>

অরুণ চট্টোপাধ্যায়।

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 10/10/2014 |

            

একান্ত ব্যক্তিগত পর্ব ৫







গৌতমবাবুর সেই সিন্থেটিক বটগাছ তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে তাঁর উকিল কোর্টে কেস ঠুকেছিল সে তো গতবারই বলেছি । আর তাঁর উকিল যে ক্ষতিপূরণ বাবদ দশ লাখ টাকা আদায় করতে পেরেছিলেন তাও বলেছি । কিন্তু যেটা বলি নি সেটা হল সেই টাকায় তিনি কি করেছিলেন ।

কি আবার করবেন ? রিটায়ার্ড বিপত্নীক মানুষ আবার বিজ্ঞানী । তিনি আর কি করতে পারেন গবেষণা করা ছাড়া ? আর তাঁর গবেষণা তো অন্য কারোর মত নয় । তাঁর গবেষণায় ল্যাবরেটরি লাগে না । বটগাছ লাগে । ভাবনার জন্য । ভাবনা করে আবিষ্কার করে রেখে দেন তাঁর মস্তিষ্কের ভেতর । কিন্তু বাস্তবায়িত করে প্রস্তুতকারক কোম্পানীগুলো ।


ফর্মুলা চুরি হবার ভয় নেই । কারণ ফর্ম-ই থাকে না তো ফর্মুলা ! স্পন্সর দেয় টাকা । সেই টাকা পেলে প্রস্তুতকারক কোম্পানী যায় ডাঃ গৌতমের কাছে । ডাঃ গৌতম আবার ধ্যানে বসেন । তাঁর মুখ দিয়ে যেগুলো বেরোয় কোম্পানি তেমন তেমন কাজ করে ।


 লিখিত কিছুই নেইএমন কি ডাঃ গৌতমকে হিপ্নোটাইজ করে কিছু ফল নেই । চেষ্টা অনেকে করে ফেল মেরে গিয়েছিল । বিদেশী কোম্পানির গুপ্তচররা ফর্মুলা চুরি করতে এসে বেকুব বনে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়ে কেটে পড়েছিল । তারা সব বরখাস্ত হয়ে এখন দর্জির দোকানে ছেঁড়া প্যান্ট সেলাইয়ের চাকরি নিয়েছে । আর নাকে কানে খত দিয়ে বলেছে, ডাঃ গৌতম ! কাম তো দূরে থাক নামও মুখে আনব না কোনোদিন ।


সেই ডাঃ গৌতমের এখন আর বটগাছের কোনও চিন্তা নেই । সিন্থেটিক বটগাছ । আবার তার সঙ্গে আছে কোর্ট কাছারির পাকাপোক্ত আদেশনামা । শীত গ্রীষ্ম বর্ষা সব সময় তাঁর বটগাছে সবুজ পাতা, লাল ফল আর নীচে পাখীর সাদা বিষ্ঠার সুন্দর ডিজাইন


পাখীর কিচির মিচির আছে সর্বদা । পাখীরা ফল খায় না খেতে পারে না বলে । সিন্থেটিক ফল কি আর কেউ খেতে পারে ? কিন্তু ওদের পেট সর্বদা ভর্তি থাকে । কারণ ওদের মন সর্বদা ভর্তি মানে খুশি থাকে বলে । ওরা কথা বলে গান করে । কিন্তু খায় না । ব্যাপারটা ডাঃ গৌতম বেশ কিছুদিন ধরে দেখেছেন । তারপর বেশ কিছুদিন ধরে ভেবেছেন ।

এরপর গৌতমবাবু একবার একটা জায়গায় বেড়াতে গেলেন । একা একাই দোকা আর কোথায় পাবেন ? গৌতম বাবুর দোকা হওয়া আর বেশ একটু ঝুঁকির তো বটেই । কিছু কিছু মানুষের মৃগী রোগ থাকে । যখন তখন মৃগীর ফিট হয় । মুখ গেজলে পড়ে থাকতে হয় সঙ্গে যে থাকে তখন তার বিপদ । ছেড়েও আসতে পারে না আবার থাকলেও হাজার প্রশ্ন হাজার উপদেশ আর হাজার অস্বস্তি ।

