>

শর্মিষ্ঠা ঘোষ

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 5/09/2014 |
ব্যাঙ রাজপুত্র


শরীরটা কুঁকড়ে যাচ্ছিলো বৃষ্টির ছাঁটে । কেঁপে কেঁপে উঠছিল । বন্ধ দোকানঘরের সামনে লাল চুড়িদার পরা এক যুবতী শরীর অঘোর ঘুমে ,নেশাছন্নের মত পড়ে আছে , অনতিদূরে একটা আধভেজা কুকুর , আশ্রয়ের খোঁজে হাজির হওয়া । দমকা হাওয়ায় বৃষ্টি ঢুকে পড়ছে একচিলতে বারান্দায় । মোটেই ভিখিরি বা ভ্যাগাবনড নয় । সবমিলিয়ে চেহারায় ভদ্র শিক্ষিত ঘরের ছাপ স্পষ্ট । তবে এই মুহূর্তে কোন ড্রাগের ঘোরে পড়ে আছে রাস্তায় এই বৃষ্টিবাদলার দিনে । রাত প্রায় দুটো । পুলিশের টহলদার ভ্যানটা হেডলাইটের আলোয় দূরথেকে আবছা কিছু একটা দেখে থমকে দাঁড়ালো ।নেমেএলেন ডিউটি অফিসার। টর্চ জ্বেলে দেখেন মেয়েটিকে ওই অবস্থায় । সাথে মহিলা পুলিশ নেই । একটু থমকালেন অফিসার । কিন্তু এভাবে মেয়েটিকে ফেলে যেতেও মন চাইছেনা । দ্রুত মনস্থির করে এক সহযোগীর সাথে ধরে চ্যাংদোলা করে সুমোতে তুলে সোজা থানায় । সেখানে দীপ্তিদিকে ডাকিয়ে হ্যান্ডওভার করলেন প্রথমে । দীপ্তিদির উদ্যোগেই পাশের পুলিশ কোয়ার্টার থেকে শুকনো জামাকাপড় আনিয়ে কোনরকমে ওকে চেঞ্জ করানো হল । ও পুরো আউট তখন। না বলতে পারছে ঠিকানা , পরিচয় , না সোজাহয়ে দাঁড়াতে পারছে । একবার অস্ফুটে জল চাইলো । কেউ একটা জলের বোতল দিল , কিন্তু হাত থেকে পড়ে গেল বোতল । দীপ্তিদি ই শেষমেশ ধরে ধরে দু এক চুমুক খাওয়ালেন। একবার বলল , ‘টয়লেট যাব’, বলে রওনাদিল দেয়ালের দিকে। ধরে ধরে পুলিশকোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হল । মিসেস সেন ব্যাপার দেখে বললেন , ‘দীপ্তি , তুমি এক কাজ কর । মেয়েটিকে নিয়ে আমার গেস্টরুমে থেকে যাও আপাতত , ভোর তো হয়েই এল প্রায় !’ 


