>

কমলেন্দু চক্রবর্তী

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 3/10/2015 |

চিরন্তনী

----- স্যার, আপনি কেন ওটাকে পুলিশ দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছেন না?
----- আপনি স্যার, কিছুতেই আমাদের প্রব্লেমটা বুঝতে চাইছেন না ৷
----- আরে তপন, উনি কি করে আমাদের প্রব্লেম বুঝবেন ৷ থাকতো যদি ওনার সুন্দর বাংলোর সাজানো বাগানটার সামনে সারাদিন পড়ে৷
          সুপারেন্টেডেন্ড সাহেব বুঝতে পারছেন, কিছু একটা করা দরকার ৷ কিন্তু কী করবেন? থানায় খবর দিলে হতো একটা সমাধান হবে ৷ হয়তো ধরে নিয়ে গিয়ে একটা ডেষ্টিটুড রুমে হোমে রেখে আসবে ৷ হয়তো ওটাই ওর বর্তমানে সঠিক ঠিকানা ৷ কিন্তু ওর এই ঠিকানা আজ কাদের জন্য ঠিক হল ৷ এই যে যারা যখন ওর সামনে দাঁড়িয়ে নালিশ জানাচ্ছে এত সব, এদের মধ্যে কারও কি একটুকুও হাত নেই এই পরিণতির পিছনে?
----- স্যার, আপনি চুপ করে থাকলে চলবে না ৷ অনেক সময় দিয়েছি আপনাকে ৷ এরপরে কিন্তু অঘটন ঘটলে তার দায় আপনার উপরেই চাপাবে ৷
----- আমাকে আর দুটো দিন সময় দিন আপনারা ৷ কথা দিচ্ছি একটা কিছু ব্যবস্থা এর মধ্যে করবই ৷
----- এবারে কিন্তু আপনার স্তোকবাক্যে আমরা ভুলব না ৷ আমরা সাধারণ কর্মচারী হলেও একটা মান সম্মান আছে ৷ আমাদের ছেলে মেয়ে নিয়ে সংসার করতে হয় ৷ কোয়ার্টারে ঢুকতে বেরুতে এমন দৃশ্য কার ভাল লাগে বলুন তো স্যার ৷ চোখ দুটো বন্ধ রেখেই ওটার সামনে দিয়ে পেরুতে হয় ৷
          সুধীর সুপারিন্টেডেন্টের খাস আর্দালি ৷ যদিও সমস্যাটা আর পাঁচজনের মত ওরও ৷ কিন্তু চাপা স্বভাবের জন্য ওকে কেউ মানুষের মধ্যে গণ্যই করে না ৷ প্রায় সময় চুপ করে থাকলেও যখন যেটা বলে একেবারে মোক্ষম ৷ সংক্ষিপ্ত কিন্তু ধারালো ৷
          নিতাই যে এতক্ষণ মতব্বরের মত বলেই চলছিল -- হঠাৎ করে সুধীরের দিকে চোখ ফিরিয়ে বলে কিরে সুধীর, তুই তো একদম গেটের কাছের ঘরে থাকিস ৷ তুই কেন কিছু বলছিস না ৷ নাকি কিছু বললে স্যারের প্যায়ার কমনে যাবে বলে ভাবছিস ৷ আরে বাবা, সত্যি কথা বলি তাতে অত ভয় পাবার কি আছে?
          সুধীর কিছু না বলে একটু শব্দ করে হাসে ৷
----- কী, হাসছিস যে বড়? কিছু ভুল বললাম না কি?
----- না নিতাইদা, তোমরা মাতব্বরেরা সব থাকতে আমাকে আবার এর মধ্যে টানছ কেন?
টানার কথা আসছে কোত্থেকে? ওটার জন্য সবচাইতে অসুবিধা তো তোরই হওয়ার কথা ৷ হয় না?
----- তাহলে কিছু বলছিস না কেন?
----- একটা কথা বলব নিতাইদা, রাগ করবে না তো?
----- বলেই দ্যাখ ৷
----- একটা সামান্য প্রাণী, অসহায় ৷ থাকুক না ৷
----- কী বললি? থাকুক ! অসহায় ! বার বার খুব দরদ দেখছি ৷
----- এ অবস্থায় কুকুর-বেড়ালকেও মানুষ সহ্য করে ৷ আর ওতো একটা জ্যান্ত মানুষ ৷ ওর তো -- ৷
সুধীর কথা শেষ করবার আগেই আবার খুক করে হাসে ৷ সুধীরের হাসিতে নিতাই রেগে ওঠে ৷ ধমক দিয়ে বলে, ---
----- আবার হাসছিস?
----- না, ঐ যে তখন বললে না, চোখ দুটো বন্ধ করে ওৱ পাশ দিয়ে যেতে হয়, কথাটা মনে পড়ে গেল তো --
----- কেন? তুই কী করিস? ওটার দিকে তাকিয়ে থাকিস?
