>

অরুণ চট্টোপাধ্যায়.

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 7/10/2014 |







কল্প-বিজ্ঞানের গল্প
একান্ত ব্যক্তিগত -২




আমাদের ডাঃ গৌতম বৃদ্ধের কথা কি মনে আছে আপনাদের ? যিনি একটা এ-সি জ্যাকেট আবিষ্কার করে নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন আর সারা জগতকে তাক লাগিয়ে ছিলেন ? যিনি দারজিলিং-এর বোধিবৃক্ষ অর্থাৎ চা গাছের নীচে দীর্ঘ ছমাস ধরে তপস্যা অর্থাৎ গবেষণা করেছিলেন আর নিউটনের মত বিজ্ঞানী হয়েছিলেন ।

সুখের কথা এখন কিছুকাল হল তিনি রিটায়ার করেছেন । সাধারণ অবসরপ্রাপ্তদের মত রোজ সন্ধ্যায় রেল প্ল্যাটফর্মগুলির বেঞ্চিগুলি বিনা টিকিটের দখলদারি না করে রাস্তায় তিনি পায়চারি করেন আর ভাবেন । যেমন নিউটন, আইনস্টাইন এঁরা সব ভাবতেন আর কি ।

একদিন রেলগেটে বিরাট জ্যাম । নট নড়ন চড়ন নট কিচ্ছু । গৌতম বাবু থেমে পড়লেন । যেমন করে থেমে পড়ে নিউটন ভাবতেন, আরে অ্যাপেলটা নীচে পড়ল কেন ? ঠিক তেমন করে তিনি ভাবতে লাগলেন গাড়িগুলির দুর্গতির কথা । আহা রে বেচারারা । ইঞ্জিন আছে, ইঞ্জিনে তেলও আছে তবু এরা গতিহীন ? কি পরাধীন একবার ভেবে দেখেছ ? সামান্য একটা গেটম্যানের ক্ষমতা দেখেছ রেল লাইনের দুপাশে এত গাড়িকে আটকে রেখেছে ? ফায়ার ব্রিগেড কি এ্যাম্বুলেন্স টুঁ শব্দটি নেই কারোর ?

হঠাৎ প্রসেনজিতের একটা সিনেমা মনে পড়ে গেল । ভিলেনকে ধরতে যাবার সময় গেট পড়ে গেল । কি হবে ? সে এক্সিলারেটরের কান এইসা মোচড়াল যে গাড়ীটা উড়ে পেরিয়ে গেল রেল লাইন । ট্রেন চলে যাবার পরে আরও পাঁচ মিনিট গেট বন্ধ ছিল । কারণ গেটম্যান অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল । কিন্তু সে তো সিনেমার কারিকুরি । ক্যামেরা আর এডিটিং- এর কারচুপি । সত্যিকারের নয় ।

২০১৪ সালের নিউটন মানে ডঃ গৌতম বৃদ্ধ এরপর ভাবতে থাকেন আর ভাবতে থাকেন । সারা রাস্তাটা ভাবতে ভাবতেই হাঁটলেন আবার বাড়িতে গিয়েও ভাবতে থাকেন । ভাবেন প্রসেঞ্জিত সিনেমায় যা পারে বিজ্ঞান তা পারবে না কেন ? বিজ্ঞানের বয়স তো প্রসেনজিতের থেকে বেশী নাকি ?

কেস নং ২ - এটা সিনেমার দৃশ্য নয় । গৌতম বাবু কোন্নগরের ঘাট পেরিয়ে যাবেন সোদপুরে এক আত্মীয়র বাড়িতে । ঘাটে এসে দেখলেন সেইমাত্র নৌকো ছাড়বার উপক্রম করছে । বয়সে যতই সিনিয়ার সিটিজেন হন না কেন, মনে তো একজন তরতাজা যুবক । মাঝে মাঝে তিনি ভাবেন আচ্ছা নিউটন কি কখনও নিজের বয়েস নিয়ে ভাবতেন ? কিংবা বিজ্ঞানীদের কি রিটায়ারমেন্ট হয় ? হয় না – তার মন বলে উঠল । মন বলল, উকিল, ডাক্তার, বিজ্ঞানী, লেখক, রাজনীতিক, হেড অফ দ্যা ফ্যামিলি আর হাউস ওয়াইফদের কখনও রিটায়ারমেন্ট হয় না । এরা জন্মান কিন্তু মরেন না । দেহে মরলেও মানুষের মনে বেঁচে থাকেন । যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়, ব্যারিস্টার দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, বিজ্ঞানী নিউটন আর গৌতম বাবুর স্ত্রী যিনি পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন আর মারা যাবার আগে পর্যন্ত তাঁর সেবা করে গেছেন । অন্য সকলের মত নিজের স্ত্রীকেও ভোলেন নি ডাঃ গৌতম ।

