>

রীতা রায় মিঠু।

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 10/10/2014 |

  

কত ের  মানুতাদের কত রকমের গল্প










আমার কাজের সূত্র ধরেই প্রতিদিন আমার নানা পেশার, নানা বর্ণের মানুষের সাথে পরিচয় ঘটে থাকে। তার কারন আমি ফোন সার্ভিসে চাকুরী করি। মানে তিনটি ফোন কোম্পাণীর ডিলার হচ্ছে ওয়ালমার্টের ওয়্যারলেস সেন্টার। আমি ওয়্যারলেস সেন্টারের শুরু থেকেই আছি। আমার পেশাটিতে কথা বলতে পারাটা অতিরিক্ত একটি গুন হিসেবে বিবেচিত হয়। আমি সেই গুনের অধিকারী। ঘরে সবার কান ঝালাপালা করে দিলেও বাইরে এর অনেক গুরুত্ব আছে। কথা বলে বলে আমি কতজনের কত কাহিনী শুনেছি, লিখতে পারলে বড় বড় উপন্যাস হয়ে যেতো। থাক! উপন্যাসে কাজ নেই, মাঝে মাঝে দুই একটা করে গল্প অল্প কথায় বললে নিশ্চয়ই কারো খারাপ লাগবেনা।
‘আই এম এ জিনিয়াস’

এক রবিবারের সকালে আমার ডিউটি ছিল। খুব বেশীদিন আগের কথা নয়, খুব শীতের সকালে আমার কোথাও বের হতে ইচ্ছে করেনা, তার উপর ছুটির দিনে সকালে কাজে যেতে হলে মনটা খারাপ থাকে অনেকক্ষন। সে রবিবারেও আমার মন মেজাজ ভালো ছিলোনা। তবে আমার মেজাজ খারাপ থাকলেও গ্রাহকের সাথে আমি সব সময় পেশাসুলভ আচরন করে থাকি। সেই রবিবারের সকালে এক হোয়াইট আমেরিকান ভদ্রলোক এসে আমার কাছে সাহায্য চাইলেন। তার হাতের মোবাইল সেটটি চার্জ অফ হয়ে পুরোপুরি ডেড হয়ে গেছে। ভদ্রলোক লং ড্রাইভে যাচ্ছেন, আমার কাছে এসেছেন চার্জারের খোঁজ করতে। ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম অনেক আগের মডেল, এখন আর চলেনা।

চার্জারও ছিলনা আমাদের কাছে। তাই তাঁকে বললাম যেহেতু এই মডেল এখন আর চলেনা, তাই তার কন্ট্র্যাক্ট রিনিউ করলে নতুন ফোন পাবে ফ্রি। কিনতু ভদ্রলোক কি ভাবলেন কে জানে, বললেন কনট্র্যাক্ট রিনিউ করবেন না, বরং অন্য সস্তা ফোন কিনে ‘সীম কার্ড’ পালটে নিয়ে ব্যবহার করবেন। আমি বললাম, ‘ বাহ! এটাই ভালো, তাই করো”। ভদ্রলোক খুব ‘হে হে হে আমার বুদ্ধি দেখো’ সুলভ হাসি দিয়ে বললো, ‘ দেখেছো আমি কত স্মার্ট! কেমন নিজে নিজেই পথ বাতলে ফেলেছি। আসলে আমি একটা জিনিয়াস”। আমি তার কথায় মাথা দুলিয়ে বললাম, ‘ এটাও ঠিক বলেছো’। তাকে একটু সাহায্য করলাম একই সারভার এর প্রিপেইড ফোন পছন্দ করার সময়। ভদ্রলোখ দেখি অনবরত কথা বলেই চলেছে, আর তার সাথে সাথে অযথাই হামবড়া ভাব দেখিয়েই যাচ্ছে!। আমি তার কথার সাথে ভদ্রতা করে হ্যাঁ হুঁ করে যাচ্ছিলাম। তারপর তাকে চেক আউট করতে গিয়ে যে কথাগুলো হলো আমাদের মধ্যে তা এমনঃ
সেঃ “তুমি কি ইন্ডিয়ান?”

