>

কথা কবিতা।

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 10/10/2014 |

    
বিজয়ের মাস - ফিরেদেখা  (পর্ব- ৫)













পাকিস্তানী আক্রমণ সম্পর্কে শেখ মুজিব ও ভাসানী দুজনেই ওয়াকিবহাল ছিলেন। আতিকুর রহমান তার গ্রন্থের ৭৩ পৃষ্টায় লিখেছেন, জেনারেল বিনীতভাবে বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চাইলেন ২৩ মার্চ কোন প্রকার গুরুতর পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশংকা আছে কি না ।ইংরেজিতে ঝট করে বঙ্গবন্ধু জবাব দেন, That may be on 25th march not on 23th.

 ২০ মার্চ পল্টনে ন্যাপ আয়োজিত জনসভার প্রধান বক্তা ছিলেন ভাসানী।কিন্ত তখন তিনি চট্টগ্রামে সফররত। জনসভার আগের দিন যাদু মিয়া লোক পাঠান চট্টগ্রামে তাকে আনার জন্য। সম্ভবত আশংকা করা হচ্ছিল তিনি আসবেন না। জনসভার আগের দিন চট্টগ্রামে ফোন করা হলে বজলুল সাত্তার জানান, মৌলানা ভাসানী রাতের ট্রেনেই রওনা হয়ে গেছেন। কিন্ত ব্যাপারটা রহস্যময় হয়ে উঠলো যখন দেখা গেল ভাসানী কমলাপুর রেল স্টেশনে নামেন নি। দুপুরে খবর পাওয়া গেল তিনি মৌলানা টাঙ্গাইল চলে গেছেন। চট্টগ্রাম থাকা অবস্থায় শেখ মুজিবের সাথে ভাসানীর কথা হয়। তখন তিনি বলেছিলেন ২০ মার্চ ঢাকায় ফিরেই তিনি সামাদ আজাদের বাসায় উঠবেন। সেখানে মুজিবের সাথে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। মুজিব সন্ধ্যায় সামাদ আজাদের বাসায় এসে অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্ত রাত দশটার পরে বজলুল সাত্তার সামাদ আজাদকে লেখা ভাসানীর একটি চিঠি দেন। ভাসানী লিখেছেন, টাঙ্গাইল চলে গেলাম। তুমি এসে দেখা করো। মুজিবকে বলবে, সাক্ষাতে আলোচনা হলে ভালো। তবে সে যে ভাবে চলছে তার বাইরে যেন সে না যায়।

শেখ মুজিবের অনুমতি নিয়ে সামাদ আজাদ টাঙ্গাইল চলে যান। মৌলানাকে দেওয়ার জন্য মুজিব দশ হাজার টাকা দেন। কিন্ত টাঙ্গাইল যেয়ে দেখা গেল ভাসানী টাঙ্গাইল নেই। সেদিনই সকালে তিনি সন্তোষ থেকে নৌকাযোগে সিরাজগঞ্জের দিকে চলে যান। সম্ভবত ভাসানী পাকবাহিনীর অঘোষিত আক্রমণের কথা জানতে পেরেছিলেন।তাই সন্তোষ ছেড়ে চলে যান।

২৫ মার্চ,১৯৭১। শেখ মুজিব ৩২ নম্বর বাড়িতে একটা জরুরী সাংবাদিক সম্মেলন ডাকার কথা যখন ভাবছিলেন, তখন খবর এলো,ইয়াহিয়া খান জাতির চোখে ধুলা দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। তখন বিকেল ৪টা বাজে। তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত নিতে নিতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। কর্নেল ওসমানী ৭টার দিকে বাড়ির ভিতরেরে ঘরে শেখ মুজিবকে ডেকে নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুভমেন্টের সংবাদটা জানালেন। রাত ৯টা পর্যন্ত ওই সংকটময় মুহূর্তে কর্নেল ওসমানীসহ অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ,ডঃ কামাল হোসেন, আব্দুস সামাদ আজাদ, কাজী জহিরুল কাইয়ুম, ও আরো কিছু বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা। সবাই মিলিতভাবে শেখ মুজিবকে বাড়ি ছেড়ে তাদের সাথে সরে পড়তে অনুরোধ করলেন। কিন্ত শেখ মুজিব নিজ বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত জানিয়ে তাদেরকে নিরাপদ স্থানে চলে যাবার নির্দেশ দিলেন। এরপর রাত এগারোটার দিকে শেখ মুজিব কথা বলেন সিরাজুল আলম খান, আ স ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ এর সাথে।