নিতাইদা, আসলে আমার তো পাপের চোখ ৷ ঐ দিকেই চলে যায় সব সময় ৷
----- সুধীর আস্তে আস্তে কথাগুলো বলে ৷ সুধীরের কথাগুলো কেন জানি সমরের সমস্ত গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেয়, ধৈর্য হারিয়ে গলা ফাটিয়ে বলে ---
----- শালা, অফিসারের চামচা ৷ নিতাইদা, চলুন, সুপার সাহেবকে বলে দিন ওনার কথামত কিন্তু দুদিনে যেন আটচল্লিশ ঘন্টা হয় ৷ ফরটি এইট আওয়ারস ৷
----- হ্যাঁ আমাকে দুদিন সময় দিন আপনারা ৷
সুপার নিচু স্বরে বলেন ৷
          দল বেঁধে চলে ওরা চলে যায় ৷ কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে থাকেন ডাঃ দত্ত ৷ সত্যি কিছু একটা করা দরকার ৷ ওদের নালিশটার পিছনে যুক্তি আছে ৷ বাইশ-তেইশ বছর বয়সের সমস্ত উপচে পড়া উপকরণ নিয়ে খোলা আকাশের নিচে একেবারে উদোম খোলা শরীর নিয়ে শুয়ে-বসে থাকার দৃশ্যটা মোটেই অভিপ্রেত নয় ৷ বিশেষ করে স্টাফ কোয়ার্টারের একেবারে গেটের কাছে ৷ বেশিরভাগ কর্মচারীই ওখানে পরিবার নিয়ে থাকে ৷ কত ধমক ধামক খায়, কেউ কেউ পাথর-টাতরও যে ছুঁড়ে মারে না এমন নয় ৷ কিন্তু সাময়িক ভাবে হাসপাতাল গেটের বাইরে বড় রাস্তায় সরে গেলেও আবার ফিরে আসে ৷ একটা কথা হাসপাতালে সুপার ডাঃ দত্তের মাথায় ঢোকে না, এতো জায়গা থাকতেও ঐ স্টাফ কোয়ার্টারের গেটের কাছটাই কেন ওর এত পছন্দের জায়গা ৷ হাসপাতালের পুরনো কীচেন বিল্ডিংসের লম্বা বারান্দাটার যেখানে মাথার উপর পাকা ছাদ, শোয়া-বসার জন্য পাকা মেঝে তিন পাশে রোদ জল আটকানোর পাকা দেওয়াল থাকতো৷ ওর মত দু-চারজন ভিখিরি-টিখিরিদের তো থাকতে দেখেন ডাঃ দত্ত ৷ তবে ও কোন এ জায়গাটা ছেড়ে যাওয়ার কথা মনে হয় না ৷ সেটাই একটা রহস্য মনে হয় ডাঃ দত্তের ৷
          কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একটু নিজের মনে হেসে ফেলেন ডাঃ দত্ত ৷ পাগলের কাজকর্ম নিয়ে উনি কারণ খুঁজছেন ৷ যার পরনের পোশাক নিয়েই কোনো মাথা ব্যথা নেই, তার আবার থাকবার জায়গার বাছ বিচার ৷ তবে পাগল হোক আর যাই হোক ওর একটা ব্যবস্থা একবার না করলেই নয় ৷ নিতাই-এর দল যখন একবার ব্যাপারটা নিয়ে পড়েছে তখন সহজে ছাড়বে না ৷ আর কিছু ভাবতে পারেন না ডাঃ দত্ত ৷ ফাইল থেকে মুখ তুলে বলে, সুধীর, রীতা হালদার, বেড নম্বর তেরো, ওয়ার্ড নম্বর তিন ৷ ডেট অব অ্যাডমিশন ---
          ডাঃ দত্তের কথা শেষ হওয়ার আগেই সুধীর বলে ওঠে --- 'বুঝেছি স্যার, বি, এইচ, টি, এনে দিচ্ছি ৷
----- রীতা হালদার ৷ এজ টোয়েন্টি ওয়ান ৷ ফাদারস নেম লেট হরিধন হালদার ৷ অ্যাড্রেস …'
          ডাঃ দত্ত খুঁটিয়ে পড়তে থাকেন রীতার হাসপাতালের থাকবার সময়কার সমস্ত নথিপত্র ৷ ভর্তির কারণ জ্বর ৷ সাতদিনের রোগিনীকে ডিসচার্জ করা হয় ৷ কোনো অভিভাবক না আসায় হাসপাতালেই থেকে যায় ৷ পুলিশ ইনফরমেশন যায় বাড়িতে ৷ কিন্তু হাসপাতালে লেখা ঠিকানার কোনো হদিশ পায় না পুলিশ ৷ দিন পেরিয়ে মাস চলে যায় ৷ রীতা হালদারের অস্থায়ী ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায় ওয়ার্ড তিন, বেড নম্বর তেরো ৷ কয়েকমাস বাদে বোঝা যায় রীতা প্রেগন্যান্ট ৷ কিন্তু কে রীতার এত বড় সর্বনাশ করলো ৷ হাসপাতাল রেকর্ড দেখে তা বোঝা যায় না ৷ জানবার চেষ্টাও করা হয়নি বিশেষ ৷ আবার মাস গড়িয়ে চলে ৷ কিছু দিন বাদে হাসপাতালেই প্রসব সুন্দর ফুটফুটে শিশু৷ তিন দিনের মাথায় দেখা যায় নবজাতক মৃত ৷ মৃত্যুর কারণ কিছুই উল্লেখ নেই হাসপাতালের কাগজপত্রে ৷ কেবল লেখা আছে কারণ অজ্ঞাত ৷ এরপরেই লেখা পেশেন্ট ইজ অ্যাবসকন্ডেট ফ্রম হার বেড -- রোগিনী হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছে ৷ পুলিশ ইনফরমেশন ৷
