>

কথা কবিতা

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 2/10/2015 |




প্রস্তাবিত ঐক্যফ্রন্টকে দূর্বল করে উপদেষ্টা কমিটিতে পরিণত করার কূটকৌশলটি ছিল মোশতাকের। বহুদলীয় কমিটি গঠন করার ফলে আওয়ামী লীগের যে অংশ ক্ষুব্ধ হয়,মোশতাক তাদেরকে তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে পরিচালিত করে। অথচ নিজের নিউইয়র্ক যাওয়া যাতে সম্ভব হয় জন্য তাজউদ্দিনের সাথে তার বাহ্যিক আচরণ ছিল ভিন্নরকম। জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠনের পাঁচদিন আগে, যখন বিষয়ে উর্ধতন প্রবাসী নেতৃবৃন্দ গোপনীয়তা বজায় রাখার চেষ্টায় ছিলেন, এমন কি ভারতীয় পত্র-পত্রিকাগুলোও ব্যাপারে কোন হদিস পায়নি তখন বাংলাদেশ প্রবাসী সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মোশতাক নিজেই লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার সংবাদদাতার কাছে জানান যে, শীঘ্রই ঐক্যবদ্ধ মুক্তিফ্রন্ট গঠিত হতে চলেছে এবং এর ফলে রাশিয়ার সমর্থন লাভ সম্ভব হতে পারে। ঠিক ওইদিনই ইসলামাবাদে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড ইয়াহিয়াকে প্রস্তাব করেন, কলকাতায় বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে তারা জানিয়ে রাখতে চান যে, ইয়াহিয়া মোশতাকের সাথে গোপনে আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছেন।ফারল্যান্ডের এই প্রস্তাবে ইয়াহিয়া রাজি হন।

সেপ্টেম্বর তাজউদ্দিন বেতার ভাষণে স্পষ্ট ভাষায় সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, বিগত ঘূর্ণিঝড়ের পর যে জলযান, হেলিকপ্টার অন্যান্য যানবাহন রিলিফের জন্য এসেছিল, তা এখন সৈন্যরা ব্যবহার করছে এদেশের মানুষের বিরুদ্ধে।জাতিসংঘের সেবাদলে এখন একদল যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এসেছেন উন্নত ধরণের যন্ত্রপাতি নিয়ে। এতে পাক-সৈন্যবাহনীর রণকৌশলে সাহায্য হবে এতে সন্দেহ নেই। জাতসংঘের সেক্রেটারি যদি পৃথিবীর এই অংশে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রাখতে চান,তাহলে তাকে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে ত্রা্ণকার্যের নামে নিষ্ঠুর প্রহসন অনুষ্ঠিত না হয়। এই ভাষণের পর পর মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের আন্ডার সেক্রেটারি জন আরউইন আরো কয়েকজন ভারতের রাষ্ট্রদূত এল কে ঝার কাছে ত্রানকর্মীদের নিরাপত্তা বিধানের অনুরোধ করেন। উত্তরে ঝা বলেন, ব্যাপারে ভারতের করণীয় কিছু নেই। যুক্ত্ররাষ্ট্রের উচিত বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাথে সরাসরি কথা বলা। জন আরউইন তখন জানান, কলকাতায় যুক্ত্ররাষ্ট্রের কনস্যুলেট ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিষয়টি ভারতের রাষ্ট্রদূত ঝা তাজউদ্দিনের গোচরীভূত করলে তাজউদ্দিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ পরিষদ সদস্যের একাংশের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে তাদেরকে অখন্ড পাকিস্তানের অধীনে একটা রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌছাবার ব্যাপারে উৎসাহিত করে চলেছেন বলে তার কাছেও সংবাদ রয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম জানান, তার জানা মতে দুজন জাতীয় পরিষদের সদস্য মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেলদের সাথে দেখা করেছেন। ব্যাপারে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র সচিব মাহবুবুল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি লিখে জানান, কোন ব্যাপারেই মার্কিন প্রতিনিধিদের সাথে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কখনো যোগাযোগ হয় নি। মাহবুবুল আলমের এই প্রাঞ্জল অস্বীকৃতি ভারতের সন্দেহ উদ্রেক করে।এরপর ভারত নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে জানতে পারেন মোশতাক, মাহবুবুল আলমসহ আরো তিন চারজন সহযোগী মার্কিন প্রতিনিধিদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।

