>

সাঈদা মিমি।

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 8/10/2014 |

       
  লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি, (বরিশাল)

অনুভব

সময়ের কোন পৃষ্ঠায় মগ্ন হয়ে গেলে বর্তমানে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না। এরকম বহুবার হয়েছে, অসংখবার কোন কালের দুয়ারে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছে, সম্ভবত এখানে আমিও ছিলাম! এখন যা নির্জন, কয়েক বছর আগে এখানে শোনা যেতো অশ্বারোহীর হাঁকডাক, ঘোড়ার পদশব্দ, জমে ওঠা বাজার, ঘুম ভেঙ্গে অন্দর বাড়ির তোড়জোড়, কাছারি ঘরের ব্যস্ততা। লাকুটিয়া জমিদার বাড়ির প্রবেশ মুখে দাঁড়িয়ে আবার সেইরকম অনুভুতি ফিরে এলো।



বর্ণনায়
বরিশাল শহর থেকে উত্তর দিকে, বেশ খানিকটা দুরেই, বাজার ছাড়িয়ে লাকুটিয়া জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ।রাজা রায়চন্দ্র রায় কর্তৃক উনিশ শতকে নির্মিত এই বাড়িটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পীঠস্থান হিসেবে ব্যাপক পরিচিত ছিলো। এই পরিবারের সদস্যদের খ্যাতি ছিলো প্রজাকল্যাণ এবং বিবিধ জনহিতকর কার্যক্রমে। এর ধারাবাহিকতায় কালিন সময়ে বরিশাল শহরে নির্মিত হয়েছিলোরাজচন্দ্র কলেজ শেরে বাংলা ফজলুল হকের মত ব্যাক্তিত্ব এই কলেজে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন।

বরিশাল ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হিসেবে লাকুটিয়ার জমিদারেরা সবসময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। সেই সময় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কয়েকবার বরিশালে এসেছিলেন এবং রাজচন্দ্রের পরিবারের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের বৈবাহিকসূত্রে আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরী হয়েছিলো। পরবর্তী সময়ে দেবকুমার রায়চৌধুরীর নেতৃত্বে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, সেই সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদার্পন ঘটেছিলো এখানে।



জনহিতকর নানা কাজের ক্রমবর্ধমান ধারায় লাকুটিয়ার জমিদারেরা নির্মান করেছিলেন লাকুটিয়া সড়ক, রাখাল বাবুর পুকুর, পরেশ সাগর নামের সরোবর ইত্যাদি। অসমর্থিত সূত্র থেকে জানতে পারি, তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে এই এলাকায়পুষ্পরানী বিদ্যালয়নামে একটি স্কুল নির্মিত হয়েছিলো। এর কোন ঐতিহাসিক তথ্য আমি পাইনি, প্রাচীনতাকে ঘিরে কত গল্পই তো তৈরী হয়। সত্যি বলতে কি, এলাকাবাসীর কাছে বিশেষ কিছুই পাইনি জানার মতন, যখন শিক্ষিত প্রজণ্মই ইতিহাস ভুলে গছে, খেটে খাওয়া মানুষগুলো আমাকে কতটাই বা তথ্য দিতে পারবে? 

মাধবপাশার জমিদারদের সঙ্গেও লাকুটিয়ার জমিদারদের ছিলো গভীর এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক(উইকিপিডিয়া থেকে) তাঁরা খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন প্রজাকল্যান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে, বরিশাল কে একটি উল্লেখযোগ্য জনপদে পরিণত করেছিলেন। এই খ্যাতি তাঁদের জন্য বয়ে এনেছিলো এক সীমাহীন বিড়ম্বনা, রক্ষনশীল গোঁড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন তাঁরা। এই রোষ এড়ানোর জন্য জমিদার রাখাল রায়চৌধুরী ধর্মীয় প্রায়শ্চিত্ত্বের মাধ্যমে তাঁর পুত্রদের হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হন।