          রিপোর্টে লেখা ছিল না আরো একটা কথা ৷ অত বড়সড় শরীর সম্বন্ধে রীতার নিজস্ব কোনো ধারনাই ছিল না ৷ নিতাই ধরের দশ পয়সার একটা লজেন্সের লোভেই বিনা দ্বিধায় চলে যেত মাঝ রাতে ওয়ার্ডের পাশের অন্ধকার বারান্দায় ৷ পেটে বাচ্চা আসবার ব্যাপারটা জানতে পারার পর থেকে আবার নাইট ডিউটি পড়লে নিতাই-এর শরীর  খারাপ হতে লাগল ৷ ডিউটির জন্য চাপ দেওয়ার হলে ক্যাজুয়াল লীভের দরখাস্ত পর্যন্ত করত মাঝে মাঝে ৷
          এরপর রীতা মা হল ৷ প্রাকৃতিক নিয়মেই দেখা দিল মাতৃত্বের নানান শারীরিক পরিবর্তন ৷ কিন্তু মনটা বোধহয় রয়ে গেল একই জায়গায় ৷ কীভাবে, কেন হঠাৎ করে একটা ফুটফুটে শিশু ওকে দেওয়া হল ৷ আবার তিনদিনের মাথায় কেনই নিথর দেহটা ওর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হল --- এসব ভাবনা ওর মস্তিষ্কে কোনো দাগই কাটতে পারল না ৷ হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সরা অমন বাজে মেয়েছেলের ব্যাপারটা মন থেকে খুব তাড়াতাড়ি মুছে ফেলল ৷
          কয়েকদিনের মধ্যেই রীতা এসে ঠাঁই নিল ওর এই বর্তমান ঠিকানায় ৷ স্টাফ কোয়ার্টারের গেটের কাছে খোলা আকাশের নীচে ৷ হয়ে গেল একটা রাস্তার পাগলী ৷ শেষ ঢাকাঢাকির বালাইটাও ক্রমে শরীর থেকে একেবারে খসে পড়ে গেল ৷ এখন নিতাই ওকে লজেন্স দেয় না ৷ ওর শরীরটাকে এখন পছন্দ করে কেবল মাছি, উকুন, আর রোগের নানা পোকা ৷ নিতাইরা এখন ও পাশ দিয়ে যেতে ঘেন্না পায় ৷ শরীরের দুর্গন্ধ চাপা দিতে নাকে রুমাল দেয় ৷
          ভরা দুপুরের ঠাঠা রোদ্দুরের তাপে সমস্ত শরীরটা জ্বালা করছে সুধীরের ৷ খালি গাযে একটা লুঙ্গি পরে নিজের ঘরের ছোট্ট বারান্দায় দাঁড়িয়ে একমনে দেখছে রীতা পাগলীকে ৷ বারবার করে হাতের ভাঙ্গা এনামেল চটে যাওয়া থালাটা হাতে তুলে দেখাচ্ছে সুধীরকে ৷ কিন্তু সুধীরের হাড়ির ভাতটা যে এখন ফুটে ওঠেনি ৷ কেন যে পাগলীটা কেবল সুধীরের কাছেই ভাত চায় ৷ সুধীর নিজেও কেন যে পাগলীকে ভাত দিতে দেরি হলে মনে মনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, সেটা সত্যিই একটা রহস্য ৷ কিন্তু সারাদিনের থালায় এক মুঠো ভাত দেওয়া নেওয়াটুকুই ওদের দুজনার একমাত্র সম্পর্ক ৷
          বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সুধীর দেখতে পায় নিতাইদা আসছে ৷ সুধীর নিতাইদার চলন দেখেই বুঝতে পারে, নিতাইদার মনে কিছু মতলব আছে ৷ সুধীর খেয়াল করে দেখেছে, কোয়ার্টারের সবারই অসুবিধার কারণ হলেও নিতাইদার যেন পাগলীটার উপর রাগটা বেশি ৷
          নিতাই হন্ হন্ করে গেটের দিকে এগোচ্ছে ৷ কিন্তু ঘটনাটা এমন চোখের নিমিঘে ঘটে যাবে সুধীর ভাতে পারেন ৷ নিতাইদা পাগলীর কাছাকাছি আসতেই ও হাত বাড়িয়ে বিড়বিড় করে কী বলল সুধীর এতদূর থেকে ঠিকমতো বুঝতে পারল না ৷ কিন্তু নিতাইদার চিৎকার ঠিক কানে গেল সুধীরের ৷
