>

অরুণ চট্টোপাধ্যায়।

SongSoptok | 8/10/2014 |

                   একান্ত ব্যক্তিগত পর্ব - ৩


আমাদের ডাঃ গৌতম বৃদ্ধের কথা যেন শেষ হইয়াও শেষ হয় না । তাঁহার পরিবহন সম্পর্কিত আবিষ্কার “একান্ত ব্যক্তিগত ২” সমাধানের বদলে সমস্যা এনে ফেলেছে কিছু লোকের মধ্যে । অনেক সময় এ রকম হয় । কিছু লোকের যেখানে সমস্যা অন্য কিছু লোকের সেটাই সমাধান । যেমন ধরুন কম্পিউটারে ভাইরাস আসে বলেই তো এন্টিভাইরাসের এত চাহিদা । জল অশুদ্ধ হয়ে লোকের সমস্যা হয় বলেই তো ফিল্টার তৈরি আর বিক্রি করে অন্য কিছু লোকের সমাধান । অর্থাৎ এ জগত ময় শুধু একের সঙ্গে অন্যের খাদ্য-খাদকের সম্পর্ক । যেমন রুগি আছে তাই ডাক্তার আছে, চোর আছে বলেই না পুলিশ ?

কিন্তু বিজ্ঞানীরা বড় ভালমানুষ । এসব নিয়ে চিন্তা করেন না । তাঁদের ভাবনায় শুধু আবিষ্কারের নেশা । আর দু দুটো আবিষ্কার করে গৌতমবাবুও এখন বড় বিজ্ঞানী । তাই তিনিও গ্যালিলিও হতে চান নি । প্রহরীর চোখে ধুলো নিজের গৃহের মায়া কাটিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন । না যেদিকে দুচোখ যায় এই চিন্তা নিয়ে নয় । যেদিকে আছে গাছের সারি এই ভাবনা নিয়ে ।

বেরিয়ে চলে এসেছেন কোন একটা স্টেশনে । আসলে তাঁর নিজের স্টেশনে আসতে ভরসা হয় নি কারণ প্রহরীরা আবার যদি তুলে নিয়ে যায় । একটা দূরের কোন স্টেশনের টিকিট কেটে প্ল্যাটফর্মে ঢোকার মুখেই শুনলেন খবরটা । কোথায় একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে ট্রেন বন্ধ । এই মরেছে । 

একটু ভাবতে হবে । ভাবার জন্যে বসতে হবে । বসার জন্য আবার একটা গাছ পেলে মন্দ হয় না। গাছের নিচের হাওয়া নাকি বেশ ঠাণ্ডা আর বিশুদ্ধ । গাছ নাকি বাতাসের অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিয়ে বেশী করে অক্সিজেন দেয় ।

খুজছেন এপাশ ও পাশ কিন্তু গাছ কই । সারা প্ল্যাটফর্ম জুড়েই তো মাথার ওপর শেড । এটা একটা নতুন স্টাইল । যাত্রীরা একটুও জলে ভিজবেন না বা রোদে পুড়বেন না । টিকিট কাটার পর থেকেই আপনার মাথা আমার জিম্মেয় । আমার মানে রেল কোম্পানির । আপনার মাথা থাকবে কি না থাকবে সে আমি বুঝব । পয়সা দিয়ে টিকিট কেটেছেন না ? সে কি আর এমনি এমনি ?

অতএব একটাও গাছ নেই কোত্থাও । যে সব বৃহৎ বৃহৎ বৃক্ষরা ছিলেন তাঁদের বনস্পতির মর্যাদা খুইয়ে শুধু পাতাহীন প্রকাণ্ড কাণ্ডখানা পেটে জড়িয়ে ধরে হাত পা গুটিয়ে বসে আছেন কবে এ কালের আলিবাবারা উদ্ধার করে নিয়ে যায় । এর থেকে কেউ দরজা জানলা হবেন কি কেউ বা শুধু জ্বালানী তার খবর কে নেয় আর কে দেয় ?

কি আর করবেন বেরিয়ে এলেন । বেরিয়ে এসে পড়লেন বাস রাস্তায় । বাসে করেই যাবেন কোনও অজানা জায়গায় । যেখানে কোনও পোপের কোপে পড়ে কোনও খোপে পড়ে থাকতে হবে না সারা জীবনের মত । আর যদি পেয়ে যান মনের মত কোনও গাছ তো তৃতীয় বারের জন্য নিউটন হওয়া আটকায় কে ?

বাস নেই রাস্তায় । আর বাস কেন নেই লরি, ট্যাক্সি, ম্যাটাডোর, রিক্সা কিচ্ছু । বন্ধ চলছে এখন এ রাস্তায় । অবরোধ । কারণ একটা দুর্ঘটনা । দুর্ঘটনার কারণ একটা হাঁই ফাই করে ছুটে চলা বাসের সঙ্গে একটা নিরীহ ছোট্ট মোটর গাড়ীর মুখোমুখি ধাক্কা । ড্রাইভার সমেত সামনের সীটের একজন আরোহীর ঘটনাস্থলে মৃত্যু আর পেছনের সীটের দুজন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে ।

এই লাগামহীন গাড়ী চালকের শাস্তি চাই । ঐ খুনী বাস ড্রাইভারের বিচার চাই । জনতা খেপলে তো নিস্তার নেই । বনধের চেহারা নেবেই । অতএব ডাঃ গৌতমের এখন প্রধান চিন্তা তিনি পালাবেন কোন পথে ।

