>

কথা কবিতা

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 1/10/2015 |



অষ্টম পর্ব

একাত্তরে পাক বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে ২৬ মার্চ যুক্ত্ররাষ্ট্রের বিদেশ মন্ত্রনালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন,আমরা উদ্বেগের সাথে ঘটনা প্রবাহের প্রতি লক্ষ্য রাখছি। চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ইয়াহিয়া খানের নিকট প্রেরিত এক তারবার্তায় ভারতীয় আগ্রাসনের মুখে পাকিস্তানকে দৃঢ় সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন। সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের আভ্যন্তরীন সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান চেয়ে ইয়াহিয়ার কাছে চিঠি লিখে বলেন, মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের বন্দী করায় সোভিয়েত ইউনিয়ন উদ্বেগবোধ করছে। এইসব নেতারা সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের বিপুল সমর্থনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি যে, উদ্ভুত জটিল সমস্যায় বল প্রয়োগ না করে তার রাজনৈতিক সমাধান করা দরকার।
      
 বিশ্বের এই প্রধান তিনটি দেশের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে বৃহৎ ভারতের সাথে তাদের স্বার্থকেন্দ্রিক সম্পর্ক আর বাংলাদেশের রাজনীতি আওয়ামী লীগের দলীয় বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে। আওয়ামী লীগ ডানপন্থী দল হিসেবে পরিচিত হলেও তাতে সময়ের প্রেক্ষাপটে একাধিক আদর্শের সংমিশ্রণ ঘটে।অবিভক্ত ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের পূর্ব বঙ্গীয় শাখার কোন্দল থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়।
    
পূর্ববাংলা মুসলিম লীগের দুটি গ্রুপ ছিল। হাশিম-সোহরোওয়ার্দী গ্রুপ এবং নাজিমদ্দিন-আকরাম খাঁ গ্রুপ। সোহরোওয়ার্দী গ্রুপ ছিল উদারপন্থী আর নাজিমউদ্দিনের গ্রুপ রক্ষণশীল। এর পাশাপাশি কাইউমপন্থী নামে আরও একটি মুসলিম লীগের সৃষ্টি হয়েছিল। নাজিমউদ্দিন গ্রুপ শাসকদের আনুগত্যে সুবিধাবাদী রূপ ধারণ করলে মুসলিম লীগের বিদ্রোহী সদস্যরা ১৯৪৯ সনে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করে। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এই দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। আতাউর রহমান খান, আব্দুস সালাম খান, সাখাওয়াত হোসেন, আলী আহম্মদ এবং আমজাদ আলী খান সহ-সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবর রহমান মোশতাক আহমদ যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।বাংলা বিভক্তির প্রশ্নে নাজিমউদ্দিন গ্রুপ জয়ী হলে হাশিম আর সোহরোওয়ার্দী ১৪ আগস্টের পরও ভারতে থেকে যান। পরবর্তী সময়ে সোহরোওয়ার্দী করাচিতে যেয়ে বসবাস করেন এবং ব্যবসার পাশাপাশি জিন্নাহ আওয়ামী লীগ নামে একটি দল সংগঠিত করেন। পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী মুসলীম লীগ গঠিত হলে সোহরোওয়ার্দী জিন্নাহ আওয়ামী লীগকে এর সাথে সংযুক্ত করে পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন এবং দলটিকে জাতীয়রূপ দিয়ে তিনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে পার্টির কাউন্সিল মিটিংএ মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নামকরণ করা হয়। তখন থেকে এই দলটি দল,মত ,বর্ণ নির্বিশেষে আপামর জনসাধারণের একটি গণসংগঠনে পরিণত হয়। সোহরোওয়ার্দীর মার্কিনঘেষা পররাষ্ট্রনীতির সাথে দ্বিমত পোষণ করে চীনপন্থী ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে ন্যাপ গঠন করলেও এবং আতাউর রহমান খান পরবর্তী সময়ে এন ডি এফ এর নেতৃতে দিলেও দেশের বৃহত্তর আন্দোলনের স্বার্থে তারা কখনো কখনো শেখ মুজিবকে সমর্থন করেছেন

