>

মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 7/15/2015 |



মধুচন্দ্রিমা (২য় পর্ব) 
আগে যা ঘটেছে::: সুভদ্র ওয়াশিংটন ডিসি দেখতে এসেছে। বাসে ঘুরবে বলে ঠিক করেছে।

বাসে ওঠার পর প্রথম একজন মহিলা কন্ঠ একটু জড়ানো ইংরাজীতে তাদের সকলকে স্বাগত জানালো। তারা কোথায় কোথায় যাবে সেসব সম্পর্কে দ্রুত জানালে। সুভদ্রর একটু অধৈর্য্যই লাগছিলো এতো বকবক শুনে। কিন্তু হঠাৎই শোনে সেই নারীকন্ঠ বলে উঠল "সুপ্রভাত, আস্সেলাম আলিকুম, নমস্কার আমার বাঙলাভাষী বন্ধুরা আমি আপনাদের গাইড সুভদ্রা আজ আপনাদের সাথে রয়েছি। ওয়াশিংটন ডি.সিতে আপনাদের স্বাগত। আসুন জেনে নিই আজ আমরা কোন কোন দ্রষ্টব্য গুলি দেখব" বাংলা শুনে আনন্দিত সুভদ্র উঁকি ঝুঁকি দিয়ে আবিষ্কার করলো তার মোটেলের সেই মেয়েটি যাকে কিনা সে স্প্যানিশ মেয়ে ভেবেছিলো। সে এখন ঝড়ের বেগে বর্ননা দিচ্ছে প্রথম দ্রষ্টব্য ওয়াশিংটন মনু্যমেন্ট সম্পর্কে,বাসও গুটি গুটি এগোচ্ছে সেই দিকেই। "এই মনু্যমেন্টটি জর্জ ওয়াশিংটনের নামানুসারে নামকরন করা হয়েছিলো। ১৮৪৮ সালে এটি তৈরীর কাজ শুরু হলেও ১৮৫৪ থেকে ১৮৭৭ ফান্ড কম থাকায় এর কাজ সাময়িক বন্ধ হয়ে যায়। মনুমেন্টটি মার্বেল পাথর, গ্রানাইট এবং ব্লু স্টোন জেনেসিস দিয়ে তৈরী। তবে লক্ষ্য করলে দেখবেন পাথরের রং আলাদা চোখে পড়বে, কাজ বন্ধ হবার নির্দশন স্বরূপ। ১৮৮৪ সালে বাইরের কাজ সম্পূর্ন হলেও ভিতরের কাজ এবং ফিনিশিং টাচ দিতে দিতে ১৮৮৮ সাল হয়ে যায়। মনুমেন্টটি একটি অবলিক্স এবং পৃথিবীর উচ্চতম অবলিক্স স্ট্রাকচার। অবলিক্স মানে লম্বা চারটি সাইড ওয়ালা মাথার দিকটা সরু হয়ে পিরামিডের আকার নিয়েছে এমন স্ট্রাকচার। পাঁচশো পঞ্চান্ন ফিটেরও কিছু লম্বা এই মনু্যমেন্ট। ভিতর দিয়ে মনু্যমেন্টের মাথায় উঠবার ব্যবস্থা আছে যেখান থেকে পুরো ওয়াশিংটন ডি.সি শহরটা, মেরিল্যান্ড ভার্জিনিয়াও দেখতে পাওয়া যায়।" এরপর কতোসময় মনু্যমেন্টের এখানে বাস দাঁড়াবে, কখন আবার সবাইকে বাসে এসে উঠতে হবে নিজেদের বাস কিভাবে খুঁজে পাবে সব বুঝিয়ে বলতে থাকে মেয়েটি। এতোক্ষনে কাল রাতের পিৎজা রহস্য দূর হোলো; ইংরেজীতে সুভদ্র আর সুভদ্রা বানান একই রকম, কাকতালীয় ভাবে একই মোটেলে দুজনেই ছিলো, নিশ্চয়ই এই মেয়েটি অর্ডার করেছিলো, ঘরের নম্বর ভুল করে ডেলিভারি বয়। কিন্তু নাম মিলে যাওয়ায় সব উলোটপালট। আচ্ছা মেয়েটি তো স্থানীয়, ট্যুর কোম্পানীতে কাজ করে যখন, তাহলে ও মোটেলে কেন? ওর তো বাড়িতে থাকা উচিত ছিলো, ঋজু এই সব ভাবতে ভাবতে মেয়েটি আর কি কি বলছে খেয়ালই করতে পারলনা। শুধু ঝটপট কটা ছবি তুলে আবার বাসে এসে বসল,পরের গন্তব্য লিঙ্কন মেমোরিরাল। 

