>

মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 2/10/2015 |




গল্পটার নাম দিয়েছিলাম "সন্তরন" কেন জানিনা। আমার আবার অদ্ভুত ব্যাপার হোলো আমি লিখতে বসলেই আমার সৃষ্ট চরিত্ররা আমায় ঘিরে ধরে। এবারে তো খাতা খুলতেই ওরা হাজির। মাঝে কতদিনের লম্বা বিরতি কাজেই আবার প্রথম থেকে পড়তে শুরু করলাম। ঠিক কি কি ভেবে ছিলাম গুলিয়ে গেছে, পড়ে নিলে মনে আসে নাকি দেখি। 

জমিদার বিজয়েন্দ্র চৌধুরীর পঞ্চম উত্তরপুরুষ সমরেন্দ্রর ছোটো ছেলে শমীন্দ্র আবার বছর পাঁচেক পর বাড়ী এসেছে। শমীন্দ্র খুব ভালো এবং কিঞ্চিৎ ছিটেল এক ফটোগ্রাফার। ছিটেল কারন অসম্ভব সব অন্য ধরনের ছবি তোলে সে। আর তার জন্য নাওয়া খাওয়া চুলোয় দিয়ে যত্র তত্র পৌঁছে যায়। দিন নেই রাত নেই ক্যামেরা তাগ্ করে বসে থাকবে সেই ব্রাহ্ম মুহুর্তের জন্য। তবে হ্যাঁ আলটিমেটলি সে যে ছবিটা তোলে সেটা তাবড় তাবড় ফটোগ্রাফার দেরও চোখ কপালে উঠিয়ে দেয়। সে সারা পৃথিবী ঘোরে ফটোর সাব্জেক্টের খোঁজে, আর ঘুরতে ঘুরতে যেন এসে পড়ে এক আধবারের জন্য নিজের বাড়ী তে। সমরেন্দ্ররা চার ভাই, সকলেরই একটি দুটি করে পুত্র সন্তান। এখনও অবধি একান্নবর্তী পরিবার তাদের। দুপুরে একসাথে খেতে বসে প্রায় জনা তিরিশেক মানুষ। মানে সব সময়েই উৎসবের আবহাওয়া। শমীন্দ্র তুতো ভাইবোনদের মিলিয়ে সে সবার ছোটো। অতএব শমী এসেছে এই খবর পেলে মেয়েরাও বাপের বাড়ী আসার এবং কটাদিন থাকার একটা শক্তপোক্ত যুক্তি পায়। শমী যদিও তাদের বংশের সবচেয়ে সুন্দর পুরুষ কিন্তু চূড়ান্ত বাউন্ডুলে বলে পঁয়ত্রিশ পেরিয়েও অবিবাহীত। 

জমিদারির কিছু অবশিস্ট না থাকলেও পেল্লায় বাড়ীটা আছে আর বিজয়েন্দ্রর আমলের কিছু নিয়ম আজও মানা হয়, তার মধ্যে অন্যতম হোলো "লক্ষ্মীর ঝাঁপি"আগের কালে রোজ একটাকা ফেলত সবাই এখন সেটাই হাজার হয়েছে। ওটা থেকেই পুরো সংসারের রান্না খাওয়ার খরচ উঠে আসে। কিছু জমি আছে যেখান থেকে বছরের চাল ডালটা যোগাড় হয়ে যায়, প্রোমোটার দের লুব্ধ দৃষ্টি বিশেষ কিছু করতে পারেনি। কারন চৌধুরী পরিবারে সার বুঝ বুঝেছে সবাই, যে ওই জমি বেচে দিলে এই এতো বড় পরিবারের সারা বছরেরে চাল ডাল যোগাড় করতে চাপ আছে। জমি বিক্রীর টাকা সবার মধ্যে ভাগ হলে পর ফোঁটা ফোঁটা জুটবে সবার কপালে। কাজেই সবাই একত্রিত হয়ে ঠেকিয়ে রেখেছে জমি। বড় একটা দিঘীও আছে যাতে মাছ চাষ হয়। ঘরের প্রয়োজন মিটিয়ে বাকি বিক্রী হয় পাইকার দের কাছে। এছাড়াও পারিবারিক বেশ কিছু বিসনেস আছে, লেখাপড়ার শেষে বাড়ীর ছেলে মেয়েরা যে যেমন পেরেছে কোনোনা কোনো একটায় ঢুকে গেছে। নিশ্চিন্ত জীবন, চাকরী খোঁজার হ্যাপা নেই। কিছু কিছু বৌ রাও যোগ দিয়েছে। এক শমীন্দ্র সম্পূর্ন আলাদা ধরনের, তবে বাবা দাদারা এমনকি দিদি বৌদিরাও এতো স্নেহ করেন যে শমীন্দ্রর খরচ বহন করতে কারোর অভিযোগ হয়না। মা নিয়ম করে শমীন্দ্রর নামের টাকা লক্ষ্মীর ঝাঁপি তে ফেলে দেন। লক্ষ্মীর ঝাঁপি ছাড়াও, খেতে বসা একসাথে বা খাবার সময়ে বাড়ীর বৌরা পরিবেশন করবে এ ধরনের নিয়ম গুলো আজও চলে।