সেদিনও মাদল আসে নি স্কুলে । ক্লাসরুমের জানালা দিয়ে একঝলক বাইরে তাকিয়ে বীথি ঠিক দেখে নিয়েছে আজও এসেছে ছেলেটা । কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে আছে যথারীতি । মাদলকে খবরটা না দেওয়া অবধি পেট গুড়গুড় করবে ওর । বাড়ি ফেরার পথেই জানিয়ে গ্যালে হয় । থাক , কাকিমা আবার সন্দেহ করবে । তারচেয়ে , স্যারের ওখানে পড়তে গিয়ে আজ মাদলের পাশে বসলেই হবে । কথা বলতে যদি নাও পারে , চিরকুট চালাচালি তো হবে । ব্যাপার শুনে মাদল তো হেসেই খুন ।বলে , ‘ বেশ হয়েছে , ক্যাবলাটা যেমন আমি স্কুল গেছি কিনা খোঁজ না নিয়েই এসেছে ! এত সাহসী যে আমার বাড়ির ধারকাছ মাড়ায় না !’ বীথি চোখ টিপল , ‘বলে দেব নাকি , তুই ক্যাবলা , ভীতু এসব বলেছিস ?’ মাদল একটা ঘুষি পাকিয়ে তেড়ে গ্যাল । বুকের মধ্যে একটা ঝর্ণা নামছে , নাভি বরাবর চিনচিনে সুখের আবেশ , গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো মাদলের । আবার একটা অভিমানও ওকে আক্রান্ত করে । সুকেশ এত ভালমানুষ গোছের যে মাঝে মাঝে মনে হয় ভীতু । রমিতার বয়ফ্রেনড কি স্মার্টলি বাইক নিয়ে আসে দুবেলা , সাঁ করে উড়ে যায় দুজন । বাইকের পিলিয়নে বসে ছেলেটার কোমর বেড় দিয়ে ধরে রমিতা । ওর সদ্যস্ফুট বুক ছেলেটার পিঠে সেঁটে থাকে ।ক্লাসমেট মেয়েরা হাসাহাসি করে । রমিতা এসব কেয়ার করে না । মাদলের ইচ্ছে করে , সুকেশ আর একটু সাহসী হোক । মাদলের নখরাবাজ ‘না’ গুলোকে অমান্য করতে শিখুক । ছলেছুতোয় আবডাল খুঁজে একটু আদর করুক মাদলকে । সুকেশের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে মাদল ইচ্ছেকরে কখনো কখনো ছুঁয়েদিয়েছে ওর হাত । বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত হাত সরিয়ে নিয়েছে সুকেশ । যেন কোন গর্হিত অপরাধ হয়েগ্যাছে । মাদলের গলাঠেলে কান্না উঠে আসে । এত ভীতু কেন ছেলেটা । মাদল নিজে ডেয়ার ডেভিল টাইপ । মাদল একটা উদ্দাম প্রেম করতে চায় । মাদল চায় স্রেফ ভেসেযেতে , ডুবে যেতে , মরে যেতে । সুকেশ এতকিছু বুঝলে তো ! থাক , ব্যাটা রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে । মাদল আরও দুদিন স্কুল যাবে না । দেখাযাক , কি করে সুকেশ । দ্যাখাযাক , বীথির হাতে অন্তত একটা চিরকুট পাঠানোর ক্যালি হয়কিনা ওর ! মাদলের রাগ হয় । নিজের কল্পিত চাওয়া ওকে পাগল করে দ্যায় । 

মাদলকে নিয়ে দীপ্তিদি আর ওসি এসে নামলেন বিবিডি মোড়ে । এখান থেকে গলিতে হেঁটে যাবেন তারা । সিভিল ড্রেসে আছেন , যাতে পাড়ার লোকের চোখে অস্বাভাবিক না লাগে । মাদলই এই অনুরোধ করেছিল তাদের । বেলটিপে দাঁড়িয়ে আছেন । মেজেনাইন ফ্লোরের জানালা দিয়ে উঁকি মারল এক মাঝবয়েসী মুখ । তাতে মুখের রেখায় কোন ভাঙ্গাগড়া চোখে পড়ল না । অফিসার আর দীপ্তিদি একটু কনফিউজড হয়ে মুখ চাওয়াচায়ি করলেন । মিনিট দুই পরে ধীরেসুস্থে ভাবলেশহীন মুখে দরজা খুলে একপাশে সরে তিনজনকেই ঢুকতে দিলেন মহিলা । মাদল এখন অনেক ফ্রি । জিজ্ঞেস করলো , ‘কি খাবেন , বলুন , চা না কফি’ ? ওরা ইতস্তত করছিলেন দেখে মাদল ই এবার ডাকদিল ভদ্রমহিলাকে , ‘মা , এদিকে এস , আলাপ করিয়ে দি , ইনি দীপ্তি দি , আর এই যে মিস্টার সামন্ত, এই থানার অফিসার ইন চার্জ’। ভদ্রমহিলার চোখগুলো বিস্ফারিত হয়েগেল । এ আবার নতুন কি ফ্যাঁকড়া বাঁধিয়ে এনেছে কে জানে !


