>

কথা কবিতা

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 11/10/2014 |



















এদিকে পাকবাহিনী ২৫ মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে  বলতে গেলে সারা বাংলাদেশেই নিজেদের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। নিপীড়িত জনগণ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ভারতে পাড়ি জমায়।২৬ মার্চ থেকে প্রথম এক সপ্তাহে মাত্র কয়েক হাজার লোক ভারতে যায়। মুখ্যত এরা ছিল আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী বিদ্রোহী সশস্ত্র লোকজন। কিন্ত এর অব্যবহিত পরেই ভীত সন্ত্রস্ত্র জনগণ ভারতে পাড়ি জমাতে থাকে।এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ১৫ এপ্রিলের মধ্যে এই সংখ্যা লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। এর পর মে মাসের মধ্যে এই শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১ লক্ষ।সংকটের গোড়ার দিকে তাজউদ্দিন ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশের গৃহযুদ্ধে ভারতীয় হস্তক্ষেপের বিষয়টি উত্থাপন করলে দিল্লীর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকমহল কর্তৃক তা প্রত্যাখ্যাত হয়। বিষয়টি ভারত সরকার তেমন প্রাধান্য না দেয়াতে প্রথমে তাজউদ্দিন একটু ভগ্নমনোরথ হলেও পরে ঘটনার জটিলতা উপলব্ধি করেন।এই মুহুর্তে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে পাক ভারত যুদ্ধ শুরু হলে সব চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম। কারণ তখন বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাক-ভারত যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হবে। তাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিণত হবে ভারতীয় চক্রান্তের একটি অংশ হিসেবে। তাই তাজউদ্দিন ভারত সরকারের কাছে শুধু বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের বিষয়টি দাবী হিসেবে জিইয়ে রাখেন। যদিও তার সহকর্মীরা তাকে বারবার চাপ দিচ্ছিলেন ভারতের কুটনৈতিক স্বীকৃতি আর ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য। কিন্ত দলের মধ্যে পাস্পরিক আস্থা আর সমঝোতা না থাকার কারণে বাস্তব সত্যকে তিনি কারো কাছে তুলে ধরতে পারেন নি

ভারতের দক্ষিণপন্থী বামপন্থীদের মধ্যে বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণেও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাগান্ধীকে ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে তখনো বাংলাদেশের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাড়াঁয়নি। যদিও চীন এবং আমেরিকার অবস্থান পরিস্কারভাবেই পাকিস্তানের পক্ষে। কিন্ত রাশিয়া তখন বিষয়টি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করে তা রাজনৈতিকভাবেই সমাধানের পক্ষপাতী
ভারতে যখন ক্রমশ শরণার্থীর চাপ বাড়তে থাকে বিশেষ করে হিন্দু শরণার্থীর সংখ্যার চাপ তখন ভারত সরকার এর একটা ব্যবস্থাগ্রহণে তৎপর হয়। কেননা এই বিপুল জনসংখ্যক জনগণকে কিছুতেই অনিশ্চয়তার মুখে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। তাই সিদ্ধান্ত হয় ন্যূনতম ব্যবস্থা হিসেবে ছাত্র-যুবকদের সশস্ত্র ট্রেনিং দেয়ার।এরই প্রেক্ষিতে ৩০ এপ্রিল ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করার দায়িত্ব পায়। যদিও এর আগে থেকেই বি এস এফ বিক্ষিপ্তভাবে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অল্প স্বল্প সাহায্য করে আসছিলো

মুক্তিযুদ্ধকে পরিচালনা করার জন্য বাংলাদেশকে প্রথমে চারটা সেক্টরে ভাগ করা হয়। চট্টগ্রাম সেক্টরের অধিনায়ক নিযুক্ত হন মেজর জিয়া, কুমিল্লা সেক্টরের অধিনায়ক মেজর খালেদ মোশাররফ, সিলেট সেক্টরের দায়িত্ব পান মেজর শফিউল্লাহ এবং কুষ্টিয়া সেক্টরের অধিনায়ক নিযুক্ত হন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপিত হয় কলকাতায় নম্বর থিয়েটার রোডে

পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে আরো সংহত করার জন্য যুদ্ধ এলাকা নির্ধারণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এই উদ্দশ্যকে সামনে রেখে জুলাইয়ের ১১ তারিখে সকল সেক্টর অধিনায়কদের নিয়ে দশদিনব্যাপী এক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন। এই অধিবেশনেই সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে প্রতিটি সেক্টরের সীমানা নির্ধারণ করা হয়

মুক্তিবাহিনীতে নিয়মিত সৈন্য ছাড়াও হাজার হাজার অনিয়মিত সৈনিক ছিলেন যারা শুধু দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। সরকারিভাবে মুক্তিবাহিনী দুইভাগে বিভক্ত ছিলঃ নিয়মিত বাহিনী গণবাহিনী। ইবিআর,ইপিআর পুলিশ আনসার মুজাহিদদের নিয়ে গড়ে উঠে নিয়মিত বাহিনী আর সর্বস্তরের জনগণের সমন্বয়ে উঠে গণবাহিনী

বাংলাদেশ সরকারের কর্তৃত্বের বাইরে মুজিব বাহিনী গড়ে উঠে চার যুবনেতার তত্ত্বাবধানে। এই চার নেতা হলেন, শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক তোফায়েল আহমেদ। ভারতীয় জেনারেল উবানের সহযোগিতায় এই বাহিনীর জন্ম হয়। এদের উপর জেনারেল ওসমানীর কর্তৃত্ব ছিল না প্রায় সাড়ে পাচঁ হাজার তরুণ মুজিব বাহিনীতে যোগদান করেন।মুজিব বাহিনীর প্রধান ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি
বাংলাদেশ সরকার কর্তৃত্বের বাইরে আঞ্চলিকভাবে আরো কিছু বাহিনী গড়ে উঠে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে যাদের অবদান কোন অংশেই কম নয়।  এগুলো হলঃ--------- সিরাজগঞ্জে লতিফ মির্জার বাহিনী,
                          ঝিনাইদহে আকবর হোসেনের বাহিনী
                          ফরিদপুরে হেমায়েত বাহিনী
                           পিরোজপুরে রফিক বাহিনী
                           টাঙ্গাইলে কাদের বাহিনী
                           বরিশালের কুদ্দুস মোল্লা, শিক্ষক আব্দুল গফুর আফতাব বাহিনীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য
মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং এর ক্ষেত্রে তরুনদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে ভারত প্রশাসনের সকল অংশের সমান উৎসাহ ছিল না বিশেষ করে বামপন্থী তরুণদের ক্ষেত্রে। এর অন্যতম কারণ ছিল নক্সালবাদী, নাগা, মিজো, প্রভৃতি সশস্ত্র বিদ্রোহীদের তৎপরতা হেতু পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা সম্পর্কে এদের উদ্বেগ। সে জন্য সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় যুব শিবির, অভ্যর্থনা শিবির স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সব শিবিরে ভর্তি করার জন্য স্ক্রিনিং পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। তদনুযায়ী বহির্দেশীয় আনুগত্য থেকে যারা মুক্ত, কেবল সে সব তরুণরাই আওয়ামী পরিষদ সদস্যদের দ্বারা সনাক্ত হওয়ার পর এসব শিবিরে ভর্তির অনুমতি পেত এবং এদেরই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে সুযোগ দেয়া হত। এতে অনেকে স্থানীয় রাজনীতির সুবিধার্থে অধিক সংখ্যায় কেবল নিজ নিজ এলাকার তরুণদের মুক্তিবাহিনীতে ঢোকাবার প্রবণতা দেখাতেন। অনেক ক্ষেত্রে এদের দৈহিক যোগ্যতা, সংগ্রামী স্পৃহা এবং চারিত্রিক গুণাগুণ উপেক্ষিত হয়েছে। এর ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের বৃহৎ একটি অংশ পরবর্তীকালে লড়াই থেকে সম্পুর্ণ দূরে থাকে।এমন কি কোন কোন ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ অপেক্ষা গ্রামীন বিবাদ ব্যক্তিগত রেষারেষির নিষ্পত্তিতে এমন কি সরাসরি লুটতরাজে অংশগ্রহণ করে

দলীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং এর আর একটা কুফল হল,আওয়ামী লীগের প্রতি অন্যান্য দলের বিদ্বেষভাব বৃদ্ধি।কারণ পাকবাহিনীর নির্যাতন দলমত নির্বিশেষে বাঙালি তরুণদের উপর যতই সম্প্রসারিত হয়েছে,ততই তরুণরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য ভারতে এসে ভীড় করেছে। মাসের পর মাস তারা অপেক্ষা করেছে সাধারণ শরণার্থী শিবিরে অথবা সরকার অননুমোদিত ক্যাম্পের দূর্দশার পরিবেশে। ফলে পাকবাহিনী দ্বারা নির্যাতিত হয়ে তাদের মধ্যে স্বাধীনতা স্পৃহা থেকে যে দলমত নির্বিশেষে একতাবোধ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে গড়ে উঠেছিল এই দলীয় রিক্রুটিং এর কারণে তা বহুলাংশে নষ্ট হয়ে যায়। এবং পরবর্তী সময়েও এই বিদ্বেষমূলক মনোভাব, রেষারেষি, দ্বন্দ্বের জের চলতেই থাকে

আগস্ট-সেপ্টেপ্বরের দিকে সামগ্রিক সমস্যার চাপে ভারত সরকারের নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে যখন দক্ষিণপন্থীদের প্রভাব হ্রাস পায়, এবং বাংলাদেশ মন্ত্রীসভার মধ্যে তাজউদ্দিনের অবস্থান অপেক্ষাকৃত সবল হয় তখন বাংলাদেশের অন্যান্য দল বামপন্থী তরুণসম্প্রদায়দের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ অনেকটা সহজতর হয়ে উঠে

মে ১৯৭১ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে পরিচালিত হয় চার সপ্তাহ মেয়াদী ট্রেনিং কার্যক্রম। এই ট্রেনিংএর মান ছিল নেহাৎই সাধারণ। মূলত শেখানো হত সাধারণ হালকা অস্ত্র বিস্ফোরকের ব্যবহার। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হয় দুই হাজার ছাত্র যুবক দলের প্রথম ট্রেনিং
তাজউদ্দিন ১০ এপ্রিল বেতার ভাষণে আক্রমনকারীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে যোগ দেবার জন্য বিশেষভাবে সকল রাজনৈতিক নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তার ইচ্ছা ছিল আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সদস্যদের সমবায়ে মন্ত্রিসভা গঠনের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সরকারকে সমর্থনদানকারী সব কয়টি রাজনৈতিক দলের সমবায়ে একটি মোর্চাগঠন করা এবং দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধ সমন্বয়ের দায়িত্ব এই মোর্চার হাতে অর্পণ করা তিনি রকম একটা ফলপ্রসু চিন্তা করেছিলেন শেখ মুজিবের অনুসৃত আদর্শ পথকে কেন্দ্র করেই। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,---