প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ দখল ছাড়াও মোশতাক মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ষড়যন্ত্রও অব্যাহত রাখে। মোশতাক গ্রুপের উদ্দেশ্য ছিল তাজউদ্দিনকে পদচ্যুত করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ এবং যুক্ত্ররাষ্ট্রের সমর্থনে পাকিস্তানের সাথে সমঝোতায় পৌছানো। ইরানের শাহের মধ্যস্থতায় এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল তেহরানে। ছয়দফা ভিত্তিক স্বায়ত্বশাসন পাকিস্তানের পরিধির মধ্যে কনফেডারেশন গঠন করা ছিল এদের মূল উদ্দেশ্য। এতে মুক্তিযুদ্ধের অস্বাভাবিক ইতি টানা এবং পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষা করা সম্ভব হতো। কিন্ত যুগোশ্লোভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো এক সাক্ষাৎকারে এই বৈঠকের কথা উল্লেখ করাতে চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যায়।১৯৭১ সালের ২৬ অক্টোবর মার্শাল টিটো মার্কিন সি বি এস টেলিভিশন নেট ওয়ার্কের এক ইন্টারভিউ পাকিস্তান-ভারতের আসন্ন সংঘাত এড়ানো প্রসংগে বলেন,

"ইরানের শাহ আমাকে বলেছেন যে, তার রকম ধারণা হয়েছে যে,ইয়াহিয়া খান যথেষ্ট নমনীয় হয়ে আসছে। অবশ্য আমি ইয়াহিয়া খানকে বলেছি যে, এটা শুধু ভারত-পাকিস্তানের বিষয় নয় বরং এটা যদিও পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয় তবুও এর সাথে জড়িয়ে আছে পূর্ব পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক প্রশ্ন" এর সাথে আর একটি তথ্য যোগ করে লিফসুজ বলেছেন যে,মার্কিন উদ্যোগে ইরানের শাহের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের অজান্তে মোশতাক চক্র পাকিস্তানের সাথে একটি সমঝোতার কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছিল। সে সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রী মোশতাকের নিউইয়র্কে এসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছে বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরার কথা। এই প্রতিনিধিদলের সাথে কর্নেল ওসমানীরও যাওয়ার কথা ছিল। এই সুযোগটা মোশতাক চক্র কাজে লাগাতে চেয়েছিল। কর্নেল ওসমানী মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে প্রস্তাবিত বৈঠকে অংশগ্রহণ করলে স্বায়ত্বশাসন কনফেডারেশনের ভিত্তিতে পাকিস্তানের অখন্ডতা টিকিয়ে রেখে শেখ মুজিবকে মুক্ত করলে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভ্রান্ত করা সহল হত, আবার অন্যদিকে জনগণকেও বুঝানো যেত বঙ্গবুন্ধুর প্রাণ বাঁচানো এবং তাকে মুক্ত করার স্বার্থেই এভাবে রাজনৈতিক সমাধানে সম্মত হতে। হয়েছে। জন্য কিছুদিন আগে থেকেই অপপ্রচার চালানো হয় যে,বঙ্গবন্ধু মুক্তি লাভ করলে তাজউদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রীর পদ হারাতে হবে এই ভয়ে তাজউদ্দিন শেখ মুজিবের প্রাণ রক্ষার জন্য রাজনৈতিক সমাধান চান না স্বাধীনতা না বঙ্গবন্ধু --- এই মর্মেও প্রচারপত্র বিলি করা হয়।

