>

কমলেন্দু চক্রবর্তী

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 9/15/2015 |




আমরা বাঙালি ৷ বাংলা ভাষাতেই কথা বলি ৷ কিন্তু আমি কোনো কথা বললেই,অন্য লোকেরা বিশেষ করে কলেজের বন্ধুরা মুচকি হাসে ৷ কয়েকদিনের মধ্যেই আমি জেনে গেলাম যে আমি বাঙ্গাল ৷ কেন ? বাঙ্গাল ? আমি তো বাঙালি ওরাও বাঙ্গালি ৷ তবে কেন আমি বাঙ্গাল ? বাঙ্গাল কি কোন গালি ? তখনও ভানু বন্দোপাধ্যায়ের বঙ্গাল ঘটির কৌতুকের রেকর্ড বের হয়নি ৷

আমার যেহেতু কোনো বন্ধু নেই আর নিজের অজ্ঞতাকে লোকের সামনে আনতে সেই বয়সে ভারি হীনমন্যতা হত ৷ কাজেইে আমি নিজেই কেন বাঙ্গাল,এটা বোঝার চেষ্টা করলাম ৷ আসল কথা জিভে ৷ ছোটবেলা থেকেই আমরা একটা ভাষাই জানি ৷ আমরা সেটাকেই বাংলা ভাষা বলে জেনেছি ৷ কিন্তু যে এদিকে অন্য বাংলা ভাষায় লোক কথা বলে,এটা আমার জ্ঞানের মধ্যে ছিল না ৷ বুঝলাম এখানে করতেসি,খাইতেসি চলবে না ৷ এখানে বলতে হবে করছি,খাচ্ছি ৷ পা দিয়ে পাড়ানো যাবে না, মাড়াতে হবে ৷ বয় মানে ছেলে, বস বলবে তবেই বসবে ৷ একদিকে কলেজের পড়া ৷ এই প্রথম কেমিষ্ট্র,ফিজিক্স বায়োলজি পড়তে হচ্ছে,তাও ইংরাজীতে ৷ ওদিকে বাঙ্গাল- বাঙ্গালভাব থেকে নিজেকে বের করতে হবে ৷ শুরু হল সাধনা ৷ যতোক্ষণ  বই পড়ি ৷ ঠিক আছে রাতে শুয়ে ভাষা চর্চা ৷ মনে মনে অওড়াতাম ৷ নতুন নতুন শোনা শব্দকে আয়ত্ব করা,আমার মনে হয় আমি কেমিষ্ট্র ফরমূলা মুখস্থ করতে যতো সময় লাগিয়েছি,তার চাইতে বেশী সময় মনে মনে ঘটিদের ভাষা রপ্ত করতে লাগয়েছি ৷ মাস তিনেকের মধ্যে আমি প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাঙ্গাল থেকে নন-বাঙ্গাল হতে পেরেছিলাম ৷ কথার টান অবশ্য ছিল ৷ তবে তেমন কিছু না ৷ 

আসানসোলে আমার সত্যিকারের দুজন বন্ধু হয়েছিল ৷ নিলু আর গৌতম ৷ নিলু  আমাদের পাড়াতেই থাকত ৷ ওর সঙ্গে আলাপ হওয়ার পরে নিলুর বন্ধু গৌতমও এসে গিয়েছিল ৷ ওরা সত্যিকারের ভালো ছেলে ছিল ৷ তিনজনের এক একটা ব্যাপারে ভীষণ মিল ৷ তিনজনই বাবা-মা থেকে দূরে থাকতাম ৷ আমি তো মাসির বাড়িতে থাকতাম ৷ নিলুর বাবা-মা কোলকাতায় থাকত ৷ কিন্তু ও থাকত মামার বাড়ি আর গৌতমের বাবা-মা ছিল না ৷ ও কাকার বাড়িতে থাকত ৷ আমার জীবনের সবচাইতে কাছের বন্ধু ওরা- সত্যি বলতে ওরাই আমার প্রথম বন্ধু ৷ আজও মনে পড়ে একজন বৃষ্টিতে ভিজলে,অন্য দুজনও বৃষ্টিতে ভিজতাম ৷ কলেজ তো একসঙ্গে যেতামই ৷ অন্য সময়ও কোথায় গেলে একসঙ্গেই যেতাম ৷