যাত্রায় শমী বেশ কয়েক মাসের উদ্দেশে্য এসেছে; সে বিদেশ থাকলে দাদা দিদিদের বেশ সুবিধা হয় ঘুরতে বেড়াতে যেতে। মোটামুটি সকলেরই ইয়োরোপ বা অ্যামেরিকা কিম্বা অস্ট্রেলিয়া কোনোনা কোনো দেশ ঘোরা হয়েগেছে। যতোবারই সে আসে প্রায় প্রতিবারই দিদি বৌদিদের মধ্যে বেশ একটা কম্পিটিশন শুরু হয়ে যায়, যার যতো বিবাহযোগ্যা ননদ, বোন আছে তাদের লাইন লাগিয়ে দেয় শমীর সামনে। শমীর যে মহিলাদের প্রতি বিতৃষ্ণা আছে তা কিন্তু নয়, তবে আজ অবধি কাউকে দেখেই মনে হয়নি এ ই সেই। কাজেই তার ভবঘুরে জীবন মহিলা সঙ্গ ছাড়াই চলছে। মাঝে মাঝে শমী নিজেও ভাবে হয়ত তাকে খুঁজেই পায় কিনা। এবারে সে ঠিক করেই এসেছে আর নয় এ যাত্রায় বিয়ে করে নেবে, সে যেমনই হোক। তবে কথাটা সে ছাড়া আর কেউ জানেনা। জানায়নি কাউকে, কারন এমিতেই অতিষ্ঠ হয়ে যায়; বিয়ে করতে চায় এটা ডিক্লেয়ার করলে আর দেখতে হবে না। হয়ত শেষে পারিবারিক অশান্তিই সৃষ্টি হয়ে যায়।

ছোটোবৌদির সাথে শমীন্দ্রর বিশেষ সখ্যতা। এই বৌদি তার তুতো বৌদি আর বয়সে ছোটো। কিন্তু শমী বোঝে যে এই মেয়েটা একমাত্র ধরতে পারে শমী কি চায়, আজ অবধি একমাত্র ছোটোবৌদিই কোনো মেয়েকে এনে অস্বস্ত্বি বাড়ায়নি। কাজেই চুপি চুপি মনের কথাটা শমী ছোটোবৌদির কাছে ব্যক্ত করেই ফেলল। সন্ধ্যেবেলা শমী কিছু কাজ করছিলো, নেট ঘাঁটছিলো সেই সময়ে মউলি এসে টুকটুক করে নক্ করলো তার ঘরে। 

