>

অরুণ চট্টোপাধ্যায়।

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 6/10/2014 |













ই গরমে কি থাকা যায় ? তাপমাত্রা প্রতিদিন পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ ডিগ্রী উঠে আরও ওঠার জন্যে হুমকি দিচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের জলীয় বাষ্প একটু স্থলভূমিতে বেড়াতে আসার প্ল্যান করেছিল কিন্তু আকাশের সূর্যদেব চোখ রাঙ্গিয়ে বলে দিয়েছে আসছ, এসো । কিন্তু মেঘ ফেগ তৈরির চেষ্টা বরদাস্ত করব না । খাবে দাবে ঘুরবে বেড়াবে তারপর আবার ফিরে গিয়ে সাগরের মাথায় নাচবে ।

বেচারি মেরিন ওয়াটার ভেপাররা আর কি করে । মনে মনে গুমরে মরে আর গুম মেরে বসে থাকে । ফলে গুমোট বাড়ে কারণ হিউমিডিটি বাড়ে বলে । আর হিউমিডিটি বাড়লে ঘামও বাড়ে । কিন্তু মাথার ঘাম তো আর পায়ে পড়তে দেওয়া যায় না । কারণ গৌতমবাবু তো আর খেটে খাওয়া মানুষ নয় । বরং খাটিয়ে খাওয়া মানুষ । অফিসের গোটা কুড়ি স্টাফকে নাকি নাকে দড়ি দিয়ে খাটিয়ে খাটিয়ে মারেন তিনি সারাদিন । একথা আমার নয় । তাদের, যাদের ( নাকি ) তিনি রক্তচোষা ম্যানেজার (তাদের ভাষায়) ।

তাই খেটে খাওয়া মানুষের মত মাথার ঘাম পায়ে ফেলা তার শোভা পায় না । তাই তাকে বেশ কয়েকটা বড় বড় তোয়ালে কিনতে হয় সে ঘাম মোছার জন্যে । অবশ্য আরও অনেক কিছু করতে হয় । যেমন বাড়িতে যতক্ষণ থাকেন ততক্ষন হাফ লুঙ্গি আর স্যন্ডো গেঞ্জি পরতে হয় । লুঙ্গিকে হাঁটু অবধি গুটিয়ে তুললেই তা হয়ে গেল হাফ লুঙ্গি । ফ্যান্সি মার্কেট থেকে ফ্যান্সি হাতপাখা কিনে সে পাখার বাতাস খেতে হয় । আর সারা বাগান ময় ঘুরে বেড়াতে হয় ।

পাখা তার সব ঘরেই আছে । সম্প্রতি বাথরুমেও একটি পাখা লাগানোর পরিকল্পনা করেছিলেন । কিন্তু তাতে কি । গরমে ছাদ একেবারে তেতে পুড়ে লাল হয়ে থেকে । তাই সেই পাখার বাতাসে থাকে না স্নেহ মমতার শীতল ছায়ামাত্র । চালালেই পাখার হাওয়া যেন তার সারা গা ঝলসে দিয়ে যায় । যেন ভূতে-ধরা মানুষের গায়ে ওঝার পোড়া সর্ষের অফুরান বৃষ্টি ।

একজন বলেছিল এসি লাগাতে । আজকাল তো বাড়িতে বাড়িতে ঘরে ঘরে এসি । এসি কার, এসি বাস, এসি ট্রেন । কিন্তু এতে কি হয় ? এসি স্কুটার, এসি সাইকেল বা এসি মোটর সাইকেল কি হয়েছে ? এসি রাস্তা কিংবা এসি ফুটপাথ ?

এই গরমটাই বাঁচিয়ে দিল গৌতমবাবুকে । জিনিসের দাম হু হু করে বাড়ায় মার্কেটও গরম । তাই এ-সি (এসেন্সিয়াল কমোডিটির) প্রাইস বেড়ে যাওয়ায় প্রাইস ইনডেক্স বেড়ে গিয়ে আকাশ প্রায় ছুঁই ছুঁই । আর তার ঠেলায় মাগ্যিভাতা বা ডিয়ারনেস ভাতা বাড়তে বাড়তে পরের বার বাড়ার জায়গা আগে থেকে খুঁজছে ।

এই মাগ্যি-গন্ডার দিনে সেই মাগ্যিভাতা বৃদ্ধিই গৌতমবাবুর শাপে বর হল । ঐ অতিরিক্ত টাকায় তিনি হিসেব কষে একটা এসি কিনে লাগিয়ে দিলেন ঘরে । যাতে ডি-এর টাকায় ঐ ই-এম-আইটা হয়ে যায় । নগদে কিছু দিতে হলে তার মনে হয় যেন গায়ের থেকে চামড়া তাকে না জানিয়ে কেউ কেটে নিচ্ছে ।