তাজউদ্দীন ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, দুই দশকেরও অধিক কাল ধরে শেখ মুজিবের ঘনিষ্ট রাজনৈতিক সহকর্মী। ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগ পূনরুজ্জীবিত হওয়ার পর থেকে সকল দলীয় নীতি ও কর্মসুচির মূখ্য প্রণেতা,দলের সকল মূল কর্মকান্ডের নেপথ্য ও আত্মপ্রচার বিমুখ সংগঠক। ৭১ এর মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সামগ্রিক পরিকল্পনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে মুজিবের পরেই ছিল সম্ভবত তার স্থান।

পাকিস্তানী আক্রমণ যখন অত্যাসন্ন, তখন তাজউদ্দীন মুজিবের পা ধরে তাকে ৩২ নম্বর বাড়ি ত্যাগ করার জন্য বার বার অনুরোধ করেন। কিন্ত মুজিব নিজ সিদ্ধান্তে অটল। বললেন, আমাকে যদি মারে তো এখানেই মারবে, নইলে আমাকে খুঁজতে গিয়ে ওরা সারা বাংলাদেশ শ্মশান বানিয়ে ফেলবে।তারপর তিনি তাজউদ্দীনকে বললেন, ঢাকারই শহরতলীতে আত্মগোপন কর। যাতে সবাই এক সময় একত্রিত হতে পারো। মুজিবের নির্দেশে তাজউদ্দীন তাই করলেন। কিন্ত ৩৩ ঘন্টাতেও যখন একনাগাড়ে চলা গুলির আওয়াজ থামলো না তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যে অনুমানের ভিত্তিতেই তাকে শহরতলীতে অপেক্ষা করতে বলা হয়ে থাকুক, তার কোন বাস্তব ভিত্তি নেই। তিনি তরুণ সহকর্মী আমিরুল ইসলামকে নিয়ে ২৭ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করেন। যাবার আগে দলের কোন সহকর্মীর সাথে যোগাযোগ করার কোন উপায়ও ছিল না তখন।

ইয়াহিয়া ভেবেছিলেন, নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালালে বাঙালি দমিত হবে। সে জন্য বুচার টিক্কা খানকে তিনি পূর্ব পাকস্তানের গভর্নর পদে নিয়োগ দেন। কারণ এই টিক্কা খান নির্মমতার সাথে বেলুচ বিদ্রোহ দমন করেছিল। যার ফলে বড় দম্ভ করে বলেছিল বাংলাদেশকে আয়ত্বে আনতে ৭২ ঘন্টার বেশি সময় লাগবে না তার। এরপর শুধু এ দেশে মাটি থাকবে।কিন্ত হিতে বিপরীত ঘটলো। মানুষ রুখে দাঁড়ালো। বাংলাদেশে তখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ছয়টি নিয়মিত ব্যাটলিয়ন, পনর হাজার ই পি আর ও প্রায় চল্লিশ হাজার পুলিশ ছিল। এ ছাড়া ছিল ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ক্যাডেট কোরের অস্ত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্ররা এবং সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার আনসার ও মুজাহিদ। পাক বাহিনী প্রথমে বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত করার চেষ্টা করে এবং পরে এদেরকে আক্রমণ করে। অসহযোগ আন্দোলনের সময় পাকবাহিনীর নির্বিচারে বাঙালি হত্যা বাঙালি সৈনিকদের মনে গভীর রেখাপাত করে। তখন থেকেই অনেকের মধ্যে জাতীয়তাবাদ চেতনা আর সংগ্রামী মনোভাব জাগ্রত হয়।

শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা হয়ত সর্বস্তরের সব মানুষ শুনতে পায় নি। কিন্ত মেজর জিয়ার ঘোষণা বাংলার পথে প্রান্তরে প্রায় সব মানুষ শুনতে পায়। এতে সেদিন সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে বিক্ষিপ্ত, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন জনগণ এবং বাঙালি সৈনিকরা যেন একটা দিক নির্দেশনা খুঁজে পেলো।
পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর সেনা সদস্যগণ। সবাই যে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তা নয়। অনেকে নিরস্ত্রকৃত হয়েছে, কেউ বন্দী ছিলেন, কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানীদের পক্ষে সক্রিয় থেকেছে। পাকিস্তানীরা বাঙালি বিদ্রোহী সৈন্যদের এমন ভাবে ধাওয়া করে সীমান্তে নিয়ে গিয়েছিল যে, এদের জন্য পাকিস্তানে ফিরে আসার পথ সম্পুর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। হয় কোর্ট মার্শাল নয় স্বাধীনতা-- এই দুটি পথ ছাড়া তাদের সামনে আর কোন পথ খোলা ছিল না। এমনি ভাবে পাকিস্তানী আক্রমণের এক সপ্তাহের মধ্যে স্বাধীনতার লড়ায়ে শামিল হয় ইবিআর ইপিআর এর অভিজ্ঞ সশস্ত্র যোদ্ধারা । কখনো কোন রাজনৈতিক আপোস-মীমাংসা ঘটলেও দেশে ফেরার পথ তাদের জন্য বন্ধ ছিল ততদিন, যতদিন না পাকিস্তানীরা এ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়।

১৯৭১ সনের ১ মার্চ এ যেদিন অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়া হল সেদিন থেকেই শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের উপর অনেকগুলো দায়িত্ব এসে বর্তালো। এ সব দায়িত্ব সুশৃংখলভাবে পালনের জন্য সেদিন শেখ মুজিব তার উর্ধতন নেতৃবৃন্দ নিয়ে একটি হাইকমান্ড বা উচ্চতর কতৃপক্ষ গঠন করেন। এই হাইকমান্ডে ছিলেন শেখ মুজিব, তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক ও কামরুজ্জামান। এদের সহযোগিতা করার জন্য নিয়োগ করা হয়,ডঃ কামাল হোসেন এবং মেজর রফিকুল ইসলামকে।
২৫ মার্চ অপারেশন সার্চ লাইটের পর এই হাইকমান্ড এর সদস্যদের মধ্যে তাজউদ্দিন ৩০ মার্চ প্রথম  
ভারতে পদার্পণ করেন । কাজেই সেদিন তার দায়িত্বটা ছিল সবার চেয়ে বেশি। সীমান্ত অতিক্রম করার আগে কয়েকবারই তাজউদ্দিন মনে করেছিলেন হয়তবা এই আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য উচ্চতর পর্যায়ে কোন ব্যবস্থা ভারত সরকারের সাথে করা হয়েছে। তার এ কথা মনে করার বিশেষ কারণ ছিল। মার্চের ৫ অথবা ৬ তারিখে তাজউদ্দিন শেখ মুজিবের নির্দেশে গোপনে ঢাকাস্থ ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার কে সি সেনগুপ্তের সাথে সাক্ষাত করেন। উদ্দেশ্য ছিল, পাকিস্তান শাসকেরা যদি সত্যি সত্যি পূর্ব বাংলায় ধ্বংস তান্ডব শুরু করে ,তবে সে অবস্থায় ভারত সরকার আক্রান্ত কর্মীদের আশ্রয় প্রদান বা সম্ভাব্য প্রতিরোধ সংগ্রামে কোন সাহায়্য সহযোগিতা করবে কি না তা জানতে চাওয়া। এ প্রশ্নের জবাব অন্বেষণে সেনগুপ্ত দিল্লী যান এবং ফিরে এসে সেনগুপ্ত জানান যে,পাকিস্তানী আঘা্তের সম্ভাবনা সম্পর্কে ইসলামাবাদস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার বিপরীত মত পোষণ করেন। তবু যদি নিতান্ত আঘাত আসেই তাহলে ভারত আক্রান্ত মানুষের জন্য সম্ভাব্য সকল সহযোগিতা প্রদান করবে। এ ব্যাপারে তাজউদ্দিন আবার শেখ মুজিবের পরামর্শে ২৪ মার্চ এ সেনগুপ্তের সাথে বসবেন বলে স্থির করা হয়। কিন্ত সে সময় বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসুচি নিয়ে তাজউদ্দিন ব্যস্ত থাকায় তাদের আর বসা হয় নি। সীমানা অতিক্রমের সময় তাজউদ্দিন ধরে নিয়েছিলেন, হয়ত শেখ মুজিব অন্য কারো মাধ্যমে ব্যবস্থা করে রেখেছেন। কিন্ত সীমানায় পৌছার পর তাজউদ্দিনের আশাভঙ্গ হল। বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সেনাদের সমর্থনে ভারতের সীমান্ত সামরিক ইউনিটসমুহের হস্তক্ষেপ করার কোন ক্ষমতা নেই। তারপরও তাজউদ্দিন বি এস এফ এর প্রধান রোস্তমজীর কাছে মুক্তিফৌজ গঠনের আবেদন জানালে রোস্তমজী বলেন,মুক্তিফৌজ ট্রেনিং বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এই ট্রেনিং শেষ হলেই না কেবল তাদের হাতে অস্ত্র দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। কিন্ত এই সিদ্ধান্ত দেবার অধিকার একমাত্র ভারতের প্রধানমন্ত্রীর। তবে তাজউদ্দিন চাইলে তিনি তাকে দিল্লীতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। তাজউদ্দিন বুঝলেন ভারতের সাথে  আলোচনা করে এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়নি। কাজেই তাকে শুরু করতে হবে একেবারে প্রথম থেকেই।

