>

কমলেন্দু চক্রবর্তী।

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 9/10/2014 |



ফুটবল খেলা একটু-আধটু শিখতে শুরু করেছি। বল কন্ট্রোল-টন্ট্রোল বলে কোনও শব্দ তখন জানাই ছিল না। সবার কোথায় লিকলিকে শরীর নিয়ে হয়ে গেলাম ফরওয়ার্ড প্লেয়ার। কারণ বল পায়ে থাকুক না থাকুক ছুটতে পারতাম খুব জোরে। আর আমার ফুটবল প্লেয়ার হওয়ার একটাই গুন দৌড়। আজকালকার মতো টোটাল ফুটবল, ড্রিবল করা, কোচ এসবের নামগন্ধ জানা ছিল না। জানার দরকারও ছিল না। শুধু খেলো। কোনও সময় ছেলে কম হলে একদিকে চার-পাচ জন করে। আবার ছেলে বেশি হলেএকেক দলে পনেরো, ষোলজন প্লেয়ারও থাকত। ফুটবল খেলার প্রথম সমস্যা ছিল বল জোগাড় করা। নিজেদের পকেটে তো পয়সা থাকত না। চেয়েচিন্তে মায়ের কাছ থেকে কিছু পয়সা জোগাড়যন্ত্র করতাম। তবে সব জায়গায়তেই আর সবসময়ই কিছু কাকু শ্রেণীর লোক থাকত – এখনো আছে। বেশিভাগ টাকাটা আসত ঐ সব কাকুদের কাছ থেকে। কিন্তু বল তো আত্মার মতো অমর নয় - কয়েকদিন লাথালাথির পর বলের চামড়ার সেলাই যেত ছিঁড়ে। তখন চলত একমাত্র মুচির কাছে গিয়ে অনুরোধ করে সেলাই করানো । 

করানো। কিন্তু সময় যেতে চামড়ার এমন হাল হত বলার নয় ৷ তার উপরে সেলাই কেটে যাওয়া ৷ সেলাই কাটা মানে মুচিকে দিয়ে সেলাই করানো ৷ অনেকসময় শুধু সেলাই করে হত না তাপ্পি মেরে হত ৷ বলের গায়ে এত সার্জারী প্লাস্টিক সার্জারী হত যে বলের সেফটা প্লাটে যেত ৷ এখানে ট্যাম ওখানে দাবা –সে এক বিচিএ বস্তু ৷

বল খেলার আসল কাজ হল খেলার আগে বিকেলে যতোটা সময় ফেলতাম তার চাইতে বল রেডি করতেই সময় যেত বেশী ৷ এখন যাদের  বছর পঞ্চাশের কাছে বয়স, তাদের কাছেও এটা অজানা বোধ হয়৷ বল রেডি করাটা ছিল একটা রীতি মতো আর্ট ৷ সবার কম্ম নয়- আমি ছোট বলে শুধু দেখা সুযোগই পেতাম – হাত লাগাত বড়দের মধ্যে দু-একজনের বিশেষঞ্জের হাতে ৷ রীতিমতো আর্ট ৷ তখনকার বল আজকাল বলের মতো ছিল না, থাকত একটা চুপসানো চামড়ার মতো বল, যার একধারটা থাকত চার ইঞ্চির মতো কাটা ৷ আর থাকত একটা ব্লাডার ৷ ব্যাপারটা অনেকটা সাইকেলের টায়ার আর টিউবের মতো ৷ চুপসানো ব্লাডারটা আগে চামড়ার বলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হত ৷ব্লাডারে লম্বা নলটা থাকত বেরিয়ে ৷ এইবার এই নলটার মুখে সাইকেলের পাম্প দিয়ে হাওয়া ভরে ব্লাডারটাকে ফোলানো হত ৷ কতটা হা্ওয়া ভরতে হবে তাও দেখত বিশেষঞ্জরা আঙুল দিয়ে টিপে দেখা হত বেশী হাওয়া ভরে টানটান হয়ে গেলে পায়ে ব্যথা লাগবে আর কম হাওয়া ভরলে বল গড়াতো না , হাওয়া ভরে গেলে পাম্পটা খুলে নিলে নলেরে মুখে থাকা ভাল্ব আপনা থেকেই হাওয়া বেরিয়ে যেতে দিত না ৷ হাওয়া ভরার পরে বাকী থাকত আসল কেরামতী ৷ চামড়ার বলের কাটা জায়গাটা বা বন্ধ করা- লম্বা চামড়ার ফিতে ঠিক জুতোর ফিতে পরানোর মতো করে পরাতে হত ৷ আর এজন্য লাগত লেসিং কল ৷ সে ভারি কিরামতীর কাজ ৷ সবাই পারত না ৷ মোট কথা খেলা শুরু করার আগেই – খেলার সময় পেরিয়ে যেত ৷ এমন হত লেস লাগানো লোক নেই বলে খেলাই বন্ধ থকল ৷