তেমনই হয়েছে ডাঃ গৌতমের কেসটা । হঠাত হঠাত যে কোনও বটগাছ পেলেই নীচে বসে যাবেন। বসে যাবেন আবিষ্কারের ধ্যানে । তখন সঙ্গীর কি দশা হবে ভাবোনমাস ছমাসের আগে তো ভাঙ্গে না সে ধ্যান । তাই এই ক’মাস মানে এই ধ্যান–পিরিয়ডে লাখো প্রশ্ন, লাখো সন্দেহ, লাখো কৌতূহল আর হয়ত লাখো ঘন্টার অনিশ্চিত অপেক্ষা ।  


তাই যেখানে যান ডাঃ গৌতমকে একাই যেতে হয় । একা একাই একবার গিয়েছিলেন চিড়িয়াখানায় । বাঘ-সিংহ-হাতি-হরিণ দেখে চোখ যখন পচে গেল তখন মাঠের ধারে একটা গাছ দেখে নিয়ে বসেছেন । না আপনাদের ভাবার কোনও কারণ নেই । কারণ এই গাছ বটগাছের মত তেমন ঝাকড়া গাছ নয় যে ডাঃ গৌতমের ভাবনা বেশ পাকিয়ে উঠবে । আর ভাবনায় সরকারের কপালে ভাঁজ পড়বে ।

তা যা বলছিলুম । গাছের নীচে বিশ্রাম নিচ্ছেন ডাঃ গৌতম । তাঁর মুখ কিন্তু বিশ্রাম পাচ্ছে না একটুও । এই এক ঘন্টায় কত কি যে খেয়ে গেলেন তার ঠিক নেই । ডালপুরি থেকে ভেলপুরি, দইবড়া থেকে আলুর বড়া, লর্ড চমচম থেকে সামান্য বোঁদে কিছুই বাদ নেই । এমন কি ফুচকার জল দিয়ে পাউরুটি খাওয়া যায় কিনা তার পরীক্ষাও হয়ে গেল । আর একেবারে ডিস্টিংশন নিয়ে পাশ । তিনি নন, খাবারগুলো । তাঁর জিভ কোয়ালিফাইং মার্ক্স দিয়ে গপাগপ খাদ্যনালী দিয়ে উদরে চালান করে দিতে লাগল ।

- একটা রুটি দেবেন স্যার ? বড্ড খিদে পেয়েছে সকাল থেকে কিছু খাই নি ।


একটা বাচ্চা ছেলে । বয়েস সাত আট । পরনে ময়লা গেঞ্জি আর একটা ছেঁড়া ফুলপ্যান্ট । সে জানে আজকাল স্যর বলে না ডাকলে কেউ খুশি হয় না । আর ডাঃ গৌতম তো একজন গুণী লোক ।

ডাঃ গৌতম খুশি হয়ে তাকে এক পিস রুটি দিলেন । আবার আলুর দমের একটা আলুও । ছেলেটা রুটিতে কামড় বসাতে বসাতে চলে গেল । শিম্পাঞ্জির খাঁচার সামনে একজন খুব সুন্দর মাউথ অরগান বাজাচ্ছিল । ছেলেটা একটা কামড় দিয়েই একমনে বাজনা শুনতে লাগল ।

এমনই তন্ময় হয়ে শুনছে যে অন্যদিক দিয়ে যে শিম্পাঞ্জীটা তার হাতের রুটি ফাঁক করে দিচ্ছে একটুও টের পেল না । বাজনা শেষ করে অন্যদিকে চলে গেল ছেলেটা যে মাউথ অরগান বাজাচ্ছিল ।

ডাঃ গৌতম অবাক হয়ে দেখলেন যে সেই বাচ্চাটা আর তার হাতের রুটিটার কথা মনেই আনল না । নিশ্চয় খিদে পেয়ে আবার তাঁর কাছে আর এক পিস চাইতে আসবে ।  তিনি প্রস্তুত হয়েই ছিলেন । এখনও কটা পিস আছে তাঁর হাতে । আহা গরিব বাচ্চা একটু খেতে দিতে পারবে না তাকে ?

