>

মৌসুমী ঘোষদাশ

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 1/15/2016 |

আধুনিক মানব ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য” –এই বিষয়ে কিছু লিখে পাঠানোর জন্য মাসিক সংশপ্তকের তরফ থেকে আমাকে অনুরোধ করা হয়েছিল। এই রকম একটা উন্নত মানের  আন্তর্জাতিক মাসিকপত্রে কি যে লিখব ভেবে খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। তারপর ভাবলাম আমার নিজের শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়েই বা কেন লিখি না! হোক না ছোট শহর, কিন্তু বহু প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করছে আমার শহর মালদা। এই শহরের ইট, কাঠ পাথর, প্রতিটি গলি রাস্তা, জনজীবনের  সঙ্গে বহু প্রাচীন রাজা-বাদশা, ওলন্দাজ ও ইংরেজদের কীর্তি জড়িয়ে আছে।

রেলপথে অথবা সড়কপথে কলকাতা থেকে উত্তরে শিলিগুড়ি যেতে গঙ্গা নদী পেরিয়েই শুরু মালদা জেলা। মুর্শিদাবাদ ও মালদার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমারেখা নির্দেশ করে গঙ্গা কিছুদূর প্রবাহিত হয়েই পদ্মা নাম নিয়ে বাংলাদেশে চলে গেছে। পূবে বাংলাদেশের রাজশাহী পশ্চিমে বিহার। উত্তরপূর্বে দিনাজপুর। এই জেলার ভিতর দিয়ে বহু নদী প্রবাহিত হয়েছে। আবার বহু নদী দিক পরিবর্তন করে অন্য দিকে চলে গেছে। নদী-বিশেষজ্ঞদের মতে গঙ্গা, মহানন্দা, কুশী নদীর খাত বদলের জন্য বাংলার ঐতিহ্যপূর্ণ প্রাচীন নগরী গৌড় আজ জলাভূমিতে পরিণত হতে চলেছে।

মালদা জেলার গৌড়, পাণ্ডুয়া একসময়ে বাংলার, আবার কখনো বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজধানী ছিল এটা শ্রদ্ধেয় ঐতিহাসিকরা বহুবার বহুভাবে প্রমান করেছেন। বর্তমানে যদিও সেগুলো বিলুপ্ত রাজধানীতে পরিণত হয়েছে। তবুও যেটুকু স্থাপত্য কীর্তি অক্ষুণ্ণ আছে তা দেখার জন্য দেশ বিদেশের পর্যটকরা প্রতি বছর মালদা আসেন। গৌড়ে এখনও যেসব আছে সেগুলি হল- পিয়াসবারি দীঘি, রামকেলি, রুপসাগর, বারদুয়ারী, দাখিল দরজা, ফিরোজমিনার, কদমরসুল, চিকা মসজিদ, ঘুমটি দরওয়াজা, বাইশগজী প্রাচির, লুকোচুরি দরওয়াজা, চামকাটি মসজিদ, লোটন মসজিদ, কতুয়ালি দরওয়াজা, গুণমন্ত মসজিদ, আরও কত কি! পাণ্ডুয়াতে রয়েছে- লক্ষণসেনী দালান, সালামী দরওয়াজা, জামি মসজিদ, কুতবশাহি মসজিদ, আদিনা মসজিদ, আরও অনেক কিছু।   

গৌড় মালদা বলতে শুধু একটি ভৌগোলিক খণ্ডকে বোঝায় না, গৌড় বলতে বোঝায় একটি জনপদ, একটি জনগোষ্ঠ, একটি বিশেষ শিল্পশৈলী, একটি স্থাপত্য রীতি, একপ্রকার ইটের নাম, একটি বিশেষ রাগের নাম আরও কত কি যা বঙ্গ বা বাংলা নামে নেই। মালদহ নামটির উৎপত্তি বিষয়ে ইতিহাসবিদদের কেউ বলেন মালকথার অর্থ ধনদৌলত আর দহকথার অর্থ সাগর। তাই মালদহ মানে ধনসাগরআবার কেউ বলেন মলদ নামক জনজাতি থেকে মালদা নামটি এসেছে। সে যেভাবেই আসুক, মালদা শহর কিন্তু বহু পুরনো শহর। পুরাতন মালদায় এমন নয়টি শিলালিপি পাওয়া যায় যাতে ৪৩৯ থেকে ১৫৩১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সুলতান ও তাঁদের বংশধরদের নামের তালিকা পাওয়া যায় যারা এই পান্ডুয়া ও গৌড়ের শাসক ছিল। কোন কোন ইতিহাসবিদ বলেন মালদা নাকি তারও আগের। এই শহরের অসংখ্য অলিগলি, দেওয়ালের গায়ে গায়ে লাগা সব বাড়ি, ইটের আকার ও আয়তনই তা প্রমান করে।   

