>

কমলেন্দু চক্রবর্তী

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 4/10/2015 |




এটা বোঝার পর থেকে মায়ের শিক্ষার উপর আমার ভক্তি আরো বেড়ে গেল ৷ সব বাড়ির মতো আমাদের বাড়িতেও বিজয়া দশমীতে এ বাড়ি ও বাড়ি যাওয়ার রেওয়াজ ছিল ৷ ছোট চেনা জায়গায় এটা আরও বেশী করে হত ৷ বাবাকে একবার লোকজনরা বলে দিল,মাস্টারমশাই,সব বাড়িতে শুধু মিষ্টি খেতে খেতে একেবারে অরুচী ধরে যায়,আপনার বাড়ির বিজয়াতে একটু অন্য কিছু করুন ৷ সেবার থেকে আমাদের বাড়িতে বিজয়ার দিন লুচি আর মাংস হত ৷ এখন ভাবি মা কী করে এক হাতে একশো-দেড়শো জনের লুচি বানাতো ৷ আর মাংস অবশ্য একেবারে ছোট ছোট টুকরো করা হত কীমার মতো ৷দুপুরের মধ্যে মাংস রান্না হয়ে যেত ৷ লুচিও ভাজার আগের অবস্থায় রেডি থাকত৷ সেদিনও ছিল বিজয়া দশমী ৷ লোকজন অনেক আমাদের বাড়িতে ৷ আমরা মাঠে রোজকার মতো খেলায় মও ৷ হঠাৎ দিদি এসে বলল মাঠে যতো ছেলে-মেয়ে আছে সবাইকে মা ডাকছে ৷ কেমন জানো লাগল ব্যাপারটা ৷ এই সময় মায়ের ডাক ৷ বিশজন হয়নি প্রণাম,কোলাকুলি বাকি ৷ সবাই গেলাম দেখলাম উঠোনে দিয়ে কলাপাতা পাতা ৷ আমাদের বসতে বলা হল ৷ আমরা বসলাম ৷ বন্ধুরা সব উৎসাহ চেঁচামেচি করছে ৷ কিন্তু আমার একটা খারাপ চিন্তা হচ্ছিল ৷ কিছু গোলমাল লাগছিল ৷ মা নিজে সবাইকে একটা করে লুচি আর অনেকটা করে মাংস দিয়ে যাচ্ছে ৷ আমার সামনে অল্প মাংস দিয়ে বলল,খুব নীচু স্বরে বলল,এত লোভ,ছিঃ ৷ সেজদা বসে ছিল আমাদের থেকে একটু তফাতে ৷ মা ওর সামনে গিয়ে পুরো পাএটাই ওর সামনে রেখে বলল,খাও

সেজদা খেতে খেতেই বলল,অতটা খেতে পারব না,মা বলল,পারবে ৷ ঠিক পারবে খাও ৷ কোনো রকম খেয়ে উঠলাম ৷ বন্ধুরা খাচ্ছে ৷ আমি গিয়ে ধরলাম দিদিকে ব্যাপারটা জানার জন্য ৷ দিদিও সবটা জানে না ৷ তবে যে টুকরো স্বগোক্তি মায়ের মুখ থেকে বেরিয়েছে ;তাতে বোঝা গেছে যে আমাদের স্নানের ঘর আর রান্না ঘরের মাঝের দেওয়ালে ছোট্ট একটা জানলার মতো ছিল ৷ মা বাথরুমে বসে একটা খুট করে আওয়াজ পেয়ে ঐ জানলার ফুঁটো দিয়ে দেখে যে সেজদা উপুর হয়ে বসে মাংসের পাএ থেকে মাংস বের করে খাওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু নরম বলে পারছে না ৷ পাছে ব্যাপরটা বেশী জানাজানি হয়ে যায় বা খেতে গিয়ে বিষম খায় তাই চুপ করে ছিল অনেকক্ষণ ৷ সেজদা দু-চারটে মাংসের টুকরো খেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরে মা আমাদের ডেকে পাঠায় ৷ কারণ গেস্টদের এত মাংস দিতে পারবে না ৷ 