মাদলের ভালনাম দ্যুতি । দ্যুতি ব্যানারজী । বাবা ব্যাঙ্ক অফ বরদার সিনিওর ম্যানেজার ছিলেন । মা স্কুল শিক্ষিকা । মাদল তাদের বড় মেয়ে । বোন আছে একটা । মাদলের থেকে অনেক ছোট । মাদল স্বভাবে বড় একরোখা , জেদি , ক্ষ্যাপা ।যখন যা মাথায় চাপে , তার জন্য এক্সট্রিম পর্যায়ে চলে যেতে পারে । শেষ না দেখে ছাড়ে না । মেধাবী ছাত্রী ছিল , সুকেশ কে বিয়ে করেছিল ক্লাস নাইন এ , বাড়ি থেকে পালিয়ে । অ্যাডভেঞ্চার যেন একটা । সে বিয়ে দু বছরের বেশি টেকে নি । সুকেশ এত গুডি গুডি যে মাদলকে ওর পাগল মনে হত । ওর উচ্ছাস , ওর হুজুগের সাথে পাল্লা দেওয়া সুকেশের কম্ম ছিল না । মাদল হয়তো চাইছে ভ্যালেনটাইন্স ডে তে সুকেশের সাথে লং ড্রাইভে চলে যেতে , যেদিকে দুচোখ যায় , সুকেশ বেলা নটায় ঘুম থেকে উঠেই প্রতিদিনের মত স্নান খাওয়া সেরে বাপের গদি সামলাতে চলল । ওর মনেই পড়ল না মাদলকে একটা চুমু খাবার কথা বা নিদেনপক্ষে একটা গোলাপ কি চকোলেট নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা । বিয়ের পর মাদলের প্রথম জন্মদিন সুকেশ ভুলে মেরে দিয়েছিল । শেষে সুকেশের সামনেই বন্ধুরা ফোনে উইশ করা শুরু করলে সুকেশ স্রেফ উদাসীন তাকিয়েছিল , না একটা স্যরি , না কিচ্ছু । মাদলের অবাক লাগতো , এত তাড়াতাড়ি পুরনো হয়েগ্যাল সে! সুকেশের জন্মদিনে সারপ্রাইজ পার্টি দিল মাদল । সুকেশদের কনজারভেটিভ বাড়িতে সে নিয়ে অশান্তি , সুকেশ ও দিব্যি বলেদিল , ‘ মা যখন চান না , এ বাড়িতে এসবের দরকার নেই’। মাদলের মনে হচ্ছিল সারাদিন ধরে সাজানো ঘরটা , খাবার দাবার , ফুল, বেলুন , কেক সব লণ্ডভণ্ড করে দ্যায় । ওর মনে ফিরেআসে এয়ারভিউ হোটেলের দুশোএগারো নাম্বার ঘরে ওদের প্রথম মিলনের সেই ভয়াবহ স্মৃতি , প্রথমবার মিলনের ব্যাপক শঙ্কা , উচ্ছ্বাস পারহয়ে ইউটপিয়ায় ভেসেভেসে ঘুমিয়ে পড়েছিল মাদল , মাঝরাতে ওকে জাগিয়ে ফের মিলনের প্রস্তুতি নিতেনিতে খুব ক্যাসুয়ালি কনডোম লাগাতে লাগাতে বলেছিল সুকেশ , ‘ তোমার তো হাইমেন ছেঁড়া দেখলাম , আমার আগে আর কার সাথে শুয়েছ’? মাদলকে বলতে হয়েছিল সাইকেল চালানো মেয়েদের অনেকসময় হাইমেন পুরুষসঙ্গের আগেই ছিঁড়ে যায় , ওর ও তবে তাই হয়েছে , আর ব্যাপারটা ওর জানা ছিল না । মনেমনে ঘেন্নায় , রাগে , অভিমানে শেষ হয়ে যাচ্ছিলো মাদল , এ কার ভরসায় পথে নেমে এল ও ? এতো সঙ্কীর্ণমনা , এত হিপক্রিট , এত অসহ্যরকম ক্যালাস ! কিন্তু ততক্ষণে ভুল যা হবার হয়ে গ্যাছে । মাদল শরীর দিয়েদিয়েছে এই ফালতু লোকটাকে । এবার টেনে চলা ছাড়া আর উপায় নেই । যে ঘর ছেড়ে এল মোহে , সেখানকার দরজাও তো আপাতত বন্ধ । পরে ক্রোধের আগুন নিভলে নাহয় দেখা যাবে ! মাদলের ইচ্ছে করছিলো সুকেশকে টেনে একটা চড় মারে । পারে নি শেষপর্যন্ত । মানসিক ভাবে মৃত মাদলের শরীরটাকে নিয়ে যখন সুকেশ যখন মত্ত হস্তির মত তোলপাড় করছিলো , মাদল ওকে মনে করাতে বাধ্য হল , ক্রিকেটার ইয়ানবথামের কেসটা ! বিদেশে সিরিজ খেলতে গিয়ে হোটেলের ঘরে এক কলগার্লের সাথে ফষ্টিনষ্টি করতে করতে খাট ভেঙে পড়েছিল , মিডিয়ায় সে নিয়ে যা তা কাণ্ড একেবারে ! আর মনেমনে মাদল মরে গেছিলো সেদিনই , ওর চোখের কোলবেয়ে গড়িয়ে পড়েছিল দু ফোঁটা হাহাকার ! নিজের মতকরে আদর সেরেই মড়ার মত ঘুমিয়ে কাদা সুকেশ টের পায়নি এসব । দুবছর চলেছিল কোনরকমে জোড়াতালি দিয়ে । 