মাঝেমাঝে ফুটবল প্রতিযোগীতা হত পাড়ায় পাড়ায় ৷ নয় তো ছোট ছোট নাম কে –ওয়াস্তে ক্লাবে ৷ তখন বেশীরভাগ প্রতিযোগীতায় ভাগ নিতে গেলে মাপকাঠি হত উচ্চতা ৷ মানে কোনো প্রতিযোগীতা হত চার ফুটের নীচের খেলোয়ারদের ৷ কোনো প্রতিযোগীতা হত সারে চার ফুটের নীচের ৷ যাদের উচ্চতা এই মাপকাঠি পেরিয়ে যেত তাদের প্রতিযোগীতায় ভাগ নিতে দেওয়া হত না ৷ খেলার আগে প্রত্যেক খেলোয়ারদের উচ্চতা মাপা হত – একেবারে নিয়ম মাফিক্ যারা ভালো খেলোয়ার অথচ উচ্চতা একটু বেশি তাদের জন্য কারিকুরি করার বুদ্ধিও বের করা হয়েছিল ৷ দুটো বেল্ট প্যান্টের সঙ্গে ভালো মতো লাগিয়ে সে দুটো কাঁধের উপর থেকে নামি বেশ করে বাঁধা হত ৷ ফলে কাঁধ দুটো বেল্টের টানে নীচু হয়ে যায় ৷ উপরে পরা থাকত জার্সি ৷ এতে উচ্চতা একটু হলেও কমত ৷ খেলতে নামার আগে বেল্ট –আড়ালে গিয়ে খুলে ফেলা হত ৷ এ নিয়ে ঝামেলা বাঁধত ৷ আমি একটু লম্বাটে হওয়ায় আমাকে প্রায় বেল্ট বেঁধে ঘন্টার পর ঘন্টা খেলার আগে মাপ নেওয়ার জন্য বসে থাকতে হত ৷ বেল্টের চাপে কাঁধ কোমর সব ব্যথা হয়ে থাকত ৷

প্রথমে পাওা না দিলেও পরে কিন্তু আমাকে নিয়মিত খেলায় নিত ৷ দু-একটা ম্যাচে গোল করে টিমকে জিতিয়ে ও দিয়েছি ৷ জার্সি পরার খুব ইচ্ছা হচ্ছে ৷ মাকে বললাম জার্সি চাই ৷ মা বেশি কথা বলা পছন্দ করে না ৷ একটু হাসল , খুব বড় প্লেয়ার হয়ে গেছি নাকি ? বলে চলে গেল ৷ জানি না মায়ের সাহায্য পাব কিনা ৷ দুপুরে বসে বসে দুটো রঙিন জামা লম্বালম্বি কেটে এই জামার ডান দিক অন্য জামার বাঁ দিক, সেলাই করে এনে  বলল, নে জার্সি ৷ সত্যি বেশ ভালোই হয়েছিল দুরঙা জার্সিটা ৷ 

জার্সি পরে খালি পায়ে খেলা ভালই চলতো ৷ এর মধ্যে একজন এক জোড়া বুট কিনে এনেছে ৷ বুটের তলায় লোহা- সবার পায়েই – অল্প বিস্তর চোট ৷ এল অ্যাঙ্কলেট (ANKLET)৷ ৩টা পরে  অনেকে খেলতে লাগল ৷ আমার খালি পা- গায়ে রঙিন জার্সি ৷ পায়ে যতোটা ব্যথা লাগে ,তার চাইতে বেশী লাগে মনে ৷ দাদাকে বললাম , আমার পায়ের জন্য কিছু চাই ৷ দাদা বলল বিকেলে দেব ৷

মায়ের প্রায় নতুন লাল পাড়ের সাদা শাড়ির একদিকে পাড় ছিঁড়ে এনে দাদা আমার পায়ে ভালো করে বেঁধে দিয়ে বলল, দেখ এই সব কেনা অ্যাঙ্কলেটের চাইতে কত ভালো ৷ সত্যি পায়ে বেশ আরাম ৷
মা কোনোদিন মারধর বা রাগারাগি করত না ৷ গম্ভীর হয়ে আমাদের দু ভাইকে ডাকল ৷ তারপর আমাদের সামনেই শাড়ির অন্যদিকের পাড়টা ফড়ফড় করে ছিঁড়ে দাদার হাতে দিয়ে দিল ৷ আমরা যা বোঝার বুঝলাম ৷