----- কী? লজেন্স চাই? লজেন্স? আমার কাছে? এত বড় সাহস ! এই নে লজেন্স ৷ আজ তোকে জন্মের শেষ লজেন্স খাওয়াবো ৷ এই নে খা ৷
          বলতে বলতেই একটা আধলা ইট তুলে বসিয়ে দিল পাগলীর কপালে ৷
          কোনো আওয়াজ বেরল না রীতার মুখ থেকে ৷ চোখে দেখা দিল না কোনো ভাবান্তর ৷ আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল সে ৷ কপাল থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তটা হাত দিয়ে বন্ধ করবার চেষ্টাও করল না সে ৷ ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল গেট পেরিয়ে বড় রাস্তায় ৷
          সুধীর দাঁড়িয়ে দেখল সবই ৷ পাগলীটা চলে যেতেই জায়গাটা শূন্য হয়ে গেল ঠিকই ৷ কিন্তু পড়ে রইল একটা প্রাণীর বাসস্থানের চিহ্ন ৷ মানুষ একদিনের জন্য বাস করলেও জায়গাটা হয়ে যায় বাসস্থান ৷ সেটা ইট-সিমেন্টের ছাদই হোক, বা খোলা আকাশই হোক ৷ একটা ভাঙ্গা চটে যাওয়া এনামেলের থালা, একটা কৌটায় মগ, কিছু ছেঁড়া কাগজ, নোংরা ন্যাকড়া, আর কয়েক ফোঁটা সদ্য ঝড়ে পড়া রক্ত, সাক্ষ্য দিতে থাকে এটা একটা বাসস্থান ছিল ৷ কয়েকদিনের জন্য হলেও এখানে কেউ থাকত ৷ সুধীর আরো কিছু ভেবে উঠবার আগেই ভাতের হাঁড়ির পোড়া গন্ধ পেয়ে ছুটে ঘরের ভিতর চলে যায় ৷
          ডাঃ গাঙ্গুলিকে লোকে বলে খ্যাপা গাঙ্গুলি ৷ কথাবার্তা শুনলে কে বলবে  যে উনি একজন বিলেত ফেরত গাইনোকোলজিস্ট ৷ নিতাই যখন পাগলী রীতার কপাল ফুঁড়ে রক্ত বের করে দিচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ই বাথরুমে পা পিছলে পড়ে নিতাই-এর বউ রমা নিজের শরীরের রক্তের মধ্যে অচৈতন্য হয়ে শুয়ে রয়েছে ৷
          সিজারিয়ান সেকশন করে ডাঃ গাঙ্গুলি রমার পেট থেকে বাচ্চা বের করলেন ঠিকই, কিন্তু রমার জ্ঞান আর ফিরল না ৷
----- স্যার, রমা আর ফিরবে না? একদম কিছু করার নেই ৷ নিতাই হাত জোড় করে এসে দাঁড়ায় ডাঃ গাঙ্গুলীর সামনে ৷
----- নিতাই, যে চলে গেছে, তার কথা না ভেবে, যে আছে তাকে বাঁচাবার চেষ্টা কর ৷
----- আপনি আমাদের ভগবান ৷ আপনি আমার সন্তানকে বাচাঁন স্যার ৷
----- দ্যাখ নিতাই, এসব ভগবান টগবানে আমার দরকার নেই ৷ আমার এখন যা দরকার তাই যদি জোগাড় করতে পারো, তবেই তোমার বাচ্চা বাঁচতে পারে ৷
----- বলুন স্যার, বলুন ৷ যত টাকা লাগে আমি খরচা করব ৷ বলুন স্যার, কী আনতে হবে ৷ রমা চলে গেল ৷ এরপর ও যদি চলে যায়, আমি আর বাঁচব না ডাক্তারবাবু ৷
----- নো, নো নিতাই, আই ডোন্ট ওয়ান্ট টিয়ার্স ৷ আই ওয়ান্ট ব্রেস্ট মিল্ক ৷ ওনলি ব্রেস্ট মিল্ক ৷ নাথিং এলস ৷
----- রমা চলে গেল ৷ ব্রেস্ট মিল্ক এখন আমি কোত্থেকে পাব ৷ কৌটোর দুধের নাম বলুন ৷ যত দামই হোক, আমি এনে দিচ্ছি ৷
          দ্যাখো নিতাই একটা ছোট্ট শিশুকে বাঁচাতে, শরীর ও মনে সুস্থ স্বাভাবিক রাখতে, আর যে যাই অ্যাডভাইস করুক না কেন, আই ওন্ট অ্যালাড পয়জনস্ ৷
----- পয়জন কোনটাকে বলছেন স্যার?
----- অল পয়জনস্ ৷ পয়জনস্ ওয়াটার, পয়জনাস্ বটলস্, পয়জনস্ ওয়ে অফ হ্যান্ডেলিং ৷ অল পয়জনস্ ৷
----- কী সব বলছেন ডাক্তারবাবু ৷ কিছুই বুঝতে পারছি না আমি ৷
----- এত বুঝবার কিছু নেই ৷ যাও যেখান থেকে পারো ব্রেস্টমিল্কের ব্যবস্থা কর ৷
----- কিন্তু স্যার, কোথায় পাব?
