>

মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 9/15/2015 |




মধুচন্দ্রিমা (চতুর্থ পর্ব)

আগে যা ঘটেছে :::: সুভদ্র ওরফে ঋজু মোটেলে ফিরে কথা বলার সুযোগ পেল সুভদ্রার সঙ্গে।

সুভদ্রাকে ঋজুর সাথে বসে থাকতে দেখে অশ্রাব্য ইংরেজীতে স্প্যানিশে যা মুখে আসছে বলতে থাকে, সুভদ্রা ওকে চলে যেতে বললেও যায়না, ছেলেটির মনে হয়েছে সুভদ্রা ঋজুর সাথে প্রেম করছে, না হলে এমন অন্ধকারে দুজনে বসে কি করছে? ঋজু বুঝল ছেলেটি মদ্যপ অবস্থায় রয়েছে আর যে চেহারা তাতে ঋজু ওর সাথে এঁটে উঠবে না। টুক করে কেটে ঋজু গিয়ে মোটেলের সিক্যুরিটিকে ডেকে আনল তারা আসতেই ছেলেটার সব হালুমঝালুম বন্ধ। ওরা দুজনে নিজের নিজের রুমে ফিরে গেল, কেমন যেন তাল কেটে গেল সব কিছুর। ঋজুর ক্ষিধে টিধে যেন মরে গিয়ে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল, সুভদ্রার সাথে আর কোনোদিনও কি দেখা হবে? একটু স্নান করবে নাকি ভাবে, নাহলে ঘুম আসতে চাইবে না, হয়ত এটাই ভালো হল, কেজানে কিসের মধ্যে জড়িয়ে পড়ত তবু মনের কোনায় কোথায় যেন খচ্ খচ্ করে, কেবল মনেহয় আর দেখা হবে না। তখন তো আর মোবাইলের এতো চল ছিল না, খুব কম মানুষেরই মোবাইল থাকত, ঋজুর একটা ছিল বটে কিন্তু সুভদ্রার তো নেই। বসেবসে আগা মাথা চিন্তা করতে করতে কতো সময় পার করে ফেলল, এখন শ্রান্তও লাগছে ক্ষিধের অনুভুতিটাও আবার জেগেছে বলে হাতটাত না ধুয়েই খাওয়া শুরু করল। প্রায় শেষ হয়েছে খাওয়া এমন সময়ে ঋজুর ঘরের দরজায় নক্, খুলে দেখে সুভদ্রা দাঁড়ানো। কেমন ফ্যাকাশে লাগছে মেয়েটাকে। ভেতরে ডেকে বসায় ঋজু, কফি বা অন্য কিছু নেবে কিনা সাধল। সুভদ্রা শুধুই মাথা নাড়ে। ঋজুর এবারে কেমন অস্বস্তি হয় কেজানে এখন যদি মেয়েটি তাকে কোনোরকম অপদস্থ করে, একটা অবিবাহীত ছেলের সাথে মোটেলের রুমে, যদি বলে ঋজু ওর সাথে জবরদস্তি করেছে বা তেমন কিছু, কি করবে ঋজু? মাথার ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে, আবার ভাবে মেয়েটি নিজেই এখন অশান্তিতে রয়েছে, ওই ছেলেটির অভিযোগে সেটা পরিস্কার, কাজেই এখন হয়ত মেয়েটির নিজের পরিত্রানের ভাবনাই আছে অন্যকিছু নেই। চুপচাপ কতো সময় যেন কেটে গেল, সুভদ্রাই এই দমবন্ধ অবস্থার শেষ করল নিজের কথা বলতে শুরু করে। 

