>

অলোক ভঞ্জ.

Unknown | 6/10/2014 |



মনশুন
গ্লোবাল-ওয়ামিং এর তাড়ায় মনশুন এখন ভীত সন্ত্রস্ত কুকুর বিড়ালের মত পিছু হটতে হটতে প্রায় পালিয়ে যাবার জোগাড়। তাই তাকে কাছে টেনে নিয়ে সোহাগ আল্হাদ করার সুযোগ নেই বললেই চলে। প্রকৃতি তার রূপ বদলায় ঠিকই কিন্ত সেই রূপ দেখার বা উপভোগ করার মতো চোখ বা মানসিকতা আর আমাদের নেই। গিন্নীরা যেমন সেজেগুজে নিজেরাই কাছে এসে জিজ্ঞাসা করে - দেখোতো কেমন লাগছে, আমরাও হয়তো সেই আশাতেই বসে থাকি প্রকৃতি কখন আমাদেরকে ডেকে বলবে দেখোতো তুমি মোরে চিনিতে পারো কিনা। কিন্তু দুঃখের বিষয় প্রেম আর প্রকৃতিতে এই তফাৎ - প্রকৃতি কথা বলতে পারেনা, অ্যাড্ও দিতে পারেনা বা মোবাইলে এস-এম-এসও পাঠাতে পারেনা, যে আমি রূপ বদল করে আসছি তোমরা তৈরী থেকো। সবই আমাদেরকে বুঝে নিত হয়, আর সেই বোঝার ক্ষমতাটাইতো আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আজ আমাদেরকে সব কিছুই জানতে বা চিনতে হয় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। ঋতু পরিবর্তনের কথাও জানতে হয় টিভি কিংবা খবর কাগজের মাধ্যমে। আগে ডাক্তাররা নাড়ী টিপেই অসুখের খবরাখবর জেনে নিতেন, আর এখন সে বোঝার ক্ষমতাটাই তাদের নেই। তাই তারা নাড়ীর বদল আপনারই গলা টিপে নানান ধরনের টেষ্ট লিখে প্রচুর টাকা ধ্বংস করিয়ে আপনাকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে শারিরীকভাবে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেন।

অথচ মজার ব্যপার মেডিকেল সায়েন্স এত উন্নত হওয়ার পরও সামান্য ঘা সারাতেও প্রকৃতির দ্বারস্থ হতে হয়, ঘা যত ভিতরে, তা সারতে সময় লাগে তত বেশি। আরো ভিতরের ঘা অর্থাৎ মনের ঘা, যা সারানোর তেমন কোন ওষুধইতো বাজারে নেই, প্রকৃতিই একমাত্র ভরসা, তাইতো ডাক্তাররা উপদেশ দেন হাওয়া বদল করুন। কিন্তু এখনকার দিনে হাওয়া বদল করা যে অতো সহজ নয় তা ডাক্তারও জানে আর রূগীও জানে। তার চেয়ে স্বামী-স্ত্রী বদল করাও বোধহয় সহজ কাজ। আর স্থান পরিবর্তন করেও কোন লাভ নেই সব যায়গার হাওয়াতো একই, সে রাজনৈতিক হাওয়া, আধুনিকতার হাওয়া কিংবা মানবিকতার হাওয়া যাই বলুনা না কেন, প্রকৃতির হাওয়া তাকে কতটুকুই বা বদলাতে পারে।

আগেকারকালে আমরা প্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকতাম। ভোরের মিষ্টি আলো আর পাখীর গুঞ্জনে আমাদের ঘুম ভাঙতো, আর এখন এসি-রুমের ভরী পর্দা দেওয়া ঘরে - না ঢোকে ভোরের আলো, না আসে পাখীর কলরব, ঘুম ভাঙ্গে কাগজের লোক কিংবা কাজের লোকের ডোর বেলে।

আমরা জাতপাত ছোট-বড়ো নিয়ে কত মাথা ঘামাই তবু তা পুরোপুরি মিটিয়ে ফেলতে আজও সফল হয়নি, তাইতো এত হানাহানি এত ভেদাভেদ। অথচ প্রকৃতির কাছে রাজা কিংবা ভিখারী সবাই সমান, সবার দুয়ারেই হাজির, না চাহিলেও যারে পাওয়া যায়, তাকে গ্রহণ করা বা না করা আমাদের উপর। এখনতো আমরা আলো বাতাসকেও ভয় পাই, তা থকে নিজেদের শরীরকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই, অথচ আমরা ভুলে যাই এই আলো বাতাসই আমাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