----- কেন? আমাদের মেটারনিটি ওয়ার্ডে যাও ৷ ওখানে অনেক মা আছেন ৷ অনেকেরই নিজের শিশুকে দিয়েও বেশি হচ্ছে ৷ নষ্ট হচ্ছে ৷
----- কী বলছেন স্যার? অন্য মায়ের দুধ ৷
----- হোয়াই নট? বিদেশে কত মায়েরা অন্য শিশুকে আনন্দের সঙ্গে খাওয়াচ্ছে ৷ বদলে হয়ত পয়সা নিচ্ছে ৷ ব্রেস্ট মিল্ক ব্যাঙ্ক তৈরি হয়েছ ৷
----- কিন্তু --
এখন কিন্তু বলে কী হবে নিতাই ৷ আমি এখানে এসে অব্দি কত দিন ধরে চেঁচিয়েছি, প্রোপোজল দিয়েছি ৷ দেয়ার সুড বি ওয়ান ব্রেস্ট মিল্ক ব্যাঙ্ক ৷ বাট হু কেয়ারস ৷
----- ব্রেস্ট মিল্ক ব্যাঙ্ক? এখানে?
----- ইয়েস ৷ লাইফ ব্লাড ব্যাঙ্ক ৷ একজনের রক্তে যেমন অন্যজনের প্রাণ ফিরে পাচ্ছে, ঠিক তেমনই একজন মায়ের দুধে অন্য একজনের শিশু বেঁচে থাকবে, বড় হবে ৷ এতো খুব সহজ কথা ৷ যাও, আর দেরি করো না ৷ জন্মের পরে মায়ের দুধ ছাড়া অন্য কিছু দেওয়া একদম বারণ ৷ ব্রিং দি বেস্ট ফুড ফর দি পুয়োর বেবি ৷
          নিতাই বেরিয়ে আসে অপারেশন থিয়েটার থেকে ৷ একটা কথা ও পরিষ্কার জানে খ্যাপা গাঙ্গুলির কথা অমান্য করা যাবে না ৷ কিন্তু তাই বলে এমন অসম্ভব কাজ করা কীভাবে সম্ভব ৷ কী করবে বুঝতে পারে না নিতাই ৷ অনেকটা বিহ্বল হয়েই হাতে একটা ছোট্র বাটি নিয়ে এসে দাঁড়ায় মেটারনিটি ওয়ার্ডের দরজায় ৷
----- কী নিতাইদা, এখানে দাঁড়িয়ে?
          সমর এসে নিতাই-এর কাঁধে হাত রাখে ৷ কোনো উত্তর দেয় না নিতাই ৷
----- চলো, চলো ৷ ঘরে চলো ৷ মুখ চোখ বসে গেছে তোমার ৷ ঘরে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নেবে চল ৷
          নিতাই সমরের মুখের দিকে তাকায় ৷ তারপর ধীরে ধীরে বলে, ঘরে কে আছে আমার? কেউ নেই ৷
----- সত্যিই নিতাইদা ৷ কী আর বলব? বৌদি এভাবে চলে গেল ৷ ভাবা যায় না ৷
----- বল্ সমর বল্ ৷ এরপরেও তুই বলবি ভগবান আছে? রমার মত এমন শান্ত ভাল মেয়ে এভাবে চলে যাওয়ার কোনো মানেই হয় না৷ কী অপরাধ করছিল সে? আমাকে এভাবে বিপদে ফেলবার মানেটা কী? কী অপরাধে করেছি আমি?
----- অপরাধের কথা কোথা থেকে আসছে, নিতাইদা ৷ বৌদির মৃত্যুতে কারো কোনো হাত ছিল না ৷ এটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট ৷ চলল ঘরে চল ৷
----- কিন্তু আমার যে একটু দুধ চাই ৷
----- দুধ?
