>

রত্নদীপা

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 1/15/2016 |







আমরা চারজনে একটি মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করছি
মা বাবা আর আমরা দুই বোন
যেন মৃত্যু একটি সুগন্ধি ফুল
চমৎকার স্বর্গ ছড়াতে ছড়াতে
একদিন নেমে আসবে আমাদের উঠোনে

যেন মৃত্যু আসলে চেনা-অপরিচিত ঈশ্বর
রোদের মেঘে উড়ে আসবেন একদিন

মোহের উপগ্রহগুলি সরিয়ে দেবেন আমাদের চোখ থেকে তারপর পিঠে হাত রেখে বলবেন , দুঃখ পেও না ...
মৃত্যু আসলে লাল লকলকে মহামূল্যবান আয়না ...
বাবার অনামিকায় রুবিপাথরটির মতন


না
কেমোথেরাপির দিকে আমরা যাইনি

ডাক্তারবাবু বললেন
লাভ নেই কোনো
তবে আপনারা চাইলে দিতে পারেন

আমরা বাবাকে জানতেই দিইনি
কোথাও কোনো অসুখ আছে তার
ভয়ঙ্কর এবং জটিল কোষবৃত্তের সংসার
কোলন ...  লিভার ... ফুসফুস পেরিয়ে
ইতিউতি সজারু

শেষ দিন অবধি আমরা বাবাকে জানিয়েছি
তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ...
লিলিফুলের ভেতরে দু 'দণ্ড জিরিয়ে নিয়েই
আমরা চারজনে বেড়াতে যাবো পুরী কোনারক


বাবাকে দেখি

রোগা শীর্ণ আঁকা বাঁকা আমাদের বাবা

আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি
আমরা চোখ সরিয়ে সরিয়ে দেখি
আমরা ক্যানসার মুছতে মুছতে দেখি

বাবাকে দেখি
জ্বলন্ত মোমবাতি
অন্ধকার মুছতে মুছতে
কেবলি আলো
আর টগরের আকাশ
আর শিউলি পৃথিবী

আমাদের


তোমাকে খুব হ্যান্ডসাম লাগছে বাবা
পরিযায়ী নদীর মত অব্যবহৃত পাখির মত
নীলকমলের রূপকথার মত পাখিসমস্ত লাগছে খুব

ধ্রুবতারা আকাশের প্রিয় ধ্রুবক
ধ্রুবতারা আমারও প্রিয় লেখক

ঠিক আমার বাবার মত
শব্দ করে হাসছে অতিমাত্রায়
সশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ছে
পদ্যের রূপকে



তোমার হাত ধরে হাঁটছিলাম বাবা
তোমার লম্বা সরু আঙুল
ছোটবেলার হরফে রঙপেন্সিল যেন

আমার বড়বেলার কুমীরগুলিকে
রঙের ডাঙা করে দিতেছে


যেন আজ তোমাদের বিয়ের দিন
যেন আজ দোসরা বৈশাখ
মা বধুসাজ
সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি
সামান্য ডাবের জল
চন্দনের শোভায় মুখ জ্বলজ্বল
চুমকির দোপাটি রঙিন
পানপাতায় প্রথম চোখ লুকনো

বাবাও বরসাজ
লাজুক ধুতি
টোপর
চৌকো আতসের কারসাজি
কবেকার আভা
বাতাসিয়া
এই সবই এখন জোনাকির টুপটাপ
বি শার্পে ঝরে যাচ্ছে চুপচাপ
মায়ের হাতের শাঁখা ... পলা ... রুলি ...

প্রতিটি ক্যানসার থেকে তুমি
আবার জন্মে যাচ্ছ বাবা
পাখি খুলে দিচ্ছ সজোরে
আপ্রাণ চেষ্টা করছ সোজা হাঁটতে
তোমার দীর্ঘদেহ
অগ্রশরীর
তোমার চোখের কোণ
প্রখর রোদ


প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে
বাতাস থেকে টেনে নিচ্ছ
অঝোর আমাদের

ক্যান্সার ট্যানসার নিপাত যাক

এসো বাবা
আমরা দু’ জনে একসাথে ছোটবেলা হই আবার
দুধের বাটি আর মুড়ি ভাগ করে নিই
আকাশ আর নদী সাঁতরে নিই
মেঘ আর রোদ
একসাথে স্বাদ নিই লেবু লজেন্স
আর কাঠি আইসক্রিম

নামতা আর ধারাপাত মুখস্ত করি

পড়া না পারার কারণে পাঠশালা থেকে
তাড়িয়ে দিক দু’ জনকেই ...

তারপর আমরা একসাথে
স্লেট আর চক
কবুতর আর বক
বেঁচে থাকাটিকে আঁকি
বাঁচতে বাঁচতে আঁকি

বৃষ্টি বাবা হয়ে আসে তখন

যখন আমি শোক থেকে কান্নার তুলি বয়ে নিয়ে আসি
যখন শ্বাসনলী ফুটো হয়ে যায় চোখের আওয়াজে
যখন মায়ের শরীরে চাঁদ তারা নেই
শুধু মেঘের কচ্ছপ
যখন ছোট বোন ফুরিয়ে যাওয়া একটা মন্দিরে
গেরিমাটির শূন্যতা আঁকে
যখন কাতরগন্ধের পাশে বসে নখ কাটি , চুল
যখন হবিষ্যিঅন্ন পুষ্ট করে আমার বয়েস , স্মৃতি

তখন বাবা ঝেঁপে আসে বৃষ্টি হয়ে

১০

কোনো কোনো সময় তোমাকে টের পাই বাবা
টের পাই
তুমিও টের পাচ্ছ আমাকে

আমাদের সমস্ত টের পাওয়াগুলি একসাথে হয়
তোমার বুক আকাশের স্তনের মত সবুজ হয়
তোমার চোখ শীত  হিমের মত স্নেহ হয়

আমি সেই স্নেহের গাছ আঁকড়ে
বড় হতে থাকি


[রত্নদীপা]

Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.