৩ এপ্রিল তাজউদ্দিন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেন। প্রথমেই ইন্দিরা গান্ধী জিজ্ঞাসা করেন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়েছে কি না ।তাজউদ্দিন এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার সময় উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োগ করেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে জানান, ২৫/২৬ মার্চের রাতেই বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। শেখ মুজিব সেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান, তিনি প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য সহকর্মীরা তার মন্ত্রিসভার সদস্য। বর্তমানে শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে সব সদস্যের অনুমতিক্রমে তিনি সার্বিক দায়িত্বে আছেন।ঐ মুহূর্তে তাজউদ্দিনের এই কথা বলা ছাড়া উপায় ছিল না। কারণ, একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী তো আর এমন এক সদস্যের সাথে কথা বলবেন না,যে সদস্যের নিজ দেশের সরকারের অস্তিত্ব নেই। তিনি কথা বলবেন সেই দেশের সরকার বা সরকারের প্রতিনিধির সাথে।

তাজউদ্দিন নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেয়ার ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রবল গতি সঞ্চারিত হয় এবং মুক্তিসংগ্রাম এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে।কিন্ত এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে দলীয় কোন্দল ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব অ্নিবার্য হয়ে উঠে।যা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এবং মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় সমগ্র রাজনীতিকে বিরাটভাবে প্রভাবিত করে রাখে।

