ওগো তুমি পঞ্চদশী
তেরো
চৌদ্দ বছরের মেয়ে যেন সব সময় একটা চিন্তার মধ্যে ডুবে থাকে। দেশে থাকতে এই মেয়েই
কত প্রাণোচ্ছ্বল ছিল। যেন একটা সদ্য ফোটা কুঁড়ি । ফুল হয়ে ফুটবে বলে অপেক্ষা করছে।
কিন্তু কই সেই বেড়ে ওঠা কুঁড়ি?
মা-বাবার সাথে সদ্য কৈশোরে
পা দেওয়া পলি এসেছে,আমেরিকার
নেইবারহুড ওয়াশিংটন কাউণ্টির রিচার্ডসন শহরে। প্রথম এই প্রবাসের মাটিতে পা দিয়ে
সেই মেয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। মা-বাবা
নিজেদের পায়ের মাটি দৃঢ় মজবুত করবে বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল দৈনন্দিন কাজের সন্ধানে। মেয়ে
ভর্তি হল মিডল স্কুলে।
দেশের
অত্যধিক প্রতিযোগীতার ফসল না হতে পেরে বেশ ভালই লাগছিল সেই মেয়ের। কিন্তু......?
স্কুলের
ছেলেমেয়েদের ফ্রী মিক্সিংটাতে নিজেকে কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছে না। পড়াশুনার গল্প
ছেড়ে সব মেয়েরা খালি ছেলেদের গল্প করতে ভালবাসে,শুধু ভালবাসাই নয় -সাথে
থাকে দুর্দান্ত সব সেক্সের গল্প,যা দেশ
থেকে সদ্য আসা একটা কিশোরী মেয়ের কাছে একেবারে বোমাফাটার মতন। দু-একজন ছাড়া প্রায়
সব মেয়েই ছেলেদের নিয়ে আলোচনাটা-কেই বেশী
গুরুত্ব দেয়। যেটা পলির মোটেই পছন্দ নয়। দেশ থেকে সদ্য আসার জন্য না অন্য কিছু
তাকে বাধা দেয়?-মা-বাবার সাথে এই বিষয়ে
আলোচনা করতেও যেন তার স্বভাবে বাধে।
তাই
বাড়ীতে এসে পড়ার টেবিলে স্কুলের বান্ধবীদের কথোপকথন মনটাকে বড্ড বেশী নাড়া দেয়। সে
তো কিছুই বোঝে না ওদের কথাবার্তা।
আজকে
স্কুলের ক্লাসটাকে সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না। শেষ ক্লাসে বিকেল ৩টের সময় সুইমিং
কস্টিউম পরে তার উপরে লম্বা লম্বা বিভিন্ন রং-এর তোয়ালে জড়িয়ে-বেরিয়ে
এল একদল মেয়ে। করিডোরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল সুইমিং ক্লাস নেওয়া কিছু ছেলেও।
স্কুলের
পিছনের ইনডোর সুইমিং পুলটা। মাঝারি পুল-৪০ ফুট
চওড়া। ১৪০ ফুট লম্বা। ড্রাইভ দেওয়ার জন্য বোর্ড রয়েছে তিন থাক। চারপাশে এখানে ওখানে
ছিটানো আছে লাউঞ্জিং চেয়ার। পুলটা এমনভাবে তৈ্রী যে বিকেলের পড়ন্ত রোদ এসে
স্কাইলাইট থেকে বিছিয়ে থাকে স্বচ্ছ নীল জলে।
পলির
সুইমিং জানা থাকায় একটু সুবিধা ছিল। তাও একবার তাকে লেশন নিতে হয়েছে -এটাই স্কুলের
নিয়ম। গায়ের ওপরের তোয়ালে খুলে মেয়েরা তাদের যোগ্যতা মত ভাগে ভাগে পরপর তিনটে তাক
থেকে সমারলস্ট ড্রাইভ দিয়ে নামল সুইমিং পুলে-তাদের
মধ্যে পলিও মিশে গেল। ভুউউউশ করে ভেসে উঠল ৩০ ফুট দূরে। কেউ আবার লম্বালম্বি ওপারে
চলে গেল ফ্রী স্টাইল সাঁতার কেটে। ফিরে এল ব্রেস্ট স্ট্রোক দিয়ে। তারপর আয়েস করে
ব্যাক-স্ট্রোক
দিয়ে রওনা হল আবার ওপরের দিকে। সাঁই সাঁই সাঁতার কেটে কেউ বা পলির পাশ দিয়ে বেরিয়ে
চলে গেল। আবার পাথরের দেওয়ালে হাত স্পর্শ করামাত্র পাঁই করে ঘুরে দেওয়ালে পা
বাধিয়ে পাকা সাঁতারুদের মত ঝাঁপ দিল সামনের দিকে। আবার কেউ কেউ পলির গা ঘেঁষে
দুপাশে ঢেউ তুলে চলে এল আবার ওপারে। পলিও ওদের পিছন পিছন এপারে পৌঁছেই দুই হাতে ভর
দিয়ে উঠে পড়ল ।
এবার সব
মেয়েদের সাথে চলে গেল স্কুল মেয়েদের বাথরুমের ঘরে----
না আর
চিন্তা করতে পারছে না পলি...ওর তো
ওদের এই নির্লজ্জভাবে সব জামা কাপড় খুলে ফেলাটাকে...নাঃ না না ...সবার
সামনে ...হলেও বা
সবাই মেয়ে...ও দেরী
করছে দেখে সবাই ওকে নিয়ে কেমন ভাবে হাসাহাসি করছিল।
বাবার
সাথে মেয়েদের সম্পর্ক নিয়েও এরা নিজেদের মধ্যে বলাবালি করে নির্বিবাদে। অদ্ভুত
লাগে পলির। ওর মনে হয় ছুটে চলে যাবে দেশে মা-বাবাকে
ছেড়ে। মা বাবাও কেমন যেন আজকাল হয়ে যাচ্ছে। কত হাসি ঠাট্টা করত বাবা আর মা মিলে---আর এখানে?না থাক...আর বলে কাজ নেই।
এমন কেউ নেই,যাকে সব
কথা খুলে বলা যায়?