সেজদার অনেকগুণ ছিল ৷ কোনো ঝামেলায় থাকত না ৷ পড়াশোনা ছিল তার একমাএ ধ্যান-জ্ঞান ৷ পাড়ায় ওর কোনো বদনাম নেই ৷ বরং ভালো রেজাল্ট করার জন্য ওকে সবাই একটু সন্মানের চোখে দেখত ৷ কিন্তু ঐ এক গুণ চুরি করে যাওয়া ৷ এটা যে খাওয়ার জন্য যাওয়া নয়-নেশার জন্য যাওয়া ৷ তখন ফ্রীজ বলে কোনো বস্তু ছিল কিনা জানা নেই ৷ তবে মীটকেস বা মীটসেফ ছিল ৷আজকার দেখা কল্পনা ৷ মীটসেফ কাঠের তৈরী আলমারীর অর্ধেকের মতো উঁচু হত ৷ দুটো পাল্লা দেওয়া দরজা থাকত ৷ তালা দেওয়ার ও ব্যবস্থা থাকত ৷ যেটার বিশেষত্ব ছিল সেটা হচ্ছে কাঠের বদলে চারিধারে সরু তারের জাল থাকত ৷ এমনকি পাল্লাদুটোও কপার ফ্রেমে জাল লাগানো থাকত ৷ এতে খাবারটা যেমন হাওয়া পায়,টাটকা থাকে একই সঙ্গে সুরক্ষিত থাকে ৷ মায়ের একটু এটোর উপর বাছবিচার ছিল ৷ ফলে ওখানে ভাত-ডাল বা অন্য রান্নার কিছু থাকত না ৷ থাকত নাড়ুর বয়েম,আচারের শিশি ৷ হাতে ভাজা কুঁচো নিমকি, তালের বড়া এই সব ৷ সেজদা যে সেখানে কী করে চলত সেটা মায়ের কোনো ধারণাই ছিল না ৷ সামনের নেট সব ঠিক আছে-কিন্তু দেওয়াল ঘেষা পিছনের নেট অনেকদিন টেনে খুলে ফেলেছে সেজদা ৷ আর মাঝে মাঝেই নাড়ুটা,আচারটা সরিয়ে খাওয়া চালাত৷ 

একদিন মা আমাদের কিছু বন্ধুদের পরীক্ষার রেজাল্টে খুশি হয়ে মীটসেফ খুলে দেখে একটা নাড়ুর বয়েম প্রায় ফাঁকা আরেকটা মুখটা আলগা করা ৷ কিছু বোঝার আগেই মা বারান্দার মেঝেটা ঝাট দিয়ে জায়গাটা জল ন্যাকরা দিয়ে মুছল ৷ তারপর হাত ধুয়ে এসে বলল,আজ হাতে হাতে দেব না ৷ নাড়ুর হরির লুট হবে ৷ যেমন পারো কুড়িয়ে নাও,বলেই বয়েম দুটো মেঝেতে ফেলে দিল ৷ কাঁচা ভাঙা আর নাড়ুতে মেঝেতে ছএাকার আমরা খেলা ভেবে কাঁচ বেছে বেছে নাড়ু কুড়ানো খেলায় মাতলাম ৷ শুধু সেজদা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল ৷ চুরি করে কিছু একটা খেতেই হবে এবং অবশ্য চুরি করে ৷ আগেই লিখেছি সন্ধ্যা থেকে আটটা পর্যন্ত আমাদের পড়াশুনোর সময় ৷ তারপর মায়ের মহাভারত বা রামায়ণ শোনা ৷ মা শুধু পড়ত না,বুঝিয়েও দিত ৷ আমি ক্লাশ এইটের ভালো ছাএ হয়েও যা বুঝতে পারতাম না,মা সেটা সুন্দর করে বুঝিয়ে দিত ৷ এতে আমরা অবাক হতাম না ৷ কারণ আমার ধারণা ছিল সব মায়েরাই সব কিছু জানে ৷ 

মায়ের মহাভারত পড়া চলছে ৷ সেজদা আমাকে হাত দিয়ে খোঁচা মারছে ৷ অনেকক্ষণ খোঁচা মারার পর ওর সঙ্গে আসর ছেড়ে খাট থেকে নেমে পড়তে হত ৷ কারণ রাতে তো সেজদার সঙ্গেই আমার শুতে হবে ৷ আমরা দুজন রান্নাঘরে যেতাম ৷ ভাজা-টাজা ধরণের ছোট্ট খাবার তুলে নিয়ে সেজদা নিজে একটা খেত আর আমাকেও একটা দিত ৷ আমাকে খেতেই হত ৷ সেজদার আমাকে খাওয়ানোর উদ্দেশ্য ছিল আমার একটু ভালো স্বভাব বলে নাম ছিল ৷ কাজেই আমি খেয়েছি মানে ওর দোষ কম হবে ৷ শীতকালে আরো আমাদের বিশাল ইট আর মাটি দিয়ে বানানো উনোনের উপর উঠে বসতাম ৷ এতে শরীর গরমও হত আবার চুরি করে খাওয়াও যেত ৷ 

