>

কমলেন্দু চক্রবর্তী

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 8/15/2015 |




পানসি চলল বেলঘরিয়া,আমি চললাম আসানসোল ৷ আগে একবার সবার সঙ্গে আসানসোল গিয়েছিলাম ৷  কাজেই আমি খুব কনফিডেন্ট ৷ একটা টিনের পুরানো সুটকেস আর একটা হোল্ড অল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বর্ধমানের পথে৷ রেলের কর্মচারী হিসেবে আমরা সেকেন্ড ক্লাসের পাস পেতাম ৷ ট্রেনে উঠে পড়লাম ৷ শিলিগুড়ি,পর্যন্ত চেনা পথ ৷ শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং মেলেও উঠতে কোনো ঝামেলা নেই ৷ খেজুরিয়া ঘাটে নেমে বালিয়ারি পেরিয়ে স্টীমার না চড়ে তাড়াতাড়ি হবে ভেবে লঞ্চে করে পৌঁছে গেলাম ফারাক্কা স্টেশন ৷ আর এখানেই শুরু হল গোলমাল ৷ ওভার কনফিডেন্সের ফল ৷ তখনও অন্যান্য প্যাসেঞ্জাররা বেশী এসে পৌঁছায়নি ৷ এতবার যাতায়াত করেছি কোলকাতায় সবার সঙ্গে,আমি জানতাম ৷ ফারাক্কায় একটা ট্রেনই দাঁড়িয়ে থাকে দার্জিলিং মেল ৷ দেখলাম একটা নয় দুটো ট্রেন ৷ কোনটায় উঠব ৷ ট্রেন দুটোই খালি ৷ আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম কোলকাতায় যাবার ট্রেন কোনটা ৷ ও বলল দুটোই যাবে,তবে ঐ ট্রেনটায় ভীড় বেশী হবে আর এটায় ভীড় কম হবে ৷  আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম কোনটায় উঠি ৷ লোকজনের ভীড়  ক্রমেই বাড়ছে ৷ তাই বেশী চিন্তা না করে ট্রেনে উঠে পড়লাম ৷

নিশ্চিন্ত মনে একটা ভালো সিটে বসে আছি ৷ ট্রেন চলছে ৷ বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর আমার মনে হল,ট্রেনটা তুলনায় একটু বেশী স্টেশনে থামছে ৷ দার্জিলিং মেল তো ফারাক্কার পরে একেবারে রামপুরহাটে গিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়ায় ৷ একটু চিন্তায় পড়লাম ৷ বয়স চৌদ্দ ৷ দুনিয়ার কিছুই জানি না ৷ যেন একটা বাঘকে,না বাঘ-সিংহ-হাতি নয়,শিয়াল-শুয়োরও নয়,একটা বনে লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুরে বেড়ানো হরিণকে জঙ্গলের প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে তুলে এনে কেউ শো চলাকালীন সার্কাসের আঙিনায় ঢুকিয়ে দিয়েছে ৷ দিশাহীন হরিণ থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছে ৷ আমার দশা বোধহয় বসে থাকা লোকটা বুঝতে পারল ৷ বলল,কোথায় যাবে তুমি,খোকা ? 

-কোলকাতা ৷
-তবে এতো চিন্তা করছ কেন ? এই ট্রেনও তো কোলকাতায়ই যাচ্ছে ৷
-কিন্তু আমি স্টেশনগুলো চিনতে পারছি না ৷
-তা আবার হয় নাকি ? স্টেশন কি লাফিয়ে লাফিয়ে পালিয়ে বেড়ায় ৷ সব ঠিকঠাকই আছে ৷ আমি তো প্রায়ই যাই ৷ চুপ করে বসে থাক ৷ দেখবে একসময় হাওড়া পৌঁছে যাবে ৷
-হাওড়া ? হাওড়া কেন ?
-আরে বার হাওড়া প্যাসেঞ্জার হাওড়া যাবে না তো কি দিল্লি যাবে ৷ তুমি তো বেশ মজা করতে পারো ৷
-মানে এই ট্রেনটার নাম বার-হাওড়া প্যাসেঞ্জার ? দার্জিলিং মেল নয় ?
-দার্জিলিং মেল তো ফারাক্কা থেকে ছেড়ে এতক্ষণে নলহাটি বোধহয় পৌঁছে গেছে ৷ 
-মানে ?
-আচ্ছা খোকা,ঠিক করে বলো তো,তুমি কোথায় যাবে ?
-কোলকাতা ৷ 
-তো এটাও তো কোলকাতাতেই যাবে ৷ তবে চিন্তা করছ কেন ?
-হাওড়া আবার কোলকাতা হবে কেন ? ওটাতো হাওড়া,গঙ্গার উপরে হাওড়া ব্রিজ ৷
-দেখছো ওসব ? গেছ কোনোদিন ?
-না বইতে পড়েছি,ছবি দেখেছি ৷ 
-আরে বাবা হাওড়া নেমে গঙ্গা পেরোলেই তো কোলকাতা ৷
-কিন্তু আমি তো শুধু শিয়ালদা স্টেশনই চিনি ৷ কোলকাতায় আর কিছু চিনি না ৷
-পরিষ্কার করে বলো তো তুমি কোথায় যাবে মানে কোলকাতায় নেমে তুমি কোথায় যাবে ?
-আসলে আমি আসানসোল যাব ৷
-আসানসোল ? তবে তো দার্জিলিং মেলে গিয়ে বর্ধমান থেকে ট্রেন ধরে চলে যেতে এ ট্রেনে উঠলে কেন ? 
আমি চুপ করে থাকি ৷

