>

ঐন্দ্রিলা মুখার্জী

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 1/10/2015 |



তৃতীয় পর্ব

চান্দ্রেয়ী মোবাইলটা অফ করে ঘরে আসে...ডিংগো খাটে শুয়ে আছে...হাতে ভিডিও গেম...ডিংগো কদিন মায়ের সাথে শুচ্ছে ... জানে বাবা আসলে ওর আর মায়ের কাছে শোওয়া হবে না.. চান্দ্রেয়ী ডিংগোর পাশে বসে বলে 'কি...ঘুম আসছে না?'

ডিংগো মাকে জড়িয়ে ধরে ...' মাম্মা জানো..এবার আমার বেস্ট ফ্রেন্ড পাল্টে গেছে....আগে মৈনাক ছিলো ...এখন বিনীত হয়েছে ...মৈনাকের সাথে একদিন খুব ফাইট হয়েছিল '
চান্দ্রেয়ী : সেকি তোরা ওখানে মারপিঠ করিস....ফাদার ড্যানিয়েল কিছু বলেন না...!!!.আচ্ছা তোর ওখানে আমাদের জন্যে মনখারাপ করে না....'!!!

ডিংগো: আগে করত...এখন আর করে না...জান ,আমি টেবিল টেনিস শিখছি,...এবার ম্যাথে হাইয়েস্ট স্কোর করেছি ....

চান্দ্রেয়ী ডিংগোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে' অনেক রাত হল ডিংগো....এবার শুয়ে পড়...কাল অনেক কাজ.... '

...ওরা দুজনে শুয়ে পড়ে....নাইট ল্যাম্পের নীল আলোয় গোটা ঘরটার যেন এক শান্ত সমাহিত রূপ....কিন্তু চান্দ্রেয়ীর মনে শান্তি কোথায় ....তার এতবছরের সিস্টেমেটিক লাইফে কোথা দিয়ে যেন ঢুকে পড়েছে ,সাঁঝ তার তো আগে কখনো মনে হয়নি ...রাজদ্বীপ তাকে অবহেলা করেছে...নিজেকে নিয়েই শুধু ব্যস্ত থেকেছে....তবে আজ কেন তার এমন মনে হচ্ছে....আজ কেন হঠাৎ সাঁঝ তার এত বেশি বন্ধু হয়ে উঠেছে ....কেন আজ সাঁঝের কথা মনে করতেই তার বেশি ভালো লাগে....আর কেনই বা সে সারাটা দিন সাঁঝের মধ্যেই ডুবে থাকে....কেন? কেন? কেন?....কি বলে এই ভাবনাটাকে? ...কে বলে দেবে এর সদুত্তর!!!
....
চান্দ্রেয়ী ভাবে, যদি সত্যিই সাঁঝ কোনদিন কলকাতায় আসে ...আর চান্দ্রেয়ীর সাথে দেখা করতে চায়?.... কি দেখা করবে?...বুকের ভেতরে যেন দামামা বাজতে থাকে ....একটা শিহরণ অনুভব করে...আচ্ছা এই যে দিনের পরদিন সাঁঝের সাথে গল্প করছে ....কেন করছে? শুধুই কি ভালো লাগা ? একটা নেশা....কিন্তু কেন ?...তার অনুভূতির সাথে আপোষ করতে হয় না বলে? ....তাহলে কি তার এতবছরের জীবনে সে কি শুধু আপোষ করে এসেছে?....ভালোবাসা বলে কিছু ছিল না?....তার যদি এই বয়সে এসে এরকম ওলোট পালোট হয়.....আর সাঁঝ তো একটা অল্পবয়সী ছেলে....তাহলে কি চান্দ্রেয়ী সাঁঝের ইমোশন নিয়ে নিজের অজান্তেই খেলছে????...উফফ একটা সজোরে ধাক্কা খেলো যেন চান্দ্রেয়ী !!!!....একটা দীর্ঘশ্বাস ...আর নিতে পারছে না ....কি সব ভাবছে..চোখটা বুজে ফেলে সে...ভাবে সম্পর্কের নাম দেওয়াটা কি এতটাই জরুরী ?...নাই বা রইল কোনো সম্পর্ক কিংবা পুরোটাই মানবিক সম্পর্ক ....মনের ভেতরটা উথালপাতাল করে উঠল....আর তার মন্থনে একঘড়া কান্না উপচে উঠল ...বিছানায় উঠে বসল চান্দ্রেয়ী....টেবিল ল্যাম্পটা জ্বাললো....সাইড টেবিল থেকে জল নিয়ে খেলো......ঘড়িতে কটা বাজে দেখল....নাঃ একটু ঘুমোনো দরকার কাল অনেক কাজ আছে...কিন্তু তার শান্তির ঘুমটা যে চুরি হয়ে গেছে... নাঃ ,সাঁঝকে এড়িয়ে চলতে হবে যত কষ্টই হোক....এতেই সবার ভালো এবার তার চোখের জল আর বাঁধ মানলো না...এই উপলব্ধি তার একান্তই নিজের ...এই কথাগুলো সে সাঁঝকেও বলতে পারবে না....রাজদ্বীপকে তো নয়ই....