"একটু আসব? বেশী ব্যস্ত নাকি?" 
"আয়, নাঃ তেমন কিছু না। বোস।"
"তোর কাছে একটা আর্জি নিয়ে এসেছি, নিরাশ করিসনা" কথাটা শুনে ভুরু তুলে তাকালো শমী, ফিক করে হেসে ফেলল মউলির কথার ধরনে
"বা বা, তুই কবের থেকে এমন নাটুকে ভঙ্গীতে কথা বলতে শুরু করলি রে? নাঃ মানতেই হবে তুই চৌধুরী বাড়ীর বৌ" বলে বিশ্রী রকম খ্যাক খ্যাক করে হাসতে থাকে শমী। বেশ রাগান্বিত হয়ে মউলি বলল
"হাসবি না, আমি যেন সব সময়ে বিচ্ছিরি করে কথা বলি?"
"আহা, আমি কি তাই বললাম? আমি তো,তুই এতো ফর্মাল হলি কবের থেকে, সেটাই মিন করলাম। বাকি বৌদিদের মতো বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে বলছিস। তা আর্জিটা কি শুনি? যদ্দুর জানি তোর কোনো বোন নেই যে বিয়ে দিবি আমার সাথে" 
"হ্যাঁ তোর তো ওই ওয়ান ট্র্যাক মাইন্ড। বিয়ে করবি ভেবেছিস অতএব চৌদিকে শুধু বিয়ের সানাই। ভাবতেই পারছিস না যে অন্য কোনো কথা থাকতে পারে কারো" 
"আচ্ছা বাবা ঘাট হয়েছে, এবার আসল প্রসঙ্গটা যদি বলেন" 
"প্রসঙ্গ হোলো সোনামনকে পড়ানোর দায়িত্ব নিবি রে?"
"হইলো; কে কি সে সব বেত্তান্ত না জানিয়ে তাকে পড়ানোর দায়িত্বে সঁপে দিলো আমায়"
"সোনামন রে, তোর খেয়াল নেই? ওই যেরে পূবের বাড়ীর যে মেয়েটা আমাদের আশ্রয়ে থাকে"
"পূবের বাড়ীর মেয়ে? সে এ বাড়ী এলো কি করে? তারা তো অ্যান্টি না আমাদের? নাকি সব মিটমাট হয়ে গেছে?" 
"ধুস্ এগুলো সেই বংশ পরম্পরার ইগো, বুঝলি না? তারা আমাদের লতায় পাতায় জ্ঞাতি, কোন পুরুষে কার সাথে কি ঝামেলা হয়ে সেই যে মাঝের রাস্তায় কাঁটাতার লাগলো সে কি আর যাবে নাকি?"
"কিন্তু এই সোনামনি না কি বললি সে আমাদের ডেরায় কেন? এটাকি কোনো পলিটিক্স?" 

"না রে, আসলে মেয়েটার বাবা মা দুজনে মারা যেতে ওবাড়ী থেকে দূর করে দিয়ছিলো। তখন তো বলতে গেলে দুধের শিশু। বড়মা বুড়োশিবতলায় পুজো দিয়ে ফেরার সময় দেখেছিলেন ওদের ফটকের সামনে বসে কাঁদছে। উঠিয়ে নিয়ে আসার পর সব কাহানি বেরোয়। তবে বড়মা ফেলে দেননি। যদিও এ বাড়ীতে ঠিক মেয়ের মতো স্থান পায়নি মেয়েটা। তবু বড়মায়ের পার্সোনালিটির সামনে মুখ খুলবে কেউ? তাই আপত্তি সত্ত্বেও রয়ে গেছে মেয়েটা। জানিস ওর সাংঘাতিক শার্প মাথা, সাথে বড়মায়ের ট্রেনিং কাজেই দুনিয়ায় সোনামন পারেনা এমন কাজ নেই। তুই আগের বারে দেখেছিলি তোর মনে নেই দেখছি"

"বেশ, তো, ওকে স্কুলে দেওয়া হোলো না কেন?"
"আরে সেটাই তো, ও থাকছে থাকুক, কিন্তু ওর দায়িত্ব কেউ নেয়না; এড়িয়ে যায়। তোকে তো সেটাই রিক্যোয়েস্ট করলাম। তুই নে না রে ওর দায়িত্ব" হো হো করে হেসে ওঠে শমী। অবাক চোখে তাকায় মউলি
"কি হোলো? হাসছিস যে বড়?"
"নাঃ তোর এই রিক্যোয়েস্ট টা অনেকটা সেই রাজার অসুখ গল্পের মতো। আমার দায়িত্ব কে নেয় তার নেই ঠিক। আমি নেবো আরেক জনের দায়িত্ব"
(ক্রমশ)

[মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী]
Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.