১৯৫০সালে রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিতে সাতজন কম্যুনিস্ট বন্দী মা্রা গেলে পূর্ববাংলার কম্যুনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য তৎপরতা  বন্ধ হয়ে যায়। এসময় পার্টির অনেক হিন্দু কর্মী ভারতে চলে যান, অনেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে জায়গা করে নিয়ে দলের আদর্শ বাস্তবায়িত করার পরিকল্পনা করেন। তালুকদার মনিরুজ্জামানের মতে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ৩৭ জন সদস্যের মধ্যে জন ছিলেন কম্যুনিস্ট। বাংলাদেশে চীনপন্থীর সমর্থক যেমন বেশি,তেমনি আবার এরা উপদলেও বিভক্ত বেশি। উপদলের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন অতিবিপ্লবী।এ ছাড়া শেখ মুজিব ১৯৫২ সালে চীন সফর করেন। সে সময় চৈনিকদের দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার দেখে দেশপ্রেমিক শেখ মুজিবুর রহমান অভিভূত হন, এবং দেশে ফিরে এসে তাদের ভুয়সী প্রশংসা করেন। আবার ষাট দশকে শেখ মুজিব চীনপন্থী নয় এমন কম্যুনিস্টদের সাথেও মতবিনিময় করেন।         
   
অন্যদিকে দফা দাবিকে ছাত্র যুবসমাজ দলমত নির্বিশেষে গণআন্দোলনে রূপ দিলে শেখ মুজিব এদের তারুণ্য দেখে উদ্বুদ্ধু হন। পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য ছাত্র যুব সমাজের ১১ দফা দাবিকেও শেখ মুজিব দফার সাথে সমান গুরুত্ব প্রদান করেন, এবং পরবর্তী সময়ে তাদের প্রাধান্য দিতে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রাধান্য দলের কেন্দ্রীয় সদস্যদেরকেও ছাপিয়ে উঠে। কিন্ত তখন দেশের সার্বিক অবস্থা, শেখ মুজিবের প্রখর ব্যক্তিত্ব আর একক কমান্ডের কারণে এই স্পর্শকাতর বিষয় পুরোটাই অস্ফুট থেকে যায়। আগরতলা মামলাকে কেন্দ্র করে শেখ মুজিবের প্রতি মানুষের অকুন্ঠ সমর্থন তাকে এতটাই কৃতজ্ঞ করে তোলে যে, তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে তার দলের মূলমন্ত্রে সমাজতন্ত্র বিষয়টি যুক্ত করেন।শেখ মুজিবের সমাজতন্ত্র কোন থিওরি নয়, এটা তার মানুষের প্রতি অকৃত্রিম কল্যাণবোধ থেকে উৎসারিত শব্দ। তেমনি শাসক আর শোষণের বিরুদ্ধে যে তিনি কথা বলেছেন তা- শুধুই জনকল্যাণকর চিন্তা থেকেই,কোন বিশেষ থিওরি থেকে নয়। শেখ মুজিব পেশাদার মার্কসবাদী বা শ্রেণীবিপ্লবী ছিলেন না। অকুতোভয় নির্ভীক দেশপ্রেমিক মানবতাবাদী নেতা হিসেবে পাকিস্তানীদের হৃদয়হীন শোষণের চিত্র জনগণের কাছে ফুটিয়ে তোলার জন্য বাস্তবতার নিরিখেই প্রতিবাদী শব্দ হিসেবে সব শব্দ ব্যবহার করেছেন।

কিন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আওয়ামী লীগের কিছু নেতার ডানপন্থী আদর্শ, মার্কিনঘেষা নীতি আর চীনাপন্থীদের প্রভাব যেমন সোভিয়েত রাশিয়াকে নিরুৎসাহিত করেছে,মুজিবের সমাজতন্ত্র আর শ্রেণী শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যেমন মার্কিনদের ভাবিয়ে তুলেছ, তেমনি তার ধর্মনিরপেক্ষতা মুসলিম দেশসমূহকেও দূরে ঠেলে দিয়েছ। রকম পারম্পরিক অভিঘাত আর বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অন্যান্য দেশের সমর্থন আদায় প্রকৃতপক্ষে বেশ জটিলই ছিল বলা চলে। তাই বলতে গেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপরেখা দান এবং এর বাস্তুবায়নে ভারতকে এক জটিল অবস্থা মোকাবেলা করতে হয়। ভারতের দুইদিকে পাকিস্তানের সীমান্ত, আর একদিকে চীন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানের ভূসামরিক ক্ষমতাকে খর্ব করতে পারলে ভারতের পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বিধানের স্বার্থে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর ভারতের স্বার্থ এমন পারষ্পরিকভাবে জড়িত ছিল বলেই ভারত দায় এড়াতে পারেনি।আর উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে গেলে রাশিয়ার সমর্থনের বিকল্প নেই। তাই সোভিয়েত নেতাদের বোঝানোর জন্য তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য মে মাসে ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টির ইলা মিত্র বাংলাদেশ কম্যুনিস্ট পার্টির মণি সিংকে মস্কো পাঠানো হয়।

