>

ঐশী দত্ত।

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 10/10/2014 |

                       


লির আড়ালে।












রাত বাড়ার সাথে সাথেই পোস্ট অফিস গলির আলো কমতে থাকে। চারদিকে নানারকম সংকেতের চলাফেরা। খুব বেশি প্রয়োজন না পড়লে সন্ধ্যার পরেই কেউ গলিতে আসেনা । এইরকম সুযোগ পেলেই, আমি হাঁটার রাস্তা বদলে গলি ধরে টিউশানি করতে যাই।  বাস্তবের ঘাত প্রতিঘাতে প্রত্যেকটা রাত আমার কাছে নিঃশ্বাস আটকে রাখার সংগ্রাম যা ঘুরে বেড়ায় পোস্ট অফিসের অলিগলি।

-এত রাতে ছাদে কি করছো?
-ঐ গলিটা দেখছি
-তিন মাস ধরেই এক কথা, চলো ঘুমাতে যাবে
-যাও, আসছি আমি
-আরে চলো তো, ভাল্লাগছেনা
- রাতের আকাশ দেখতে ভাল লাগে । ঐ দ্যাখো ফিনিক্স, এরিডেনাস... আকাশটা জ্বলজ্বল করছে। তার কোনো অতীত বা ভবিষ্যতের ভয় নেই!

মানুষের যৌবনে এইরকম হয়। লোভ আর দৃষ্টির কোনো ভয় থাকেনা । গলির অন্ধকার বেড়েই চলছে। চারদিকের স্তব্ধতা ভেতরের হাহাকারের কথা জানান দিচ্ছে । তখন দূর থেকে ভেসে আসা কান্নার আওয়াজটাও অসহ্য লাগে ।
-উফ, এই দিব্য জানালার কাঁচটা লাগিয়ে দাওনা।
-এত রাতে কে কাঁদছে?
-পাশের বাসার ছন্দা, আজ নাকি ডাক্তার বলেছে, ওর পেটে বাচ্চা। কী অসভ্য
মেয়ে! এদের এমনি হয় ।
-এইভাবে বলছো কেনো? ভুল তো হতেই পারে ।
-কোনটা ভুল? যে মেয়ে পনের বছর বয়সে এতকিছু বুঝে সে কোনো পদ্ধতির কথা জানেনা এটা আমি বিশ্বাস করিনা। আর যে ছেলে এটা করেছে তার আক্কেল বলতেই নাই।
-চুপ থাক তো । ঘুমোতে দাও ।

টিনার এই স্বভাবটা আজও গেলনা, সুযোগ পেলেই মানুষের নামে কয়েক কথা না বললে তার চলেনা। এই কারণেই মা বাড়িতে থাকতেই ভালবাসে । কয়েক মাস পরপর শহরে আসে । সাথে থাকে কখনো  কুমড়ো পাতা, নারিকেল, চালতা, খেতের ডাল, সরিষা, এবং দুধের নাড়ু । আবার চলে যাওয়ার সময় মা একা যায়না । সাথে থাকে কেমোথেরাপির ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা ! নিউ বেইলি রোড, মহিলা সমিতিতে প্রথম গিয়েই ক্যানসার আর লুকিয়ে থাকতে পারেনি মায়ের কাছে। কিন্তু দিনকে দিন আমিই লুকিয়ে যাচ্ছি মায়ের কাছ থেকে । বুকের মধ্যে খুব কষ্ট হচ্ছে, প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয় । ব্যস এটুকুই !

সকালের প্রাণশক্তি বাস স্টপেজ পর্যন্ত । এত খেটেও মাইনেটা দশের উপরে নিতে পারলামনা। রাতে এর ওর বাসায় টিউশানিটা না থাকলে শহরে থাকার স্বপ্নটা অন্ধকারেই হারিয়ে যেত ।
- রেডি হয়ে গেছো?
-হ্যাঁ এখনি বের হবো
-তাড়াতাড়ি চলে এসো । একা একা ভাল লাগেনা ।
-একা ? আমাদের বাচ্চাটিও তো তোমার সাথে ।
-তুমি জাননা? বাচ্চা  বাবাকেও চাইবে।
-হে হে এটাই তো স্বাভাবিক ডিয়ার ।

বাইরে বের হলে আমার কোনকিছুই স্বাভাবিক থাকেনা, অস্থির লাগে সবকিছু । সংসারের অভাব যেন কাঁচাবাজার । রোজ রোজ বেড়েই চলছে । রাস্তার পাশে আমিন ভাইয়ের দোকানের চোখ পড়তেই দেখি, আমার ভুরুর ভাঁজ ঘন হয়ে গেছে ।
-আরে ভাই, রাস্তায় ভ্যাবলার মত দাঁড়িয়ে না থেকে যেতে দাও।
তাকিয়ে দেখি
খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে সেই ভদ্রলোকটা
যার বাসায় ছয়মাস টিউশানি করার পরেও তিনমাসের মাইনে বাকি রেখে দিয়েছিল । ব্যাটা একটা হারামীর শেষ ! রোজ রাতে মদ গিলে, বাসায় এসে বউকে পেটাতো । প্রায় সময় উনার বউ কাপড় সরিয়ে দেখিয়ে বলতো
-এই দেখেন, আমি কোন দোজখে পড়ে আছি ! মেয়েদের ব্লাউজের উপর থেকে কাপড় সরে গেলে আমি অনুভব করি সব সুন্দর প্রতিই মায়ার সাথে সাথে এক ধরনের লোভ জেগে ওঠে মনে । তবে আমার ছাত্রের খুবই সাহস  ছিল। একদিন তো পড়তে বসেই বলে ফেললো –