বৃটিশ আমলে অখন্ড বাংলার দাবী কার্যকর না হলেও পূর্ববাংলার স্বায়ত্বশাসনের দাবিটা পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ধূমায়িত হতে থাকে। ৫৪ সনে যুক্তফ্রণ্টের প্রধান দাবিই ছিল স্বায়ত্বশাসনের আর স্বায়ত্বশাসনের চেহারা্য ছিল স্বাধীনতার ছাপ। অর্থাৎ, যুক্তফ্রন্ট গঠনই প্রমান করে যে, বাংলার স্বায়ত্বশাসন বা বাংলার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে জোটের বিকল্প নেই। কিন্ত বাঙালি নেতৃবৃন্দকে জোটের রশিতে বেঁধে রাখাও যে কঠিন কাজ একথাও ছিল নির্মম সত্য। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর তাত্ত্বিক আদর্শের কারণে দেশের রাজনীতি বহুধা বিভক্ত, বহু বিভাজনে বিভাজায়িত। এর মুলে সিংহভাগ রাজনীতিবিদদের না আছে নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম, না আছে দেশের মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালবাসা। দেশ এবং দেশের মানুষ ব্যবহৃত হয়েছে ব্যক্তির উচ্চাকাঙ্খা চরিতার্থে,দেশ এবং দেশের মানুষ ব্যবহৃত হয়েছে মগজপ্রসুত তত্ত্বের প্রায়োগিক ক্ষেত্র হিসেবে। এমন সত্যের মুখোমুখি  হয়েছেন শেখ মুজিব রাজনীতির শুরু থেকেই। তারপরেও রকম একটা বৈপরীত্যের মধ্য দিয়েও শেখ মুজিব অন্যান্য দলের সাথে যে যোগাযোগ রক্ষা করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন তা শুধু মাত্র বাংলা,বাংলার মানুষকে ভালবেসে এবং ভালবাসাজাত স্বাধীনতা লাভের অভীপ্সা থেকেই। কারণ দলীয় প্রচেষ্টা দিয়ে শোষকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া যায়, কিন্ত আপামর জনতার সামগ্রিক মুক্তির প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। সে জন্য শেখ মুজিব ১৯৬১সালে কম্যুনিষ্ট পার্টির এক বৈঠকে গোপনে যোগ দেন। এই বৈঠকে শেখ মুজিব খোকা রায়ের একটি বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন, একটা কথা আমি খোলাখুলি বলতে চাই,আমার বিশ্বাস,গণতন্ত্র, স্বায়ত্বশাসন এসব কোন দাবিই পাঞ্জাবিরা মানবে না। কাজেই স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালির মুক্তি নেই।দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যেই আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ কর্মীদের সমন্বয়ে একটি গোপন সংগঠনের নিউক্লিয়াস তৈরি হয় ১৯৬২ সালে। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৬৬ সালে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। তাতে ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদ, আবুল কালাম আজাদ, চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম মান্নান। পরবর্তীতে পরিষদের ছাত্র ফোরামের সদস্য হন মনিরুল ইসলাম, কাজী আরেফ আহমেদ, আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ, স্বপন চৌধুরী, মফিজুর রহমান খান, মাসুদ আহমেদ রুমী শরীফ নুরুল আম্বিয়া।সত্তর সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তিলাভের পর শেখ মুজিব সিরাজুল আলম খান,আব্দুর রাজ্জাক একটি ফোরামের সদস্যরুপে বিপ্লবী পরিষদে কাজ করেন

ষাট দশকেই শেখ মুজিব বাংলাদেশ নামক একটি দেশের স্থাপনা ঘটাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে গিয়েছিলেন এবং সে লক্ষ্য ধরেই এগোচ্ছিলেন। খোদ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই তার সাথে তাল মেলাতে পারেন নি। দেশে সশস্ত্র সংগ্রাম ঘটাতে গেলে প্রতিবেশি ভারতের সাথে একটি লিয়াঁজো দরকার, উদ্দেশ্যেই তিনি ১৯৬২ সালে গোপনে ভারতে গিয়েছিলেন,কিন্ত কেন্দ্র থেকে তার আগমনের বার্তা আগরতলায় এসে না পৌছানোয় শেখ মুজিবকে বন্দী করে দুইদিন জেলে রাখা হয়। ভারত সরকারের এই উদাসীনতার কারণে শেখ মুজিব মনক্ষুন্ন হন,যারফলে পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতের উপর আস্থা রাখতে পারেন নি। তবু স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বার্থে পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে ভারতের সহযোগিতার বিকল্প নেই ভেবে ১৯৭০ সালে গণ পরিষদের সদস্য চিত্তরঞ্জন ছুতারকে তার প্রতিনিধি হিসেবে আবার ভারতে প্রেরণ করেন