জুলাইয়ের প্রথম দ্বিতীয় সপ্তাহে কিসিঞ্জার ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে পাকিস্তান কর্তৃক যুদ্ধঘোষণা এবং সেই সাথে চীনের যুদ্ধে অংশগ্রহণের সম্ভবনা সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়ার পর ইয়াহিয়া জুলাইয়ের ১৯ তারিখ থেকে আগস্টের মধ্যে তিনবার ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী মনোভাব ব্যক্ত করে। কিন্ত সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঁন্দ্রে গ্রোমিকোর আকস্মিক দিল্লী সফর এবং আগস্ট ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার ফলে ইয়াহিয়ার মনোভাব স্তিমিত হয়ে যায়।কিসিঞ্জার এই চুক্তিকে bombshell বলে অভিহিত করেন। প্রকৃতপ্রস্তাবে এই চুক্তি বহির্বিশ্বের কাছেও অভাবনীয় ছিল। ভারত নিজেও নিকটসম্ভাব্য চুক্তির ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলনা ২৫ বছর মেয়াদী এই মৈত্রী চুক্তির মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধাবস্থার মধ্যে আপাতত একটা ভারসাম্য চলে আসে। কারণ এই চুক্তির নবম ধারায় উল্লেখ করা হয়, দুই দেশের কারো বিরুদ্ধে যদি বহিঃআক্রমণের বিপদ দেখা দেয় তবে এই বিপদ অপসারণের জন্য উভয় দেশ অবিলম্বে পারস্পারিক আলোচনায় প্রবৃত্ত হবে এবং তাদের শান্তি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য যথোচিত ব্যবস্থা অবলম্বন করবে। ভারতের উপর চীনা আক্রমনে সোভিয়েত ইউনিয়ন নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকবে না বরং ক্রেমলিন চীনের সেই হ্রদের উপর আঘাত হানবে যেখানে চীনের পারমানবিক বোমা তৈরির প্রকল্প অবস্থিত। এতে চীনা নেতারা সংযত হন।এই চুক্তি ভারতের জন্য চরম স্বস্থিদায়ক হিসেবে কাজ করে। কারণ অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পাক-ভারত যুদ্ধ সংঘটিত হলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যদি পূর্বতন স্থিতাবস্থা বজায়ের উদ্দেশ্য যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব উত্থাপন করে তাহলে সেখানেও সোভিয়েতের ভূমিকা ভারতের পক্ষে নিশ্চিতভাবেই সহায়ক থাকবে।

মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের দিন দিল্লীতে এক উল্লসিত জনসমুদ্রের কাছে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিআন্দোলনের সাফল্যের জন্য এবং সত্তর লক্ষ শরণার্থীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জন্য ভারত সকল কিছু করতে প্রস্তুত। কিন্ত এই কথায় কর্ণপাত না করে ভারতের দক্ষিণপন্থী আর প্রবাসী বাংলাদেশ নেতৃত্বের দক্ষিণপন্থী একসাথে প্রচারণা চালাতে থাকে যে, এই চুক্তির মাধ্যমে মস্কো বাংলাদেশের প্রতি কূটনৈতিক স্বীকৃতি জ্ঞাপন থেকে ভারতকে নিবৃত্ত করেছে এবং এরপরে আর ভারত কখনোই বাংলাদেশের পক্ষে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে না। এই প্রচারণার মূল উৎস ছিল নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় পরিবেশিত একটি সংবাদ। সেখানে বলা হয়, ভারত-সোভিয়েত মৈত্রীচুক্তি বাংলাদেশকে সাহায্য প্রদান থেকে ভারতকে নিবৃত্ত করবে। ভারতে অবস্থানকারী বাংলাদেশ রাজনৈতিক মহলে যখন এই উদ্দেশ্যমূলক অসৎ প্রচার নিয়ে তোলপাড় চলছিল তখন কিন্ত অন্তরালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে সঠিক সংবাদটা দিয়েই নমনীয় হওয়ার কৌশল অবলম্বন করতে পরামর্শ দেন। ফলে ইয়াহিয়া খোল নলচে বদলে ফেলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আর ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য টিক্কাখানকে সরিয়ে বাঙালি গভর্নর হিসেবে মালেককে নিয়োগদান করেন। ছাড়া,ইয়াহিয়া নির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত নয় এমন দুষ্কৃতিকারীকে সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনসহ শরণার্থীদের জন্য অভ্যর্থনা শিবির,দেশদ্রোহের অপরাধে অভিযুক্ত শেখ মুজিবের বিচারকার্য পিছিয়ে দেয়া ইতাদি নমনীয়তা দেখাতে থাকে। মূলত এটা ছিল ইয়াহিয়ার কূটকৌশল।