পরের দিকে মা ইচ্ছে করে কিছু খাবার বানিয়ে আলাদা করে পাএে রেখে দিত ৷ সেজদার চুরি করার জন্য ৷ এখন ভাবলে হাসি পায় ৷ এমন কি সেজদা যখন মাসির বাড়িতে কলেজে পড়ার জন্য গেল,তখন মা মাসিকে বলে দিয়েছিল একটু চুরি করে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে ৷ আর এতেই সেজদার চুরি করে খাওয়ার স্বভাবটা বন্ধ হয়ে গেল ৷ 

দোমহনীর এত ঘটনার পরেও টুকটাক আরো ঘটনা ঘটে ছিল ৷ যেমন নাটক করা ৷ কার মাথায় এল নাটক করতে হবে ৷ বাড়ির সামনের মাঠে মায়েদের শ্রীরামকৃষ্ঞ নাটক হবে ৷  কে কী সাজবে ৷ মেজদা বলল,রামকৃঞ্ষ কমল আর ভানু গিরিশ ঘোষ ৷ আমাদের মধ্যে যে আড়ি চলছে সেটা মেটানোর জন্যই মেজদা এটা বলেছিল ৷ কারণ মূলত এই দুজনকে নিয়ে নাটকটা ৷ কিন্তু ভানু বাদ সাধল ৷ এক,আমার সঙ্গে নাটক করবে না ৷ দুই,রামকৃঞ্ষ ও নিজে হবে ৷ পরে অবশ্য সব মিটমাট হয়ে গেল ৷ ভানু গিরিশ ঘোষই সাজল ৷ আমি গানের গ জানি না আমাকে দিয়ে গায়ানো হল-“ডুব ডুব রূপ সাগরে আমার মন ৷বড়রা সবাই কিন্তু নাটক দেখতে এসেছিল ৷ এরপর হল সুকুমার রায়েরলক্ষণের শক্তিশেলএখানেও মেজদা আমাকে রাম বানালো ৷ এর মানে এই নয় যে আমি রামের মতো দেখতে বা আমি ভালো অভিনয় করি ৷ এটা পরিষ্কার আমার প্রতি মেজদার দুর্বলতা ৷ এবার ঝামেলা শুরু করল সেজদা ৷ ঔ হনুমান সাজবে না ৷ নাটকে মহরা চলছে ৷ সেজদা বসে আছে ৷ কিন্তু রিহার্সাল দিচ্ছে না ৷ ও হনুমান সাজবে না ৷ হাসির নাটক হনুমানের অনেক বড়পাট ৷ কিন্তু হনুমান ও সাজবে না ৷ নাটকের দিন এসে গেল ৷ শেষ মুহুর্তেও সেজদা গো ধরে বসে আছে হনুমান কখনই না ৷ 

নাটক শুরু হয়ে গেল ঠিক দিনে ঠিক সময় ৷ মেজদা বলল,তোর সেজদা ঠিক আসবে, আর না আসলে আমিই করব ৷ হনুমান আমার সময় হয়ে গেল দেখি একটা ব্যডমিন্টনেও নেট গায়ে জড়িয়ে সেজদা স্টেজে ঢুকছে এবং সবাইকে মজা দিয়ে দাপটে পার্ট করছিল ৷ 