প্রথম রাত্তিরটা বেশ ভালই ঘুম হল । শনিবারের বারবেলা ঘুচে কিন্তু রবিবারের কাল-সকাল শুরু হতেই বাতাসের চড় চড়ানিটা বাড়তে লাগল । প্রকৃতির আহ্বানকে কেই বা আর উপেক্ষা করতে পারে ? সেই উদ্দেশ্যে বাথরুমে যেতে গিয়ে বাইরে মানে বারান্দায় পা দিতেই ওরে বাবা । মনে হল কে যেন তপ্ত তাওয়া থেকে গরম গরম পরোটা তার খালি গায়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারছে । বেলা মাত্র সাড়ে নটাতেই যদি এই তো বেলা বারোটায় কি হবে ভাবতে গিয়ে তার জ্ঞান লুপ্ত হবার উপক্রম হল ।

সেদিন সারাদিন তিনি বেডরুমে পড়ে রইলেন । কিন্তু পরের দিন তো অফিস যেতেই হল । তিনি যে অফিসের একমাত্র খাটিয়ে খাওয়া মানুষ । খেটে খাওয়ায় যেমন দুঃখ খুব তেমনই খাটিয়ে খাওয়ানোর মজাই আলাদা । খাটিয়ে খাওয়া মানুষরা ঐ জন্যে নাকি চট করে অফিস কামাই করে না । এটা আমার নয়, ঐ যে লোকগুলোকে (নাকি) খাটিয়ে মারে তাদের কথা ।

বেডরুম এসি, রাস্তা গরম । তারপর অফিস আবার ঠাণ্ডা । তারপর রাস্তা আবার গরম । তারপর আবার বেডরুম ঠান্ডা । এই ঠান্ডা গরমের অনবরত চরকি পাকে সর্দি –গর্মি হয়ে গেল । একদিন ভির্মি খেয়ে পড়ল বিছানায় সাতদিনের জন্যে ।

হ্যাঁ সেই থেকে গৌতম বাবু ভেবেই চলেছে কিভাবে এই সমস্যার জট খোলা যায় ।

আচ্ছা ফ্রিজ থেকে ঠিক পর মুহূর্তেই উত্তপ্ত ওভেনে যেতে কার ভাল লাগে বল ? কিংবা ওভেন থেকে সরাসরি ফ্রিজে ? এমন অদ্ভুত যাতায়াতে হবে না সর্দি গর্মি ? সাতদিনের ছুটি তো রোগেই কেড়ে নিয়েছে । এখন ছুটি আরও মাস তিনেক বাড়িয়ে দারজিলিং চলে গেলেন । চাকরিতে প্রোমশন পাওয়ার পর থেকে আর ছুটি নেন নি ভদ্রলোক । কারণ খাটিয়ে খাওয়ার মজাই যে আলাদা ( তার ভাষায় ) । সেই স্তুপাকার ছুটি এখন মরার অপেক্ষায় । ওদের বাঁচিয়ে তোলার এই হল মস্ত এক সুযোগ ।

সহৃদয় ওপরওলা স্যংশনটা দিয়ে দিলেন । যাক যাক লোকটা তো আর কটা দিন পরেই রিটায়ার করছে । এ সময় যদি রাঁচির জল হাওয়া একটু ভাল লাগে তো ক্ষতি কি ? মাথাটা নাকি আর কাজ করছে না । মানে মাথার স্ক্রু ঢিলে হয়েছে । হতেই পারে । আর কে না জানে রাঁচিতে খুব ভাল মাথার স্ক্রু পাওয়া যায় ।

ছুটির এপ্লিকেশনে লিখেছে রাঁচি কিন্তু গৌতম বাবু টিকিট কাটল দারজিলিং-এর । সাফাই দিল, এই গরমে মাথাটা আর কাজ করছে না একদম । নিন্দুকরা বলল, মাথার আর দোষ কি ? যা গরম পড়ছে আলগা হওয়া তো দূরে থাক মাথার স্ক্রু যে গলে যায় নি এই ঢের। ইস্পাত গলে যাচ্ছে তো এ মাথার হাড়-মাস ।