নিজেকে ক্রমাগত নামাতে নামাতে , টিকে থাকার , বিয়েটা টিকিয়েরাখার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় একটা সময় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল মাদলের । যেকোনো ছেলের সাথে গল্প করলেই সুকেশ ভাবতো , ফ্লারট করছে মাদল , মাদলের কোথাও একলা চলাফেরায় স্বাধীনতা থাকলো না , খালি জবাবদিহি , খালি পাহারাদারি । হাঁপিয়ে গেছিলো মাদল । বাপের বাড়িতে পরিস্থিতি একটু একটু করে নরম হয়েছে ততদিনে । মাদল মনস্থির করে ফেলল । বাপের বাড়ি ফিরে এসে মাদল এম এ অবধি পড়েছে ,তারপর বি এড। সেই সুবাদে একটা চাকরিও জোগাড় করেছে , কিন্তু সেই থেকে মাদল যেন উশৃঙ্খল হয়ে গেল আরও । কি করে কখন ঠিক নেই । এই হয়তো ফেসবুক ফ্রেন্ডের সাথে দিঘায় গিয়ে রাত কাটিয়ে আসছে , ত আবার কোন ছেলেকে রেজিস্ট্রি করে দুদিন সংসার সংসার পুতুল খেলছে । কাল যেমন কতোগুলো ড্রাগ অ্যাডিকট এর পাল্লায় পড়েছিল ... একসাথে হেরোইন টেনেছে সারাদিন , তারপর কি ভাবে কি হল , মনে নেই আর । এসব তথ্যই জানা হয়েগেল চা খেতে খেতে , ওর মায়ের থেকে খানিক , মাদল বলল কিছুটা । মাদলের মা , ভদ্রমহিলা যতই কঠোর হবার চেষ্টা করুন না কেন , বলতে বলতে ভেঙ্গে পড়লেন । এই মেয়ের জন্য তাঁদের সামাজিক সম্মান জলাঞ্জলি গ্যাছে , প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে ভয়ে পাড়ায় কারোর সাথে মেশেন না । ছোট মেয়ে ব্যাঙ্গালরে চাকরি করছে , এম বি এ কমপ্লিট করে । ওকে বলেছেন , ওখানেই কাউকে বিয়ে করে সেটেল করে যেতে । এদিকে এলে দিদির কিস্যা শুনে পাত্রপক্ষ ভেগে যাবে ! এই গোটা কথন পর্ব জুড়ে মুখ নামিয়ে বসেছিল মাদল । দীপ্তিদি আহা উঁহু করছিলেন । তোলপাড় চলছিলো অফিসারের মনে । খুব ইচ্ছে করছিল , মেয়ের বয়সী ওই মেয়েটাকে পাশে বসিয়ে ওই টলটল জলভরা চোখ দুটো দু হাতের চেটোয় মুছিয়ে মাথায় ঠোঁট ঠেকিয়ে বুকে জড়িয়ে রাখেন । বলেন , ‘ চলরে মেয়ে , খুঁজে আনি তোর জন্য এক স্বপ্নের প্রেমিক রাজপুত্র , না হয় সে ব্যাঙ রাজপুত্রই হল ,তোর প্রেমে সেই জাদু আছে , যা তাকে মানুষ করে তুলতে পারে ফের !’ আর একদিন আসবেন তিনি , এই উর্দিটা ছেড়ে , মাদলের কাকু হয়ে , মাদলের বন্ধু হয়ে , তারপর শুরু হবে একটা নতুন গল্প ...

Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.