ষাট দশকে শেখ মুজিব প্রকাশ্যে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আর অপ্রকাশ্য গোপনে সশস্ত্রবাহিনী তৈরি করতে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি জানতেন, যুদ্ধ লাগবেই। যে মানুষ জীবনভর নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির উপাসক, সোহরোওয়ার্দীর নিয়মতান্ত্রিকতা আর ভাসানীর গণসংযোগ নীতি যার রাজনীতির ভিত্তি, সেই মানুষ শুধু বঞ্চিত বাঙালির মুক্তির লক্ষ্যে একটি শোষণমুক্ত দেশের স্বপ্নে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সশস্ত্রযুদ্ধ পরিকল্পনার সাথে জড়িত হয়েছিলেন। যতদূর জানা যায়,আইয়ুব খানের সামরিক আইন জারীর পর ১৯৫৮ সালে নভেম্বর মাসে ময়মনসিংহে ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন পার্টি নামে একটি সশস্ত্র দল গঠিত হয়। সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে পুর্ববাংলাকে স্বাধীন করা এই দলের মূল উদ্দেশ্য ছিল। আওয়ামী লীগের সমর্থক আব্দুর রহমান সিদ্দিকী, খন্দকার ফজলুর রহমান, ন্যাপ সমর্থক এম সাঈদ এই দলের নেতৃস্থানীয় সদস্য ছিলেন। মাসেই স্থানীয় ন্যাপ নেতা নাসির উদ্দিনের পুত্র আলী আসাদের নেতৃত্বে জামালপুরে, ডিসেম্বরের প্রথম দিকে নেত্রকোণায় এবং ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে টাঙ্গাইলে এই দলের শাখা খোলা হয়
১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রহ্মপুত্র নদীবক্ষে একটি বড় নৌকার উপর এই দলের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই দলের কর্মীরা ভারতে চলে যায় অস্ত্র অর্থ সাহায্যের আশায়। ভারত থেকে কিছু পোষ্টার প্রচারপত্র ছাপিয়ে এনে তারা গোপনে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পূর্ববাংলার বিভিন্ন বার লাইব্রেরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডাকযোগে পাঠাতে থাকে।এ খবর শেরে বাংলা এবং সোহরোওয়ার্দীও জানতেন। কিন্ত মুজিব এর সাথে সরাসরি সম্পর্ক্ত ছিলেন। তিনি এই সশস্ত্রবাহিনীকে টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করতেন

গোয়েন্দা বিভাগ শত চেষ্টা করেও এই দলের হদিস পায় নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নেতাদের জড়িত থাকার বিষয়টি তৎকালীন শাসকের অনুমান ছিল মাত্র।সামরিক শাসন উৎখাত, সামরিক নেতাদের হত্যা,স্বাধীন পূর্ববাংলা প্রতিষ্ঠার কথা সব প্রচারপত্রের বিষয়বস্তু ছিল। এতে স্বাভাবিক ভাবেই শাসক মহলে ভীতিসঞ্চার হয় এবং অভিযান চালিয়ে অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে এই দলের কর্মী সংগঠকদের খুঁজে বের করে দমনমুলক ব্যব্যস্থা গ্রহণ করা হয়। ফলে ১৯৬০ সালের জুলাই মাসে এই দলের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়