এদিকে তাজউদ্দিন অন্যান্য দলের সমন্বয়ে জাতীয় মোর্চা গঠনের যে চিন্তাভাবনা করছিলেন,তা ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তিকে কেন্দ্র করে বাস্তুবায়নের জন্য তৎপর হয়ে উঠেন। যদিও কাজটা সহজ ছিলনা এই অর্থে যে, শেখ মণি, মোশতাক বা অন্যান্যদের সাথে তাজউদ্দিনের বিরোধ যদি নীতিগত হত তাহলে কোন কথা ছিল না,কিন্ত ব্যাপারটা তো তা নয়।এটা হল ক্ষমতা দখলের লড়াই। কাজেই তাজউদ্দিন যা- করুক না কেনো, তাতে তারা শুধু বিরোধিতা করার জন্যই বিরোধিতা করবে। এক্ষেত্রে তাজউদ্দিন সব চেয়ে ক্ষতিকর মনে করলেন শেখ মণিকে। যদিও শেখ মণির উদ্দেশ্যও ছিল দলের অন্যান্যদের মত প্রধানমন্ত্রীত্ব পদ দখল করা,কিন্ত অন্যদের সাথে তার পার্থক্য ছিল এই অর্থে যে,অন্যরা নিরস্ত্র হলেও তার দল সশস্ত্র।তাই তাজউদ্দিন আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে দিল্লীতে মুজিব বাহিনী নিয়ন্ত্রনের দাবি তোলেন। কিন্ত ব্যাপারে পি এন হাকসার এবং রমানাথ কাও দুজনেই নীরব থাকেন। ক্ষুব্ধ তাজউদ্দিন কলকাতায় ফিরে মুজিব বাহিনীকে বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রনে আনার পাশাপাশি এদের অন্তর্ঘাতী কার্যকলাপকে কীভাবে খর্ব করা যায় তা নিয়ে একান্ত সহচর মঈদুল হাসানের সাথে পরামর্শ করেন। কারণ অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, যদি অনতিবিলম্বে এদের নিয়ন্ত্রন করা না যায় তাহলে স্বাধীনতা যুদ্ধ আত্মঘাতী যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। তা ছাড়া জাতীয় মোর্চা গঠনের প্রশ্নে মুজিব বাহিনী আওয়ামী লীগের ভিতরে বিরুদ্ধ শক্তিকে যদি প্ররোচিত করে তাহলে জাতীয় মোর্চা গঠনই শুধু দুঃসাধ্য হবে তা নয়, এর ফলে মুক্তিযুদ্ধকে জাতীয় সংগ্রাম হিসেবে উপস্থিত করে সোভিয়েত সহযোগিতা অর্জনের প্রচেষ্টাও ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কর্নেল ওসমানী রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়,সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে এদের উচ্ছৃংখলতা রোধ করতে রিক্রুটিং এর ব্যাপারে তিনি যে অধিকারপত্র শেখ মণি তার সহকর্মীদের দিয়েছিলেন তা প্রত্যাহার করেন, এবং মুজিব বাহিনীকে শীঘ্রই তার কমান্ডে না আনা হলে পদত্যাগ করবেন বলে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনকে জানিয়ে দেন। এরপর যুবনেতারা মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের দেশের ভিতরে পাঠানোর চেষ্টা করলে তা বাধাপ্রদান করা হয়। ব্যাপারে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য ছিল যে,যেহেতু প্রবাসী সরকারের কমান্ডে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন না করলে কাউকে অস্ত্রসহ দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না।

ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর দিল্লী থেকে দুবার তাজউদ্দিনের কাছে জাতীয় মোর্চা বা মন্ত্রিসভার ফ্রন্ট গঠনের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। এব্যাপারে আভ্যন্তরীন কোন্দল সম্পর্কে আভাস দিয়ে ভারত সরকারের প্রতিনিধি হাকসারকে জানানো হয়, জাতীয় মোর্চার পক্ষে মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা যদিও বিদ্যমান, তবু ব্যাপারে নিশ্চিত করে বলার সময় এখনো আসে নি।প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন ভারত সরকারের কাছে এভাবেই প্রকৃত সত্যকে তুলে ধরেছেন জন্য যে, বিপদের সময় যাতে তারা প্রবাসী সরকারের উপর নির্ভর না করে নিজেরাই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। ইতোমধ্যে হাকসারের চাকুরি থেকে অবসরগ্রহণের সময় ঘনিয়ে এলে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রাক্তন মস্কোস্থ রাষ্ট্রদূত ডি পি ধরকে আস্থাভাজন প্রতিনিধি হিসেবে ভারতের বাংলাদেশ বিষয়ক নীতি কর্মতৎপতার সমন্বয় সাধনে নিয়োগ করেন।

বাংলাদেশের প্রবাসী নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশ আন্দোলনের রাজনৈতিক উপাদান সম্পর্কে প্রত্যক্ষ তথ্য সংগ্রহ করতে ডি পি ধর ২৯ আগস্ট কলকাতায় আসেন। এর আগে হাকসারের সাথে প্রবাসী সরকারের দীর্ঘ সময়ের সম্পর্ক গড়ে উঠাতে সার্বিক আলোচনার ক্ষেত্রে যে স্বাচ্ছন্দ্য পরিবেশ তৈরি হত, নব নিযুক্ত প্রতিনিধির সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে তা অনেকাংশে ব্যাহত হয়। তারপরেও তার সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে জানা যায়, ভারত সরকার যেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এবং সুনিদির্ষ্ট লক্ষ্যের দিকে সমগ্র ঘটনাধারাকে পরিচালিত করতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। ডি পি ধরের সফরের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের বামপন্থী দলগুলোকে এমনভাবে স্বাধীনতা মুল সংগ্রামের সাথে গ্রথিত করা যাতে এই সংগ্রাম জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের রূপলাভ করে এবং ভারত-সোভিয়েত মৈত্রীচুক্তিকে কেবলমাত্র বর্ম হিসেবে ব্যবহার না করে পাকিস্তানী দখল বিলুপ্তির অন্যতম সহায়ক উপাদান হিসেব ব্যবহার করা সম্ভব হয়। সেপ্টেম্বরের শেষে ইন্দিরা গান্ধীর মস্কো সফরের আগেই যাতে ফ্রন্ট গঠিত হয় এর জন্য তিনি যেভাবে বাংলাদেশ সরকারের অনিচ্ছুক অংশকে সম্মত করান তাতে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরাগ উৎপাদন করে। ফলে তিনি চলে যাবার সাথে সাথে এটাকে অনেক নেতৃবৃন্দ ভারত সরকারের চাপ বা হস্তক্ষেপ হিসেবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এই পরিস্থিতিতে মন্ত্রিসভা জাতীয় ঐক্যজোট গঠন করে ঠিকই,তবে এই জোট কোন কার্যকরী সংগঠনের রূপ লাভ না করে নিছক একটা উপদেষ্টা কমিটিতে পরিণত হয়।প্রবাসী সরকারের সামনে যে বিদ্যমান সমস্যা ,তা যদি শুধু ক্ষমতা কর্তৃত্বের প্রশ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো তাহলে তো কথাই ছিল না,কিন্ত বাস্তবে যখন উপদলীয় পরিস্থিতি গোপন বৈদেশিক হস্তক্ষেপের ফলে জটিল এবং বিস্ফোরণোন্মুখ, তখন এই অবস্থা থেকে উত্তরণের শেষ চেষ্টা হিসেবে তাজউদ্দিন মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তকে অমান্য না করেও প্রস্তাবিত উপদেষ্টা কমিটিকে অপেক্ষাকৃত সক্রিয় সংগঠনে রূপান্তরিত করার সুযোগ উন্মুক্ত রাখার জন্য এর প্রতিনিধির সংখ্যা বৃদ্ধি করে একটি সেক্রেটারিয়েট স্থাপনে সচেষ্ট হন। মন্ত্রিসভার গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার পক্ষে এই প্রস্তাব উত্থাপন করা অসুবিধা বিধায় তিনি সেপ্টেম্বর ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের কাছে অনুরোধ করে চিঠি লেখেন এবং দেখা করতে বলেন।কিন্ত মোজাফফর আহমদ ব্যস্ত থাকার দরুণ তার দেখা করার সময় হবে না বলে তাজউদ্দিনকে জানান।