বাসের সব যাত্রীরা ফিরে এলে আবার ধীরে বাস রওনা হোলো, সুভদ্রা আবার বলতে শুরু করল লিঙ্কন মেমোরিয়াল সম্পর্কে। "লিঙ্কন মেমোরিয়াল, নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এটি ১৬তম প্রেসিডেন্ট অ্যাব্রাহাম লিঙ্কনের স্মৃতি সৌধ। গ্রীক ডরিক টেম্পলের ধাঁচে তৈরী এই মেমোরিয়ালটি ১৯২২ সালে সর্বসাধারনের উদ্দেশে্য খুলে দেওয়া হয়। ভেতরে ষাট ফুট উঁচু ষাট ফুট চওড়া চুয়াত্তর ফুট লম্বা অ্যাব্রাহাম লিঙ্কনের একটি বসা মুর্তি দেখতে পাওয়া যাবে। মুর্তিটির পিছনে "IN THIS TEMPLE AS IN THE HEARTS OF THE PEOPLE FOR WHOM HE SAVED THE UNION THE MEMORY OF ABRAHAM LINCOLN IS ENSHRINED FOREVER" খোদাই করা আছে। এই মেমোরিয়ালটির এখানেই ১৯৬৩ সালের ২৮শে আগস্ট মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র তাঁর প্রখ্যাত  "আই হ্যাভ আ ড্রিম" স্পিচটি দিয়েছিলেন। যেখানে দাঁড়িয়ে উনি স্পিচ দেন সেখানে একটি ফলক লাগানো আছে। এই ওয়াশিংটন মন্যুমেন্ট ও লিঙ্কন মেমোরিয়ালের মধ্যবতর্ী অংশে ভিয়েতনাম ওয়ার মেমোরিয়াল, কোরিয়ান ওয়ার মেমোরিয়াল এবং ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু মেমোরিয়াল দেখতে পাওয়া যায়। লিঙ্কন মেমোরিয়ালের ঠিক সামনে একটি রিফ্লেক্টিংপুল রয়েছে যাতে আমরা ওয়াশিংটন মনু্যমেন্টের ছায়া দেখতে পাই। আপনারা মন্যুমেন্টের দিক থেকে তাকালে লিঙ্কন মেমোরিয়ালের ছায়া দেখতে পাবেন। আর লিঙ্কন মেমোরিয়ালের সিঁড়ি তে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করবেন ওয়াশিংটন মন্যুমেন্ট এবং তার পিছনে ক্যাপিটল হিল কে একলাইনে দেখতে পাওয়া যায়।" বাস থেকে নামার পরেও সুভদ্রা বলে চলেছে বাইরের কারুকাজের ঠিক কি অর্থ। ভিতরে লিঙ্কনের বলা কোন কথা গুলো খোদাই করা, আরোও কত শত ইনফর্মেশন, ঋজুর সেসব শোনবার ইন্টারেস্ট নেই, সে ততোক্ষনে ফটো তুলতে ব্যস্ত। তখন তো ডিজিটাল ক্যামেরা ছিলোনা কাজেই একটু বুঝে দেখে তুলতে 'ত যাতে ফিল্ম নষ্ট নাহয়। এখানে দাঁড়িয়ে আরোও জানল পুরো এলাকাটি কে ন্যাশনাল মল বলাহয়। তাতে এই সব সৌধগুলি এবং স্মিথসোনিয়ান গ্রুপের তত্ত্বাবধানে অনেকগুলি মিউজিয়াম অন্তর্গত। ন্যাশনাল পার্কগুলি দেখভালকারি সংস্থা এই ন্যাশনাল মল এরও দায়িত্বে রয়েছে। 