প্রয়োজন অনুযায়ী অধিক সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট না হওয়াতে এবং সীমিত অস্ত্রের কারণে মে মাসে পাকবাহিনী প্রতিরোধ কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। অথচ সংগ্রামও যে সহজে শেষ হবার নয়, এই বিষয়টি যখন স্পষ্ট হয়ে উঠে তখন তাজউদ্দিন দীর্ঘ সংগ্রামের প্রস্তুতি হিসেবে আওয়ামী লীগের সাথে মোজাফফর আহমদ পরিচালিত ন্যাপ,মণি সিং এর বাংলদেশের কম্যুনিস্ট পার্টি,বাংলাদেশ কংগ্রেস দল,এবং সম্ভব হলে ভাসানীপন্থী ন্যাপকে একটি রাজনৈতিক ফোরামে একত্রিত করার চিন্তাভাবনা করেন। এই ফ্রন্ট গঠনের চিন্তা ছিল আওয়ামী লীগ কর্তৃক গঠিত সরকারের কোন পরিবর্তন তাদের ক্ষমতাকে সংকুচিত না করেই। কিন্ত বহুদলীয় ফ্রন্টের বিরুদ্ধে অধিকাংশ নেতা নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে। এটা যে শুধুমাত্র স্বায়ত্ব শাসনের দাবী নয়, এটা যে স্বাধীনতার সংগ্রাম, সংগ্রামের বৃহৎ প্রেক্ষাপটে যে জাতীয় ঐক্যের দরকার আছে কথা বুঝানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তাজউদ্দিনের পক্ষে। শেখ মুজিবের চ্ছত্রছায়ায় নীতি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে যদিও তার স্থান ছিল সুউচ্চে।কিন্ত তাজউদ্দিন নীতি প্রণয়ন করে শেখ মুজিবের হাতে দিয়েই ক্ষান্ত হতেন, আর সেই প্রস্তাবিত নীতি সম্পর্কে দলের দেশবাসীর সম্মতি আদায় করার দায়িত্ব ছিল শেখ মুজিবের। আজ সেই জনপ্রিয় নেতার অনুপস্থিতিতে সেই কাজটা করা নিয়ে তাজউদ্দিনকে হিমসিম খেতে হয়। আরো হিমসিম খেতে হয় দলের ভিতরে তার বিরুদ্ধে প্রচারণা অপপ্রচারের কারণে

মিজানুর রহমান চৌধুরী প্রশ্ন তোলেন যে, তাজউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী এবং দলের সাধারণ সম্পাদক উভয় পদই দখল করে রয়েছেন। মিজান চৌধুরী, জহিরুল কাইয়ুম প্রমুখ ব্যক্তিরা তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ক্ষেত্রে মন্ত্রী পরিষদকে সম্প্রসারণ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়।মশিউর রহমান যাদুমিয়া কলকাতায় উপস্থিত হয়ে প্রবাসী সরকারের মন্ত্রী হওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। আওয়ামী লীগের নেতারাও মন্ত্রী হওয়ার অভিলাষে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেন। খন্দকার মোশতাক, মনসুর আলী, কামরুজ্জামান স্ব স্ব উপদলের নেতৃত্বে থাকেন এবং প্রধানমন্ত্রীত্বের দাবীদার হিসেবে প্রচারণা চালাতে থাকেন। প্রবীন নেতাদের কেউ কেউ স্বাধীনতা ঘোষণা আদেশ অনুযায়ী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি কতৃর্ক প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করে তাজউদ্দিনকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায় সে পথ অন্বেষণে ব্যস্ত থাকেন

কলকাতায় অনেক আওয়ামী লীগ নেতারই গড়ে উঠেছে ছোটখাটো দপ্তর,উপদলীয় গ্রুপ। প্রভাব-প্রতিপত্তি,গাড়ি অর্থ এবং প্রচারযন্ত্র। সবাই যে যার মতে মুক্তি যুদ্ধে ব্যস্ত। নাই শুধু দলীয় শৃংখলাবোধ আর নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য

সবচেয়ে আত্মঘাতী ভূমিকা গ্রহণ করে শেখ ফজলুল হক মণির নেতৃত্বে যুবক ছাত্রবৃন্দ। সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ, আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ, নুরে আলম সিদ্দিকী এবং আব্দুল কুদ্দুস মাখন কলকাতায় একত্রিত হয়ে তাজউদ্দিন আহমদের সরকারকে উৎখাত করার জন্য একটি গ্রুপ তৈরি করলেন। এই যুবনেতাদের সহায়তা প্রদান করেন খন্দকার মোশতাক আহমদ, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, শেখ আব্দুল আজিজসহ প্রভৃতি পরিষদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। সম্পর্কে বদরুদ্দিন আহমদ তার স্বাধীনতা সংগ্রামের নেপথ্য কাহিনী গ্রন্থে লিখেছেন,

