জন্যে? কিন্তু তিনি জানবেন কি করে যে ভাইয়ের ফোন দরকাররীনা প্রথমে আমতাআমতা করলেও মোবাইলফোনটা নিয়ে নিল

কমলবাবু রহস্যময় হাসি দিয়ে বুঝে নিলেন, মেয়ে লাইনে এসেছেতিনি রহস্যময় ভঙ্গিতে একটা হাসি দিয়ে বললেন, কাল তোমার ভাইয়ের এডুকেশনাল সার্টিফিকেটের জেরক্স আমায় মনে করে দিওমিত্তিরবাবুর সাথে আমার কথা হয়েছেএকটা কোম্পানিতে ঢুকিয়ে দেবো তোমার ভাইকেভাল মাইনে দেবে বলেছেরীনার মনে হল, এই লোকটা তাদের সংসারের জন্য বড্ড সহায়কঅন্তত ভাইটি একটা ভাল চাকরি পাবেসংসারে অভাব থাকবেনাতাছারা এই পাড়াতেও তাদের একটা প্রতিপত্তি বাড়বেলোকটার ক্ষমতাও আছেরীনা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লমানে সে জেরক্স তাকে দেবেরীনার মনে অনেক আনন্দ খেলে গেল

প্রায় প্রতি রাতেই রীনা ঘুমাতে পারেনাকমলবাবুকে নিয়ে হাজার ভাবনা তৈরি হয়দু একবার স্বপ্নও দেখল তাকে নিয়েপার্কে সিনেমায় পাশাপাশি বসে আছে, কখনও হাঁটছেরীনা অদ্ভুত সব আবদার করছেবাচ্চাদুটোকে অবশ্য দেখেনি স্বপ্নেকয়েকদিনের ভেতর রীনা ফোনেও কথা বলা শুরু করে দিলসে বেশিক্ষণ ফোনে কথা বলতে পারেনামাথা ধরে আসেতাছারা কমলবাবুরও একই কেসতিনিও বেশিক্ষণ কথা বলেন না ফোনেতার মাথাধরা হয় কিনা কে জানে! তাছারা প্রতিদিন তো দেখা হচ্ছেই, কথাও হচ্ছে পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে

কিছুদিন বাদে গুড্ডুর চাকরির এপোয়েনমেন্ট লেটারও চলে আসলজয়েন সামনের সোমবারসবই কমলবাবুর কৃপারীনার আনন্দ হলেও সে খানিকটা চিন্তিতখানিকটা না বেশ চিন্তিতলোকটা তাকে একটা বাজে প্রস্তাব করে বসেছেবিয়ের আগেই রাত কাটাতে বলেছেরীনা এই বিষয়গুলোকে বড্ড ঘৃণা করেএকটা ছেলের সাথে খুব অল্পবয়েসে ভালোবাসা ছিল তারছেলেটা ওকে এরকমই প্রস্তাব করেছিলএই নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি অবশেষে ব্রেকআপব্রেকআপ টা ছেলেই দিলরীনা তবুও নিজেকে সংযত রেখেছিলরীনা কমলবাবুকে বিয়ের কথা বলতেই সে আশ্বাস দেয় বিয়ে সে তাকেই করবে কিন্তু একরাত থাকলে কি এমন ক্ষতি হবে তাররীনা বুঝতে পারল, ভদ্রলোকের স্ত্রী অনেকদিন গত হওয়ায় হয়ত শরীরের চাহিদা মেটাতে চাচ্ছে

সকালে ঘুম থেকে উঠে রীনার মনে হল, একটু একা একা কোথাও ঘুরে আসা যাকসে একটা খয়েরী রঙের সালোয়ার কামিজ পরে রাস্তায় বের হলহাঁটতে হাঁটতে চলে আসল ওই পার্কটার কাছেই যেখানে কমলবাবু তাকে বাইকে নিয়ে এসেছিলরীনা মনের অজান্তেই পার্কের ভেতরটায় ঢুকলঅনেক ছেলেমেয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আছেলাজলজ্জার মাথা খেয়ে বসে আছে ওরাকিছু বুড়ো লোক বেঞ্চে বসে গল্প করছেরীনা হাঁটতে হাঁটতে ভেতর দিকে গেলহঠাৎ সে থমকে দাঁড়ালশুকনো ঘাসে দুজন বসে আছেকমলবাবু না! সাথে ওই মেয়েটি কে! চেনাচেনা লাগছেরীনা একটু আবডালে গিয়ে দাঁড়িয়ে ভাল করে পর্যবেক্ষণ করল, হ্যাঁ কমলবাবুই তোওই তো পাশে আর ওয়ান ফাইভ বাইকটাসাথে মেয়েটা কি মৌমি? রীনার বুঝতে বাকী রইল না যে কমলবাবুর মৌমির সাথেও প্রণয় আছেকমলবাবু মৌমিকে বেশ ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ধরলরীনার ঘৃণায় গা ঘিনঘিন করে উঠলসে মুখ বিকৃতি করে ছিঃ বলে আবডাল থেকে সরে এসে সোজা মূল রাস্তায় চলে আসলমানুষ চিনতে এতো ভুল করল সেরীনা বেশ খানিকক্ষণ ভবলতার এখন অনেক কাজ বাকীগুড্ডুর এপোয়েনমেন্ট লেটার টা ছিঁড়ে ফেলতে হবেমোবাইলফোনটা ফেরত দিতে হবেআর ও বাড়িতে পড়ানো নয়তার মুখে এখনও একরাশ ঘৃণা জমে আছেসে বাড়ির উদ্দেশ্যে পথ হাঁটা শুরু করল।


[গোপেশচন্দ্র দে]

Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.