ভারতের গোয়েন্দা বাহিনীর মারফতে সংবাদ জানার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দিন উভয় নেতা ভাষণ দিয়ে বলেন, পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ চলবে। তাজউদ্দিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে মোশতাককে বরখাস্ত করার জন্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন। কিন্ত অজ্ঞাত কারণে রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম মোশতাককে বরখাস্ত না করে পররাষ্ট্র সচিব মাহবুবুল আলম চাষীকে বরখাস্ত করে তার স্থানে ফতেহ কে নিয়োগদান করেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে মোশতাকের নিউইয়র্ক যাত্রা বাতিল করে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।

সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের উপদলীয় কোন্দল চরমে উঠে। মুজিব বাহিনী এবং খোন্দকার মোশতাক ছাড়াও একদল বিদ্রোহী গণপরিষদ সদস্য তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠে। সেপ্টেম্বর পশ্চিম বাংলার বারাসত শহরে ৯নং আঞ্চলিক প্রশাসনিক এলাকার ( খুলনা,বরিশাল,পটুয়াখালি অংশত ফরিদপুরের) কমিটি অফিসে প্রায় ৪০ জন সদস্য মিলিত হন।এই গ্রুপের নেতৃত্ব দেন আব্দুর রব সেরনিয়াবাত,শাহ মোয়াজ্জেম শাহ আব্দুল আজিজ। এই বৈঠকে মন্ত্রিসভা কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত জোনাল কাউন্সিল অর্ডার প্রত্যাহার, শুধু আওয়ামী লীগ সদস্যদের নিয়ে জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট গঠন, পার্লামেন্টারি কমিটি গঠন, এবং অন্তর্বর্তীকালীন শাসনতন্ত্র ঘোষণার দাবি করা হয়। দাবিগুলো যদি রাজনৈতিক কারণেও ন্যায্য হয়,তাহলেও যুদ্ধকালীন সময়ে প্রবাসে বসবাস করা অবস্থায় ধরণের পদক্ষেপ মোটেও যুক্তিযুক্ত বা সময়োপযোগী নয়। তথাপি এই দাবির ভিত্তিতে ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় পরিষদের সদস্য এনায়েত হোসেন খানের সভাপতিত্বে ৪০ জন জাতীয় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করেন। এর পাশাপাশি কামরুজ্জামান-ইউসুফ আলীর গ্রুপটিও তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে তৎপরতা শুরু করে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ভারতের ক্রীড়ানক হয়ে পড়ায় স্বাধীনতা অর্জন অসম্ভব -- এই ধারনায় উক্ত গ্রুপটি কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের চেষ্টা করে। ২৫ সেপ্টেম্বর দেবেন শিকদারের সভাপতিত্বে কলকাতায় সমন্বয় কমিটির নেতৃবৃন্দ(কাজী জাফর আহমদ,হায়দার আকবর খান রণো,রাশেদ খান) বৈঠক করেন।কামরুজ্জামান-ইউসুফ আলী পরিচালিত বিদ্রোহী গ্রুপের যে কোন শর্ত মেনে নিয়ে তারা একত্রে কাজ করবে বলে উক্ত বৈঠকে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। চীনাপন্থী অন্যান্য উপদল এই বিদ্রোহী গ্রুপকে সমর্থন করে।এসব উপদল উপদলীয় নেতৃবৃন্দ হলেন,আব্দুল হক-সত্যেন মিত্র গ্রুপ, তোহা গ্রুপ,অমল সেন-নজরুল গ্রুপ,পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন সংগঠনের ( সর্বহারা পার্টি)সিরাজ শিকদার, কম্যুনিস্ট সংঘের সাইফুর,মারুফ-আফতাব, বাংলাদেশ কম্যুনিস্ট পার্টির নাসির আলী,পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের অচিন্ত দিলীপ। এদের বক্তব্য হল,ভারতের সাহায্য নয়, বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে  মুক্তিযুদ্ধ করতে হবে। ভারতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের সম্প্রসারণবাদের দালাল। মুক্তিযুদ্ধের নামে ভারত আগ্রাসন চালাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানে।এই মতাদর্শের ভিত্তিতে পাক হানাদার প্রতিরোধের পাশাপাশি এদের কার্যক্র্মের একাংশ পরিচালিত হয় মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধেও।

