>

সহেলী ভট্টাচার্য

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 6/15/2015 |




মাংস (সাত) :

______________
"মাম্মাম, তোমার নতুন ফোনে ফেসবুক আর হোয়াটস্-অ্যাপ্ দুটোই ডাউনলোড করে দিলাম, এবারে ক্লাসে বসেও পড়া ফেলে তোমার সাথে চ্যাট করতে পারবো, হি হি..." এই বলে হাসতে-হাসতে মধুমিতার গলা জড়িয়ে ধরে রিম্পি,রিম্পির চুলের মোটা বেণীটাতে হাল্কা একটা টান দিয়ে কপট-রাগে মধু বলে -"মেয়ের খুব সাহস হয়েছে দেখছি, মায়ের সাথে ইয়ার্কি? পড়া না করে অন্যদের সাথেও সারাক্ষণ ওই করিস তাহলে?"রিম্পিও হার মানবার পাত্রী নয়, মায়ের কোলের কাছে আরও একটু সরে এসে, চোখ বড়-বড় ক'রে বলে -"সবাই আর তুমি এক হলে মাম্মাম্? আফ্টার অল ইউ আর মাই বেস্টফ্রেন্ড..."
ফেসবুকে মাস-দু'য়েক হল মধুর প্রোফাইলটা বানিয়েছে রিম্পি, তার সব বন্ধুর মা নাকি বেশ মর্ডান অ্যান্ড স্মার্ট, অতএব তার মাই বা কারো থেকে কম হবে কেন? অকাট্য যুক্তি.. সকল সন্তানের চোখেই তার মাবাবা 'বেস্ট ইন দি ওয়ার্ল্ড', সুপারহিরোর বয়সটা পেরিয়ে এলেও, ফ্যান্টাসিটা কখনই শেষ হয় না...
প্রথমে কিছুদিন - "তোদের ওসব খুটুর-খুটুর আমার দ্বারা হবে না, উঁহু.. না না..." করলেও,অনেকখানি রিম্পির জেদে আর খানিকটা নতুন কিছু শেখার আগ্রহে, স্বাভাবিকভাবেই মধুও ধীরে-ধীরে মুখবইয়ের মায়াজালে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে...
বিশেষত সকালবেলার চরম ব্যস্ততার পর, সেই বিকেলে অফিস-কলেজ থেকে সব না ফেরা পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ের একাকীত্ব ক্রমশঃ যেন অসহ্য হয়ে উঠছিল, কিছুটা হলেও তার থেকে মুক্তি.. আর বন্ধু বলতে সবাই তো প্রায় চেনা, আত্মীয়-পরিবার স্বামী-কন্যা, এমনকি মেয়ের বন্ধুগুলো অবধি 'আন্টি-আন্টি' করে হাজির। নতুন কিছু মুখের মাঝে দু-একজন পুরানো স্কুল-কলেজের বন্ধুকেও খুঁজে পায় মধু, এত বছর পর সেও খুব একটা কম পাওয়া নয়...
সেটিংস-টা ঠিক করা নেই, মেসেজ-এ 'ফ্রেন্ডস্ ফ্রেন্ড' করা না থাকায়, সারাদিন 'হাই, হ্যালো' চলতেই থাকে। পি.সি. থেকে অনলাইন থাকার সময় এগুলো অত নজরে পড়তো না, আর পড়লেও ইনবক্স ওপেন না করে সরিয়ে রাখতো। কিন্তু এই 'মেসেঞ্জার' নাকি ছাই, সর্বক্ষণ খালি টিরিং-টিরিং, মেয়েটারও যত ওস্তাদি মায়ের ওপর, জ্বালাতন একেবারে...
আজ পোস্ত দিয়ে মাংস রাঁধবে, রিম্পির খুব প্রিয় ডিশ, গ্রেভিটা বিশেষ ক'রে ভীষণ পছন্দের, তার মায়ের মতো নাকি আর কেউ রাঁধতে পারে না, পাগলি একটা.. ভাবতে-ভাবতেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে মধুর। ম্যারিনেট করাই ছিল, কড়াইতে পোস্ত-মশালা দিয়ে কষতে-কষতে ঘাম মুছে মোবাইলটা হাতে নেয়, যথারীতি তিন-চারটে মেসেজ এসে পড়ে আছে



'আর ইউ অনলাইন?
হাই, কেমন আছো?
আমরা কি ভালো বন্ধু হতে পারি?'