এরপর আর আমরা মায়ের শাড়ির পাড় কোনো দিন ছেঁড়ার কথা ভাবিনি ৷ মা নিজেই অবশ্য পুরানো শাড়ির পাড় কেটে আমাদের জন্য জমিয়ে রাখত ৷ আমার এমন মনে হয় মায়ের এধরনের ব্যবহারEXCELLENT PARENTING মধ্যে অবশ্যই পড়ে ৷

একদিন শুনলাম ভেটারেন দেয় সঙ্গে ইয়াথদের ফুটবল ম্যাচ ৷ ইয়োথ মানে না জানতাম কিন্তু ভেটারেন মানে তা জানতাম না ৷ দেখলাম বাবার  বয়সী লোকজনদের সঙ্গে আমাদের স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছেলেদের ম্যাচ ৷ আমার হল মহাবিপদ ৷ একদিকে স্কুলের দাদারা অন্যদিকে নিজের বাবা ৷ কোন দলকে সমর্থন বুঝতে না পেরে চুপ করে লাইনের ধারে বসে খেলা দেখতে লাগলাম ৷ বাবাকে দেখেছি ঘরে ধুতি পরতে আর অফিস যাওয়ার সময় সাদা –প্যান্ট ৷বাবা ধুতিটা একটু উচুঁ করে পরে মাঠে নেমেছে ৷ হাতে নস্যির কৌটো আর রুমাল ৷ মনে হচ্ছিল বাবা খেলতে নামেনি কোচ হিসাবে মাঠে নেমেছে ৷ নিজে মাঝ মাঠে দাঁড়িয়ে দু দলের খেলোয়ারদের পরামর্শ দিচ্ছে ৷ একটা কথা বলা হয়নি বাবা নাকি একসময় ফুটবলে প্রাইজ ট্রাইজ পেয়েছে ৷

এখন বাবার এসব কথা লিখতে যতোটা মজা লাগছে, তখন কিন্তু বাবার ব্যাপার স্যাপার দেখে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল ,লজ্জা লাগছিল ৷ বাবা তখন ও পর্যন্ত একটা বলেও পা লাগায় নি ৷ এরমধ্যে বেশ কয়েকটা হজম করেছে বাবার দল ৷ আমাদের স্কুলে একজন ছাএ ছিল , তার নাম ভবেশদা ৷ ভবেশদা হাট্টা গোট্টা চেহারা ৷ অনেক বার ফেল করে করে এখন ক্লাস এইট ৷ পা দুখানা দেখলে ভয় লাগে –মোটা , শক্ত  আবার প্রচন্ড জোর ৷ ভবেশদা বল নিয়ে দৌঁড়াচ্ছে ৷ কোনো কারিকুরি নেই সোজা গাঁয়ের জোরে সবাইকে ঠেলেঠুলে বল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ৷ বল ভবেশদার পায়ের সামনে শুধু গোলকিপার ৷ গোলকিপার কাকু – বাবার চাইতে বয়সে অনেক বড়৷ তখন রেলওয়ে বিভাগে খেলাধুলোর চাকরি দেওয়া হত ৷ ঐ কাকুও খেলার জন্যই চাকরি পেয়েছেন ৷ সত্যিকারের খেলোয়ারী মনোভাব ৷ ভবেশদা মোটা বাঁকা পা দিয়ে বল নিয়ে এগোচ্ছে ৷ আর হা হা করে হাসছে ৷বলটা একবার এপায়ে একবার ওপায়ে নিয়ে কায়দা দেখাচ্ছে ৷ আর বলের নড়চড়টা দেখে গোলকিপার নাচছে ৷ ভবেশদা এগোচ্ছে গোলকিপার একা বলের সঙ্গে সঙ্গে লাফাচ্ছে ৷ হঠাৎ বাবা চিৎকার করে বলল ,ননীদা বল ছেড়ে দিন ৷ হয়ে থাক গোল ৷ 

