>

কথা কবিতা।

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 8/10/2014 |
                      বাইশে শ্রাবণ


বাইশ শ্রাবণ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণের দিন (১৮৬১-১৯৪১)সাহিত্য হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কাব্য পড়েছি, সাহিত্যের ছাত্রী হিসেবে রবীন্দ্রনাথের সমগ্র রচনা পড়েছি। পরীক্ষা পাসের তাড়া থাকাতে অনেক বিষয় হৃদয়ঙ্গম হয় হয় করেও হয়ে উঠেনি। বরং কিছু বিষয় আমার কাছে কঠিনই ঠেকেছে। তবে সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে যখন রবীন্দ্রনাথকে নিবিষ্টমনে পাঠ করলাম তখন রবীন্দ্রজগত বহুমাত্রিক রূপ নিয়ে আমার অন্তর্লোকে পাপড়ি মেলে দিয়েছে। যত পড়ি তত নব নব দিক উন্মোচিত হয়, যত ছাত্রদের বুঝাই তত ভাবের গভীরে তলিয়ে যাই। জগত ও জীবনের কোন দিকটা নেই রবীন্দ্র সাহিত্যে! বিজ্ঞান দর্শন আধ্যাত্মিকতা সমকাল, পুরাকাল,দেশ বিদেশের ধ্রুপদী সাহিত্য, রোমান্টিক সাহিত্য ---- সব একাকার হয়ে বিশ্বের বৈচিত্র্য ধারণ করেছে।

পাঁচ যুগেরও বেশি সময় ধরে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য সাধনা করেছেন। বাংলা সাহিত্যের সব কটি শাখা তার সৃষ্টিশীলতায় সমৃদ্ধ। এর মধ্যে কাব্য জগতের স্ফীতিই সব চেয়ে বেশি। জগতের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ, জীবনের সুখদুঃখহাসিকান্নাবিরহমিলনে রবীন্দ্র কাব্যজগত এক অলৌকিক মায়ার জগত। এ জগতের একপ্রান্তে আছে সীমার কথকতা অন্যপ্রান্তে অসীমের রহস্যময়তা, যা ভূমি ভূমা একই সূত্রে গ্রথিত করে 'প্রভাতে পথে লইয়া আসে,সন্ধ্যায় ঘরে লইয়া যায়। একবার তানের মধ্যে আকাশ-পাতাল ঘুরাইয়া,সমের মধ্যে পুর্ণ আনন্দে দাঁড় করাইয়া দেয়।" ভরা বর্ষায় যার মহাপ্রস্থান, তিনি তো বর্ষারই কবি। বাংলার বর্ষা প্রেম আর বিরহের যুগল সঙ্গীত।
রবীন্দ্রনাথের ভাবাকাশে বিভিন্ন বিষয় মেঘের মত ঘনীভূত হলেও মানবপ্রেম বর্ষা হয়ে অঝোর ধারায় ঝরেছে। রবীন্দ্র সাহিত্যের যা মূল বিষয়, রবীন্দ্রকাব্যের বিষয়ও তাই। অর্থাৎ জগত ও জীবন। জগত ও জীবনের যে তিন সত্য তার সমগ্র ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু, তা হলো প্রকৃতি প্রেম ও সৌন্দর্য। নিখিলের রূপ আর মানব প্রেম হর-গৌরী হয়ে রবীন্দ্রকাব্যে সর্বাঙ্গসুন্দর হয়েছে। যাকে আমরা সৌন্দর্য বলি।

মানুষের মহৎ অনুভূতির নাম প্রেম। রবীন্দ্র কাব্যের শুরুতেই প্রেম অলক্তপায়ে আসন করে নিয়েছে। কবির কৈশোরের প্রেমানুভূতি কাব্যের কৈশোর কালে এক চিন চিন ব্যথা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে -----

হেরো তমোঘন মরুময়ী নিশা ----
আমার পরান হারায়েছে দিশা,
অনন্ত ক্ষুধা অনন্ত তৃষা করিতেছে হাহাকার।
আজিকে যখন পেয়েছি রে তোরে
এ চিরযামিনী ছাড়িব কী করে।
এ ঘোর পিপাসা যুগযুগান্তরে মিটিবে কি কভু আর !
[
রাহুর প্রেম ঃ কাব্যগ্রন্থ- ছবি ও গান]
কবির প্রেমৈকসত্ত্বার এই চিন চিন ব্যথা তীব্র হয়েছে মানসী কাব্যে, ব্যথা থেকে মুক্তিও ঘটেছে এখানেই। বিষয়ের দিক থেকে 'মানসী' রবীন্দ্রনাথের প্রেমের কাব্য। যদিও মানসী পরবর্তী কাব্যগুলোতেও প্রেম একটা বিশেষ জায়গা দখল করে আছে, কিন্তু তারপরেও মানসী কাব্যেই রবীন্দ্রনাথের প্রেমবোধ অনেক প্রশ্ন আর জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়ে প্রেমচেতনায় রূপান্তরিত হয়েছে।  ১৮৮৪ সালে রবীন্দ্রনাথের বৌঠাকুরাণী কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করেন। রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তি জীবনের অনেক কিছুই অন্তরালে অবগুণ্ঠিত,, তবুও জানা যায় কবির 'পুরাতন' নামক কবিতার পরিপ্রেক্ষিতেই নাকি কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করেছেন।