অবশেষে পথ পাওয়া গেল । একজন পরামর্শ দিল গঙ্গা পেরিয়ে ওপারে যান মশাই । বাস পেয়ে যাবেন । শুধু বাস কেন বাস, ট্রেন, ট্যাক্সি, লরি ট্রাক সব – সব কিছু । অতএব ধরা গেল নৌকো। এ পারে পৌঁছে বাস ধরার আগেই খিদে পেয়ে গেল । খেতে না খেতে পেল ঘুম । রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই পেলেন একটা বেশ বড় সড় নিমের গাছ । নিমগাছের পাতা তেঁতো হলেও তার ফাঁক দিয়ে বেরোন বাতাস নাকি ভারি মিষ্টি হয় । তাছাড়া চর্ম-শুদ্ধিতেও নাকি নিমের জুড়ি নেই । স্বগৃহে পরের ইচ্ছায় অন্তরীন থাকার জন্যে তাঁর এলারজিটা বোধ হয় আবার বেশ মাথা চাড়া দিয়েছিল । এখন ট্রেনেও চড়েন না যে হকার-ডাক্তারের কাছ থেকে এক ফাইল চাল মোগরার তেল কিনে মাখবেন । তাই ভাবলেন মন্দ কি । ঘুম, বিশ্রাম হবে আবার সারানো যাবে স্কিন ডিজিজটাও ।

টানা দু ঘণ্টা নিশ্চিন্ত নিদ্রা । তবে সেই ঘুমের মাঝে একটা স্বপ্ন বা বলা যায় দুঃস্বপ্ন তাঁকে বড় বিব্রত করছিল । ঐ বাস-মোটরের দুর্ঘটনা । আচ্ছা এমন কিছু কি করা যায় না যাতে –

সেই নিমগাছ তাঁকে আবার নিউটন করল । তৃতীয় বারের জন্য । নিউটন হয়েই তিনি ছুটলেন সোজা এক টিভি চ্যানেলের দিকে । যেটা এরপর থেকে নিরন্তর টেলিকাস্ট করে চলল একটি খবর । মানে ডাঃ গৌতমের শেষতম আবিষ্কার যার নাম তাঁর নিজের ভাষায় হল “একান্ত ব্যক্তিগত -৩” ।

কি বৈশিষ্ট এই যন্ত্রের ? এটা হল এন্টি-কলিশন ডিভাইস । এই যন্ত্র অন্য যন্ত্রের সঙ্গে ধাক্কা নিরোধ করবে । অর্থাৎ যে গাড়ীতে এই যন্ত্র বাঁধা থাকবে সে একটা সিগন্যাল ছড়াবে । সেই সিগন্যাল তার থেকে একশ ফুট দূরত্বের কোনও গাড়ীর ভেতর সম-চৌম্বক ধর্ম আরোপ করবে যেটা মাত্র পঞ্চাশ ফুটের মধ্যে এলেই কাজ শুরু করে দেবে অর্থাৎ নিজের ও অন্য গাড়ীর গতি কমিয়ে দেবে আর ধাক্কা হবে না ।

অনেকে হতাশ হয়ে বলবেন, ফুস এ যন্ত্র তো ভারতীয় রেল বিভাগ আগেই বার করে ফেলেছে । হ্যাঁ রেল বিভাগ রেলের কর্তব্য করেছে । আর ডাঃ গৌতমের মত সাচ্চা মানুষ মানুষের কর্তব্য করেছেন ।

বুঝতে দেরি হচ্ছে ? কষ্ট হচ্ছে ? তবে শুনুন এই যন্ত্র শুধু গাড়ির সঙ্গে গাড়িরই নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের কলিসন মানে ধাক্কা আটকাবে । যেমন ধরুন কোনও সুন্দরী মেয়েকে দেখলেই যে সব পুরুষের একটু গা ঘেঁষতে ইচ্ছে হয় তারা পড়বেন মুশকিলে । এই যন্ত্র যে সমমেরু আরোপ করবে । মানে পুরুষটিও যে যন্ত্রের গুনে সাময়িক নারীত্ব প্রাপ্ত হবেন । তাই আর আকর্ষণ তো এমনিতেই বিনষ্ট । আর যদি হন “হোমো’র দলের কেউ তো যন্ত্রের গুনে তিনি হয়ে যাবেন বিপরীত মানে তিনি হবেন একজন পুরুষ । নারীপুরুষে কি আর “হোম সার্ভিস” দেওয়া যায় ?
তাই তো এটা হয়েছে আর একটা “একান্ত ব্যক্তিগত” ।

সিনেমা হলে এক রূপসীর পাশে বসে থাকতে থাকতে এক দর্শকের তো হঠাৎ ধর্ষক হতে ইচ্ছে হয়েছিল । তা ওর চোখের গতিবিধি দেখেই ঠিক ধরে ফেলল মেয়েটি । অমনি চকচকে লেডিস ব্যাগ থেকে ঝকঝকে সেই যন্ত্র মানে ডাঃ গৌতমের “একান্ত ব্যক্তিগত” বার করে হাতে বেঁধে ফেলল মেয়েটি ।

আর অমনি যায় কোথা । মুহূর্তে সেক্স চেঞ্জ । ছেলেটি গলা মিহি করে বলল, নায়কটা না কি দুষ্টু আর কি দুষ্টু ।
দুজনে কাঁধে কাঁধ দিয়ে সমস্ত সিনেমাটা দেখল, পপ কর্ণ খেল । অন্য অঙ্গগুলো স্রেফ ভোঁতা হয়েই রইল ।
এবার বোধহয় ডাঃ গৌতমের ভারতরত্ন হবার বাধা আর থাকল না ।

  









Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.