যত 'নেই কাজ তো খই ভাজ'-এর দল, লেখাপড়া-কাজকর্ম কিছুই কি নেই এদের?
হঠাৎ চোখ পড়ে তিন নম্বর মেসেজটা তে.. সস্ত্রীক এক ভদ্রলোকের ছবি, কোলে ফুটফুটে একটি শিশু, ছবির পাশে লেখা

"আমার কোনো দিদি নেই, আপনাকে কি দিদি বলে সম্বোধন করতে পারি? অবশ্যই যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে..."
সবার মাঝে অন্যরকম লাগে, কোথায় যেন একটা আন্তরিকতার ছাপ, চোখের সামনে নিজের ভাইয়ের মুখ-খানা ভেসে ওঠে বারবার, আজ প্রায় বছর-দু'য়েক হল - বুবানটা বিদেশে বসে আছে, কবে যে ফিরবে.. বেশি কথা না বলে উত্তরে শুধু "হুম্" লেখে মধু...
এমনিতেই মধু একটু চুপচাপ্, তার ওপরে সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা মানুষের সাথে তো সহজে একদমই মিশতে পারে না। তবু নতুন পাতানো-ভাইয়ের সাথে কথা হয় মাঝে-মাঝে.. নাম - অয়ন সমাদ্দার, বেলেঘাটায় বাড়ি, তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সুখের সংসার...
রাত প্রায় সাড়ে-বারোটা, কর্তা অফিসের কাজে দিন-দশেকের জন্য বাইরে গেছেন, এতদিনের অনভ্যেসে তাই মনে হয় ঘুম আসছে না একা-একা। পরীক্ষা শেষ, রিম্পিও একটু টি.ভি. দেখছে আনন্দে, টেবিল থেকে মোবাইলটা হাতে নেয় মধু.. সকালে দু-তিনটে ভালো-লেখা নজরে পড়েছিল, তাড়াহুড়োতে পড়া হয়নি, এবারে সেগুলো দেখা যাক্ নিশ্চিন্তে...
"দিদি এত রাতে?" - মেসেজটা দেখেও কোনো উত্তর দেয় না মধু, মিনিট-খানেকের ভিতরেই আবার মেসেজ -
"কি হল, রিপ্লাই দিলে না?"
বিরক্তি লাগলেও ভদ্রতার খাতিরে "ব্যস্ত আছি" কথাটুকু লিখে দেয়..
সাথে-সাথে প্রশ্ন - "কার সাথে ব্যস্ত?"
মধু তো অবাক, এ কি ধরণের কথাবার্তা.. 'কার সাথে' মানে? নিরুত্তর থাকে...
কিন্তু তারপর যে ঘটনা ঘটে, তার জন্যে সত্যিই কেউ প্রস্তুত ছিল না, মধুকে হতভম্ব করে দিয়ে পরপর মেসেজ ঢুকতে থাকে -
"আজ আমি তোমাকে নাম ধরে ডাকতে পারি মধুমিতা?
বিশ্বাস কর, আজ আমার মনটা খুব খারাপ..."
"কি হল উত্তর দেবে না? ধরা দাও মধু, নিজেকে একটিবার সঁপে দাও আমার কাছে..."
"মধু, চুপ করে আছো কেন? তোমার কোলের ভিতর মুখ গুঁজে কাঁদতে দাও আমাকে, তোমার শরীরের গন্ধ পেতে দাও..."
মধুর মাথা ঘুরতে থাকে, কোনোরকমে ফোনটাকে সুইচ-অফ করে বিছানার উপর ছুঁড়ে ফেলে দেয়.. ছিঃ ছিঃ মানুষ এত নীচে নামতে পারে? সম্পর্কের নামগুলো কি এতটাই অর্থহীন? ঘেণ্ণায় গা গুলোতে থাকে...