পরবর্তী গন্তব্য হোয়াইট হাউস, অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্টের বাসভবন। তবে হোয়াইট হাউস যাবার পথে কোরিয়ান ওয়ার মেমোরিয়াল, ভিয়েতনাম ওয়ার মেমোরিয়াল বা ওয়াল্ডর্ ওয়ার টু মেমোরিয়াল এর মতো ছোটোখাটো সৌধগুলি অল্প সময়ের জন্য দেখার অনুমতি পাওয়া যাবে। কোরিয়ান ওয়ার মেমোরিয়ালে গ্রানাইট পাথরের দেওয়ালে FREEDOM IS NOT FREE কথাটি বড় বড় হরফে লেখা ও তার নীচে যোদ্ধাদের নাম খোদাই করা তার পাশেই ইউ এস আর্মির মেরিন কর্পস, নেভি কর্পস, এয়ার ফোর্সের যোদ্ধাদের মতো করে কিছু মুর্তি বানানো আছে এবং সেগুলিকে একটু গাছপালা জঙ্গলে বসানো কারন কোরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের এফেক্ট আনার জন্য। এর পাশেই ভিয়েতনাম ওয়ার মেমোরিয়াল যেখানে কর্নাটকের গ্যাব্রো পাথরের দেওয়ালে যোদ্ধাদের নাম খোদাই করা আছে। তার আশেপাশে তিনজন সৈনিকের মুর্তি এবং একজন আহত সৈনিকের সেবায় রত এক মহিলার মুর্তি ভিয়েতনাম ওয়ারের যোদ্ধাদের ও যেসব মহিলারা ওই সময়ে সাহায্য করেছিলেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের উদ্দেশে্য রাখা আছে। এর পরেই ফোয়ারা ঘেরা ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু মেমোরিরাল। বাস ধীরে ধীরে হোয়াইটহাউস অভিমুখে রওনা দিচ্ছে বাসের জানলা দিয়ে দেখা যায় টমাস জেফারসন মেমোরিয়াল। পোটোম্যাক নদীর টাইডাল বেসিনে মার্বেলের সৌধটি প্রায় লিঙ্কন মেমোরিয়ালের মতোই লম্বা লম্বা থাম ওয়ালা চেহারা। মাথাটা অবশ্য গোল। ভেতরে তৃতীয় প্রেসিডেন্ট এবং অ্যামেরিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা টমাস জেফারসনের একটি ব্রোঞ্জের মুর্তি দেখতে পাওয়া যায়। বাস আজ যাবেনা সেখানে, নাঃ সুভদ্রর খুব আগ্রহ জন্মালো না কারন এই রকম স্মৃতিসৌধ, মুর্তি এখানে ছড়ানোহয়ত প্রত্যেকটার নিজস্বতা রয়েছে তবু প্রতিটা দেখতে বসলে মুস্কিল। হোয়াইট হাউসের অবশ্য কিছুটা দূরে বাস দাঁড়ালো যেখান থেকে হেঁটে গিয়ে দেখতে হবে। আর লম্বা লম্বা শিকওয়ালা বেড়ার বাইরে থেকে দেখতে হয়। ভেতরে ঢুকতে গেলে অনুমতি পত্রের জন্য আলাদাকরে আবেদন করতে হয়। 