দোমহনীর শেষ বড় ঘটনাটা বলি ৷ বাড়ির সবাই জল্পেশ্বর মন্দির দেখতে যাবে ৷ কিন্তু বাড়ি পাহাড়ার তো একটা লোক চাই ৷ আমি রাজী হয়ে গেলাম বাড়ি পাহাড়ায় ৷ দিনের বেলায় আমি একা একা শুয়ে বসে বই পড়ে কাটিয়ে দিলাম ৷ কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকেই সমস্যা শুরু হল ৷ ভূত ৷ আমার বিশাল ভূতের ছিল ৷ প্রচন্ড প্রস্রাব পেয়েছে যেতেই হবে ৷ কিন্তু খাটের তলায় যদি ভূত থাকে ৷ নামলে যদি লম্বা হাত বাড়িয়ে আমার পা টা টেনে ধরে ? যদি খাটের তলার অন্ধকারে আমাকে নিয়ে গিয়ে গলা চেপে ধরে ? কিন্তু যেতে তো হবেই ৷ হিসাব করলাম ভূতের ভয় আর শরীরের চাপ-কোনটা বেশী কষ্টকর ৷ শেষে কিছু চিন্তা না করে এক লাফ দিয়ে খাটের থেকে একটু দূরে ল্যান্ড করলাম ৷ দৌড়ে গেলাম বাথরুমে ৷ বাথরুম করা আর শেষ হয় না ৷ যতো দেরী হচ্ছে ততবেশী মনে হচ্ছে ভূতেরা এগিয়ে আসছে ৷ পুরোতল পেটটা বোধহয় খালি হয়নি ৷ প্যান্টে একটু-আধটু-পড়ছে,আর অপেক্ষা নয় বলে দৌড় খাটে উঠতে গেলাম ৷ আমার ধারণা ভূত সব খাটের তলায়তেই থাকে ৷ তাই বেশ কিছুটা দূর থেকে লাফ মেরে খাটে উঠতে গেলাম ৷ কিন্তু দূরত্ব আর লাফের সমতা হল না ৷ হুমরি খেয়ে পড়লাম খাটের মোটা কাঠের উপর ৷ প্রচন্ড লাগল পায়ের উপরের দিকে ৷ কোনো রকম ঘষটে খাটে উঠলাম ৷ ব্যথা বেশ ভালোই লাগছে ৷ চুপ করে শুয়ে থাকলাম৷ কিছুক্ষণ পরে অবশ্য সবাই ফিরে এল ৷ মা জিজ্ঞেস করল,কিরে ভয় পেয়েছিস? আমি কোনো উওর দিলাম না ৷

ঘটনাটা এখানে শেষ নয়,শুরু বলা যায় ৷ আমাকে একা বাড়িতে রেখে যাওয়ার জন্য মায়ের মনটা খারাপ হয়েছিল ৷ তাই যাওয়ার আগে বলেছিল তোমার কি চাই ৷ আমি বলেছিলাম সিরাজদৌলা যাএা এলে আমাকে দেখাবে ৷ তারপর অনেকদিন হয়ে গেছে ৷ যাএা দেখার কথা আমি ভুলেই গেছি ৷ কাল থেকে ক্লাশ এইটের অ্যানুয়াল পরীক্ষা ৷ প্রথম দিনই বাংলা ৷ কাজেই একটু  পরীক্ষার চিন্তা আর একটু বই-পএ ঘাটাঘাটি করেই সময় যাচ্ছে ৷ হঠাৎ দুপুরে মা আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে বলল,যাও আজ সিরাজদৌলা যাএা হবে ৷ তুমি বলেছিলে ছোট ফণীর সিরাজ দেখবে ৷ এই নাও টিকিট ৷ 
-কিন্তু আমার তো কাল পরীক্ষা ৷
-দেখ,আমি কথা দিয়েছিলাম ৷ এখন টিকিট কেটে দিলাম ৷ এবার তোমার ব্যাপার ৷
-কিন্তু
-দেখ,যদি তোমার মনে হয় রাত জেগে রাএে যাএা দেখলে তোমার পরীক্ষা খারাপ হবে তুমি ঠিক করবে তুমি যাবে কিনা ৷ এনিয়ে আর কথা নয় ৷ 
 আমি তো মহা ঝামেলায় পড়লাম ৷ পুরস্কার এমনও হয় ৷ অনেক ভাবলাম ৷ দাদাদের জিজ্ঞেস করলাম ওরা বলল যেমন তোমার খুশি ৷ বাবা-মা বরাবর বলত সারাবছর ঠিক মতো পড়লে হয় না ৷ পরীক্ষার আগের দিন হালকা মনে থাকতে হয় ৷ সত্যি কথা পরবর্তী কালেও যতো পরীক্ষা দিয়েছি পরীক্ষার আগে একদমই পড়তাম না ৷ বিকেলে ঠিক করলাম যাএা দেখতেই যাব ৷ রাত দশটায় তখন যাএা শুরু হত ৷ শেষ হতে হতে প্রায় চারটা ৷

রাত জেগে শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল কিন্তু পরীক্ষা যেমন হওয়ার তেমনি হয়েছিল ৷ 
সেবার আমি আর সেজদা এতগুলো বই প্রাইজ পেয়েছিলাম যে মায়ের কোলে রাখার জায়গা হচ্ছিল না ৷ মাকে খুশি দেখে আমরাও খুব খুশি হয়েছিলাম ৷


[কমলেন্দু চক্রবর্তী]

Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.