 ওরা কোনোদিনও আমাকে বাঙ্গাল বলেনি ৷ বরং আমাকে মন থেকে বন্ধু মেনে নিয়েছিল ৷ কিন্তু মাঝে মাঝে একটু-আধটু মস্করা তো আমাকে নিয়ে করতই ৷ যেমন,একদিন নিলু বলল,বলত, Band Box কি ? আমি তো ওই নাম কোনোদিন শুনিনি ৷ নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে বললাম,যে বাক্সের উপর Band মানে বাজনা বাজানো হয় ৷ নিলু একটু মুচকি হাসল ৷ পরে জানলাম,ওটা একটা বড় লন্ড্রির দোকানের নাম ৷ এইভাবে একদিন জানলাম Bombay dyeing আসলে একটা বড় কোম্পানি,কাপড়ের কোম্পানি ৷ এভাবেই কিছু র্যগিং-এর ছলে নিলু আমাকে দুনিয়াটা চেনাচ্ছিল ৷ গৌতম তুলনায় কম কথা বলত এবং বেশ গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ ৷ অত কম বয়সে ওধরণের ব্যক্তিত্ব আমি খুব কম দেখেছি ৷ 

আমরা বাসে করে কলেজ যেতাম ৷ যতোদূর মনে আছে Goldwin নামের একটা সাধারণ বাস ছিল ৷ আমরা হেঁটে কোর্টের মোড়ে যেতাম,সেখান থেকে বাস ধরতাম ৷ বাস জিটি রোড ধরে আসানসোল শহরের বুক চিরে কলেজে যেত ৷ বিবি কলেজের একটা সুনাম ছিল ৷ আমরা তিনজনই সায়েন্স সেকশনে ভর্তি হলাম ৷ একটু বাস যাত্রার কথা না বললেই নয় ৷ তখন বাসের সাধারণ ভাড়া ছিল দশ পয়সা ৷ আর স্টুডেন্ট কনশেসন পাঁচ পয়সা ৷ কিন্তু এখানে একটু টুইস্ট আছে ৷ কোনো ছাত্র যদি পাঁচ পয়সার টিকিট কিনে মাঝে কোথায় নেমে পড়ে আর সেই বাসেই উঠলেই তাকে আবার নতুন করে পাঁচ পয়সার টিকিট কাটতে  হবে ৷ মাঝে মাঝে আমরা পুরানো টিকিট রোল করে ঠোঁটে গুঁজে রাখতাম ৷ কনডাক্টার টিকিট কাটা আছে ভেবে আর টিকিট কাটে না ৷ তবে সব সময় এই চালাকি চলত  না ৷ ধরাও পড়তে হত ৷ তখন নতুন করে পাঁচ পয়সা খরচা ৷ না,নীতিগতভাবে আমি,বিনা পয়সায় যাওয়া বা রেল,বাস,ট্রামকে ফাঁকি দেওয়ার একেবারে বিরোধী ৷ ঐ বয়সে তিনটে পনের-ষোল বছরের ছেলের কাছে এটা একটা খেলা ৷ কী করে কনডাক্টারকে বোকা বানানো যায় ৷ ছোট্ট অ্যাডভেঞ্চার ৷ কিন্তু আসল কারণ পয়সার অভাব ৷ নিলু কিছু হাত খরচা পেত ৷ গৌতমও কোনোভাবে চালাত ৷ একমাত্র আমি সে অর্থে বিশাল ধনী ছিলাম ৷ মাসে মাসে বাড়ি থেকে পঁচিশ টাকার মানি অর্ডার আসত ৷ মাসির বাড়িতে যাওয়া দাওয়া,বাদ বাকি পয়সায় ভালো ভাবেই চলে যেত ৷ কিন্তু সিনেমা,সার্কাস দেখতে তো বেশ পয়সা চলে যেত ৷ 