যুবনেতারা অনেকেই সেদিন ভেবেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আর বেঁচে নেই। ইয়াহিয়া খান এতোদিনে তার মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করে থাকবেন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাজউদ্দিন তাদের কোন দাবিই পূরণ করবেন না অথচ বঙ্গবন্ধু তাদের সাথে পরামর্শ না করে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না তিনি থাকলে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার দায়িত্ব তাদের হাতেই থাকতো। কিন্ত তাজউদ্দিনের দুঃসাহসের অন্ত নেই। তিনি ধমকের সুরে কথা বলেন। স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার ক্ষেত্রে যুবনেতাদের মতামত তিনি উপেক্ষা করছেন। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকলে তারা সব রকম সুযোগ সুবিধা হতে বঞ্চিত হবেন

যুবনেতারা মনে করেন যে, বঙ্গবন্ধুর ভাবমুর্তিকে কাজে লাগিয়ে তার নিকট আত্মীয় তরুণ শেখ মণির নেতৃত্বকে মেনে নিলে বাংলাদেশ থেকে আগত তরুণদের প্রভাবিত করা সহজ হবে। ওই তরুণদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা যদি শেখ মণির নেতৃত্বে করা যায় তাহলে ওদের মাধ্যমেই তাজউদ্দিন সরকারকে উৎখাত করা সহজ হবে। যুবনেতারা শেখ মণির প্রতি পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার করে তাদের পরিকল্পনা বাস্তুবায়নে প্রচেষ্টা চালাতে লাগলেন

তাদের পরিকল্পনা কাজে পরিণত করার প্রথম পর্যায়ে কয়েকজন যুবনেতা দিল্লী গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জানান যে, তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকহানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আগে তাদেরকে ভারত সরকারের সহায়তায় স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করার নির্দেশ দিয়ে যান।তাজউদ্দিন আহমদের প্রতি বাংলাদেশ থেকে আগত জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের সমর্থন নেই।এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীত্ব করার কোন অধিকার তাজউদ্দিন সাহেবের নেই। তাদের কথার সমর্থনে তারা বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের একটি চিঠি ইন্দিরা গান্ধীর হাতে দেন এবং বঙ্গবন্ধুর জৈষ্ঠ্য পুত্র শেখ কামালকে তার নিকট উপস্থিত করেন। বাংলাদেশ থেকে আগত তাদের অনুগত তরুণদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার জন্য তারা ইন্দিরা গান্ধীকে অনুরোধ জানান

ইন্দিরা গান্ধী তাদের অনুরোধ রক্ষা করেন। RAW এর বিশেষ তত্ত্বাবধানে দেরাদুনের অদূরে চাকতারায় এদের বিশেষ ট্রেনিংএর ব্যবস্থা করা হয়। ট্রেনিং এর দায়িত্ব দেয়া হয় জেনারেল উবানের উপর। শেখ মণির নেতৃত্বে এই বাহিনীর নামকরণ করা হয় মুজিব বাহিনী। এদের সর্বাধিনায়ক শেখ মুজিবুর রহমান। তার অবর্তমানে শেখ মণির আনুগত্য স্বীকার করে এদের শপথনামা পাঠ করা হত। অন্যদিকে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং হত তুরায় বি এস এফ এর তত্ত্বাবধানে। মুক্তি বাহিনীর স্যালুট গ্রহণ করতো জেনারেল ওসমানী। এভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে দুটি বাহিনী দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে সূচনায় অবশ্য বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন নিয়েই এই গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। মুক্তিবাহিনী গঠনের উদ্দেশ্যে দেশের ভিতর থেকে ছাত্র