প্রকৃতির আরো এক বড় গুন কোন মান অভিমান নেই – অনেকটা রাস্তার কুকুরদের মত, অপনি মারধোর করে তাড়িয়ে দেওয়ার পরও একবার ডাকলেই চলে আসবে আবার খুশি হয়ে লেজও নাড়াবে। প্রকৃতিও তাই - আপনি দরজা জানলা বন্ধ রেখে প্রকৃতিকে যতই অটকে রাখুন না কেন কিন্তু একবার তা খুলে দিলেই আলো, বাতাস সব এসে আপনাকে সানন্দে জড়িয়ে ধরবে আপনার গায়ে লুটোপুটি খাবে, আদরে আবদারে আপনাকে ভরিয়ে দেবে। সত্যি এই স্বভাবটা যদি মানুষের থাকতো কত সমস্যারই সমাধান হয়ে যেতো, সমস্যার সুত্রপাতই হয়তো হত না।

আমরা নিজেরাই প্রকৃতি থেকে দূরে সরে থাকি তাই প্রকৃতির পরিবর্তন আমাদের চোখে পড়ে না।, আর যদিবা পড়ে তার খারাপ দিকটার কথাই বেশী মনে পড়ে। তাই বর্ষায় জল-কাদায় হায়রানির কথাই আমরা বেশী ভাবি, কিন্তু বর্ষার সৃষ্টিশীল রূপটার কথা বেমালুম ভুলে যাই। প্রসব যন্ত্রনার তীব্র কষ্টটাকে মনে রাখলে হয়তো সৃষ্টিই বন্ধ হয়ে যেতো, তাই সে যন্ত্রনার কথা আমরা ভুলে যেতে চাই। অথচ প্রকৃতির বেলায় তা মানতে রাজী নই – তাই প্রকৃতিও হয়তো তার এই ক্ষোভ জ্বালা মেটানোর তাগিদেই ধ্বংসের খেলায় মেতে ওঠে আর তখন আমাদের নিরুপায় দর্শক হওয়া ছাড়া আর কোন গতি নেই।

বর্ষাকালে সেই “বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপর নদে এলো বাণ” এর দিন আর নেই, কারণ বৃষ্টির শব্দ শোনার মত কানই আমাদের নেই। আকাশে বর্ষা এসেছে সে খবরও এখন জানতে হয় আকাশবাণী থেকে আকাশের বাণী থেক নয়, কারণ সে বাণী শোনার মত সময় আমাদের নেই। এমনকি বইরে যে বৃষ্টি পড়ছে সে কথাটাও হয়তো জানতে হয় পাড়া-পড়শীর মারফৎ। আর জানলেও যে দেখার ইচ্ছে হবে তাও নয়, বৃষ্টিদর্শন তাও ছাড়া যায় কিন্তু টিভিদর্শন - নৈব নেব চঃ - বিশেষ করে প্রাইম টাইম সিরিয়েল, আর টি-টয়েন্টি ম্যচ থাকলেতো কথাই নেই।

তবু আজও হঠাৎ অফিস ফেরতা পথে কালবৈশাখীর ঝড় বৃষ্টি দেখলে কেমন যেন প্রানটা হাহাকার করে ওঠে, ছোটবেলার সেই কালবৈশাখীর বৃষ্টির পর ভেসে আসা মাটির সোঁদা গন্ধ যেন আজও নাকে আসে। এত দেশ-বিদেশের পারফিউমের উগ্র গন্ধতেও তা হারিয়ে যায়নি। শুধু কি তাই, বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর মাঝ উঠনে জমে থাকা সেই অথৈ জলে কগজের নৌকা ভাসানো আর তাদের ভেসে বেড়ানোর দৃশ্যটা আজও মনে পড়ে। কিছু নৌকা শুরুতেই কাত হয়ে যেতো, কিছু দূরে যেয়ে পাড়ে ধাক্কা খেতো, আর কিছু নৌকা মনের আনন্দে ভেসে বেড়াতো – তা যেন জীবনেরই প্রতিছবি - এক একটা নৌকা যেন এক একটা মানুষ - জীবন সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে।

না আর বেশী নষ্টালজিক হয়ে কাজ নেই তার চেয়ে বরং আসুন আমর আবার সবাই মিলে আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে সজাগ করে প্রকৃতির সবরকম রুপ-রসের আস্বাদ গ্রহণ করার চেষ্টা করি। ভয় নেই - তার জন্য আপনাক জাপান বা কাশ্মীর যেতে হবে না, শুধু রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতার লাইনটা একটু মনে করুন তাহলেই বুঝতে পারবেন প্রকৃতির রুপ আস্বাদন করার জন্য তেমন কিছুই চাই না, চাই শুধু দেখার মত চোখ আর মন।

 দেখিতে গিয়েছি পর্ব্বতমালা, দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু ,    
 দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া,   
 একটি ধানের শীষের উপর, একটি শিশির বিন্দু।

Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.