আমিঃ’ বেশ কাছাকছি বলে ফেলেছো, আমি বাংলাদেশের মেয়ে”
সেঃ আমি মিনেসোটা থাকি, খুব ঠান্ডা ওখানে, আমার এক ইন্ডিয়ান ফ্রেন্ড তাদের দেড় বছরের বাচ্চাকে নিজেদের কাছে না রেখে ইন্ডিয়া তার ন্যানির কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। বাচ্চাটা এত ঠান্ডা সহ্য করতে পারছিলোনা। আমার ফ্রেন্ড হচ্ছে একটা আসল জিনিয়াস। আমি নিজেও একজন জিনিয়াস, তবে ছেলেটা আমার চেয়েও বেশী স্মার্ট’। আমরা দুজনেই আইটি এক্সপার্ট”।
আমিঃ ‘হ্যাঁ আমাদের এশিয়ান ছেলেমেয়েরা অনেক স্মার্ট। এখানে যারাই আসে, সবাই মোটামুটি জিনিয়াস। তাছাড়া তার বড় বড় কথা একটু থামাবার জন্য সাথে যোগ করলাম, আমার হাজব্যান্ডও জিনিয়াস”।এটা শুনে সে খুব একটা খুশী হয়েছে মনে হলোনা, বললো , ” তাই নাকি? কি করে তোমার হাজব্যান্ড”?
বললাম, ‘ এখানে ইউনিভার্সিটিতে কেমিস্ট্রি পড়ায়’। সে বললো, ‘ ওয়েল, সবাই তার কথা বুঝতে পারেতো!’

রবিবারের সকালে এমন কথা শুনে আমার মেজাজটা একটু খিঁচড়ে যেতেই বললাম, ‘ তুমিতো আমার কথা ঠিকই বুঝতে পারছো! আমার হাজব্যান্ডের কথা যাদের বুঝার তারা ঠিকই বুঝে। তাছাড়া আমার হাজব্যান্ড কিনতু স্টুডেন্টদের মাঝে খুব পপুলার। আমাদের উচ্চারণে এশিয়ান একসেন্ট আছে ঠিক, তবে আমরা কথা বলি যে কোন আমেরিকানের চেয়ে অনেক শুদ্ধ ইংরেজীতে।। তাছাড়া আমার হাজব্যান্ডকে এখানে এসে চাকুরী খুঁজতে হয়নি, দেশে থেকেই চাকুরী নিয়ে এসেছে”। সে বললো, ‘ তাই নাকি? ভালো’।
একফাঁকে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ তোমার ছেলে মেয়ে আছেনা?”
বললো ‘ একটি ছেলে, ২০ বছর বয়সী। ওয়ালমার্টে চাকুরী করে। ট্রাকে মালামাল উঠানামা করায়”।
আমি বললাম, ” ট্রাকে মাল তোলে তোমার ছেলে? আহারে! তোমার ছেলেতো দেখি তোমার মত ‘জিনিয়াস’ হয়নি!”

সে একটু থমকে গিয়ে বললো, ‘ আমার ছেলে অনেক স্মার্ট, আসলে সে পড়ালেখার লাইনে যেতে চায়নি। সে খুবই এনজয় করে তার কাজ।”
আমি বললাম, ” তাতো ঠিকই, যে যেকাজ করতে ভালোবাসে তার সেটাই করা ভালো। তবে তুমিতো খুব প্রাউড তোমার প্রফেশান নিয়ে, তাই ভেবেছি তোমার ছেলেও বুঝি তোমার মতই জিনিয়াস হয়েছে। মনে হয় তোমার ছেলে খুব স্মার্ট বলেই বাবার পেশা বেছে নেয়নি, লাইফটাকে তার মত করে এনজয় করছে! যাহোক, ভালো থেকো, তোমার যাত্রা শুভ হোক”। এবার সে হাসিমুখে বিদায় নিল এবং বলে গেলো, ” তোমার কথাই ঠিক, এশিয়ানরা আসলেই স্মার্ট, তোমার সাথে পরিচিত হয়ে ভালই লাগলো।”
Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.