দারজিলিং-এ পৌঁছে গৌতম বাবুর মনে হল এই রে, টিকিটটা কাশ্মীরের কাটলেই তো ভাল হত । নিউটন মাধ্যাকর্ষণ সূত্র বার করলেন কোথায় বসে ? কোথায় আবার । আপেল গাছের নীচে বসে। কিন্তু এখানে আপেল গাছ কই সব তো কমলা লেবু গাছ । আর আছে তার হাঁটুর বয়সী চা-গাছ । মানে তার হাঁটু অবধি উঁচু বলেই তিনি এইটা ভাবলেন হয়ত ।

তা চা গাছই বা মন্দ কি ? বেশ ঠান্ডা ঠাণ্ডা কুল কুল । বসলেন তার নীচে । মাসের পর মাস কেটে যাচ্ছে । ঠাণ্ডা দারজিলিং-এও হোটেলের বিল উঠছে চড়চড় করে । ফিরলেন মাস ছয়েক পরে । বাড়ির ঘর থেকে এসি খুলে ফেলে দিলেন । তারপর অফিসে এলেন । পাখা চালালেন না। সবাই ছুটে এল । কেমন যেন একটা আজব লোককে দেখছে সব ।

আজবই তো বটে । নাহলে এমন অদ্ভুত রকমের জ্যাকেট পরে কেউ ? ব্যাপারটা নিয়ে তো সবাই কানাঘুসো করছে কিন্তু বলতে সাহস পাচ্ছে না । কিন্তু কৌতূহল বলে তো একটা কথা আছে নাকি?

গ্রামে গ্রামে মানে ডিপার্টমেন্টে ডিপার্টমেন্টে রটে গেল বোধিবৃক্ষের নিচে বসে সেকালের গৌতম যেমন বুদ্ধ হয়েছিলেন, তেমনই দার্জিলিঙয়ের চা-গাছের নীচে বসে একালের এক গৌতম বৃদ্ধ হয়েছেন তো বটেই আর হয়েছেন নিউটনও । কারণ তিনি একটা বিশাল মাপের আবিষ্কার করে ফিরেছেন ।

অফিসে ফিরেই গৌতম বৃদ্ধের (ছমাসের পুরোন লম্বা দাড়ি রাখার জন্যে ইতিমধ্যেই সবাই আড়ালে তাকে এই নামে ডাকতে শুরু করেছে ) প্রথম কাজ হল অফিসের সমস্ত এসি মেশিনগুলো রাস্তায় ফেলে দেওয়া । চোখ চড়কগাছ সকলকে ইতিমধ্যে তিনি প্রত্যেককে একটা করে স্বচ্ছ্ব মাথা ঢাকা হালকা জ্যাকেট দিয়েছেন পরতে ।

অফিসের সকলে খুব খুশি লোকটার ওপর । কারণ জ্যাকেট খুব আরামদায়ক । বাইরের তাপমাত্রার সঙ্গে খাপ খাইয়ে এর নিজের ভেতরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে বা কমিয়ে নেয় । একেবারে নিজে থেকেই । যেমন গরম যত বাড়তে থাকবে জ্যাকেটের ভেতরের তাপমাত্রা তত কমতে থাকবে । আবার শীত যত পড়তে থাকবে জ্যাকেটের আভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ততই বাড়তে থাকবে।

আর বর্ষা ? রাম কহ ! এর ভেতরে ঢোকার সাহস বা ছিদ্র কোনটাই জলের ফোঁটার অন্তত নেই ।

দাম ? ভারি সস্তা । কারণ এগুলো ফেলে দেওয়া পুরোন কাপড় জামা থেকেই বিশেষ রি- সাইক্লিং পদ্ধতিতে হয়ে থাকে ।

গৌতম বাবু এর নাম দিয়েছেন “Most Personal Assistant” বা বাংলায় “একান্ত ব্যক্তিগত” । খবরের কাগজটা পড়ে শোনাচ্ছিল সিকুরিটি গার্ড ঝগড়ু । এ বছর বিজ্ঞানে নোবেল আসছে ভারত থেকে আর প্রাইজ পাচ্ছে গৌতম বাবু । ঐ জ্যাকেটটার জন্যে । ঐ জ্যাকেটটা হল পারসোন্যাল এসি মানে একান্ত ব্যক্তিগত এসি । এটা খুড়োর কলের মত যে পরে থাকবে তার সঙ্গেই ঘুরবে । তার মানে ঘর বা অফিস, বেডরুম বা বাথরুম, বাস বা ট্রেন সর্বত্রই এসি তোমার সঙ্গেই ঘুরছে। তোমার আজ্ঞাবহ হয়ে । 


Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.