এর অন্যপিঠে,আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকা- পাকিস্তান জাতিসংঘের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা বন্ধের দাবী জানালে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রচেষ্টায় তা ব্যাহত হয়। বাংলাদেশ প্রশ্নে সোভিয়েত ভূমিকার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে ইন্দিরা গান্ধীর ২৮ সেপ্টেম্বর মস্কো সফরের প্রেক্ষিতে। এসময়ে এক যুক্ত ইশতেহারে বলা হয়, উপমহাদেশে শান্তি সংরক্ষণের স্বার্থে ---- পূর্ববাংলার মানুষের বাসনা, অবিচ্ছেদ্য অধিকার আইনানুগ স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে এবং শরণার্থীদের দ্রুতগতিতে নিরাপদে, সম্মান মর্যাদার পরিবেশে স্বদেশ ফেরত পাঠানোর উদ্দেশ্যে জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। ইশতেহারে আরো বলা হয়, ভারত সোভিয়েত ব্যাপারে যোগাযোগ মতবিনিময় অব্যাহত রাখবে।

অক্টোবরের প্রথম দিকে পাকিস্তান সমর প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। যদিও সেপ্টেম্বর থেকে চীনে আভ্যন্তরীন গোলযোগ এবং ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ায় চীনা সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়া পাকিস্তানের অজানা নয়। এতে চীন কতটুকু সহায়কভূমিকা পালন করতে পারবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ হলেও শুধু আমেরিকার উপর ভরসা করে পাকিস্তান হয়বা এই জন্যই সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে যে, যুদ্ধ বা কূটনীতি যে ভাবেই হোক পুর্ববংলার উপর তাদের দখল বজায় রাখা। ভারত-সোভিয়েত চুক্তি,ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে বিপুল পরিমানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের সংবাদ, পূর্ব পশ্চিম সীমান্তে ভারতের সৈন্য সমাবেশ লক্ষ্য করে পাকিস্তান ভেবে থাকতে পারে যে,আরো দিন গড়ালে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাইরে যেতে পারে।তাই ইয়াহিয়া খান নিক্সনের ব্যক্তিগত উদ্যোগ কামনা করে কিসিঞ্জারের কাছে এক জরুরী বার্তা পাঠান। কিসিঞ্জার ওইদিনই WSAG (Washington Special Action Group) এর জরুরী বৈঠক তলব করেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সীমান্ত থেকে ভারতের সৈন্য অপসারণসহ বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা প্রেরণ বন্ধের ব্যাপারে মধ্যস্থতা প্রত্যাশা করে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের কাছে তারবার্তা পাঠানো হয়। এদিকে দিল্লীস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাত করে বলেন, ভারত যদি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য প্রদান থেকে নিবৃত্ত না হয় তাহলে পাকিস্তান পশ্চিম দিক থেকে ভারত আক্রমণ করেব। ভারত জবাবে বলে,বিদ্যমান অবস্থার রাজনৈতিক সমাধান এবং শরণার্থীদের সসম্মানে দেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে পাকিস্তান সম্মত না হওয়া পর্যন্ত ব্যাপারে ভারত অপারগ। সোভিয়েত কর্তৃপক্ষও এই মর্মে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে জানান, শেখ মুজিবের মুক্তি এবং পূর্ব পাকিস্তানে দ্রুত রাজনৈতিক নিষ্পত্তি সাধন ব্যতীত কেবল সীমান্ত থেকে ভারত-পাকিস্তানের সৈন্য প্রত্যাহারের মাধ্যমে যুদ্ধের আশংকা রোধ করা সম্ভব নয়। এরই পাশাপাশি ভারতের কূটনৈতিক ভারসাম্য আনায়ন,শরণার্থীর প্রশ্নে ভারতের ভূমিকা পশ্চিম ইউরোপের কাছে ব্যাখ্যা এবং শেখ মুজিবের প্রাণ রক্ষার উদ্দেশ্যে ২৪ অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধী ঊনিশ দিনের সফরে পশ্চিম ইউরোপ যুক্ত্ররাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে দিল্লী ত্যাগ করেন।

