>

ঐন্দ্রিলা মুখার্জী

SongSoptok | 11/10/2014 |





.

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চান্দ্রেয়ী ভিজে চুল , ঈষৎ কোঁকরানো , টিকালো নাক,সুডৌল চিবুক, ছোট কপাল ডানহাতের তর্জনী ও বুড়ো আঙুলের সাহায্যে এক চিমটে সিঁদূর নিয়ে সরু সিঁথিতে ছোঁয়ালো চান্দ্রেয়ী তারপর নাকের ওপরে পড়া গুঁড়ো সিঁদূরটা শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে, একটু হাসলো আঁচলটা ঠিক করে আরও একবার আয়নায় নিজেকে দেখলো আর ভিজে চুলটা পিঠের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে , একটু নাক কুঁচকে ,মিউজিক সিস্টেমটা অন্ করল এফ.এম এ রূপঙ্করের গান ....."গভীরে যাও, আরও গভীরে যাও.....এই বুঝি তল পেলে ,ফের হারালে.....প্রয়োজনে ডুবে যাও".......হালকা একটা ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো চান্দ্রেয়ী একটা বালিশ নিয়ে শরীরটা এলিয়ে দিল বিছানায় চোখ বুজে একটু শ্বাস নিল, যেন আঘ্রাণে অনুভব করতে চাইলো গানটাহঠাৎ একরাশ ঝোড়ো হাওয়ার মতো ঘরে ঢুকলো আত্রেয়ী 'এই দিদি, জাম্বোর ফোন ! ধর ধর '.......রেশ কেটে গেলো চান্দ্রেয়ীর ফোন হাতে নিয়ে স্নিগ্ধ কন্ঠে বলল 'হ্যালো, এই যে মশাই তোমার কি ব্যাপার বলতো, ফোন করতে হলে খালি কি ত্রয়ীর নাম্বারটাই মনে আসে ?'...ফোনের ও প্রান্তে রাজদ্বীপের আরক্ত কন্ঠ ভেসে ওঠে ....


রাজদ্বীপ : তাই , নাকি তোমার ফোনটা কোনও সময়ই তোমার কাছে থাকেনা ! সারাদিন কোথায় থাকো দয়ি ....ফোনের আওয়াজও শুনতে পাও না ?
চান্দ্রেয়ী : ওহো ,সরি সরি , আমি স্নানে গিয়েছিলাম তো ......
রাজদ্বীপ : সেটা তো আধঘন্টা আগে...তারও একঘন্টা আগে কি করছিলে শুনি ?
চান্দ্রেয়ী : তুমি কি আমাকে জেরা করছো নাকি !
রাজদ্বীপ : ল্যান্ডলাইনটা এনগেজড ছিলো ....মানে নেট খোলা ছিলো ..যাক্ ছাড়ো ,কাজের কথায় আসি....আমার এখানে আরও দিন তিনেক সময় লাগবে...ফিরতে ফিরতে শনিবার ডিংগোকে নিয়ে একটু  বেরিয়ো ,তবে সাবধানে ,আজকাল এতো আনমনা হয়ে থাকো....
একটু চুপ করে থেকে চান্দ্রেয়ী বলে,
'
ঠিক আছে বাবা,ঠিক আছে ....জানতো ....( একটু চুপ করে থেকে)....না থাক পরে বলব....তুমি কি ত্রয়ী বা ডিংগোর সাথে কথা বলবে?'
রাজদ্বীপ : না না আমি এখন রাখছি
ফোনের লাইন কেটে গেলো ....চান্দ্রেয়ী হাতে ফোনটা ধরে কিছু একটা ভাবতে লাগল আত্রেয়ী ঘরে আসল,বলল 'কিরে , কথা হল? জাম্বো কি বলছে ? কবে ফিরছে?'
চান্দ্রেয়ী কথাটা ঠিক শুনেও শুনেছিল না....আত্রেয়ী বিছানার ওপর ফেলে রাখা ফোনটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল'তুই কিন্ত একটু বেশিই ফিদা হয়ে যাচ্ছিস সাঁঝে'র ওপর'....
কথা শেষ না হতেই চান্দ্রেয়ী বলে উঠল 'এভাবে বলিস না,....একটা সাদামাটা ব্যাপারকে নিয়ে এত জল ঘোলা করার খুব দরকার আছে কি ?'

আত্রেয়ী: সাদামাটা হলেই ভাল....চ্যাটিং আমরাও করি ....কিন্তু এতটা ইনভল্ভমেন্ট....আই থিন্ক....

চান্দ্রেয়ী: ঔচিত্যবোধটা মানুষের কনসেন্স থেকে আসে ত্রয়ী, আর আমার কনসেন্স আমাকে কাউন্টার করেনি কখনও ....তাই...