১৮০০ সালে দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস্ এর সময় থেকে এই বাড়িটি প্রেসিডেন্টদের অফিসিয়াল রেসিডেন্ট এবং প্রিন্সিপল ওয়ার্ক প্লেস হিসাবে ব্যবহৃত হয়। তবে ১৮১৪ সালে বৃটিশ সৈন্যদের দ্বারা চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাড়িটি। ভিতরের বাইরের বেশিরভাগ টাই পুড়ে খাক হয়ে যায়। যদিও তক্ষুনি সারাই এর কাজ শুরু হয়। পঞ্চম প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ১৮১৭ সালে অর্ধ্ব সারানো বাড়িতেই থাকতে শুরু করেন। এই রকম সময় থেকেই বাড়িটির নাম হোয়াইট হাউস হয়, শরীরে পুড়ে যাওয়ার ওপর সাদা প্রলেপ লাগানোর সাথে বাড়িটির পুড়ে যাওয়া ও তারপর সারাই করে সাদা রং দেওয়াকে মিলিয়ে এই নাম চালু হয়। এর আগে প্রেসিডেন্টস্ হাউস, প্রেসিডেন্টস্ প্যালেস, প্রেসিডেন্টস ম্যানসন এমন বিভিন্ন নামে ডাকা হোতো। এরপর থেকে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নানান প্রেসিডেন্ট এর দ্বারা বাড়িটির এক্সটেনশন হয়, তাতে সুবিধাজনক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যেমন প্রেসিডেন্ট রুসভেল্ট এর সময় থেকে হুইলচেয়ার নিয়ে চলার সুবিধা হয় এমন বন্দোবস্ত করা হয়। বর্তমানে বাড়িটি তে রয়েছে ছ'তলা সমান প্রায় ৫৫০০০ স্কোয়ার ফিট ফ্লোর স্পেস, ১৩২টি ঘর, ৩৫টি বাথরুম, ৪১২ টি দরজা, ১৪৭টি জানলা, আঠাশটি ফায়ার প্লেস, আটটি সিঁড়ি, তিনটি এলিভেটর, পাঁচজন ফুলটাইম শেফ, একটি টেনিস কোর্ট, একটি সিঙ্গল লেনের বোলিং অ্যালি, একটি মুভি থিয়েটার যেটিকে হোয়াইট হাউস ফ্যামিলি থিয়েটার নামেই বলা হয়। এছাড়াও জগিং ট্র্যাক, সুইমিংপুল, পুটিং গ্রীন বা গল্ফএর কোর্ট। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে প্রতি সপ্তাহে অন্ততঃ তেত্রিশ হাজার মানুষ হোয়াইট হাউস দেখতে যান

এই অবধি দেখতে দেখতে দুপুর, লাঞ্চের সময় হয়েছে, একটা ফাস্ট ফুডের দোকানে নিয়ে গেল বাস। তবে ঋজু একটু হতাশই হচ্ছে চেরীব্লসমের ফুল তেমন ফোটেনি দেখে। এক আধটা গাছে হয়ত বিচ্ছিন্ন কিছু ফুল, ব্যস্ ওই পর্যন্তই। তারমানে হয় আবার আসতে হবে, নতুবা অন্যত্র দেখতে হবে। খেতে খেতে এইসব ভাবছে, এমন সময় হঠাৎ লক্ষ্য করল একটি ছেলে এসে সুভদ্রাকে দোকানের বাইরে ডেকে নিয়ে গেল। কাঁচের ভেতর থেকে দুজনের কথোপকথন শুনতে না পেলেও বুঝতে পারল কোনো সুখকর আলাপ হচ্ছেনা দুজনের। সুভদ্র ক্রমশঃ টের পাচ্ছে ওর অকারণ কৌতুহল, আকর্ষণ জন্মাচ্ছে এই সম্পূর্ণ অপরিচিত মেয়েটির প্রতি। হয়ত কোনো বাঙালি মেয়েকে এমন জীবন যাপনে এই প্রথম দেখল তাই। ভাবছিল সুভদ্রা দোকানের ভেতরে ফিরলে ওর সাথে গিয়ে আলাপ জমাবে। একা যখন, একই টেবিলে বসতে চাইতেই পারে। মনের কথা মনেই রইল সুভদ্রা ওই ছেলেটিকে বিদায় দিয়ে দোকানমুখী হতেই বাংলা বলিয়ে গ্রুপটার থেকে মহিলারা গিয়ে কথা আরম্ভ করল। 
(চলবে) 
©মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী



Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.