পরদিন সেপ্টেম্বর সকাল দশটায় জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠনের জন্য পাঁচদলের নেতৃবৃন্দ কলকাতায় মিলিত হয়। মন্ত্রিসভার প্রতিনিধি ছাড়াও বাংলাদেশের কম্যুনিস্ট পার্টির মণি সিং,বাংলাদেশ কংগ্রেসের মনোরঞ্জন ধর এই বৈঠকে যোগদান করেন। ন্যাপের মোজাফফর আহমদ আগের দিন তাজউদ্দিনের অনুরোধে তার সাথে দেখা না করার সুযোগ হলেও তিনি বৈঠকের দিন উপস্থিত হন দেরাদুন থেকে আসেন মওলানা ভাসানী।

বামপন্থী দলের সব নেতৃবৃন্দ মন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাই এর বিরোধিতা করেন। তাজউদ্দিন পরলেন মহা বিভ্রাটে। কারণ স্বাধীনতার এক অভিন্ন লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধকে পরিচালনা করার জন্য বামপন্থীদের নাখোশ করা সম্ভব ছিল না, অন্যদিকে রাশিয়াসহ বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সমর্থন লাভের জন্য বামপন্থী দলগুলোর সহায়তার দরকার ছিল। এসব চিন্তা করে মোশতাকের বিরোধিতা সত্বেও মওলানা ভাসানীকে সভাপতি করে সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়।মন্ত্রিসভার দুজন সদস্য,তাজউদ্দিন খোন্দকার মোশতাক ছাড়াও আওয়ামী লীগ থেকে আরো দুইজন প্রতিনিধি এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, মনোরঞ্জন ধর, মণি সিং কে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব পেশ করেন খোন্দকার মোশতাক আহমদ। উত্থাপিত প্রস্তাব সমর্থন করেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ।

সর্বদলীয় কমিটি গঠনের আগে দেরাদুন থেকে মওলানা ভাসানী কলকাতায় আসার পর পরই (ভাসানী) ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান যাদু মিয়া কলকাতায় এসে টাওয়ার হোটেলে উঠেন।এখানে যাদু মিয়া দেবেন শিকদার,হায়দার আলী রণো, রাশেদ খান মেনন এবং অমল সেনের সাথে বৈঠক করেন। ভাসানীর সাথে যাদু মিয়া দেখা করতে চাইলেও ভাসানী তার দলের জেনারেল সেক্রেটারি যাদু মিয়ার সাথে দেখা করতে রাজী হননি। ভাসানী বলেন, যাদু মিয়া যাদু জানে। তেলেসমাতি যাদু। তাকে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য যাদু মিয়া কলকাতায় এসেছেন। তিনি তাকে ভারতেও আসতে দিতে চান নি। ওরা তাকে চীনে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।চীনা দুতাবাসের লোকজন ভাসানীর সাথে তিনবার দেখাও করেছে। তারা বলেছে, হয় পাকিস্তানকে সমর্থন করুন, নাহয় চুপ থাকুন। এরপর এক বামপন্থী নেতা তাকে বার্মায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল।ভাসানী বলেন, স্বাধীনতা ঘোষণা তো মুজিবের নয়, ওটা আমিই তো প্রথম কাগিমারীতে ঘোষণা দিয়েছি। তার ইচ্ছে ছিল লন্ডনে যেয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়া। এই উদ্দেশ্যেই তিনি যমুনার বুকে নৌকা ভাসিয়েছিলেন। মাঝখানে তিনি ভারতে এসে আটকে গেলেন। এর দুইদিন পর যাদু মিয়া সবার চোখে ধুলো দিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গিয়ে দখলদার বাহিনীর সাথে হাত মেলান। যাদুমিয়া পাকিস্তানী সরকারের মন্ত্রী হওয়ার খায়েস প্রকাশ করে প্রত্যাখ্যাত হন। তাই ভগ্নমনোরথে আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। মওলানা ভাসানী দেশোদ্রোহিতার অভিযোগ এনে যাদু মিয়াকে ন্যাপ থেকে বহিষ্কার করেন।

(ক্রমশ)

[কথা কবিতা]




Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.