এক সময় মালদা ছিল একটি উল্লেখযোগ্য নদী বন্দর। কালিন্দ্রি ও মহানন্দার মিলন স্থলে গড়ে উঠেছিল বন্দর শহর পুরাতন মালদা। ওলন্দাজ, ইংরেজ ব্যবসায়ীরা এই নদী পথেই এসে মালদায় ঘাঁটি গেড়েছিল। এখানকার সুতিবস্ত্র ও রেশমবস্ত্র জগদ্বিখ্যাত ছিল তখন। পাটনা ফ্যাক্টরির এক ইংরেজ বনিকের ১৬২০-২১ সালে লেখা এক ডাইরি থেকে জানা যায় মালদহে প্রচুর সুজনী তৈরি হত। তার ওপরে মেয়েদের হাতের সূক্ষ্ম সূচী শিল্প ছিলউত্তরবঙ্গের প্রথম বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল ইংরেজবাজারের কুঠি সেখান থেকে সুতি ও সিল্ক কাপড়ের আমদানি ও রপ্তানি হত দেশে বিদেশে। যদিও আজ পুরাতন মালদা শহরের সেই বাণিজ্য গৌরব আর নেই। যে মালদহে একসময় গঙ্গা-কালিন্দ্রি-মহানন্দা নদীপথে ষ্টীমার চলতো, যে নদীপথে ঢাকা, কলকাতা, ভাগলপুর, পাটনা, মুঙ্গের, এলাহাবাদের সাথে বানিজ্য চলতো সে নদীপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা হারিয়ে গেছে। সেই সব পোতাশ্রয়গুলি এখন স্মৃতি চিহ্ন হয়ে আছে। 

এই শহরের বিভিন্ন ধর্ম, ভাষাভাষী, জাতি, জনজাতির মানুষ রয়েছে। সাঁওতাল, পলিয়া, কোল মুন্ডা, রাজবংশী,কোচ, দেশি,বাদিয়া, মৈথিল, খোট্টা, মুসলমান, হিন্দু, মারোয়াড়ী সম্প্রদায় বসবাস করে। এদের প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের সাংস্কৃতিক পার্থক্য যেমন সুস্পষ্ট, তেমনি বহুকাল ধরে পাশাপাশি বসবাস করার ফলে মিলও প্রচুর। এখানকার বাসিন্দাদের কথনরীতিতে এক বিশেষ ধরনের টান বা ঝোঁক দেখতে পাওয়া যায় যা শুনেই ধরে ফেলা যায় সে মালদার অধিবাসী।

বাংলার লোকসঙ্গীতের একটি অন্যতম ধারা হল মালদার গম্ভীরা গান। এটি মূলত বর্ণনামূলক গান। অতি প্রাচীন কালে শিবের উৎসবে শিব বন্দনা হিসেবে এটি গাওয়া হত। শিবের আর এক নাম গম্ভীর, তাই এই গানের নাম গম্ভীরা। বর্তমানে গম্ভীরা গানের আসরে গ্রামীণ দারিদ্রক্লিষ্ট মানুষের সুখদুখের কথা, সারা বছরের ঘটে যাওয়া বিশেষ ঘটনা, সামাজিক সমস্যার কথা বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। 

মালদার ঐতিহ্য সম্পর্কে যে কথাটা না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তা হল আজ থেকে পাঁচশ বছর আগে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব পুরীধাম থেকে বৃন্দাবন যাবার পথে যাত্রা বিরতি নিতে মালদার রামকেলীতে কয়েকদিনের জন্য এসে থেকেছিলেন। তখন সুলতান হোসেন শাহের শাসনকাল। হোসেন শাহের দুই বিচক্ষণ মন্ত্রী দবীরখাস ও সাকর মল্লিক এসে মহাপ্রভুর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। প্রথম সাক্ষাতেই তাঁরা অভিভূত হয়ে মহাপ্রভুর কাছে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হলেন। দীক্ষা নিয়ে নাম হল রূপ গোস্বামী ও সনাতন গোস্বামী। পরবর্তীতে এঁরাই হলেন গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের রচয়িতা ও ব্যাখ্যাতা। যে তমাল গাছটির নীচে বসে দীক্ষা দিয়েছিলেন, সে তমাল গাছটি আজও শাখা প্রশাখা বিস্তার করে একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সেই গাছের তলে একটি কালো পাথরের উপর মহাপ্রভুর চরণচিহ্ন ধরে রাখা আছে। মহাপ্রভু রামকেলী এসেছিলেন জ্যৈষ্ঠ মাসের সংক্রান্তিতে। তাই প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তিতে সাত দিন ব্যাপী মেলা বসে। সেই মেলাকে উপলক্ষ করে দেশবিদেশের বৈষ্ণবরা সেই স্থানে মিলিত হয়।

প্রাচীন বাংলার রাজধানীর আসেপাশেই এখন গড়ে উঠেছে নতুন মালদা শহর সেই ইংরেজ আমল থেকেই মালদা জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র ইংরেজবাজার। আজকের মালদা জেলার যতটুকুই আধুনিকীকরণ হয়ে থাকুক না কেন, গৌড়, পান্ডুয়ার সঙ্গে এই জেলার একটা গভীর নাড়ীর যোগ রয়েছে। তাই তো বলা হয় এখানকার মাটি গৌড়ী, ভাষা গৌড়ী, সংস্কৃতি গৌড়ী, ঐতিহ্য গৌড়ী! তাই মালদাকে না জানলে বাংলার অনেক কিছু জানা থেকে বঞ্চিত থাকতে হবে। পরিসরাভাবে একটা প্রায় বিস্মৃত স্মৃতিকে অল্প কথায় তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। আশা করি এই সামান্য তথ্য মালদা সম্পর্কে জানার জন্য পাঠকের সামান্য হলেও তৃষ্ণা নিবারণ করবে

[মৌসুমী ঘোষদাশ]





Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.