এদিকে নীতিগত কারণে তাজউদ্দিনের প্রতি মন্ত্রিসভার বিরোধিতা হ্রাস পেলেও ব্যক্তিগত বিরোধের জের চলতেই থাকে। শুধু বিষয়বস্তু পরিবর্তিত হয়। অক্টোবরের আগে বলা হত তাজউদ্দিনের মুক্তিযুদ্ধের নীতি সম্পুর্ন ভ্রান্ত, ভারতের ভূমিকা অস্পষ্ট বা ক্ষতিকর এবং সোভিয়েত নীতিবিরোধী। সোভিয়েত চুক্তির পর বলা হল, তাজউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধ প্রবাসী সরকারের সর্বস্তরে আওয়ামী লীগের দলগত স্বার্থ নিদারুণভাবে অবহেলা করে চলেছেন। এই অবস্থার প্রতিবিধানের জন্য আওয়ামী লীগ কার্যকরী সংসদের তলবীসভা অনুষ্ঠানের দাবি শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী এবং সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে তাজউদ্দিনকে অপসারণের জন্য বিভিন্ন উপদলের নেতৃবৃন্দের সফর প্রচার অভিযানের ফলে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে সরব হয়ে উঠে।কিন্ত সামগ্রিকভাবে এই সব  উপদলীয় তৎপরতা দলের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়। ২৭ ২৮ তারিখের বৈঠকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য তাজউদ্দিনের পক্ষে থাকায় বিরোধী সদস্যরা তাজউদ্দিনের পদত্যাগ দাবী উত্থাপন করা থেকে বিরত থাকেন।

আওয়ামী লীগের একাংশের সাথে মুজিব বাহিনীর সংঘাত, মুক্তিযোদ্ধার কোন কোন ইউনিটের সাথে তাদের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ,এবং নৌকমান্ডোদের সাথে তাদের অসহযোগী আচরণের সংবাদ প্রচারিত হয়ে পড়ার দরুণ রাজনৈতিকভাবে মুজিব বাহিনী ক্রমেই অপ্রিয় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে শুরু করে। তা ছাড়া মুজিব বাহিনীর চার নেতাকেই তাদের পৃষ্টপোষকগণ উপমহাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতির আলোকে তাজউদ্দিনবিরোধী তৎপরতা থেকে বিরত হওয়ার নির্দেশ দিলে সিরাজুল আলম খান তাজউদ্দিনের মন্ত্রীসভা সম্পর্কে একটু নমনীয় হয়। এতে সিরাজুল আলম খানের সাথে শেখ মণির শীতল সম্পর্কের সূচনা হয়। এক পর্যায়ে শেখ মণি তাজউদ্দিনের প্রতি আরো ক্ষিপ্ত হয়ে সহিংস পথ অবলম্বন করে। শেখ মণি মনে করে,তাজউদ্দিনকে সরাতে পারলেই হয়ত তার ক্ষমতা দখলের পথ পরিস্কার হবে।

তাজউদ্দিন তার অফিসে একা ছিলেন। এমন সময় মুজিব বাহিনী পরিচয়দানকারী এক যুবক আগ্নেয়াস্ত্রসহ অফিসে ঢুকে তাজউদ্দিনের সামনে নতজানু হয়ে বলে, ওরা আপনার প্রাণনাশের পরিকল্পনা করাতে আমি স্বেচ্ছায় এই দায়িত্ব গ্রহণ করে আপনার কাছে এসেছি যাতে আপনার প্রাণ রক্ষা হয়। যুবকটি স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দিতে প্রস্তুত হয়। তাজউদ্দিন আরও কিছু প্রয়োজনীয় কথা জিজ্ঞাসা করে অস্ত্রসহ যুবকটিকে বিদায় দেন। ওই সময় মুজিব বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর কোন কোন ইউনিটের এবং আওয়ামী লীগের একাংশের ক্ষোভ এতটাই প্রবল ছিল যে, এই ঘটনা প্রকাশ পেলে শেষে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে এই ভয়ে তাজউদ্দিন ঘটনাটা চেপে যান।