----- হ্যাঁ ৷ যে গেছে সে তো গেছেই ৷ জানিনা কোন পাপের শাস্তি আমাকে দিয়ে গেল ৷ কিন্তু আমিও বলছি, সমর, আমার সন্তানকে আমি বড় করব, মানুষ করব ৷ কিন্তু এখন যে একটু দুধ চাই ৷ ডাঃ গাঙ্গুলি বলেছেনে -- তাড়াতাড়ি ৷
----- একবাটি দুধের জন্য তুমি সিস্টারের কাছে হাত পেতেছো? আমার সঙ্গে চল ৷ কিচেন থেকে হাসপাতালের সাপ্লাই দুধ এক বাটি কেন, এক বালতি দিয়ে দেব ৷
----- আরে বাবা, তুমি নিজের সম্বন্ধেই ভুলে যাচ্ছ ৷ নিতাইদার দুধ লাগবে কোনো ব্যটা আপত্তি করবে, বরং নিতাইদাকে খুশি করতে পারলে কেতাত্থ হয়ে যাবে ৷ আর আমি তো সঙ্গে থাকছিই ৷ চল, চল ৷
----- না সমর, আমার ব্রেস্টমিল্ক চাই ৷
----- কী বলছো নিতাইদা, তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? বৌদি নেই ৷ এখন তুমি ওসব পাবে কোথায়? বৌদির শোকে দেখছি সব গোলমাল পাকিয়ে ফেলছো ৷
----- না সমর, ডাঃ গাঙ্গুলি বলেছেন, অন্য কিছু কোনো মতেই খাওয়ানো চলবে না ৷ ব্রেস্ট মিল্ক চাই ৷
----- তুমিও যেমন নিতাইদা ৷ খ্যাপা ডাক্তারের কথা ধরে বসে আছো ৷ মা বেঁচে থাকতেই প্রায় সব বাচ্চা কৌটোর দুধ খেয়ে বেঁচে থাকছে, তারা কি বড় হচ্ছে না ৷ আচ্ছা তুমি একবারও ভাবলে না এমন ব্রেস্টমিল্ক তুমি কোথায় পাবে ৷ বৌদি কি আকাশ থেকে এমন ব্রেস্টমিল্কের বৃষ্টি ঝরাবে ৷ পাগলের কথা শুনে তুমিও যে পাগল হয়ে উঠলে নিতাইদা ৷ চলো চলো ঘরে চলো ৷ আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি ৷ বাজারে সব চাইতে দামী কৌটোর দুধ, বোতল, নিপল মানে যা যা লাগে কিনে দিচ্ছি ৷ নতুন ভাইপোর জন্য আমার তরফের প্রেজেন্ট ৷ কিন্তু সমর, ডাক্তারবাবু যে বললেন, কিছুতেই বিষের বোতল ওকে খেতে দেবেন না ৷
----- তবে আর কী? অতটুকু শিশু ঐ খ্যাপা ডাক্তারের পাল্লায় পড়ে না খেয়ে মারা পড়ুক ৷ নিতাই হঠাৎ সমরের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে ৷ দু চোখ বেয়ে নেমে আসে কান্নার ধারা ৷
          সমর, আমার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না ৷ তোর বৌদি যে এভাবে আমাকে বিপদে ফেলবে ভাবতেও পারিনি ৷ আর দেখ আমার এমনই কপাল, বেছে বেছে ঠিক ডাঃ গাঙ্গুলীর অ্যাডমিশনের দিনেই এমন কান্ডটা হল ৷ অন্য ডাক্তার হলে তবু ---
----- শোন নিতাইদা, এভাবে সময় নষ্ট করে কোনো লাভ নেই ৷ একটা কথা বলব? শুনবে?
----- বল ৷
----- তুমি বরং রিস্ক বন্ড করে তোমার বাচ্চাকে কোয়াটারে নিয়ে চল ৷ আমরা আছি ৷ আশে পাশে অনেক মা-বৌরা আছে ৷ ঠিক সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে ৷
----- কী বলছিস তুই? এ সময় হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? অতটুকু শিশু পারবো?
----- আচ্ছা নিতাইদা, এমনও তো কত লোকের বাচ্চা বাড়িতে জন্মাচ্ছে ৷ তারা সব বেঁচে থাকছে না? আর তাছাড়া আমরা সব হাসপাতালে কাজ করি ৷ ডাক্তার না হলেও এত বছর কম তো আর কিছু দেখলাম না ৷ রোজই কত কী দেখছি ৷ কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক আমরা কি কিছুই বুঝি না?
----- কিন্তু নিজের বাচ্চা তো ---
----- এখনও তোমরা কিন্তু গেল না ৷ আরে বাবা, তেমন কিছু হলে না হয় ডাঃ দাসের আন্ডারে ভর্তি করে দেব আবার ৷
----- বলছিস?
----- হ্যাঁ বলছিই তো ৷
----- মানে সমর আমার কিন্তু ভয় করছে ৷
----- তুমি ওসব ভয়ডর ছাড় তো ৷ নিতাইদা, তুমি না আমাদের নেতা ৷ তোমার মুখে এসব কথা মানায় না ৷ যাও ওকে বাড়ি নিয়ে যাও৷ আমি ততক্ষণে যা যা দরকার সব বাজার থেকে কিনে আনি ৷