"আপনি আমার কথা জানতে চাইছিলেন না? দেখুন, আমার বাড়ি ছিল অ্যারিজোনা স্টেটে, আমার বাবা বাঙালি হলেও মা কিন্তু মেক্সিকান। আমার মায়ের অন্ততঃ আরোও দু'বার বিয়ে আছে, একটা আমার বাবার আগে, আরেকটা পরে, এখনকার খবর অবশ্য জানিনা। উনি আমার মিড্ল স্কুল মতো সময়ে আমাদের ছেড়ে চলে যান, মানে আমি তখন সেভেন্থ গ্রেড শেষ করেছি তেমন সময়ে; বাবা একাই আমায় বড় করেন। আমি হাই স্কুলে থাকতেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাজ করে কিছু কিছু রোজগার করতে শুরু করি। এরপর বাবা আবার বিয়ে করেন, আর আমার স্টেপমম এতোবড় মেয়েকে মেনে নিতে পারেননি। আমিও দেখলাম যে কলেজে পড়তে হলে এইসব ঝেড়ে ফেলে দেওয়া উচিত। বাবার সাথে যোগাযোগ থাকলেও আমি চলে আসি, উনি ওনার জীবনে আমার জন্য অনেকটা ত্যাগ করেছেন, এখন ওনার নিজের মতো থাকুন। কিছু স্কলারশিপ পেয়েছিলাম আর একজন স্পনসর পেয়ে গেলাম সাথে কিছু কাজও পেলাম কাজেই পড়াশোনা চালাতে পারলাম। এই ছেলেটি আমার মায়ের সূত্রে পরিচিত, অনেকবার গেছে আমাদের বাড়ি, হঠাৎই দেখা হয় এখানে। এতোদিন পর চেনা মানুষ দেখেই হোক কি কেন জানিনা, আমরা একসাথে থাকতে শুরু করি, যদিও আমাদের দু'জনের অনেক কিছুই মেলেনা। ছেলেটি স্কুল ড্রপ আউট, ফলে ও খুব সাধারণ কাজ পেত, কখনও পেতও না। কয়েকদিন ধরে ওর কোনো কাজ ছিল না। আমায় অনুরোধ করে যে, আমি যেন কটা দিন সাহায্য করি। মানে আমরা তো সমান ভাগে সব কিছু পে করি, সেটা ও কটাদিন পারবে না। আবার কাজ পেলেই ও আমার যা খরচ হয়েছে দিয়ে দেবে। আমি কেন যে মেনে নিলাম; সেদিন বাড়ি ফিরে দেখি ও আরেকটা মেয়েকে নিয়ে ঘরে। আমি ওমনি আমার সব নিয়ে বের হয়ে এসেছি। কেন থাকব আর ওর সাথে? আসলে ও ভেবেছিল যে, আমি আর্ন করব আর ও মজা করবে। সেটা হয়নি বলে এখন আমার পিছে পিছে আমার কাজের সময়ে বিরক্ত করছে, আমি ওকে ঠকিয়েছি বলছে আর এই জায়গাও খুঁজে পেয়ে গেল। আমি জানতাম ও ঠিক এসে যাবে এখানে এই জন্যই আমি কাল থেকে ওই কাজে আর যাব না; অন্য কাজ নিয়েছি আর এই মোটেল থেকেও চলে যাব, একটা অ্যাপার্টমেন্ট নিয়েছি।" চুপ করে থাকে দুজনেই। এমন অদ্ভূত সিচুয়েশনে ঠিক কি বলা উচিত ভেবে পায় না ঋজু। জড়িয়ে পড়ছে বুঝতে পেরেও উদাসীন হতে পারছে না। "তুমি একা একটা মেয়ে বাড়ি ভাড়া পেয়ে গেলে?" প্রশ্নটা করেই বুঝল একেবারে কাঁচা বং মার্কা প্রশ্ন হয়ে গেল। "হ্যাঁ, কেন পাবো না? আমি তো অ্যাডাল্ট, আর তাছাড়া ওই কমপ্লেক্সের লিজিং অফিসেই তো কাজ করছি কাজেই ওদের এম্প্লয়ি রেন্টেই পেলাম ঘর।" যাক বাবা, সহজেই কথাটার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া গেল। 

"আমি অবশ্য সামনের সপ্তাহ থেকেই অফিস যেতে শুরু করব। এই তিনটে চারটে দিন আরাম করব, ঘর গোছাব।" 
"বাঃ তাহলে তো কাল তোমায় গাইড করে ডিসির বাকিটা ঘুরে নেব,সরি তুমি বলে ফেললাম"
"হ্যাঁ, অসুবিধে নেই। কিন্তু কাল আমি যাব না তো, তুমি কী শুনলে এতো সময়? আমি ডিসিতে গেলেই মাইক আবার আমায় ঠিক ধরতে আসবে"
"হ্যাঁ, আসুক না, আমি তো থাকব" শুনে হঠাৎ বিকট রকম হাসতে থাকে সুভদ্রা, বিষম টিশম খেয়ে একাকার। 
"তুমি? তোমার তো শুধু হাইট আছে, এমন রোগা তুমি তোমায় তো মাইক ব্যাকপ্যাকে ভরে নিয়ে চলে যাবে" কোনোরকমে হাসি সামলে বলে সুভদ্রা। বেশ আহত হ'ল ঋজু, যদিও জানে কথাটা ভুল বলেনি সুভদ্রা। ব্যাপারটাকে লঘু করতে সুভদ্রা হঠাৎ বলে 
"হে গাই, আই হ্যাভ অ্যান আইডিয়া, বলব?"
"বলো" কিছুটা হতাশ, ক্লান্ত শোনায় ঋজুর আওয়াজ। 
"কাল বরং একটা অন্য জায়গায় যাই" ঠিক ধরতে পারল না ঋজু। সুভদ্রা চলে তো যাবেই, এ আবার কি বলে? 
"মানে?" 
"মানেটা হ'ল তোমায় অন্য একটা জায়গা যদি দেখাই, কিছুটা লং ড্রাইভ। ধর, এখান থেকে উমমম তিন ঘন্টার মতো লাগবে একটা জায়গা আছে লুরে কেভার্নস্। সেটা হ'ল অনেকগুলো কেভ একসাথে আর তার ভেতরে স্ট্যালাকটাইট স্ট্যালামাইট হয়ে দারুন দেখার মতো সুন্দর। যাবে?"
"যেতে পারি কিন্তু কার রেন্ট করতে লাগবে, আমি তো গাড়ি আনিনি" 
"কেন? আমার গাড়ি আছে" 
"তাহলে তুমি টে্রনে যাচ্ছিলে যে?"
"সে তো, ডিসিতে গাড়ি পার্ক করার অসুবিধে, তার ওপর খুব দামী" 