আজ জমিদারী নেই, নেই জমিদারও। লাকুটিয়া জমিদার বাড়ির শেষ উত্তরাধিকারী দেবেন রায়চৌধুরী সপরিবারে কোলকাতা চলে যান, সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। দেবেন রায়চৌধুরীর কন্যা মন্দিরা রায়চৌধুরীর বিয়ে হয় বরিশাল কাশীপুরের মুখার্জি বাড়ীতে, শ্রদ্ধেয়া মন্দিরা মুখার্জি এখন সেখানেই বসবাস করছেন।


বাড়ির কিছু বর্ণনা

বৃষ্টি এবং মেঘের যৌথ অধিবেশন চলছিলো, রোদ মেঘের সাথেই প্রবেশ করলাম্ বাবুদের বাড়িতে, এলাকাবাসি এই নামেই বাড়িটিকে চেনে। ভগ্ন প্রাসাদের প্রবেশ মুখে রয়েছে কয়েকটি স্থাপনা, অজানা গুল্মের আশ্রয়ে। সদর দরজার দিকে এগোই, দক্ষিনে বিখ্যাত বউরানির দিঘি, জল এখনো টলটলে, শান বাঁধানো ঘাটে বাতাসের ফিঁসফাঁস। মুল ভবনের সামনে দাঁড়ালাম, দোতলা প্রাসাদ; এখন কি একে প্রাসাদ বলা যায়!

দোতলায় যাওয়ার কোনো উপায়ই নেই,বাইরের দিক থেকে উঠে যাওয়া সিঁড়ি ভেঙে স্তুপ হয়ে আছে। স্বাভাবিকভাবে সম্ভব নয়, উঠলাম মই বেয়ে, মইয়ের যোগান দিলেন বাসু দাদা। তাকে কোথায় পেলাম? বাড়িটি লীজ নিয়েছে বিএডিসি অফিস, সেখানেরই একজন কর্মচারি তিনি। দোতলায় জমে আছে ধূলার পাতারা, একটা শ্যাওলাপঁচা গন্ধ চারদিকে। শোবার ঘরগুলি, বসার জায়গা, রান্নাঘর, বারান্দা…… আরো একটু উপরের দিকে যাই, রেলিংবিহীন স্যাঁতসেতে ছাদ।ওখানেই দাঁড়িয়ে দেখি, বাড়ির পেছনের শান বাঁধানো অংশে ধান শুকানো হচ্ছে। সময়টা বৃষ্টির তাই ধানের পাশে তেরপল ফেলে রাখা।

নিচে নেমে আসতেই বাসু দাদা জানালেন, তার পূর্বপুরুষের মুখে শুনেছেন, এই শান বাঁধানো অংশে ছিলো আকর্ষণীয় জলসাঘর, বসতো সঙ্গীতের আসর, কবিতার আড্ডা। কোলকাতা থেকে বড় কবিরা আসতেন। আরো দূরে চোখ যায়, পশ্চিমের ঢালে কয়েকটা ছোট ছোট মন্দির, ইঁটের পাঁজর দাঁড়িয়ে আছে। ওখানে দুর্লভ কষ্টিপাথরের কিছু মূর্তি ছিলো, এখন নেই। লতাগুল্ম আর কাঁটাওয়ালা উদ্ভিদ ঘিরে রেখেছে পথটা। বাসু দাদার দিকে তাকাই, :ওখানে যাওয়া যায় না দাদা? :না যাওয়াই ভালো, সাপ আছে।


ফেরাপথ
ফিরছি, বাড়িমুখো পথ।কিছু কি ফেলে এলাম? আত্মার একটি কণা? হ্যাঁ, রেখে এসেছি, অনেককাল আগের এক আনন্দআশ্রমে।
তথ্যসূত্র:বৃহত্তর বরিশালের ঐতিহাসিক নিদর্শন : সাইফুল আহসান বুলবুল , এলাকাবাসীর কাছ থেকে পাওয়া কিছু মিশেল তথ্য।
কৃতজ্ঞতায়: শ্রদ্ধেয় কবি 'মোশতাক আল মেহেদি কে তাঁর ফেসবুক ওয়ালে লাকুটিয়া জমিদার বাড়ীর ছবিগুলি দেখার পর থেকেই, অস্থির হয়ে উঠতে থাকি তথ্যের জন্য
Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.