          মাতব্বর নিতাই এই প্রথম বুঝতে পারল রমা নামে যে মহিলা তা বৌ হিসেবে এতদিন সঙ্গে ছিল, তার বেঁচে থাকাটা কতটা জরুরী ৷ নিজের খাওয়া দাওয়ার কথা মাথায় নেই ৷ কী করে যে অতটুকু একটা প্রাণীর কান্নাটা থামবে ৷ সেটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না সে ৷ কোয়ার্টারের লোকজন সন্ধ্যারাত পর্যন্ত এসেছে ৷ এটা সেটা উপদেশ দিয়েছে ৷ সমরের বৌ কয়েকবার কৌটোর দুধ গুলে খাইয়েও দিয়ে গেছে ৷ কিন্তু এখন রাত এগারোটা বাজে ৷ রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর কান্নার রেশও বেড়ে চলে ৷ কিসের জন্য এত কান্না ওর সেটাই নিতাই-এর মাথায় আসছে না ৷ অতটুকু শরীরটাকে ঠিকমত দুহাতে জড়িয়ে ধরতেও ভয় লাগে পাছে হাতের চাপে ওর নরম হাড়-গোড় ভেঙ্গে যায় ৷ শোয়ালে পরে কান্না আরও বেড়ে যাচ্ছে ৷ কোলে নিয়ে ঘর-বারান্দায় পায়চারী করলে একটু কমছে কান্না ৷ কিন্তু কখনোই একেবারে চুপ করছে না ৷
          নিতাই কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না ৷ পাশের ঘরের রতনের বৌ একবার জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলে, নিতাইদা, মনে হচ্ছে ওর খিদে পেয়েছে ৷ একটু দুধ বানিয়ে দিন দেখবেন ঘুমিয়ে পড়বে ৷
          বাচ্চাকে বিছানায় ওপর রেখে কেরোসিন স্টোভটা জ্বালায় নিতাই ৷ কিন্তু জল গরম করব কোন পাত্রে ৷ চায়ের সসপ্যানটা এঁটো বাসনপত্রের মধ্যে পড়ে আছে ৷ রমা ধুয়ে রেখে যেতে পারেনি ৷ চাই করে রাখা এঁটো থালাবাসনের তলা থেকে চায়ের সসপ্যানটা টেনে বের করেন নিতাই ৷ আগের বানানো চায়ের ছাকা পাতা, দুধ, জল মিশে বিশ্রী একটা দলা পাকিয়ে রয়েছে ৷ কোনো রকমে জল দিয়ে ধুয়ে উপর উপর পরিষ্কার করে তাতে কিছুটা জল দিয়ে সসপ্যানটা বসিয়ে দেয় স্টোভের উপর ৷ ওদিকে ঘরের মধ্যে দিয়ে আসা কান্না নিতাইকে অস্থির করে তোলে ৷ কিছুক্ষণ জল গরম হওয়ার পরে নিতাই এর মনে হয় জলের পরিমাণটা বোধ হয় কম হবে ৷ কোনও কিছু না ভেবে আরও খানিকটা ঠান্ডা জল পাত্রে ঢেলে দেয় ৷ জল ঢালতে গিয়ে কিছুটা জল গিয়ে পড়ে জ্বলন্ত স্টোভের আগুনে ৷ কিন্তু কতক্ষণ জলটা গরম করতে হবে ৷ হাসপাতালের চাকরি করা নিতাই জানে জল পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট না ফোটালে বীজাণু নির্মূল হয় না ৷ এদিকে কেরোসিন স্টোভের তেল ফুরিয়ে এসেছে ৷ এখন আগুনের চাইতে কালো ধোঁয়াই বেরোচ্ছে বেশি ৷ সরাসরা কালো কালির জাল হাওয়ায় উড়ে এসে পড়েছে জলের পাত্রে ৷ একটা বিশ্রী রঙের আস্তারণ পড়েছে জলের উপর ৷ এই জলে দুধ গুলে খাওয়ানোটা কি ঠিক হবে? কান্নার আওয়াজ নিতাইকে অস্থির করে তোলে ৷ বিরক্ত নিতাই সসপ্যানের সমস্ত জলটা ঢেলে ফেলে দেয় ৷ নতুন করে স্টোভে তেল ভরতে যায় নিতাই ৷ কিন্তু কেরোসিনের পাত্রটা রমা কোথায় রাখে?
          রান্নাঘরের পাঁচ মিশালি গৃহস্থালির জিনিসপত্রের মধ্যে রমা কেরোসিন তেলের টিন কোথায় রেখেছে ৷ নিতাই খুঁজে পায় না ৷ জল গরম করবার চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে ফিডিং বোতলে কিছু কলের জল ভরে নেয় নিতাই ৷ আন্দাজে কিছুটা কৌটোর গুঁড়ো দুধ ঢেলে দেয় বোতলে ৷ নিপলটা লাগিয়ে বোতল ঝাকিয়ে দুধটা গুলতে চেষ্টা করে ৷ ঠান্ডা জলে কিছুটা দুধ গুলে যায় ৷ কিন্তু বেশিরভাগটাই ছোট ছোট ডেলা পাকিয়ে ভাসতে থাকে বোতলে ৷ নিতাই ঘরে এসে বোতলটা ধরে বাচ্চার মুখে ৷ ঠোঁটে নিপল লাগাতেই ছোট্ট মুখ দিয়ে কিছুটা দুধ খায় ও ৷ তারপরেই মুখ সরিয়ে নিয়ে জুড়ে দেয় তারস্বরে কান্না ৷ অনেক রকম করসত করে নিতাই ৷ কিন্তু কান্না থামে না ৷ অসহায় নিতাই প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে ওঠে ৷ তারপরে হঠাৎ করেই সব কিছু ফেলে রেখে সোজা হাজির হয় মেটারনিটি ওয়ার্ডের সামনে ৷ হাতে একটা ছোট্ট বাটি ৷