সামান্য দৌড়ে পেয়ে গেলেন নৌকোখানা । নৌকোয় সিনিয়র সিটিজেনদের কোনও কোটা না থাকলেও মাঝি বেচারির মনের মধ্যে আছে । তার কিছুটা অনুকম্পা সামান্য এগিয়ে যাওয়া নৌকোটাকে আবার পেছিয়ে এনে একটা হাত বাড়িয়ে দিল গোতম বাবুর দিকে ।

আর একটা সাইকেল আসছিল । পড়ি মরি করে আসছে সাইকেলটা ধরে ধরে ছুটতে ছুটতে । আর হাত নেড়ে নেড়ে মাঝির দিকে চেয়ে মিনতি করছে একটু দাঁড়াতে । কিন্তু ততক্ষনে নৌকো আর পাড়ের মধ্যে ব্যবধান বেশ খানিকটা । অতএব সে বেচারির কপালে শিকে ছিঁড়ল না ।

নৌকোয় বসে আবার ভাবছেন গৌতম বাবু মানে ডঃ গৌতম বৃদ্ধ । ঠিক নিউটনের মতই ভাবতে থাকলেন নৌকো ছাড়াও ঐ সাইকেলটাকে কিভাবে নদী পার করান যায় তার কথা ।

কোন্নগরে চা গাছ নেই, আপেল গাছ নেই আর বোধিবৃক্ষ তো দূরের কথা । আছে কতগুলো ক্যাক্টাস মানে কাঁটাগাছ । আর মরশুমি ফুলগাছ । গৌতম বাবুর বারান্দায় ফ্যান্সি টবগুলোয়। সেখানে ফ্যান্সি বেতের চেয়ারে বসে দিনের পর দিন তিনি গালে হাত দিয়ে ভেবেই চলেন আর ভেবেই চলেন ।

সময়ের সার পেয়ে সেই ভাবনার গাছে ফলল ফসল । তাঁর নবতম আবিষ্কার “একান্ত ব্যক্তিগত ২”। পার্থক্য হল আর্কিমিডিসের মত প্রায়-উলঙ্গ হয়ে “ইউরেকা ইউরেকা” বলে রাস্তা দিয়ে ছুটে চললেন না। তবে হাফ লুঙ্গি পরে ফ্যান্সি মার্কেটের ফ্যন্সি হাতপাখার বাতাস করতে করতে ছোটাছুটি করে চললেন নিজের বাগান ময় যেখানে আপেল গাছ তো দূরের কথা – আগাছা ভরা যে বাগানে টিয়াপাখি খাবার মত একটা পেয়ারা গাছ পর্যন্ত নেই । তেলাকুচো গাছ কয়েকটা আছে বটে তবে তারা তো আবার নিজের পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতেই শেখেনি লতিয়ে লতিয়ে হাঁটে ।

এবারে গবেষণায় লাগল মাত্র তিনমাস । চারিদিকে বার্তা গেল রটি যে ডাঃ গৌতম বৃদ্ধ এমন এক গাড়ী আবিষ্কার করেছেন যা জলে স্থলে অন্তরীক্ষে সমান ভাবে আর সমান দ্রুততায় চলে । এর কাছে ট্র্যাফিক জ্যাম বা ট্র্যাফিক সিগন্যালের বাধাও বাধা নয় । সিগন্যালের লাল চোখ দেখা মাত্রই এর চাকাগুলো সব মাথার ওপর উঠে পাখার মত বনবন করে ঘুরতে থাকে । সকলে সেই মিনি হেলিকপ্টার দেখে খুব মজা পায় ।

আবার নদী দেখলে এর কোনও ভয় নেই । চাকাগুলো মাটির সমান্তরাল হয়ে জলের ওপর একে ভাসিয়ে রাখে । আর একটি নতুন চাকা ঘুরে ঘুরে জল কাটতে থাকে । স্টিয়ারিং তখন ঠিক হালের কাজ করে । বর্ষার জল জমুক বা বন্যার – এ গাড়ির ডোন্ট কেয়ার ভাব ।