দিল্লী থেকে ফিরে তাজউদ্দিন ৮ এপ্রিল কলকাতায় আসেন।এখানে ভবানীপুর এলাকার ২১ রাজেন্দ্র রোডে অবস্থিত বরিশালের সাবেক গণপরিষদ সদস্য চিত্তরঞ্জন ছুতারের বাড়িতে কামরুজ্জামানসহ উপস্থিত আওয়ামী ও যুব নেতৃবৃন্দকে তার দিল্লী সফর ও ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সফল আলোচনার কথা সবিস্তারে বলেন। কোন প্রেক্ষাপটে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ,সরকার গঠন ও নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর পরিচয় দিতে বাধ্য হয়েছেন তাও ব্যাখ্যা করেন।এবং এতদসংক্রান্ত একটি ভাষণ বেতারের মাধ্যমে প্রচার করার প্রস্তাবও উপস্থিত নেতৃবৃন্দের সামনে পেশ করেন। উপস্থিত নেতৃবৃন্দ মুক্তিযুদ্ধের সাহায্যের ব্যাপারে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করার যৌক্তিকতা, অথবা দিল্লী আলোচনার উপযোগিতা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন তোলেন নি।তারা অধিকাংশই বিতর্ক তোলেন তাজউদ্দিনের প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণের বৈধতা নিয়ে।কিন্ত যুবনেতা ফজলুল হক মণি শুধু প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ নয়, মন্ত্রিসভা গঠনেরই প্রবল বিরোধিতা করেন, এবং বাংলাদেশ স্বাধীন সরকার ও সামরিক কমান্ড গঠন-সংক্রান্ত তাজউদ্দিনের প্রস্তাবিত বেতার ভাষণ প্রচার বন্ধ করার দাবি জানান। পরে শেখ ফজলুল হক মণি ৪২ জন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতার স্বাক্ষর সংগ্রহ করে তাজউদ্দিনের বক্তৃতা বন্ধ করার জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে এক আবেদন প্রেরণ করেন। তাজউদ্দিন কর্তৃক মন্ত্রিসভা গঠন এবং তার প্রস্তাবিত বেতার ভাষণ রদ করার জন্য চিত্তরঞ্জন ছুতারকে বেশ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়।
যুব নেতৃবৃন্দের অসন্তোষ প্রকাশের পিছনে কারণ ছিল। শেখ মুজিব ১৮ ফেব্রুয়ারি চার যুব নেতা সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদকে ভারতে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তাজউদ্দিনকেও সঙ্গে নিতে বলেন। শেখ মুজিব বলেন যে, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে হবে এবং তা হবে সশস্ত্র বিপ্লব। শেখ মুজিব ভারতে গিয়ে কলকাতায় গণপরিষদের সাবেক সদস্য চিত্তরঞ্জন ছুতারের ২১ রাজেন্দ্র রোডস্থ বাসভবনে তাদেরকে উঠতে বলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে,চিত্তরঞ্জন ছুতার অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার সাথে সাথেই কলকাতায় যান এবং ২১ রাজেন্দ্র রোডে অবস্থান করতে থাকেন।
 তাজউদ্দিনের প্রধানমন্ত্রী হওয়া শেখ মুজিব কর্তৃক ১৮ ফেরুয়ারি প্রদত্ত নির্দেশ পরিপন্থী বলে আব্দুর রাজ্জাক দাবী করেন। শেখ মুজিব তাজউদ্দিনের উপস্থিতিতে চার যুব নেতাকে বলেছিলেন, কমান্ড কাউন্সিল হবে এবং কমান্ড কাউন্সিলের মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালিত হবে।এমন কী তিনি বলেছিলেন যে, স্বাধীনতার পরেও এই কমান্ড কাউন্সিলের মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হবে পাঁচ বছর পর্যন্ত। পাঁচ বছর পর গণতন্ত্র এবং বহুদল ব্যবস্থা চালু হবে। পাঁচ বছরের মধ্যে নির্বাচন হবে না। কারণ অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে সশস্ত্র বিপ্লবের পর দেশে অস্ত্র থাকে বিভিন্ন বয়সী লোকের কাছে। আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বঙ্গবন্ধু যা বলেছিলেন সে অনুযায়ী কাজ হলনা।
প্রধানমন্ত্রী যদি কেউ হন তাহলে বঙ্গবন্ধুই হবেন। বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রী করে তিনি উপমন্ত্রী হতে পারতেন। আর সিনিয়রিটি অনুযায়ী উপমন্ত্রী তো হবেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তাজউদ্দিন ছিলেন তিন নম্বরে। তিনি কমান্ড কাউন্সিল না করে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করলেন। তাজউদ্দিনের সাথে কথা ছিল, তিনি ভারতে গিয়ে চিত্তরঞ্জন ছুতারের বাসায় উঠবেন। কিন্ত তাজউদ্দিন তা না করে দিল্লী চলে গেলেন।

তাজউদ্দিনের সাথে চার নেতার বিরোধের সূত্রপাত এখান থেকেই। শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কে বা কারা দেবেন তা সুস্পষ্ট না হওয়াতে নেতৃত্ব-কলহ ও বিশৃংখলা একরূপ অবধারিত ছিল বলেই বলা চলে। তাজউদ্দিন আশংকা করেন,মার্চের অসহযোগ আন্দোলন, ২৫ মার্চ থেকে পাক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ,বাঙালি সশস্ত্রবাহিনীর স্বতঃস্ফুর্ত বিদ্রোহ এং সম্মিলিত সিপাহী-জনতার প্রতিরোধ সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে অবয়ব ফুটে উঠতে শুরু করেছে,আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব-কলহ ও বিশৃংখলা তা নস্যাৎ করে দিতে পারে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করার ব্যাপারে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস কার্যকর রূপ না নেওয়া পর্যন্ত অস্থায়ী সরকারের গঠনে কোন বড় ধরণের পরিবর্তন আনলে শেখ মুজিব কর্তৃক সরকার গঠিত হওয়ার দাবী সম্পর্কেই ভারত সরকারের সন্দেহ হতে পারে এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্ষতি হতে পারে ----ইত্যাদি ভেবে তাজউদ্দিন সেদিন অনেক ধৈর্যসহকারে দলের রাজনৈতিক ও যুবনেতা এবং সাধারণ কর্মীদের বিরোধিতা সত্বেও স্বাধীন সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই দিল্লীতে থাকাকালীন সময়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের মুলনীতি সম্বলিত একটি বেতার ভাষণ রেহমান সোবহান এবং আমিরুল ইসলামের সহযোগিতায় তৈরি করা হয়, যা রাজেন্দ্র রোডস্থ বাসভবনে নেতৃবৃন্দের সামনে তাজউদ্দিন পেশ করা করেছিলেন, তা ১১ এপ্রিল শিলিগুড়ি্তে এক অনিয়মিত বেতার কেন্দ্র থেকে তাজউদ্দিনের কন্ঠে রেকর্ড করে প্রচার করা হয়। তখনো বাংলাদেশের নিজস্ব বেতারকেন্দ্র হয়নি। পরবর্তী সময়ে এ ভাষণ আকাশবাণীর নিয়মিত কেন্দ্রসমুহ থেকে পূনঃপ্রচারিত হয়।