পাশের একজন বলে উঠল,কেন আজ রাতে না হয় হাওড়া স্টেশনে থেকে গেলে৷ কাল সকালে ব্লাক ডায়মন্ড বা কোলফিল্ড ধরে চলে যাবে ৷ সমস্যা কোথায় ? ট্রেন চলছে ৷ আমি চিন্তা নিয়ে সঙ্গে চলছি ৷ দিশাহীন লোক বোধহয় একেই বলে ৷ হঠাৎ পাশের ভদ্রলোক বলে উঠল,তুমি কাটোয়ায় নেমে যাও না কেন ? ওখান থেকে একেঁবেঁকে ধরে বর্ধমান চলে যেতে পারবে ৷

আমি ভূগোলের ম্যাপ জানি কাটোয়াকে চিহ্নিত করতে পারব ৷ কাটোয়ার ডাঁটা খুব বিখ্যাত এটাও জানা ৷ কিন্তু কাটোয়া স্টেশন বা ঐ অদ্ভূত নাম একেঁবেঁকে রেলওয়ে? ওটা কি ? একেঁবেঁকে তো সব ট্রেনেই যায় ৷ তবে কি এই ট্রেন বেশী বেঁকতে বেঁকতে যায় ৷ আমার ভয় আরো বেড়ে গেল ৷ হাওড়া গেলে হারিয়ে সব নির্ঘাৎ আর একেঁবেঁকে গেলেও জানিনা ৷

-ভাবছি কি খোকা আর একটু পরেই কাটোয়া ৷রেডি হয়ে নাও ৷ নামব,কি নামব না ভাবতে ভাবতে কাটোয়ায় নেমেই পড়লাম ৷ জিজ্ঞেস করে প্লাটফর্মের একধারে একটু আলাদা  করে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটাকে দেখলাম ৷ একটু যেন জাতের দিক থেকে নিম্নশ্রেণীর ৷ সাইজে তো ছোটই ৷ মানে ন্যারো গেজ ৷ দার্জিলিং-এর পাহাড়ে ওটা ট্রয়ট্রেনের মতো ৷ উঠে বসলাম ট্রেনে ৷ একটা আমাকে বর্ধমানে পৌঁছে দেবে ৷ ট্রেনের প্য্যাসেঞ্জার শুরুতে ছিল না ৷ আমার চোখ আমার উল্টোদিকে বসা একটা লোকের দিকে ৷ গরমের মধ্যেও মাথা মুখ সব মোটা চাদরে জড়ানো ৷ কেবল চোখ দুটো চকচক করছে ৷ আর চোখদুটোর দৃষ্টি সোজা আমার  মুখের উপর ৷ তার আগেই শোনা হয়ে গিয়েছিল যে এখানে প্রচুর ডাকাতি হয় ৷

হঠাৎ দেখলাম চলন্ত ট্রেনেই একদল লোক উঠল বস্তা,ঝুড়ি ইত্যাদি নিয়ে ৷ এরা হাট ফেরতা ৷ এখন কামরা একেবারে ঠাসা ৷ কিন্তু তারমধ্য্য থেকেই মাথাটা হেলিয়ে লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে ৷ আমার অবস্থা কি সেটা আমি নিজেই বলতে পারব না ৷ তখন বোধহয় আমার  নামও আমি ভুলে গিয়েছিলাম ৷ কিছুক্ষণ পরে হাটুড়ে লোকগুলো নেমে খেতে সোজা সেই জোড়া দৃষ্টির আক্রমণ ৷

কতক্ষণে লেগেছিল জানি না ৷ হট করে আলো ঝলমলে বর্ধমান স্টেশন ৷     পরে জেনেছি যে রেললাইনের ট্রেন আমাকে উদ্ধার করল,তার আসল A.K-B.K Rly অর্থাৎ Ahmedpure to Burdwan এবং Burdwan to Katoa . ব্যাস,অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন ধরে আসানসোল ৷ তারপর আধচেনা শহর পেরিয়ে মাসির বাড়ি পৌঁছালাম ৷

এক ধাক্কায় আসানসোলে এসে পড়াতে আমার মধ্যে অদ্ভূত অনুভূতি হচ্ছিল ৷ আমি বুঝতে পারছিলাম এ জায়গা আমার জন্য নয় ৷ শহরের একটা নিজস্ব রীতিনীতি থাকে,সেটা রপ্ত করা খুব কঠিন না ৷ কিন্তু আসানসোল তো শুধু শহর নয়শিল্পাঞ্চল ৷ এদের কায়দা-কানুন এক্কেবারে ভিন্ন ৷ এখানে আমার পদে পদে সমস্যা হতে লাগল ৷ যাইহোক পরের দিন মাসির বড় ছেলে  মানে রঞ্জিতদা আমাকে নিয়ে গিয়ে ওখানকার বি.বি কলেজে ভর্তি করে দিয়ে এল ৷ এটা ছিল বর্ধমান ইউনিভারসিটির অধীনে ৷ কলকাতা ইউনিভারসিটিতে এই কোর্সটা পড়ানো হত Pre-University নামে ৷ বর্ধমান ইউনিভারসিটিতে এই একই কোর্সের নাম ছিল University Entrance . শুধুমাত্র ছেলেদের কলেজ ৷বইপত্র জোগাড় হল ৷ অন্যকিছুতে মন না দিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম ৷ দু-একদিন যেতে মাসির বাড়িতে বলাবলি শুরু হল,এতো জোরে চিৎকার করে পড়ে কেন ? পাড়ার লোকজন কী ভাববে ? এটা কানে আসতেই আমি আওয়াজ না করে পড়ার অভ্যাস শুরু করলাম ৷ রপ্তও হয়ে গেল ৷ 
(ক্রমশ)
[কমলেন্দু চক্রবর্তী]


Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.