ছেলেটি কিন্তু আর এলোই না । তার মানে ওর খাবারটার কথা আর মনেই নেই । মুখ দেখে মনে হল খিদে বলে এখন আর তার কিছু অবশিষ্ট নেই । তার মানে ?


মানেটা আর চিড়িয়াখানায় খোঁজা হল না । পড়ি মরি করে ছুটে এলেন নিজের বাড়ীতে । বসলেন সিন্থেটিক বটগাছের নীচে পাখীর সাদা বিষ্ঠার ডিজাইন করা লাল মেঝেতে । এখানে না বসলে যে চিন্তা দানা বাঁধবে না ।


তাই তো । এর মানে হল বাঁশি বা সঙ্গীতের একটা সম্মোহনী শক্তি আছে যাতে করে খিদে তেষ্টা সব ভুলিয়ে দেওয়া যায় মানুষের । তার মানে সঙ্গীত দিয়ে খিদের কষ্ট ভোলানো যাবে এবার থেকে ।

তিনমাস পরে ধ্যান ভঙ্গ হল ডাঃ গৌতমের । তাঁর এবারের আবিষ্কার মিউজিক থেরাপি নিয়ে । কতগুলো বিশেষ তরঙ্গের মিউজিকের আওয়াজ দিয়ে খিদে ভুলিয়ে দেওয়া যায় । এই পোড়া দেশে রোজ জিনিসের দাম বাড়লেই যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো ভুখা মিছিলের আওয়াজ তোলে সেখানে ডাঃ গৌতমের এই আবিষ্কার তো রীতিমত আলোড়ন ফেলে দেবে ।


শুধু মাউথ অরগান নয় । গীটার, সেতার, সরোদ এমন কি হারমনিয়াম দিয়েও পরীক্ষা হল । সবাই পাশ করলেও ডাঃ গৌতমের মন পাশ করতে না পেরে মনমরা হয়ে রইল । তাই তো সেতার গীটার এসব তো কৃত্রিম বাজনা । এসব তো বেশ দামী জিনিস । খুব সস্তায় কি কিছু হয় না ?


তা ছাড়া এসব তো কৃত্রিম । ব্যবস্থাটা প্রাকৃতিক বা ন্যাচারাল হয়ে বেশ হয় । যেই ভাবা তেমনই কাজ । বটগাছের ডালে ডালে বসা পাখীদের ডাকগুলো সব ডিজিটাইজ করা হল । সেগুলো এবার নিয়ে যাওয়া হল বুভুক্ষু ছেলেমেয়েদের সামনে । এক্কেবারে মিরাকুলাস রেজাল্ট ।


এক একটা যন্ত্র বার করলেন ডাঃ গৌতম । দারুণ সে যন্ত্র । রোজ রোজ খাবার কিনতে হবে না। যন্ত্রটা কিনতে হবে জীবনে মাত্র একবার । সেটাতেই বাজবে পাখীর কল কাকলি । আর তাতেই খিদের দফারফা । ঘুম হবে দারুন । প্রথম প্রথম সরকার বি-পি-এলদের বিনাপয়সায় আর এ-পি-এলদের সাবসিডি দিয়ে দিতে লাগল ।


দারুন ফেভারিট । ডাঃ গৌতমের পঞ্চম একান্ত ব্যক্তিগত ।  গরীব দেশে সবাই এবার বড়লোক হয়ে যাবে । না খেয়ে খেয়ে । এই ডাকগুলোর প্রথমে ডাঃ গৌতম জুড়ে দিয়েছেন কিছু বাঘ-ভালুক আর কুকুরের ডাক । শুনলেই পিলে চমকে পালিয়ে যাবে । সঙ্গে খিদেও । তারপর শুরু হবে পাখিদের কলকাকলি । মধুর আর সুমধুর । না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়বে সব । কারণ সকলের পেট ভর্তি ততক্ষনে ।  


৪/১০/২০১৪


Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.