রিম্পি এসবের কিছুই জানে না, পরীক্ষা শেষের আনন্দে সকালবেলা মায়ের সাথে গল্প করতে ব'সে অকারণে বকুনি খায় বারবার...মধু কিছুতেই নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারছে না, বিশ্বাস শব্দটাকেই সব থেকে বেশি অবিশ্বাসী মনে হচ্ছে...'আশ্চর্য মাম্মামের আজ হল কি? বাবাও বলছিল- মায়ের ফোন সুইচ-অফ', রিম্পির অস্বস্তি হতে থাকে...সাত-পাঁচ না ভেবেই মায়ের মোবাইলটা অন করে, নেট-অন করাই ছিল, সুইচ-অন হতেই বাকি মেসেজগুলো ঢুকতে থাকে, সবকিছু ছবির মতো পরিষ্কার হয়ে যায়...মায়ের জন্য খুব কষ্ট হয় রিম্পির, সত্যিই এই ফেক-দুনিয়া সম্বন্ধে মাকে তার সাবধান করে, জানিয়ে রাখা উচিত ছিল। কিন্তু... নিজের ভুল শুধরে নেবে রিম্পি, তার মায়ের সাথে-সাথে চেনা-অচেনা আরও অনেক মেয়ের প্রতি-মুহূর্তে অপমানের বদলা নেবে...
বেলা প্রায় দেড়টা, স্নান-খাওয়া সেরে ঘরে আসে মধু, মোবাইলটা বিছানার পাশে টেবিলে রাখা, খানিক ইতস্তত করে হাতে তুলে নেয়.. মিসড্-কল-লিস্ট হোয়াটস্-অ্যাপ চেক করে ফেসবুকে আসে, মনে-মনে ঠিক করে -ইনবক্স ওপেনই করবে না।
কিন্তু আশ্চর্য মধু তো কোনো স্ট্যাটাস পোস্ট করেনি, তাহলে "____ অ্যান্ড টুয়েলভ্ আদার ফ্রেন্ডস্ কমেন্টেড অন ইওর স্ট্যাটাস" বলছে কেন নোটিফিকেশনে?
কিছু বুঝতে না পেরে নোটিফিকেশন-ওপেন করে, অয়ন সমাদ্দারের নাম উল্লেখ করে মধুর জবানিতেই ছোটোখাটো একটি স্ট্যাটাস-টাইফূন, আর সেখানে চেনা-অচেনা বহু মানুষের অয়নের মতো (অ)মানুষকে ধিক্কার জানিয়ে, মধুকে আন্তরিক সমর্থন ও তীব্র সহমত পোষণ...
ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ ক'রে বসে থাকে মধু, চোখ ভর্তি জল, মেয়ে তার বড় হয়ে গেছে.. শুধু নিজের নয়, মেয়ে হয়ে মায়ের সম্মানও রক্ষা করেছে।
যে জবাব মধু দিতে পারেনি, লজ্জায়-ঘেণ্ণায় বিনা-অপরাধেই নিজেকে অপরাধী ভেবে লুকিয়ে ফেলেছিল, তার সঠিক প্রত্যুত্তর খুঁজে বের করেছে রিম্পি, তার রাজকন্যা...
দরজার বাইরে আর এক জোড়া চোখও তখন ভেজা-ভেজা, বেস্টফ্রেন্ডের গলা জড়িয়ে আদরের অপেক্ষায়...
[সহেলী ভট্টাচার্য]


Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.