প্রধান মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আমন্ত্রনে ২১ অক্টোবর তাজউদ্দিন সৈয়দ নজরুল ইসলাম দিল্লী যান।প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীকে ইন্দিরা গান্ধী জানান যে,তিনি ১৯ দিনের সফরে পশ্চিম ইউরোপ যুক্ত্ররাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন, শান্তিপূর্ণভাবে বাংলাদেশ সমস্যার নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারসমূহকে সম্মত করার জন্য, যদিও তিনি ব্যাপারে আশাবাদী নন; তবে,যদি সুফল না পাওয়া যায়, তাহলে তিনি ফিরে আসার পর বাংলাদেশের পথ ঘাট আরো শুষ্ক হলে পাকিস্তানের দখলের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে দেখা হবে। জানা যায়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের ইঙ্গিত ইন্দিরাগান্ধীর মন্ত্রীসভার প্রবীণ সদস্যদের কাছেও গোপন রাখা হয়েছিল, কিন্ত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি কলকাতায় ফিরে এই আনন্দের সংবাদ প্রচার করাতে প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে আওয়ামী লীগের কার্যকর কমিটি--- তা থেকে সর্বসাধারণের মধ্যে এটা প্রচার হতে থাকে যে, ইন্দিরা গান্ধী বিদেশ থেকে ফিরে এসেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন, এতে আওয়ামী লীগের কার্যকর কমিটির মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এলেও পরোক্ষভাবে এর কুফল পড়েছিল। সেজন্য ইন্দিরা গান্ধী ভ্রমণ শেষে ফিরে এসে তার সফর প্রসঙ্গে কোন কথা আর প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে অবহিত করেন নি। এতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম মনঃক্ষুন্ন হন।

দিল্লীতে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আলোচনাকালে এই প্রথমবার তাজউদ্দিন সৈয়দ নজরুল ইসলামের সামনে RAW এর সমর্থনের ফলে মুজিব বাহিনী যে নানাভাবে বিড়ম্বনা সৃষ্টি করে চলেছে তা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। ব্যাপারে ত্বরিত প্রতিবিধানের জন্য ইন্দিরা গান্ধী সভায় উপস্থিত ডি পি ধরকে নির্দেশ দেন। ডি পি ধর মুজিব বাহিনীকে বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রনে আনার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মেজর বি এন সরকারকে নিয়োগ করেন। এই উদ্দেশ্যে কলকাতায় এক বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তাজউদ্দিন, কর্নেল ওসমানী, মুজিব বাহিনীর পক্ষে তোফায়েল আহমদ, সিরাজুল আলম খান,আব্দুর রাজ্জাক উপস্থিত ছিলেন। শেখ মণি আমন্ত্রিত হওয়া সত্বেও উক্ত বৈঠকে যোগদান করেন নি। এই সভায় আরো ছিলেন ভারতের সেনাবাহিনীর পক্ষে মেজর জেনারেল বি এন সরকার ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্ত। আলোচনার এক পর্বে যুবনেতাদের একজন দাবী করেন, আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলার অধিকার একমাত্র তারই রয়েছে। কথার প্রেক্ষিতে সেদিন আলোচনা আর এগুতে পারেনি পরে, বি এন সরকার শুধু যুবনেতাদের নিয়ে আলোচনার জন্য ফোর্ট উইলিয়মে মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজন করেন। কিন্ত সেখানে আওয়ামালীগের পক্ষ থেকে কথা বলার 'একমাত্র অধিকারী' যুবনেতা ছাড়া আর সবাই অনুপস্থিত ছিলেন। কয়েকদিন পর যুবনেতারা আগরতলায় থাকবেন বলে জানালে বি এন সরকার সেখানেই গমন করেন। কিন্ত যুবনেতারা একযোগে সবাই অনুপস্থিত থাকাতে মেজর জেনারেল বি এন সরকার এই পন্ডশ্রম বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য বিষয়ের দিকে মনোনিবেশ করেন।

(ক্রমশ)
[কথা কবিতা]



Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.