একবার কলেজ ফেরত আমাদের মনে হল কিছু খেলে হয় ৷ গরমকাল ৷ খাওয়ার ইচ্ছার মূল কারণটা তখনও আমি জানি না ৷ আসানসোল টার্ডনের মাঝে একটা দোকান ছিল ৷ দোকানেটার নাম জনতা৷ আর এখানে বিখ্যাত ছিল জনতার সিঙাড়া ৷ খুব নাম ছিল এই সিঙাড়া ৷ কিন্তু এখানে যেটার জন্য আমাদের বয়সী ছেলেরা যেত ৷ ঠান্ডা জল খেতে ৷ সে সময় রেফ্রিজিটর ছিল কিনা জানি না ৷ কিন্তু অদ্ভূত ঠান্ডা জল ৷  এক গ্লাস খেলে মন ভরে না ৷  ওদের সঙ্গে আমিও প্রথমবার গেলাম জনতায় ৷ কিন্তু ঠান্ডা জল খেতে গেলে কিছু খেতে হবে ৷  তবেই পাবে বিনে পয়সায় ঠান্ডা জল ৷ প্রতিটি সিঙাড়ার দাম ছিল দশ পয়সা ৷ মানে তিনজন তিনটে সিঙাড়া খেলে ত্রিশ পয়সা ৷ কুড়িয়ে  বাড়িয়ে পয়সা হয়ে গেল ৷  সিঙাড়াটা সত্যি ভালো ৷ কিন্তু তার চাইতেও ভালো ঠান্ডা জল ৷ ওঃ জল তো যেন কেওড়া দেওয়া সরবৎ ৷

এভাবেই দিন চলছিল ৷ কোনো কোনো দিন ক্যান্টিনে একটা পকোড়া তিন টুকরো করে খেতাম ৷ তাতেই মহাআনন্দ ৷ একদিন আবার দুষ্টু বুদ্ধি খেলল নিলুর মাথায় ৷ বলল,কত পয়সা আছে ? কুড়িয়ে বাড়িয়ে তিনজনের পকেট থেকে বেরোলে পঞ্চান্ন পয়সা ৷ হিসাব হল ৷ পাঁচ পয়সা করে বাস ভাড়া মানে পনের পয়সা আর সিঙাড়া তিনটে ত্রিশ পয়সা ৷ মানে পাঁচ পয়সা শর্ট ৷ কী করে পাঁচ পয়সা ম্যানেজ করা যায় ৷ আর যাওয়ার টিকিটের জন্য পনের পয়সা তো রাখতেই হবে ৷ ঠিক হল যে কারেই হোক,একজনের বাস ভাড়া ফাঁকি দিতেই হবে ৷ আমাদের মধ্যে গৌতমের মাথা খুব ঠান্ডা ছিল ৷ হিসাবেও পাকা ৷ কাজেই ওর কাছেই সব পয়সা রাখা হল ৷ বাজারের বাস স্টপ আসতেই আমি আর নিলু নেমে পড়ে হাঁটা দিলাম ৷ একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালাম ৷ গৌতম ধীরে সুস্থে নামতেই কন্ডাক্টার গৌতমের হাত চেপে ধরল ৷ ভাড়া ৷ গৌতম  নিজের পাঁচ পয়সা ভাড়া কন্ডাক্টরের হাতে দিতেই ও চিৎকার করে উঠল, আর ঐ দুজনের ভাড়া ৷ 

-ওদের ভাড়া আমি কেন দেব ? গৌতম গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করল ৷
-তুমি দেবে মানে ? তোমরা তো একসঙ্গে যাতায়াত কর ৷ আর অনেকক্ষণ ধরে তোমরা পয়সার হিসাব করছিলে দেখেছি ৷ তখন থেকেই আমি নজর রাখছি ৷ দাও ভাড়া দাও ৷ গৌতম বুঝল বৃথা চেষ্টা করে লাভ নেই ৷ আমাদের তিন জনের ভাড়া দিয়ে চলে এল ৷ আমরা চলছি ৷ কিন্তু কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছি না ৷  হাঁটছি তো হাঁটছি ৷ কিছুক্ষণ পরে নিলু বলে উঠল,জনতার সিঙাড়ার আর তেমন টেস্ট নেই ৷ আজ একদম ভালো খেলাম না ৷