পেট্রোল, ডিজেল, সি-এন-জি বা এলকোহল কিছুই লাগে না এতে । আছে সোলার ব্যাটারি – চার্জ কমে গেলে “ভানুসিংহের পদাবলী “ গাও আর রিচারজ কর । পরিবেশ দূষণ নেই, জ্বালানী খরচা নেই, ট্র্যাফিকের চোখ রাঙ্গানী নেই এমন কি দরকার নেই এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলারের বরাভয়ও । এ শুধু চলে নিজের মর্জিতে ।

সবাই পেটেন্ট কেনার জন্যে হুড়োহুড়ি কাণ্ড । এরা সব ছোট দেশ । বড় দেশের আবার বড় ভাবনা । ওরা তো ডাঃ গৌতম বৃদ্ধকেই কিনতে চায় । এক দেশ বলল একে আমরা সেনাপ্রধান করব । আর একজন আর একটু এগিয়ে করতে চায় সেনা উপদেষ্টা । বাকিগুলো আবার আর একটু একটু করে এগোতেই থাকে ।

নাসা বলল, এ তো চাঁদ মঙ্গলে রকেটো বানাতে পারবে । সূর্য থেকে চার্জ নিলে আমাদের কত জ্বালানী সাশ্রয় হবে বল তো ?

এক গাদা ইমেল ফ্যাক্স এসব জড় হয়েছে ডাঃ গৌতম বৃদ্ধের কাছে । এরা সব আমন্ত্রণ পাঠিয়েছে। কিন্তু ডাঃ গৌতমের গোঁ আমি এ দেশ ছেড়ে নড়ব না । পেটেন্টের জন্যে এপ্লাই করেছি এসে যাবে নিশ্চয় ।

আশায় আশায় দিন গুনছেন আর ভাবছেন এই চিঠি এল বলে কথা । আবার ভাবছেন ভারতরত্নের কথা । ক্রিকেটের ব্যাট হাতে ধরেন নি বলে তিনি কম কি ? ভারতরত্ন হওয়া এবার কে আটকায়? আবার কখনও ভাবছেন আচ্ছা নোবেল কি দু দুবার পাওয়া যায় না ? কেনই বা পাওয়া যাবে না মাদাম কুরির কথা ভাব ।

খবর একটা এল । একটা নয় অনেকগুলো । খবরে খবরে কাগজ আর চ্যানেলগুলো উপচে উঠল।

প্রথম খবর হল অটো ওলারা ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি দিয়েছে । এরপর ট্যাক্সি, তারপর বাস, লরি, টেম্পো, হেলিকপ্টার এরোপ্লেন সব সব – পরিবহন সংস্থাগুলো ডাঃ গৌতমের এমন পথে বসিয়ে দেয়া পরিবহনের ভার বহন করতে নারাজ ।

প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন আর ব্যানারে ছেয়ে গেল । মিছিল আর মিছিল । স্লোগান উঠলঃ আমাদের ভাতে মারা চলবে না । ডাঃ গৌতম নিপাত যাক নিপাত যাক ।

ডাঃ গৌতমের নিরাপত্তা বিঘ্নিত । একজন সরকারকে পরামর্শ দিলঃ স্যার ডাঃ গৌতমের পক্ষে সেফ হল জেল কাস্টডি । ওখানে কেউ কিছু করতে পারবে না ।

সরকার ভদ্রলোক গালে হাত দিয়ে ভেবে বললেন, সে আর কদিন বল ? তারপর আর একটা কিছু আবিষ্কার করে বসলে ? শেষে জেলখানাকেই উড়িয়ে নিয়ে চাঁদ মঙ্গলে ফেললে ?

সেই থেকে ডাঃ গৌতম নিজ গৃহে অন্তরীন । তাঁর বাড়ীর দুশ মিটারের মধ্যে কোনও গাছ রাখা হয় নি । আপেল গাছ তো দূর অস্ত - আম জাম লিচু তো দূরের কথা একটা তেলাকুচো ফলের গাছ পর্যন্ত নয় । পাছে পকেটে টান পড়া কিছু আবিষ্কার করে ফেলেন – আর একটা “একান্ত ব্যক্তিগত” ? সেই জন্য আপাতত নিজের বাড়িতেই “একান্ত ব্যক্তিগত” হয়ে রয়েছেন । তবে ভাবনার কিন্তু শেষ হয় নি । নিউটন নয়, নিরন্তর নিজেকে গ্যালিলিও ভেবে চলেছেন ডাঃ গৌতম বৃদ্ধ ।

Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.