          সদ্যজাত শিশুকে পরম যত্নে নিজের স্তন্যপান করাচ্ছিল চার নম্বর বেডের মহিলা ৷ চোখ বন্ধ করে উপভোগ করছিল মাতৃত্বের স্বাদ ৷ নিতাই কোনো কিছু না ভেবেই সোজা গিয়ে নবজাতকের মুখটা টেনে সরিয়ে নিয়ে হাতের বাটিটা এগিয়ে ধরে একবারে মহিলার শরীরের কাছে ৷ আচমকা একটা অস্বাভাবিক স্পর্শে চোখ খুলে নিতাই-এর ঝুকে পড়া মুখটা দেখে ভয়ে চিৎকার করে ওঠে মহিলা ৷ ততক্ষণে হাজির হয়ে যায় ওয়ার্ড সিস্টার ৷
          লজ্জা করে না আপনার নিতাইবাবু ৷ ছিঃ ছিঃ নিজের স্ত্রী গত হওয়ার একদিনও সবুর সইল না ৷ এক্ষুণি বেরোন ৷ নইলে আপনার নামে রিপোর্ট করতে বাধ্য হব ৷
          নিতাই ধীরে ধীরে ঘরের দিকে পা বাড়ায় রমার কথা মনে পড়ে ৷ মা হারা সন্তানের কথা ভেবে ওয়ার্ড সিস্টারের অপমানটা হজম করে নেয় সে ৷ অন্য সময় হলে মাতব্বর নিতাইকে এ ভাষায় কথা বলবার উচিত শিক্ষা দিতে পারত সে ৷ এক সে স্নেহান্ধ পিতার মতই সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন ৷ কীভাবে কী করবে ৷ সামান্য একটা প্রাণী ৷ কিন্তু তার কান্না থামাতে সম্পূর্ণ অপারগ সে ৷
          ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে এগোয় সে ৷ সমরের বৌ-এর কথা শুনে মনে হয় ৷ বললে হয়তো ঠিক মত দুধ বানিয়ে খাইয়ে যাবে ৷ আপাততঃ রাতটা কাটা দরকার ৷ কাল সকালে যা হোক একটা ব্যবস্থা করা যাবে ৷ কারও কাছ থেকে ঠিকমত দুধ গুলবার নিয়মটা শিখে নিলেই চলবে ৷ একজন দেখাশুনোর লোক রেখে নিলেই চলবে ৷ হঠাৎই ডাঃ গাঙ্গুলির কথা মনে পড়ে নিতাই-এর ৷ এ অবস্থাতেও একটু হাসির রেখা দেখা যায় ওর মুখে ৷ খ্যাপা ডাক্তারের যেমন কথা, বোতল, কৌটো, সব পয়জন -- বিষ ৷ তাহলে সরকার এতদিনে সব বিক্রি বন্ধ করে দিত না ৷
          দরজাটা হাট করে খোলা ৷ বেরিয়ে যাওয়ার সময় এভাবেই দরজাটা খুলে রেখে গিয়েছিল কিনা, নিতাই মনে করতে পারল না ৷ কিন্তু ওর কান্নার আওয়াজটা তো শোনা যাচ্ছে না ৷ ভীষণ ভয় পেয়ে যায় নিতাই ৷ বুকের মধ্যে গুড়গুড় করে ওঠে ৷ কাঁদতে কাঁদতে কি কান্না চিরতরে থেমে গেল ৷ খোলা দরজা দিয়ে কোনো কুকুর টুকুর ৷ দ্রুত ঘরের মধ্যে পা বাড়ায় নিতাই ৷
          বিছানার দিকে চোখ পড়তেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় নিতাই ৷ এও কি সম্ভব ৷ রমা ফিরে এসেছে? নিজের সন্তানের বিপদ দেখে মূর্ত শরীরে ফিরিয়ে এনেছে মায়ের প্রাণ ৷ দরজার দিকে পিছন ফিরে বসে রয়েছে রমা ৷
          সমস্ত শরীরে একটা শিহরণ ওঠে নিতাই-এর ৷ ধীর পায়ে এগিয়ে যায় বিছানার কাছে ৷ ঝুঁকে পড়ে রমার মুখটার দিকে তাকায়৷ এ কী ঐ রমার একটা পুরোনো শাড়ি কোনোরকম শরীরে জড়িয়ে বসে আছে রীতা পাগলী ৷ ছোট্ট শিশুকে পরম যত্নে ধরে রেখেছে নিজের বুকের কাছে ৷ শান্ত শিশু পরম নিশ্চিন্তে খেয়ে চলেছে মায়ের অমৃত ৷ কে বলবে রীতা উন্মাদ, বোধ শক্তিহীন ৷ সমস্ত মুখে ছড়িয়ে আছে অনাবিল অন্ধের আভা ৷
          স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নিতাই ৷ হাত দিয়ে চোখটা মোছে নিতাই ৷ মনের মধ্যে হাজারোও চিন্তা একসঙ্গে জড়ো হয়
          কিছুক্ষণের মধ্যে নিজেকে ফিরে পায় নিতাই ৷ মনে হয় এটা হতে পারে না ৷ ওর মান-সম্মান এতদিনের প্রতাপ-প্রতিপত্তি সব কিছু তছনছ করে দিতে এসেছে রীতা ৷ ওকে চলে যেতেই হবে ৷ চলে যাওয়াটাই সামাজিক নিয়ম ৷
          কিন্তু পরমূহুর্তেই চিন্তার গতি ঘুরে যায় নিতাই-এর ৷ মা ও শিশুর চিরন্তনী ছবিটা দেখতে দেখতে মনে মনে বলে, ক্ষমা কর ৷

[কমলেন্দু চক্রবর্তী]




Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.