এরপরের কাজ হল মন্ত্রিসভার সকল সদস্যদের খুঁজে বের করা। তাজউদ্দিন আমিরুল ইসলামকে নিয়ে মালদহ,বালুরঘাট,শিলিগুড়ি,রূপসা ও শিলচর হয়ে ঘুরে ঘুরে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, আব্দুল মান্নান ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে খুঁজে বের করেন এবং তাদের নিয়ে আগরতলায় আসেন। আগরতলায় খোন্দকার মোশতাক আহমদ আর কর্নেল ওসমানী অপেক্ষা করছিলেন।দুইদিন ধরে তাদের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা, ও বিতর্ক চলে।
অবশেষে মন্ত্রিসভার ক্ষমতার পরিসরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধন করে 'স্বাধীনতা আদেশ ঘোষণা' অনুমোদন করা হয়। এটাই পঠিত ও প্রচারিত হয় ১৭ এপ্রিল বৈদ্যনাথতলায় মুজিব নগরে প্রবাসী সরকার গঠনের দিনটিতে।১১ এপ্রিলে তাজউদ্দিনের দেয়া বেতার ভাষণের সাথে সামঞ্জস্য রেখে 'স্বাধীনতা আদেশ ঘোষণা'র তারিখ দেয়া হয় ১০ এপ্রিল।
স্বাধীনতা আদেশ ঘোষণায় শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা, প্রধান সেনাপতির ক্ষমতা, এমন কী প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্য নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির অথবা তার অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির হাতে অর্পণ করা হয়।এবং এই আদেশটি ২৬ মার্চ থেকে কার্যকারিতা লাভ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের হাতে আইন প্রণয়ন এবং কার্যকরী ক্ষমতা ন্যস্ত হওয়াতে প্রধানমন্ত্রী পদের দাবীদাররা আপাতত তাদের আকাঙ্খা দাবিয়ে রাখেন।

দিল্লীতে তাজউদ্দিন যখন মুক্তিযুদ্ধের সাংগাঠনিক পরিকল্পনা শুরু করেন তখন এদিক এপ্রি্লের ৪ তারিখে সিলেট জেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী ইউনিটগুলির কমান্ডারগণ একত্রিত হন প্রতিরোধ যুদ্ধের সমস্যাবলী আলোচনা এবং সম্মিলিত কর্মপন্থা নির্ধারণের উদ্দেশে। এ বৈঠকে যোগ দেন,কর্নেল আতাউল গণি ওসমানী, লে,কর্নেল আব্দুর রব, মেজর জিয়া, খালেদ মোশাররফ, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর কাজী নুরুজ্জামান,মেজর নুরুল ইসলামসহ আর কয়েকজন। আলোচনায় বুঝা গেল পাকবাহিনীকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তাদের বড়ই অকিঞ্চিৎকর। এমতবস্থায় তারা ভারতের শরণাপন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং বিদেশ থেকে অস্ত্র-শস্ত্র সংগ্রহ করার জন্য একটি রাজনৈতিক স্বাধীন সরকারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কিন্ত সরকার গঠনের জন্য তারা অপেক্ষা না করে বাস্তবতার আলোকে বিদ্রোহী ইউনিট গুলোর সমন্বয়ে মুক্তিফৌজ গঠন করেন। মুক্তিফৌজ পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয় কর্নেল ওসমানীর হাতে। ভারতীয় নিরাপত্তা এজেন্সিগুলির মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলের রণাঙ্গনের  এসব খবর পৌছে যাচ্ছিল তাজউদ্দিনের কাছে।

(ক্রমশ)



Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.