আত্রেয়ী: ওহো দিদিভাই....তুই রেগে যাচ্ছিস....লিভ্ ইট.....চল না আজ একটু শপিং -এ যাই!!
.......
এই বলে আত্রেয়ী চান্দ্রেয়ীর কাবার্ডে রাখা শাড়ি গুলো উল্টে পাল্টে দেখতে লাগলো ....

চান্দ্রেয়ী: (এবার একটু সহজ হয়ে হেসে বলল)হুম্.......বুঝেছি!! সায়ন আসছে বলে?.....কি রে ? তোর কি হল....ত্রয়ী যে তুই জিনস ছাড়া কিছু পড়তে চাইতিস না.....আজ আলমারীতে আমার শাড়ি দেখছিস!!! সায়ন তোকে কি বদলে দিল নাকি ....আচ্ছা চল বেরিয়ে আসি কোথাও একটা..........আত্রেয়ী দিদির কথায় একটু লজ্জা পেল
দুপুর বেলা খাওয়া দাওয়ার পর চান্দ্রেয়ী ওর বেডরুমে এলবেডরুমটা সাউথ ফেসিং......দক্ষিণে একটানা একটা বড় জানলা....সেই জানলার একদিকে চান্দ্রেয়ী আর রাজদ্বীপের হাল ফ্যাশনের স্টিলবেড বেডের পাশে সাইড টেবিল....ল্যাম্প শেড ...... উল্টোদিকে একটা ফুল সাইজ কাবার্ড উইথ মিরর...... ডিংগো ওদের ৯ বছরের ছেলে......ওদের পাশের ঘরটা ডিংগোর দুটো ঘরের মাঝে একটা কমন্ দরজা ডিংগো সিমলার একটা কনভেন্ট স্কুলে পড়ে এখন এই সামার ভেকেশনে বাড়ী এসেছে রাজদ্বীপ চায় ডিংগোর ব্রাইট কেরিয়ার ক্লাস ফোরের ডিংগো সারাদিন ল্যাপটপে ভিডিও গেম খেলছে
চান্দ্রেয়ীর বিয়ে হয়েছে এগারো বছর একটা সময় ছিল যখন সে তার অফিস নিয়ে বেশ ব্যস্ত থাকত
তখনও ডিংগো হয়নি তখন শ্বশুর শ্বাশুড়ি দুজনেই ছিলেন তার বছর দেড়েকের মাথায় ডিংগো হওয়ার আগেই রাজদ্বীপের মা মারা গেলেন এরপর ডিংগো হল....আর তার চারমাসের মেটারনিটি লিভ্ ও শেষ হল অফিস জয়েন করার জন্যে তখন ব্যস্ত চান্দ্রেয়ী....সাথে সাথে চিন্তাও....কি করবে....ডিংগোকে কার কাছে রেখে যাবে!!!! তার এই চিন্তায় ছেদরেখা টানল রাজদ্বীপ ছেলেকে আয়ার হাতে ছেড়ে অফিস করতে দিতে নারাজ সে ....শুরু হল চান্দ্রেয়ীর আপোষ বিপত্নীক শ্বশুর মশাই, ডিংগো, রাজদ্বীপ .....এই তিন বয়সী তিনটি পুরুষের মাঝখানেই আটকে রইল চান্দ্রেয়ী রাজদ্বীপের বাবা চাইলেও রাজদ্বীপের উষ্মা তাকে বলিষ্ঠ হতে দেয় নি

প্রায় চার বছর হল রাজদ্বীপের বাবা মারা গেছেন ....ডিংগো বর্ডিং-...আর রাজদ্বীপ প্রায়শই ট্যুরে.....চান্দ্রেয়ী দিনে দিনে ক্রমশঃ একা হয়ে গেছে এরই মাঝে তার মা মারা যাওয়ায় সে তার ছোটো বোন আত্রেয়ীকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছে চান্দ্রেয়ীর বাবা তো সেই কোন ছেলেবেলায় মারা গেছেন আত্রেয়ী এখন রিসার্চ করছে....বছর পঁচিশেকের আত্রেয়ী ভীষণ কনফিডেন্ট,স্মার্ট, শার্প.....সায়নের সাথে বন্ধুত্ব বছর দুয়েকের.... তারপর প্রেম!! ....বেলেঘাটার ছেলে সায়ন এখন অস্ট্রেলিয়ায়....স্কলার ছেলে ....নম্র,ভদ্র ,খোলামনের ,পুরোপুরি একজন বাঙালী সায়নের সাথে চান্দ্রেয়ীর কথা না হলেও আত্রেয়ীর কাছে শুনে শুনে খুব চিনে ফেলেছে ও আর এই সায়ন সেনগুপ্ত কদিন পরই আসছে কলকাতায়....তাই সন্ধেবেলায় চান্দ্রেয়ীরা যাবে কেনাকাটা করতে