"সর্বক্ষণ তোমার এই বিশুদ্ধ বাংলা শুনলে কেমন না অস্বস্তি হয়" হাসতে থাকে ঋজু। ঠিক হ'ল পরদিন সকালে ওরা যাবে ভার্জিনিয়ার লুরে কেভার্নস্ এ। ঋজু ঘুরতে বেড়াতে ভালোই বাসে, আর এ তো বিনা প্ল্যানে বেড়িয়ে পড়া, এটার মজাই আলাদা। তবে রাস্তার জন্য বেশ কিছু জল, শুকনো খাবার নিয়ে নিতে হবে। রেস্ট এরিয়া পেলেও সেখানে কি পাবে কি পাবে না জানা নেই। তাছাড়া রেস্ট এরিয়া দেখলেই যে দাঁড়ানো যাবে তেমন না ও হতে পারে। মোটমাট সন্ধ্যের গুমোট ভাবটা কেটে বেশ খুশি খুশি মুডে রাত কাটাল দু'জনেই। 

সক্কাল সক্কাল রওনা দিল, যদিও গাড়ি সুভদ্রার ঋজু প্রথমে চালানোর অনুমতি পেল, সুভদ্রা নেভিগেটর হয়ে ম্যাপ নিয়ে পাশের সিটে। তখন তো গ্লোবাল পসিশনিং সিস্টেম বা জিপিএস এতো জনপ্রিয় ছিল না, যে তাকে বলে দিলেই সে পথ বাতলে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। তখন ইন্টারনেট থেকে ডাইরেকশন প্রিন্ট করে নিতে হ'ত কিম্বা পথের নির্দেশক বোর্ড দেখে চলতে হ'ত অথবা বড় ম্যাপ খুলে তাতে দাগিয়ে নিয়ে চলতে হ'ত। কোথাও ভুল হলে সে ভারী গোলমাল; দিনের বেলা তাও একরকম রাতের বেলায় খুবই বিপদে পড়তে হ'ত ভুল হলে। রাত্রে বড় ম্যাপে দাগিয়ে রেখেছে সুভদ্রা, এখন সেটা দেখে দেখে বলতে থাকল কোনদিকে যেতে হবে। 

ভার্জিনিয়া ভারী মনোরম পাহাড়ে ঘেরা রাজ্য। প্রায় ৬৫ শতাংশ জঙ্গলে ভরা এই রাজ্যের পূব প্রান্তে অ্যাটলান্টিক ওশন। অ্যাপালাশিয়ান পাহাড়ের একটা অংশ ব্লু রিজ মাউন্টেনস নামে এই রাজে্যর অন্তর্গত। ব্লু রিজের সর্বচ্চ শিখর যেটি প্রায় ৫৭২৯ ফিট সেটিও এই রাজ্যেই, নাম মাউন্ট রজাসর্। পাহাড়ের ঢালে ঢালে কোথাও কোথাও অনেক গাছে ফুল ফুটেছে দেখতে পেল। ভার্জিনিয়া ওয়াশিংটন ডি.সির তুলনায় গরম বেশি। কাজেই এখানে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। রাস্তার ধারে কখনও কখনও দাঁড়িয়ে ফটো তোলে ঋজু। স্টিয়ারিং যেহেতু তারই হাতে কাজেই দাঁড়ানর ইচ্ছে হলে টুক করে হ্যাজার্ড লাইট জ্বালিয়ে গাড়ি রাস্তার ধারে সরিয়ে নিচ্ছে। বেশ ক'বার করার পর একবার ঋজু নামতেই সুভদ্রা গিয়ে চালকের আসনে। গাড়িতে উঠতে গিয়ে ঋজু বেকুব। 