আমি বললাম,আমরা আজ সিঙাড়া খেলাম কোথায় ?
-আর কি খাব ? খেলাম তো ৷ গৌতম একটু বেশী খেল ৷ নিলু বলল ৷
আমি চুপ করে গেলাম ৷ 
-আচ্ছা আমরা কি দিনকে দিন খারাপ ছেলেদের দলে চলে যাচ্ছি ৷ গৌতম বলল ৷
 সবাই আবার হাঁটছি ৷ কোনো কথা হচ্ছে না ৷
আমরা হাঁটছি অনেকক্ষণ ধরে জিটি রোড দিয়ে ৷
হঠাৎ নিলু বলল,যাক ভালোই হল; হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির কাছে চলে এসেছি প্রায় ৷ বাসের ভাড়া লাগল না ৷
-নিলু,এবার চুপ কর ৷ আমি বললাম ৷ ছিঃ এই শিক্ষা আমাদের ৷ জনতার সিঙাড়া কোনোদিনও আর না ৷ 
-কমল,যা বাবাঃ এখানে জনতার সিঙাড়া এল কোথা থেকে ৷ আমি তো বাস ভাড়ার কথা বললাম ৷ 
-কমল ঠিকই বলেছে আর না ৷ গৌতম গম্ভীর হয়ে বলল ৷ 
-আরে তোরা এত সিরিয়াস হচ্ছিস কেন ?
নাতি-নাতনি হবে না ? ওদের জন্য স্টক করতে হবে না ?
-কি বলছিস নিলু ৷ পাগলের মতো প্রলাপ বকছিস ৷ আমি বললাম ৷ 
-না প্রলাপ নয়,ঠিকই বলছি ৷
-তোর মাথা বলছিস ৷ ছিঃ বাস কন্ডাক্টর যখন আমার হাতটা ধরেছিল,আমার নিজেকে চোর মনে হচ্ছিল ৷ গৌতম বলল ৷ 
-
সেটাই তো বলছি ৷ ভেবে দেখ তোর নাতি-নাতনিদের কথা ৷ যখন আজ থেকে পঞ্চাশ-ষাট বছর বাদে তোরা নাতির সঙ্গে গল্প করবি ৷ তখন যদি বলিস,আম খুব ভদ্র ছেলে ছিলাম ৷ বাসে কলেজে যেতাম ৷ কলেজ করতাম ৷ আবার বাসে ফিরতাম সবসময় ভাড়া দিতাম ৷ বাড়ি এসে বই নিয়ে পড়তে বসতাম ৷ এই রসকসহীন গল্প ও শুনে আনন্দ পাবে ? তার চাইতে কি করে আমরা বাস ভাড়া ফাঁকি দিতাম,কিভাবে একদিন ধরা পড়ে প্রচন্ড অপমানিত হলাম ৷ এই গল্পটা বেশি উত্তেজনা দিত ৷ ভেবে দেখ আজ থেকে পঞ্চাশ-ষাট বছর বাদের কথা ৷ আমি অবশ্য এই গল্প করতে পারব না কারণ আমার আবার আজকের অপমানটা মনে যাবে ৷ভালোই হয়েছে আমরা নিজেরাই বুঝেছি অন্যায় ভারি অন্যায় হয়েছে ৷ আর না ৷ নিলু বলতে বলতে থেমে গেল ৷ আমরা ততক্ষণে বাড়ির কাছাকাছি এসে গেছি ৷

আসানসোলের জীবনে খুব বেশী ঘটনা ঘটেনি ৷ কলেজ আর তিন বন্ধুর নির্মল আড্ডা আর সঙ্গে পড়শোনা ৷ এভাবেই চলত ৷ তবে আমাদের ক্লাসে বিজন বলে একটা ছেলে পড়ত ৷ সে স্কুল ফাইনালের মতো বড় পরীক্ষায় অষ্টম স্থান পেয়েছিল ৷ ওর একটা হামবড়া ভাব ছিল ৷ কারো সঙ্গে বেশী মিশত না,কথা বলত না ৷ ওর ভাব দেখে আমি নিলুকে একদিন বলেই ফেললাম যে বিজন যতো নম্বরই পাক আমি ওর চাইতে এক নম্বর বেশী পেলেও পাব ৷ শুনে নিলু বলেছিল,সেও একথাটাই ভাবছিল ৷ এবং সত্যি আমরা দুজনেই University Entrance পরীক্ষায় বিজনের থেকে অনেক বেশী নম্বর পেয়েছিলাম ৷ 
(আগামী সংখ্যায় সামপ্য)

[কমলেন্দু চক্রবর্তী]

Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.