দুপুর আর বিকেলের এই সময়টায় চান্দ্রেয়ীর একটু ঘুম ঘুম পায়.....গরমের সময় একটা আলসেমী চেপে ধরে সবাইকে কিন্তু আজ তার চোখে ঘুম নেই....কদিন ধরেই ডিংগো কম্পিউটারটা দখল করেছে তাই কিছুতেই আর তার নেট খোলা হচ্ছে না....আজ বেলায় একটু খুলেছিল কিন্তু সারবার বিজি থাকায় কানেক্ট করতে পারা যায় নি ডিংগো এখন ঘুমচ্ছে চান্দ্রেয়ী ল্যাপটপ নিয়ে বসল প্রায় তিন চার দিন হবে....কথা হয়নি সাঁঝের সাথে ফেসবুক লগ্ ইন করে চান্দ্রেয়ী.....সাইট খুলে যায়...আঃ পাওয়া গেছে....চান্দ্রেয়ীর যেন ধৈর্য ধরতে পারছিল না.....ইনবক্সে সাঁঝের অনেক মেসেজ্ জমা হয়ে আছে কোনো উত্তর করা হয়নি....বেশ খানিকটা রাগ ,অভিমান ,দুঃখ, অভিযোগ ....... তার সাথে কথা বলতে না পারার জন্যে একটা মনখারাপ.....চান্দ্রেয়ী সব লেখাগুলো নিমেষের মধ্যে পড়ে ফেলে....সাঁঝকে অনলাইন দেখতে না পেয়ে, চান্দ্রেয়ী টাইপ শুরু করে
'হাই সাঁঝ....
আছিস......নাকি?
রাগ করেছিস.......
                                                                
সরি....
প্লিজ.....
আমার সাথে কথা বলবি না তো ? যাঃ আমি নেট অফ করে দিচ্ছি ......

.........
এবার চ্যাট বক্সের নীচে টাইপিং লেখাটা দেখতে পাওয়া যায়...স্ক্রীনে রিপ্লাই ভেসে ওঠে...

সাঁঝ : তোর ব্যাপারটা কি দয়িতা ?
আমার কথা একটুও ভাবিস কি !!আমি যে একটু ফাঁকা সময় পেলে তোর সাথে কথা বলার জন্যে ছটফট করি....তার কি আদৌ কোনও মূল্য আছে?

দয়িতা(চান্দ্রেয়ী): আরে নারে...আমার বোনের উড বি কলকাতায় আসছে....আমার ছেলে পাঁচদিন হল গরমের ছুটিতে বাড়িতে এসেছে ....আমি সময় করেই উঠতে পারছি না.....প্লিজ একটু বোঝ....আচ্ছা তোর এমনি ছবি তো দিস না ...একটা রাগী মুখেরই ছবি দে....

সাঁঝ: না আর ছবি দেখতে হবে না,থাক......তোর বাড়ি যাব যখন পোস্তর বড়া আর বিউলির ডাল খাওয়াস.....আর তুই ই তো বলেছিস সারপ্রাইজ....আমরা পেন ফ্রেন্ডের মত শুধুই শব্দে থাকব....যতদিন না কলকাতায় যাচ্ছি .....

দয়িতা : হ্যাঁ তাইতো ....যাহোক বল তোর জি .এফ কেমন আছে ?কি নাম যেন....ওহো জিনা.....আচ্ছা এটাও কি আসল নাম নয় ,তোর সাঁঝ নামটার মত?
সাঁঝ: আসল নকলের কিছু নেই তো....আমি ডাকি 'জিনা' বলে....আর শোন , একটা মানুষকে অন্য একজনের থেকে আলাদা করতেই নাম দরকার...সারাজীবন তো ওই মা বাবাকে ওগো-হ্যাঁগো করতেই শুনলাম!! আর তুই তো তোর অনেক নামের মধ্যে একটা নাম বলেছিস.....তাতে তোকে চিনতে কি আমার অসুবিধে হয়েছে??

দয়িতা: জানিস, আমি মাঝে মাঝে ভাবি আমি তোকে কতটুকুই বা জানি তবুও কথা বলার নেশাটা কাটাতে পারছি না কেন কে জানে? তুই কলকাতা কবে নাগাদ আসবি....?

সাঁঝ : বলব না....সারপ্রাইজ দেব কলকাতায় পৌঁছে....আচ্ছা এখন আর নয়....পরে আবার....বাই

মনটা কেমন যেন একটু বিষণ্ণ হয়ে গেল চান্দ্রেয়ীর....ঘড়িতে প্রায় পাঁচটা বাজে....ফেসবুক লগ অফ করে বিছানায় একটু গড়িয়ে নিল চান্দ্রেয়ী....চোখটা বুজে একটা ভালোলাগা অনুভব করলো ....তার নিত্যদিনের পাঁচালী...কেমন যেন একটা ভালোলাগা.... নেশা.....মোহ!!!!! 

[পরবর্তী সংখ্যায়]


Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.