কবিতাটি ছিল এরকম --
হেথা হতে যাও পুরাতন,
হেথায় নূতন খেলা আরম্ভ হয়েছে।
[
কবিতা- পুরাতন, কাব্যগ্রন্থ ছবি ও গান]

কাদম্বরী খুব কষ্ট পেলেন এ কবিতা পড়ে। তিনি ভাবলেন,নব বিবাহিত রবীন্দ্রনাথ তাকে উদ্দেশ্য করেই এ কবিতা লিখেছে।এখন তিনি তার কাছে পুরাতন। এদিকে বাস্তবক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ নাকি নববঁধুকে পেয়ে তার কৈশোরের খেলার সাথী থেকে একটু দূরে সরে গিয়েছিলেন। বয়স্ক স্বামীর সাথে বালিকা কাদম্বরী দেবীর তেমন মানসিক সম্পর্ক ছিল না,খেলার সাথী রবীন্দ্রনাথের অবহেলা পেয়ে তিনি খুব কষ্ট পান, উপরন্তু এই কবিতা অভিমানী কাদম্বরী দেবীকে ভীষণভাবে মর্মাহত করে।

এ কথা সত্য, বড় প্রেম ছাড়া বড় ভাবের জন্ম হয় না। বড় ভাব ছাড়া সাহিত্যে সাবলিমিটি আসে না। কাদম্বরী দেবীকে না হারালে হয়ত রবীন্দ্রনাথ আজ অন্য রবীন্দ্রনাথ হিসেবে পরিচিত হতেন।  প্রিয়জন হারিয়ে রবীন্দ্রনাথ বুঝলেন 'কি জানি কিসের লাগি প্রাণ করে হায় হায়'সাথী হারা বেদনায় রবীন্দ্রনাথ যেন শায়কবেঁধা পাখি। কবির মনে প্রশ্ন এলো, এর নাম যদি প্রেম হয়, তাহলে প্রেমের স্বরূপ কী?  এবার কবি প্রেমের স্বরূপ নির্ণয়ে সচেষ্ট হলেন। মানসী কাব্যে তিনি প্রেমকে দু ভাগে ভাগ করেছেন। এক,দাম্পত্য প্রেম, দুই অদাম্পত্য প্রেম। গভীর অনুধ্যানের মাধ্যমে তিনি এ দুয়ের মর্মার্থ ও পার্থক্য উপলব্ধি করতে চাইলেন। নারী পুরূষের পারস্পরিক সম্পর্ক আর একে অপরকে পাওয়ার আকুতির নাম যদি প্রেম হয় তাহলে তো দাম্পত্য প্রেমই উৎকৃষ্ট হওয়ার কথা। কারণ এখানে পাওয়ার পথে বাঁধা নেই, সমাজের রক্তচক্ষু নেই,হারানোর বেদনা নেই। কিন্তু দেখা গেল, বিবাহিত জীবনে ভালবাসার অভ্যাস আছে, কিন্তু হৃদয়ের সেই আকুতি নেই, যে আকুতি মিলনেও বিরহ আনে। 'নারীর উক্তি' কবিতায় আবহমান নারী তার উদ্দিষ্ট পুরূষকে নানাভাবে অভিযুক্ত করে বলছে ---

সর্বত্র ছিলাম আমি এখন এসেছি নামি
হৃদয়ের প্রান্তদেশে,ক্ষুদ্র গৃহকোণে। (নারীর উক্তি)
উত্তরে চিরায়ত পুরূষ বলছে, ----
'
তুমি কেনো মূর্তি হয়ে এলে
রহিলে না ধ্যান ধারণার। (পুরূষের উক্তি)
অর্থাৎ ভোগে প্রেম থাকে না। দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মানসিক সম্পর্কের নাম প্রেম নয়। তাহলে প্রেম কোথায়? এ রকম একটা প্রশ্ন থেকে রবীন্দ্রনাথ অদাম্পত্য প্রেম নিয়ে গভীরভাবে ভাবিত হলেন। দেখা গেল অদাম্পত্য প্রেমেও সুখ নেই। এখানেও প্রিয়বিরহ সারাক্ষণ হৃদয়কে ব্যথিত করে রাখে -----