কিন্তু ভবেশদার ওরকম মুখে হাসি নিয়ে আগ্রাসন যেমন থামেনা, তেমনি গোল আটকানোর মরিয়া চেষ্টাও বন্ধ হয় না ৷ হঠাৎ কি হল কে জানে বাবা মাঝ মাঠ দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল ৷হাটু অবধি ধুতি আর হাতে লস্যির আর রুমাল ৷ বাবা দৌড়ে গিয়ে ভবেশদা পিছন থেকে ফাউল করল – যাকে আমরা লেংগি মারা বলি ৷ বাবার অবশ ছিল বলাটা ৷ বাবার পায়ে লেগে বলটা গোলের অনেকটা উপর থেকে বাইরে চলে গেল ৷ ভবেশদা আর বাবা দুজনেই মাঠে শুয়ে ৷ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভবেশদা উঠে চিৎকার করতে শুরু করল ফাউল ,ফাউল ৷ রেফারী বাঁশি বাজিয়ে ফাউল দিল ৷ কিন্তু বাবা? বাবাতো মাঠে পড়েই আছে ৷ আছে তো আছেই,বাবার পা ভেঙে গেছে ৷ শিন বোন পুরো দু-টুকরো ৷ ব্যাস ভগবতীর ঘাড়ে চড়ে বাড়ি ৷ ছয় সপ্তাহের জন্য্ প্লাস্টার ৷ কেন বাবা সারক্ষণ একটা বলও টাচ না করে হঠাৎ একটা গোল বাঁচাতে এমন ঝাপিয়ে পড়ল- এর উওরে বাবা বলল,গোল বাঁচাতে নয়,খাঁচা বাঁচাতে ৷ বাবার কথায়,গোলকীপার শরীর একদম হালকা,বুকের খাঁচা শার্টের উপর থেকেই দেখা যায় ৷ ভবেশ যেভাবে এগোচ্ছিল আর ইয়ারকি মারছিল,গোলকীপারের খেলোয়ারী মনোভাব ততো বেড়ে যাচ্ছিল,যদি ভবেশের মারা বল ওর বুকে লাগে তবে বল শুদ্ধ গোলকীপার উড়ে যেত ৷ তাই গোল নয়,খাঁচা বাঁচাতে অমন করতে হয়েছিল ৷

বামনহাট আমার চেনা জায়গা হয়ে গিয়েছিল ৷ স্কুল চলত ভালই ৷ যদিও রেজাল্ট তেমন ভালো হত না,খেলা চলত ৷ কিন্তু যে কোনো খেলাতাই বিশেষ পটু ছিলাম ৷ তবে হ্যাঁ,আমার জীবনের প্রথম দেওয়া গোলটার কথা আমার এখনো মনে আছে ৷ একটা দলের বিরুদ্ধে রেষারেষি ম্যাচ ৷ আমি সেন্টার ফরওয়ার্ড – এখন টোটাল ফুটবলের যুগে আর এই শব্দ ব্যবহার হয় না ,যাই হোক আমি একটা বল নিয়ে দৌঁড়ে গোলের করে পৌঁছে গেছি ৷ পিছন থেকে ওদের প্লেয়ার ছুটে আসছে ৷ আমি বল নিয়ে সোজা স্লিপ খেয়ে গোলে ঢুকে গেলাম ৷ আমাদের টিম জিতে গেল ৷ সবাই হাত তালি দিচ্ছে ৷ আমি উঠে দাড়ালাম ৷ পায়ের হাঁটুর দিকটা ব্যথা করছে ৷ তাকিয়ে দেখি চামড়া ফাঁক হয়ে নীচে হাড্ডি লম্বায় চার ইঞ্জির বেরিয়ে গেছে ৷ ব্যাস লাগালো গাঁদা পাতার রস ৷ যে দাগ এখনও আছে ৷ গাঁদা পাতার রস লাগানো পা নিয়ে বাড়ি আসা তারপর ব্যথা লুকিয়ে পড়তে বসা ৷ পায়ে যতই কষ্ট হোক,মনে বিশাল আনন্দ গোল করে জিতিয়েছি আমাদের দলকে ৷ তাও আবার যে সে টিম নয়- টিমের নাম ‘ধর যাই ত্যা ছাড়িছ না’৷ নামটা শুনলেই বুকে ধরফরানি শুরু হয়ে যায় ৷ মোটকা মোটকা মাঠে লাঙল চালানো পা ৷ ওদের নীতি হল বা ছাড়ো, পায়ে মারো ৷ মনের আনন্দে আর পা ব্যথার যুগল বন্দিতে যাতে ভালো করে ঘুমোতেও পারিনি ৷ থাক সে সব কথা ৷ 

মাকাল ফলের কথা মনে পড়ে গেল ৷ আজকালকার ছেলে মেয়েরা বোধ হয় মাকাল ফল দেখেনি বা নাম শোননি ৷ তাই একটু ছোটবেলা ঝাপসা স্মৃতি হাতড়ে মাকাল ফলের কথা লিখছি ৷ দাদা দিদির সঙ্গে প্রকৃতি ভ্রমণে বেরিয়ে দেখি লতানো গাছে সুন্দর লাল গোল গোল মাঠে ছেয়ে আসে ৷ দাদা দিদিদের ‘না যেত না’ কথাটা কানে আসার আগেই আমার মাথায় চলে এল একটা লাল বল , না ফল ৷ এতো সুন্দর যে কোনো ফল হতে পারে তা আমার তখনকার মাথায় আসছিল না ৷


Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.