-আচ্ছা স্যার, আপনাদের দুগ্গা যদি মা হয়, তবে তার মেয়েও কীভাবে মা হলো? আন্টি কেন হলোনা? মনে মনে খুব হেসেছিলাম । যেভাবে অনার্স পড়ার সময় ব্লুফ্লিম দেখে হাসতাম। জীবনে এই দুইবারই হেসেছি । আর কখনো কি হেসেছি? না মনে পড়ছেনা, আমার কিছুই মনে পড়েনা । ভুলে যাচ্ছি না ভুলতে চাচ্ছি তাও মনে করতে পারছিনা ।

সন্ধ্যার দিকে বাজার করে পোস্ট অফিসের গলিতে ঢোকতেই, একটা অদ্ভূত অনুভব হলো আমার হাঁটু কাঁপছে । গত কয়েকমাস ধরেই গলিতে হাঁটতে গেলে শুধু ভয় হতো । কিন্তু এখন হাঁটুও কাঁপছে ! লম্বা কয়েকটা পা ফেলে দ্রুত বাসায় ঢুকে, জুতো -জামা খুলে লম্বা হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ি । শরীর খুব ঘামছে । ঘামের বিন্দুগুলো অসহ্য লাগছে খুউব ।

-এখনো পড়ে আছো? আজ টিউশানিতে যাবেনা?
-চা নিয়ে আসো, এইতো পান করেই চলে যাবো ।
টিনার হাতের চা না পান করলে আমার হয়তো অনেক কিছুই জানা বাকি থেকে যেত । আর ও অসম্ভব ভালবাসে আমাকে । তাড়াতাড়ি করে বাইরে চলে আসি, এই রাতে আর পালানোর পথ থাকলোনা আমার !

নিজের মা চলে গেছে অনেক আগেই । তার কয়েকমাস পরেই টিনাও চরম মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে কলিকাতায় তার মাসির বাড়িতে পা রেখেছে । শুনেছি টিনার খুব ভাল জায়গায় বিয়েও হয়েছে । ওর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ! এগারো বছর পর দিব্যর চোখে জল । দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘুরে দাঁড়াতেই 
-কি আংকেল পোস্ট অফিস গলি না গেলে, না তো অন্তত বলবে ! কখন থেকে জিজ্ঞাসা করছি ।
-হ্যাঁ মা যাবো, ওঠে পড়ো ।
-তোমার কি হয়েছিল আংকেল?
-না, তোমার মত আমারো একটা মেয়ে আছে ।
-ও কি করে?
-একটা স্কুলে পড়ে । চাকরি চলে যাওয়ায় ভালো কোন স্কুলে পড়াতে পারিনি । হে হে
-আচ্ছা আংকেল, তুমি কি ওর জন্য বাসায় টিচার রেখে দিয়েছ?
-কেনো? তোমার বাসায় নেই?
-না, আম্মু যে কী! নিজে নিজে পড়ায়। হোম টিচারের কথা শুনলে রেগে যায় । ওরে কে পড়ায়?
-আমিই রাতে বাসায় ফিরে ।
-কেন? ওর মা পড়াতে পারেনা?
- ওর মাকে ও দেখেনি  ।
-কেনো মারা গেছেন?
-না না সব মায়েদের পরিচয় থাকেনা ।তেমনি ওর মায়েরও
-হু ঠিক । আম্মুও বলে সব বাবার পরিচয় থাকতে নেই, আমার বাবাও নাকি তেমন ।

আংকেল ও আংকেল এইতো এসে গেছি । ডানদিকের গলিতে ঢোকে যান ।

এগার বছর পরেও, গলিতে ঢোকার সাহস হলোনা দিব্যর ।
পেছনে ফিরতে আর চায়না সে, মেয়েকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে । অনেক সামনে...অনেক কোনো দীর্ঘশ্বাস যেন মেয়েকে না ছুঁতে পারে ! পোস্ট অফিসের গলির পথ কি তাকে মনে রেখেছে? না পথ কাউকে মনে রাখেনা । অথচ আজ দিব্যর সব মনে পড়ে যাচ্ছে । সে কী ভয়ানক অপরাধে এখনো আছে ! আজ আবার ভয়ও তাড়া করছে ঠিক এগারো বছর আগের সেই ভয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয় পোস্ট অফিস গলির আড়ালে!


Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.