সকালে ঘুম থেকে উঠতে একটু বেলাই হল চান্দ্রেয়ীর ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এসে দেখল আত্রেয়ী আজ চা বানিয়ে রেডি....দুজনে একসাথে চা নিয়ে বসল....সারাদিনের প্ল্যান ডিসকাশন হল...আজ সারাদিন অনেক কাজ....ঝাড়াঝুড়ি,পর্দা পাল্টানো....শেল্ফ গোছানো, বাগানের আর ব্যালকনির গাছ গুলোকে একটু কেটে ছেঁটে ঠিক করা....চান্দ্রেয়ী আর আত্রেয়ী কাজ গুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিল..
সন্ধ্যেবেলা একবার বেরিয়ে সে ফ্লরিস্টকে অর্ডার করে আসে ....কেক আর কনফেকশনারীর অর্ডার দেয় মনজিনিসে.....নতুন টেবিল ম্যাট কিনে আনে...টেবিল সাজানোর ব্যাপারে সে আবার ভীষণ খুঁতখুঁতে... ...সারাদিন এইভাবে নিজেকে কাজে ভীষন ব্যস্ত রেখে সে সাঁঝকে ভুলে থাকতে চেষ্টা করে.............বাড়ি ফিরে আসার পর দেখল বিন্দু রান্না করতে আসেনি....অন্যদিন হলে চান্দ্রেয়ী ভীষন রেগে যেত....আজ কিন্তু সে ভাবল....ভালোই হয়েছে ডিংগো বাড়ি এসেছে কদিন....নিজে রেঁধে ওকে কিছু খাওয়ানোই হয়নি .....ছেলেটা আবার নর্থ ইন্ডিয়ান ফুড খেতে খুব ভালোবাসে ....তাই চান্দ্রেয়ী ডিনারে রাজমা , পালক পনীর আর পরোটা বানায়....

.....রাত্রে ত্রয়ী আসে, চান্দ্রেয়ীর ঘরে... দিদির সাথে একটু কথা বলতে ....দুইবোনে ছোটবেলার অনেক গল্প ডিংগোকে শোনায় ....খুব মজা হয়....এত হৈ চৈ এর মধ্যেও কিন্তু চান্দ্রেয়ী কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়....কেমন যেন তাল কেটে যায়....সবার মাঝে থেকেও সে এই নিখাদ আনন্দের স্বাদটা চেটেপুটে নিতে পারে না....কিন্তু সে বদ্ধ পরিকর ....এখন কিছু দিন সে কোনোভাবেই সাঁঝের সাথে যোগাযোগ করবে না....এই মোহটা কাটাতেই হবে....যে ভাবেই হোক

এইভাবে চান্দ্রেয়ী পরের দিনটাও কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করে ....সকাল থেকে ঘর সাজায়....ইকেবানা তৈরি করে....বেলায় ব্যাঙ্কের কাজে বেরোয়....

....সন্ধ্যেবেলা ডিংগোর কলকাতায় স্কুলে পড়াকালীন বেস্ট ফ্রেন্ড অনীশের বাড়িতে নিমন্ত্রণে নিয়ে যায় ডিংগোকে....বেশ লাগে চান্দ্রেয়ীর...হাসি, মজা ,গল্পে অনেকটা সময় কেটে যায়....

......ফেরার পথে চান্দ্রেয়ী ভাবে...একা থাকলেই তো যত সমস্যা ....মনটা ছটফট করে...রাতে বরং ত্রয়ীকে ডেকে নেবে...আজ রাতে একসাথে তিনজনে শোবে.... গতকালের মত গল্প করে কাটিয়ে দেবে....আর আগামী কাল তো শনিবার....সকালে তো তার অনেক কাজ....রবিবারের রান্নার জোগাড় ....চিকেন ম্যারিনেশন....কাজুর পেস্ট বানানো....পুদিনার চাটনি....হাঙ্গ কার্ড প্রসেস...আরও কত কি..!!! আর রাতের ফ্লাইটে তো রাজদ্বীপ এসেই যাবে.....এবার সে সব ভাবনা তাকেই দিয়ে দেবে.....আর না অনেক হয়েছে ....আর সে নিজেকে হারিয়ে যেতে দেবেনা....রাজদ্বীপকে নতুন করে আঁকড়ে ধরবে....নতুন ভাবে ভালোবাসায় রাজদ্বীপের সব অভিমান ভাঙিয়ে দেবে....মনের সবটুকু জুড়ে থাকবে তার জীবনের সামতলিক ক্ষেত্রটা....আর সে নিজের আইডেন্টিটি বাইরে খুঁজতে যাবে না ....ডিংগোর মাম্মা...মিসেস রাজদ্বীপ এর মাঝেই সে নিরাপদ ...এর মাঝেই সে আবদ্ধ থাকবে.....বাড়ির গেটের কাছে গাড়ী এসে থেমে যায়....

(ক্রমশ)


[ঐন্দ্রিলা]

Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.