মা দুবার
এসে দেখে গেছে পলি টেবিল ছেড়ে স্থির হয়ে শুয়ে রয়েছে তার বিছানায়। একটা হাত মাথার
নিচে আর একটা হাত বুকে। মুখটা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে,ঠোঁট দুটো চেপে রেখেছে একটার ওপর আর একটা।
ভাবছিল
শুয়ে শুয়ে সেই অদ্ভুত লজ্জাহীণা মেয়েদের ব্যবহার...সেও তো দেশে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছে কিন্তু এ যেন ...না না আর ভাবতে
পারছে না সে। মাথাটা কেমন যেন টনটন করছে...চোখটা
ভারী হয়ে যাচ্ছে।
ফিসফিস
করে বলতে চায় তার গোপন কথা -যে কথার
ভাব আছে,ভাষা
নেই। স্থূল বাস্তব/সূক্ষ্ম
পরাবাস্তব।
কথায় বলে-”শতং বদ মা লিখ”
তখন সে
একা আর এক বগ্গা।
-কি রে এখনও শুয়ে
থাকবি নাকি?স্কুল
থেকে এসে অবধি একবার টেবিলে আবার এখন দেখি বিছানায়?কেন?কি হয়েছে
বলবি?
-বলা যাবে না...মা। মানে বলতে
আমার গা-মন সব
ঘিন ঘিন করছে। শুধু একটাই প্রশ্ন-তোমরা
কেন নিজেদের সুখের জন্য আমাকে এত বড় একটা শাস্তি দিলে? না পারছি এদের
সাথে মিশতে-না পারছি
এদের আদব কায়দা মেনে নিতে!তাকে মা -এর সামনে খুলতেই
হল দুঃখের উপচে পড়া ডালি।
দুহাতে
তালুর ওপর চিবুক রেখে চুপচাপ শুনলেন মা। চশমাটা ঠিক করে নিলেন। গভীর চিন্তায় মগ্ন
হয়ে রইলেন পুরো একটা মিনিট ২৬ সেকেন্ড। তারপর ৪ সেকেন্ডে নিজের মনকে আয়ত্ত্বে এনে
বলে উঠলেন...
আমরা কি
আর নিজেদের সুখের জন্য এসেছি না তোকে বেটার লাইফ দেবো তার জন্য এসেছি? দেশে কত
কম্পিটিশন দেখেছিস তো? কত স্কোপ
আছে এই দেশে? বুঝবি
যখন-তখন আর
আমাদের দোষ দেখবি না।
তোমাকে
তোমার মতন বাঁচতে শিখতে হবে। নিজের মর্যালিটি বাঁচিয়ে এদের সাথে মিশতে হবে। তোমার
মতন কত মেয়ে আছে এদেশে যারা প্রথম এসে গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসেছিল তারপর নদীর পাড়ের
খুঁটি শক্ত করে ধরে নিজেদের প্রতিষ্টিত করেছে। এটা সম্পূর্ণ একটা অন্য দেশ,অন্য কালচার-সেখানে তোমার
পছন্দমত সব পেতে গেলে নিজেকে আগে তৈ্রী করো।
ফোঁস করে
উঠল মেয়ে-
-নিজেকে তৈ্রী? কি বলতে চাইছো? তোমরা বুঝবে না
আমাদের মতন দেশে জন্মানো মেয়েদের ব্যথা,যারা এই
টিনেজ-এ এসে এক
ভিষণ সমস্যার মুখোমুখি হয়। তারা এখানকার কালচার জানবে না নিজেদের পড়াশুনায় মন দেবে?
তোমরা
বুঝবে না-কি দারুন
মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে আমার দিন কাটছে। কাউকে বুঝিয়ে উঠবার মতন মানসিকতা
হারিয়ে ফেলছি দিনের পর দিন। তোমরা আছো তোমাদের জগতে আর আমি?দুঃখ আর কান্নার
নদীতে ভেসে যাই রোজ...জানো তা?
এই
রূপকথার দেশে মেয়ের চোখের অশ্রুবিন্দু যেন জমাট বাঁধা কোন পাথর। কিছুতেই সেই
পাথরকে উন্মোচন করা যাচ্ছে না। জীবনের আলো ও অন্ধকার দুই জগতকে সঠিকভাবে চিনতে হলে
কি সেই জগতে জীবন যাপন জরুরী?
মা বাবাই বা এখন ফিরবে কি ভাবে?তাই
মেয়েকে জড়িয়ে মা গেয়ে উঠলেনঃ
“চারিদিকে চেয়ে
দেখো হৃদয় প্রসারী
ক্ষুদ্র
দুঃখ তব তুচ্ছ মানি...”!!