এমন করিয়ে কেমনি কাটিবে মাধবী রাতি,
দখিনে বাতাসে কেহ নাই পাশে সাথের সাথী।
(
কবিতা- ভুলে,কাব্যগ্রন্থ-মানসী)
বুঝেছি আমার নিশার স্বপন হয়েছে ভোর,
মালা ছিল তার ফুলগুলি গেছে, রয়েছে ভোর (ভুল ভাঙ্গা, মানসী)
এভাবে কবি দাম্পত্য প্রেম আর অদাম্পত্য প্রেমের তুলনামূলক ছবি এঁকে প্রেমের স্বরূপ অনুধাবন করতে চেয়েছেন। দেখা গেল, দাম্পত্য জীবনেই হোক আর অদাম্পত্য জীবনেই হোক, প্রেমে কোথাও শান্তি নেই। তাই যদি হয়, তাহলে কেন মানুষ প্রেমের পথে আত্মবিসর্জন দেয়? কেন লায়লির প্রেমে কয়েস মজনু হয়ে যায়? ফরহাদ কেনো শিরির জন্য পাহাড় কেটে নদীর গতি পথ পাল্টে দেয়। কেন কালে কালে যুগে যুগে রচিত হয়ে চলেছে রোমিও জুলিয়েট, অর্ফিয়াসের কাহিনী? এ কেমন অনুভূতি,যা চাইলে পাওয়া যায় না, যা না পেলে জীবনটা মরুতে পথ হারায়!
কবির
পথ এ জিজ্ঞাসা উচ্চারিত হয়েছে 'মেঘদূত' কবিতায় -----
ভাবিতেছি অর্ধরাত্রি অনিদ্র নয়ান---
কে দিয়েছে হেন শাপ, কেন ব্যবধান?
কেন উর্ধ্বে চেয়ে কাঁদে রুদ্ধ মনোরথ?
কেন প্রেম নাহি পায় আপনার?

এই জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ এক অতিন্দ্রীয় জগতের সন্ধান পান, প্রেম সম্পর্কেও তার একটা ধারণার জন্ম হয়। কবির এ ধারণার বহিঃপ্রকাশ ঘটে 'নিষ্ফল কামনা' কবিতায়। এ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন, প্রেম মহৎ উপলব্ধির নাম। একে ভোগ দিয়ে, প্রবৃত্তি দিয়ে খর্ব করা যায়, কিন্তু অর্জন করা যায় না। তাই তো কবি বলেছেন ---

'যে জন আপনি ভীত,কাতর দূর্বল,
আপন হৃদয়ভারে পীড়িত জর্জর
সে কাহারে পেতে চায় চিরদিন তরে ?
ক্ষুধা মেটাবার খাদ্য নহে যে মানব
কেহ নহে তোমার আমার।'
এতএব, --
'ভালবাসো, প্রেমে হও বলী
চেয়োনা তাহারে।
আকাঙ্ক্ষার ধন নহে আত্মা মানবের।' ( নিষ্ফল কামনা---মানসী)

এরপরই কবির প্রেমবোধের উত্তরণ ঘটে প্রেমচেতনায়। তিনি যখনই প্রেমকে পৃথিবীর মালিন্য থেকে, প্রবৃত্তির ক্ষুধা থেকে, প্রয়োজনের খাতা থেকে, স্বার্থের নাগপাশ থেকে মুক্তি দিয়েছেন তখনই তার প্রেম জগতের সৌন্দর্যের সাথে একীভূত হয়ে অসীমের দিকে ধাবিত হয়েছে। কবির কামনা বাসনামুক্ত প্রেমের অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে 'সুরদাসের প্রার্থনা' কবিতায়।
অন্ধ সুরদাস হিন্দি ভাষার কবি। তিনি দৃষ্টি দিয়ে পৃথিবীকে দেখতে পান না বটে, কিন্তু অনুভূতি দিয়ে পৃথিবীর যে রূপ রস তিনি পান করেছেন, তা চক্ষুষ্মানের মানুষের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তেমনি ইন্দ্রিয় দিয়ে চাওয়ার নাম প্রেম নয়, অনুভূতি দিয়ে উপলব্ধি করার নামই প্রেম। প্রেম একটি পিপাসার নাম, অতৃপ্তির নাম, যা মানুষকে পিপাসিত রেখে, অতৃপ্ত রেখে ক্ষুদ্র থেকে বৃহতের, সীমা থেকে অসীমের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

কবির ভাষায় -----
অপার ভূবন, উদার গগন, শ্যামল কাননতল,
বসন্ত অতি মুগ্ধ মূরতি, স্বচ্ছ নদীর জল,
বিবিধবরণ সন্ধ্যানীরদ গ্রহতারাময়ী নিশি,
বিচিত্রশোভা শস্যক্ষেত্র প্রসারিত দূর দিশি,
ইহারা আমায় ভুলায় সতত, কোথা নিয়ে যায় টেনে,
মাধুরীমদিরা পান করে শেষে প্রাণপথ নাহি চেনে।
তোমাতে হেরিব আমার দেবতা, হেরিব আমার হরি,
তোমার আলোতে জাগিয়া রহিব অনন্ত বিভাবরী।
(
সুরদাসের প্রার্থনা ঃ মানসী).









Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.