"এটা কি হ'? আমি চালাচ্ছিলাম তো" 
"হ্যাঁ, কিন্তু তোমার যে অবস্থা দেখছি তাতে এই ভাবে চললে দশ দিন লেগে যাবে পৌঁছতে" 
"মোটেই না, আমি সবখানে অল্প সময়ই দাঁড়াচ্ছি"

"ঠিক আছে, এরপর আমিও তাহলে 'অল্প সময়' স্মোক করার জন্য দাঁড়াব, তুমি নন স্মোকার বলে আমিও কন্ট্রোল করছি" সুভদ্রার কথায় পুরো বাকরুদ্ধ ঋজু। বেজার মুখ করে ওই ক্যামেরা তাগ্ করে বসে রইল জানলা দিয়ে বা উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে যতোটুকু তোলা যায়। ফটো তোলার সাথে মুখ চালায় চিপস, কোল্ডড্রিঙ্কসে। লুরে কেভার্নস পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর। প্রবেশ পথের গা ঘেঁষেই একটা রেস্তোঁরাঁ ঋজুর তো ক্ষিধেয় পেট চোঁচোঁ দেখে সুভদ্রাও কোনো কথা না বলে পা বাড়াল রেস্তোঁরাঁর দিকেই। 'বেশ মিলেছে দু'জনের' মনেমনে ভাবে ঋজু। "তা গাইড সাহেবা এই লুরে না মুরে কি যেন, এটা সম্পর্কে কিছু বলুন" হাসতে হাসতে পিছে লাগে সুভদ্রার। 

"সে ওদের গাইড থাকে তারাই বলবে, আমি তো এখানকার গাইড না, এখনতো আমি দেখতে এসেছি" খেতে খেতে উত্তর দেয় সুভদ্রা। তবে সংক্ষেপে জানিয়েও দেয় লুরে কেভার্নস সম্পর্কে।  মোটামুটি ১৮৭৮ সালের তেরোই আগস্ট নাগাদ স্থানীয় বাসিন্দা জনা পাঁচেকে মিলে এই কেভার্নটি আবিষ্কার করেন। অ্যান্ড্রু জে ক্যাম্পবেল নামের এক টিনের কারিগর, তাঁর তেরো বছুরে নেফিউ ক্যুইন্ট আর স্থানীয় ফটোগ্রাফার বেন্টন স্টেবিনস মূল উদ্যোক্তা। চুনাপাথরের একটি স্তম্ভ এবং তার কাছের একটি ধ্বস নামা গর্ত যেটার ভেতর থেকে কিনা আবার ঠান্ডা বাতাস বের হয়ে আসছে এই ব্যাপারটাই ওঁদের কৌতুহল জাগায়। প্রায় ঘন্টা চারেকের প্রচেষ্টার পর ছোট্ট একটা গর্ত করে কোনোক্রমে অ্যান্ড্রু আর ক্যুইন্ট একটা দড়ি বেয়ে মোমের আলোয় আবিষ্কার করেন সেই সুন্দর প্রাকৃতিক সৃষ্টির। প্রথম যে কলামটি তাঁরা দেখতে পান সেটির নাম দেন ওয়াশিংটন; ইউনাইটেড স্টেস্টস্ এর প্রথম প্রেসিডেন্টের সম্মানে। এরপর যে জায়গাটায় ওঁরা পৌঁছন সেটার নামকরন হয় স্কেলিটনস্ জর্জ। মানুষের ব্যবহৃত বহু জিনিষ সাথে প্রস্তরিভূত কঙ্কালও ছিল সেখানে। একটি কঙ্কাল যেটি দেখে আন্দাজ করা হয় সেটি একজন নেটিভ অ্যামেরিকান বাচ্চা মেয়ের, সে বোধহয় পাঁচশো বছর ধরে ক্রমে ক্রমে স্ট্যালাকটাইটে রূপান্তরিত হয়েছে। যদিও আসল কারন অজানা তবু আন্দাজ করা হয় যে, কোনোভাবে হয়ত ধ্বস নামায় মেয়েটি চাপা পড়ে যায় ওই গর্তে। প্রস্তরিভূত সেই মেয়েটিকে সম্মান জানাতে ওই কলামটির নাম হয় প্রিন্সেস কলাম। 
(আগামী পর্বে)

© মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী



Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.